
ওড়িশার কালাহান্ডিকে দেশ চিনেছে ‘কালাহান্ডি সিনড্রোম’ দিয়ে। কালাহান্ডি মানে যেন দুর্ভিক্ষ, অনাহারের মুমূর্ষুতা। সেই ভূমির তরুণ, কিশোর। দক্ষিণী মশলা ছবির ভীষণ ভক্ত ছেলেটি এখন হাত ধরেছে আন্দ্রেই তারকোভস্কির। রূপকলা কেন্দ্রের পরিচালনা বিভাগের ছাত্রটি প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আধঘণ্টা আগে চলে আসে। রোজ একটু একটু করে দেখে ‘স্টকার’। শুষে নেয় সিনেমার ভাষা। প্রতিদিন বোধ বদলায়।
অ্যানিমেশন, মোশন পিকচার ফটোগ্রাফি, পরিচালনা, সম্পাদনা, সাউন্ড ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনের মতো বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স করার সুযোগ রয়েছে এখানে। সত্যজিৎ রায়ের স্বপ্নের ফসল রূপকলা কেন্দ্র। ২০০১ সালে জন্ম। ২০০৪ সালে পাশ করে প্রথম ব্যাচ।
ফারহা খাতুন। দু-দুটো জাতীয় পুরস্কার ঝুলিতে। ভারতীয় ছবির দুনিয়ায় এখন নিয়মিত চর্চায় থাকা এক নাম। মেদিনীপুরের বেলদা থেকে ক্লাস করতে আসতেন। প্রতি শুক্রবার চারটের মধ্যে ইনস্টিটিউট থেকে বেরিয়ে ট্রেন ধরতে হত। স্টেশনে নেমে বুরখা পরে তবেই গ্রামে ঢুকতে পারতেন ফারহা। এই ধরাবাঁধায় চলতে গিয়ে বহু দিন খাওয়া ভুলতে হয়েছে। ‘হোলি রাইটস’ আর ‘আই অ্যাম বনি’ তথ্যচিত্রের জন্য ৬৫ এবং ৬৭তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু তাঁর পুরোনো দিনগুলো সিনেমা পাগল বহু ছেলেমেয়ের অনুপ্রেরণা।
এমন বহু গল্প কান পাতলেই শোনা যায় রূপকলা কেন্দ্র (Roopkala Kendro)-এর ক্যাম্পাসের আনাচে-কানাচে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য ও সংস্কৃতি বিভাগের অধীনস্থ একটি ফিল্ম অ্যান্ড সোশ্যাল কমিউনিকেশন ইনস্টিটিউট, রূপকলা কেন্দ্র। ঠিকানা সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। অ্যানিমেশন, মোশন পিকচার ফটোগ্রাফি, পরিচালনা, সম্পাদনা, সাউন্ড ডিজাইন এবং ডেভেলপমেন্ট কমিউনিকেশনের মতো বিভিন্ন বিষয়ে পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা কোর্স করার সুযোগ রয়েছে এখানে। সত্যজিৎ রায়ের স্বপ্নের ফসল রূপকলা কেন্দ্র। ২০০১ সালে জন্ম। ২০০৪ সালে পাশ করে প্রথম ব্যাচ।
শুধু সিনেমাকে ভালোবেসে সিনেমা জীবন গড়তে চায়, কিন্তু সাধ আর সাধ্যের লড়াইতে জেরবার তাঁদের স্বপ্নকে প্রশ্রয় দেয় এই প্রতিষ্ঠান। ধোপদূরস্ত জামাকাপড়, কথায় কথায় ফটফটে ইংরেজি হয়তো কিশোরের মতো সিনেমা পড়ুয়াদের নেই, কিন্তু যা আছে তা হল সিনেমাকে শিরায়-মগজে হৃদয়ে ধারণ করার ক্ষমতা।
এ-বছর ৩১তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রূপকলা কেন্দ্রের ছাত্রছাত্রীদের তৈরি ছবির জন্য রাখা হয়েছে সম্পূর্ণ একটি আলাদা বিভাগ। তথ্যচিত্র, এনিমেশন, ডিপ্লোমা মিলিয়ে ২৩টি ছবি নির্বাচিত হয়েছে। রূপকলার ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ব্যাচের কাজ রয়েছে এই তালিকায়। রূপকলা বিভাগের অন্তর্ভুক্তি প্রতিষ্ঠানের আধিকারিক কৃত্তিবাস নায়ক ও যুগ্ম পরিচালকদের প্রচেষ্টায় সম্ভব হয়েছে। রূপকলা কেন্দ্রের ডিরেকশন বিভাগের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার সৌমেন্দু ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এই খবরে ছাত্রছাত্রীরা খুব খুশি। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে অতীতেও তাদের তৈরি ছবি দেখানো হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে পুরস্কার ও স্বীকৃতিও এসেছে, কিন্তু এভাবে আলাদা বিভাগ বাড়তি উৎসাহ জোগাচ্ছে। এক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা যেমন নিজেদের কাজ দেখাতে পারবে, তেমনই সিনিয়রদের কাজ দেখার সুযোগ পাবে। আসলে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসব সকলের কাছেই যেন পৃথিবীর জানলা খুলে দেয়।”
রূপকলা কেন্দ্রের ডিরেকশন বিভাগের হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার সৌমেন্দু ভট্টাচার্য বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এই খবরে ছাত্রছাত্রীরা খুব খুশি। কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবে অতীতেও তাদের তৈরি ছবি দেখানো হয়েছে। দেশের নানা প্রান্তে পুরস্কার ও স্বীকৃতিও এসেছে, কিন্তু এভাবে আলাদা বিভাগ বাড়তি উৎসাহ জোগাচ্ছে।”
প্রসঙ্গত, এ বছর চলচ্চিত্র উৎসবের ট্যাগলাইন- ‘চলচ্চিত্র মেলায় বিশ্ব’। ওটিটি, নিত্য নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কি বদলে দিচ্ছে না এই ধারণা? ছাত্রছাত্রীদের প্রতি অগাধ স্নেহশীল এক শিক্ষকের আবেগ ঝরে পড়ল তাঁর কথায়। তিনি বলেন, “রূপকলাকেন্দ্র প্রান্তিক মানুষের জন্য। প্রান্তিক পড়ুয়াদের সিনেমা শিল্পে আনাই যার অন্যতম উদ্দেশ্য। চমকের দুনিয়ার বাইরেও আর্থিকভাবে পিছিয়ে ছাত্রছাত্রীরা যাতে সিনেমার পাঠ নিতে পারে, মেধার উৎকর্ষে এই শিল্পক্ষেত্রে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে সেটাই মূল লক্ষ্য।”
কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০২৫-এ সপ্তাহব্যাপী রূপকলা কেন্দ্রের প্রতিটি ছবি দেখা যাবে শিশির মঞ্চে। ২৩টি ছবির তালিকা দেখুন নিচে:



সিনেমা আসলে স্বপ্নদেখা আর উত্তরণের পরিক্রমা। অনেক দূরে অভাবী গ্রামের ছোট্ট ঘরে বসে যে মেয়েটা স্বপ্ন দেখে বিশ্বজয়ের, আর যে ছেলেটা পাড়ি দেয় ভিন শহরের অজানায় তাদের বুকে বায়োস্কোপের বাস। উৎসবের শহরে নন্দনের আলো মোড়া চত্বরে তাদের স্বপ্নগুলো এভাবেই অক্সিজেন পায় বাধা জয়ের। যেতে হবে যে অনেক দূর… কিফ-এর ওয়েবসাইটে জ্বলজ্বলে ‘রূপকলা’ সেই বার্তা-ই যে দিচ্ছে!

