‘বৌদ্ধ’ কলকাতা : চেনা শহর ও অচেনা গল্প

ফো গুয়াং শান বুদ্ধ মন্দির, ট্যাংরা

থায় আছে ‘অতিথি দেব ভবঃ’। ততৈত্তরীয় উপনিষদে বর্ণিত এই মর্মটির সর্বোচ্চ নিদর্শন আমরা এই মহানগরে দেখি। কলকাতা (Kolkata) ছাড়া এমন সংগঠিত সহাবস্থান আর কোথাও আছে কী না সন্দেহ। কলির শহর কলকাতা। কালের শহর কলকাতা। সামান্য তিন গ্রাম থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আজকের ব্যাপ্তি, সময় খুব একটা কম হল না। যুগ যুগ ধরে বয়ে চলা এই আবহমান ইতিহাসে যুক্ত হয়েছে নানা পর্ব। কখনও ভাষা, কখনও ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, কখনও আবার নতুন জনগোষ্ঠী, সকলকেই সাদরে গ্রহণ করেছে এ শহর। গ্রাম্য সরল কৃষকটির মতো পেতে দিয়েছে আসন, এগিয়ে দিয়েছে আপ্যায়নের রোদ। অবশ্য গতানুগতিকের চোখে কিছুটা ব্রাত্য সেসব। অনালোচিত তেমনই এক অধ্যায়ের কথা আজ আমরা দেখব। (কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি)

তখন কোম্পানি আমল। রাজধানী কলকাতায় যজ্ঞি বাড়ির ব্যস্ততা। উপমহাদেশীয় বাণিজ্যের অভিমুখ পরিবর্তিত হওয়ায় একে একে ভিড় জমাচ্ছে বহু জাতি। এর মধ্যে পাশ্চাত্যের ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, ইটালিয়ান, পর্তুগিজ, গ্রিক, আর্মেনিয়ান, ইহুদি যেমন আছে, তেমনই আছে চিনা, তিব্বতি, সিংহলি ও জাপানি মানুষজন। প্রাচ্যের এই একাংশের হাত ধরেই বৌদ্ধদের সংস্পর্শে আসে শহর। যদিও বৌদ্ধধর্ম বাংলায় নতুন কিছু না। স্বয়ং গৌতম বুদ্ধের সময় থেকেই যোগাযোগ ছিল। এরপর অশোক তথা পাল রাজবংশের অধীনে, উল্লেখযোগ্য বিস্তৃতি লাভ করে বৌদ্ধধর্ম। পাল রাজাদের আমলে বৌদ্ধদের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তৎকালীন সমাজ, সাহিত্য, শিল্প, দর্শনে সে ছাপ স্পষ্ট। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন ‘চর্যাপদ’ আসলে সহজিয়া সাধনপদ্ধতি। অন্যদিকে প্রথম সচিত্র গ্রন্থ ‘মঞ্জুশ্রী মূলকল্প’-এ রয়েছে বজ্রযানী আচার উপাচার। এছাড়া সোমপুর, জগদ্দল, রক্তমৃত্তিকা অথবা অতীস দীপঙ্করের মতো ব্যক্তিত্ব থেকে, বঙ্গের সুদৃঢ় বৌদ্ব প্রভাব সহজেই অনুমেয়। সে এক অন্য প্রসঙ্গ। আপাতত আলোচনায় ফেরা যাক। (কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি)

না-মু-ম্যো-হো-রেন-গে-কো, অর্থাৎ পদ্মসূত্রের পথে আমি নিবেদিত

সেকেলে কলকাতা ছিল বহুমাত্রিক। মিশ্র সংস্কৃতির বাহক এই নগরীতে এক অনন্য মাত্রা যোগ করে বৌদ্ধ ঐতিহ্য। আধুনিক কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি, মূলত এশিয়া থেকে আসা বিভিন্ন সম্প্রদায় ও বাংলায় বৌদ্ধধর্মের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। এ সাপেক্ষে বৌদ্ধ উপাসনাক্ষেত্রগুলির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। আজও শহরে বেশ কিছু মঠ-মন্দির আমাদের চোখে পড়ে। যেমন মহাবোধি সোসাইটি, বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা, নিপ্পনজান মায়োহোজি, কর্ম গণ বৌদ্ধ মঠ ইত্যাদি। শত ব্যস্ততার মাঝে নিজেদের ক্ষয়িষ্ণু উপস্থিতি বজায় রেখেছে তারা। (কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি)

সে এক অন্য পৃথিবী। সিঁড়ি ঘুরে দোতলায় আসতেই সিকিম! দেয়ালে চিত্র বিচিত্র নকশায় আঁকা আছে ফ্রেসকো। বুদ্ধজীবন, জাতকের গল্প ও পৃথিবীর নানান প্রান্ত থেকে আনা মূর্তিকল্পে মিশে যাচ্ছে অলীক সুবাস। মহাবোধি সোসাইটি। কলেজ স্কোয়ার সংলগ্ন বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে অবস্থিত এই বিহারটি, ১৯২০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন অনাগারিক ধর্মপাল। যদিও সোসাইটির প্রথম দপ্তর ছিল বৌবাজারে- ২০/১, গঙ্গাধর বাবু লেন। তখন ১৮৯২। সেখান থেকে ক্রীক রো হয়ে বর্তমানে অবস্থান। ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যে নানা স্থানে ঘুরে বেড়ান বছর ছাব্বিশের অনাগারিক। কখনও গয়া, সারনাথ, কুশিনগর কখনও আবার ছুটে যান সুদূর পশ্চিমে। ১৮৯৩ সালে আয়োজিত শিকাগো ধর্ম সভায়, বৌদ্ধধর্মের হয়ে বক্তব্য রাখেন তিনি। সে যুগের বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিরাই যুক্ত ছিলেন এর সঙ্গে। আজও নানান মানুষ সেখানে যান। বুদ্ধপূর্ণিমার দিন আয়োজিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। বিহারটি খোলা থাকে সকাল ছটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত। রয়েছে নিত্য পুজো ও ধ্যানের ব্যবস্থা। (কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি)

কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি শুধুমাত্র মন্দির-মঠেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধারার সহাবস্থান, রসনা, পোশাক ও রুচি শহরে বৈচিত্র্য এনেছে। এখানকার তিব্বতি এবং চিনা এলাকায় গেলে মুগ্ধ হতে হয়। মোমো, থুকপা-র আশ্চর্য ঘ্রাণে জেগে থাকে পাড়া। শহরের খাদ্যচিত্রে বৌদ্ধদের বিশেষ স্থান রয়েছে। অবশ্য স্থান বললে কিছুটা কম বলা হয়। তারচেয়ে বরং ‘বিপ্লব’ বলা ভালো।

মায়ানমার বুদ্ধ মন্দির, ইডেন হাসপাতাল রোড

এই কলেজ স্ট্রিট সংলগ্ন এলাকায় আরও দুটি মন্দির আছে। সূর্য সেন স্ট্রিট থেকে সোজা এগিয়ে আসুন সেন্ট্রাল এভেনিউয়ের দিকে। বড়ো রাস্তায় পৌঁছে এবার বাঁদিক নিন। চিরব্যস্ত ইডেন হসপিটাল রোডের বাড়িগুলো গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে থেকে বোঝার যো নেই। ওই কথায় আছে না, ‘ডোন্ট জাজ এ বুক বাই ইটস কভার!’ আকারে ইঙ্গিতে আপনাকে একটা চিঠিবাক্স খুঁজতে হবে, ‘Myanmar Buddhist Temple, 10 A Eden Hospital Road, Kolkata- 700073’। এখন অবশ্য বোর্ড টাঙানো থাকে। ১৯২৮ সালে, কলকাতার এই একক বর্মা মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন ইউ সেন মিন। সে যুগে এটি ছিল বিখ্যাত ধর্মশালা। বাড়ির এক ও দোতলায় আছে গেস্ট হাউস। তিন তলায় মন্দির। ছিমছাম তেতলার ঘরটা গাছে ফুলে ভর্তি। সোনালি সাজে উপবিষ্ট বুদ্ধ, মুদিত চোখে চেয়ে আছেন। একসময় বর্মা থেকে বহু মানুষ ভারতে আসতেন। কখনও উদ্বাস্তু, কখনও আবার জীবিকার তাগিদে। দিল্লি, মিজোরাম, অসমের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের কামারহাটি ও বারাসাতে বর্মাদের বসতি ছিল। কলকাতার পোদ্দার কোর্ট ও টেরিটি বাজার অঞ্চলেও তারা থাকতেন।

বর্মা মন্দির হয়ে এবার এগিয়ে আসুন বো ব্যারাকের দিকে। ক্রিসমাসে আলো ঝলমলে এই গলির পাশেই আছে বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা। ভারতে বৌদ্ধ দর্শন প্রসারের লক্ষ্যে ১৮৯২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন কৃপাশরণ মহাস্থবির। তাঁকে বলা হয় ‘The Maker of Modern Buddhist Bengal’। বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার বহুমুখী কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে সম্মেলন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, গুণিজন সম্বর্ধনা ও সর্বসাধারণের জন্য চিকিৎসালয়। এছাড়া পালি ভাষা ও সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এই প্রতিষ্ঠান।

নিপ্পনজান ময়োহোজি, লেক রোড

কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি শুধুমাত্র মন্দির-মঠেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধারার সহাবস্থান, রসনা, পোশাক ও রুচি শহরে বৈচিত্র্য এনেছে। এখানকার তিব্বতি এবং চিনা এলাকায় গেলে মুগ্ধ হতে হয়। মোমো, থুকপা-র আশ্চর্য ঘ্রাণে জেগে থাকে পাড়া। শহরের খাদ্যচিত্রে বৌদ্ধদের বিশেষ স্থান রয়েছে। অবশ্য স্থান বললে কিছুটা কম বলা হয়। তারচেয়ে বরং ‘বিপ্লব’ বলা ভালো।

উত্তর ও মধ্য কলকাতা পেরিয়ে পাঠক, এবার কিছুটা দক্ষিণে আসা যাক। লেক রোডের ওপরেই অবস্থিত শহরের একমাত্র জাপানি মন্দির, নিপ্পনজান ময়োহোজি। ১৯৩৫ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন জনৈক নিচিদাৎসু ফুচি। তিনি ছিলেন সাধক নিচিরেনের শিষ্য। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকে নিচিরেন স্বপ্ন পান, একদিন সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে যাবে তাঁর সূত্র। প্রায় ৬৫০ বছর পর, গুরুর সেই অপূর্ণতাকে পূর্ণ করতে ১৯৩১ সালে কলকাতায় আসেন নিচিদাৎসু। কথায় আছে, ‘Where there is a will, there is a way!’ প্রথমে অর্থাভাব হলেও, ফুচি সাহেবের অনড় মনোভাবে অনেকেই এগিয়ে আসেন। এঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিলেন যুগল কিশোর বিড়লা। মন্দির নির্মাণে ঢাকুরিয়ার জমি দান করেন তিনি। শহরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান নিপ্পনজান। এর স্থাপত্যে জাপানি সংস্কৃতির স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। সাদা রঙের এই মন্দিরটি, সাঁচি স্তূপের মতো দেখতে গম্বুজ ও জাপানি শান্তি বার্তার ফলক দ্বারা সজ্জিত। ‘না-মু-ম্যো-হো-রেন-গে-কো’ (Na – Mu – Myo – Ho – Ren – Ge – Kyo)। অর্থাৎ পদ্মসূত্রের পথে আমি নিবেদিত। মন্দিরের ভেতরে বুদ্ধের শ্বেতমূর্তি বিরাজমান। প্রতিদিন এখানে সন্ধ্যাপুজো হয়। তাইকো নামক বাদ্যযন্ত্রের তালে তাল রেখে, এক বিশেষ সুরে উচ্চারিত হয় ফলকের সাতটি সুর। সন্ধে নামলে দিনভাঙা আলো মাথায় করে কিছু শরণার্থী আসেন। নারী, পুরুষ, বৃদ্ধ, যুবক সকলেই। বছর তিরিশের এক ব্যক্তির কাছে আমরা পৌঁছে যাই।

–    এখানে কবে থেকে আসছেন?
–     কয়েক বছর ধরে।
–    আপনি কি নিয়মিত আসেন?
–    না, রোজ হয়তো হয় না। তবে মাঝে মধ্যে আসি।
–    কেন আসেন?
–    শান্তি পাই!
শহরের অনেকের কাছেই নিপ্পনজান ‘শান্তি প্যাগোডা’ নামে খ্যাত।

কর্ম গণ বৌদ্ধ মঠ, পদ্মপুকুর

লেকের ধার ধরে এবার বেরিয়ে আসুন। হাতে সময় থাকলে বালিগঞ্জে একবার ঢুঁ মারতে পারেন। এখানকার পদ্মপুকুর বা চক্রবেড়িয়া এলাকায় রয়েছে কর্ম গন বৌদ্ধ মঠ। ১৯৩০-এর দশকে বৌদ্ধ ভিক্ষু আক্কা দর্জি, দার্জিলিং থেকে এসে মঠটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের (কার্মা কাগ্যু শাখা) প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

কিছুটা ঢুঁ মারা যাক শহরের নব্য চায়না টাউন- ট্যাংরায়। অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় একদল চিনা মানুষ আসেন। প্রথমে টেরিটি বাজার, সেখান থেকে ১৯২০ সালে তারা ট্যাংরায় নতুন বসতি গড়ে। মূলত খানপানের জন্য খ্যাত হলেও, এখানেই রয়েছে কলকাতার বিচিত্র এক মঠ। ফো গুয়াং শান বৌদ্ধ মঠ। মন্দিরটি স্থাপিত হয় ১৯৯৮ সালে। তাইওয়ান ভিত্তিক সংস্থা বুদ্ধ লাইট ইন্টারন্যাশনাল, ৮, নিউ ট্যাংরা রোডে এটি প্রতিষ্ঠা করে। মঠের প্রবেশপথে চোখে পড়ে সিংহমূর্তি। কিছুটা খোলা, প্রশস্ত উঠোন পেরোলেই মূল হলঘর। এখানে সকলেই আসতে পারেন। নিত্য উপাসনার পাশাপাশি রয়েছে লাইব্রেরি ও ক্যালিগ্রাফি চর্চার ব্যবস্থা। এছাড়াও রেস্তোঁরা হিসেবেও রাজ করে তারা। দোকানটি সকাল ১১টা থেকে সন্ধে ৬টা পর্যন্ত খোলা। কোনও নির্দিষ্ট মেনু নেই। মূলত নিরামিষ জলখাবার বানায় তারা। তাছাড়া ভিন্ন স্বাদের চা খেতে অনেকেই ছুটে যান আজও। এছাড়াও নিউটাউন ও বাইপাস মিলিয়ে আরও কয়েকটি মোনাস্ট্রি আছে শহরে। আছে গড়িয়া বুদ্ধ মন্দির, ধর্মচক্র বিহার, বেদর্শন শিক্ষাকেন্দ্র। কলকাতার বৌদ্ধ সংস্কৃতি শুধুমাত্র মন্দির-মঠেই সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন ধারার সহাবস্থান, রসনা, পোশাক ও রুচি শহরে বৈচিত্র্য এনেছে। এখানকার তিব্বতি এবং চিনা এলাকায় গেলে মুগ্ধ হতে হয়। মোমো, থুকপা-র আশ্চর্য ঘ্রাণে জেগে থাকে পাড়া। শহরের খাদ্যচিত্রে বৌদ্ধদের বিশেষ স্থান রয়েছে। অবশ্য স্থান বললে কিছুটা কম বলা হয়। তারচেয়ে বরং ‘বিপ্লব’ বলা ভালো।

টিবেটান ডেলাইট

ইদানীং ছোটো-বড়ো হরেক রাস্তায় মোমো মেলে। দু-পা হাঁটতেই একটা করে দোকান। ফুচকা, বিরিয়ানি, চপের সঙ্গে রীতিমতো টেক্কায় নেমেছে মোমো। এক প্লেটে চারটে, পাঁচটা, সাতটা, কোথাও আবার আটটা। অনেকেই মোমোকে চাইনিজ ডিশ ভাবেন। তবে ব্যাপারটা সর্বৈব মিথ। মাংসের পুর ভরা এই পদটির উৎপত্তি আসলে তিব্বত দেশ থেকে। আনুমানিক সতেরো শতকে ওখানকার নেওয়ারি ব্যবসায়ীরা এটি আবিষ্কার করেন। ব্যবসার তাগিদে তারা নানান জায়গায় যেতেন। তাদের সঙ্গে সঙ্গে মোমোও সেখানে পৌঁছায়। প্রথমে নেপাল, এরপর দার্জিলিং, গ্যাংটক, কালিম্পং হয়ে ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে পাহাড়ি এলাকাগুলোতে। কলকাতায় মোমো অনেক পরে আসে। তখন আশির দশক। এলগিন রোড ক্রসিং-এর কাছে একটি দোকান খোলেন তিব্বতি দম্পতি। নাম ‘টিবেটান ডেলাইট’। এক সংকীর্ণ রহস্যময় গলি পেরিয়ে যেতে হয়। তবে ঢুকেই মনে হবে আরব্য রজনী। কোনটা ছেড়ে কোনটা নেবেন। ‘উই ওয়ের দ্য ফার্স্ট টু স্টার্ট মোমো। শহরে আমরাই প্রথম এটা আনি।’ বর্তমান মালিকের কথায়, “আমার শ্বশুরমশাই ব্যবসাটা শুরু করেন। হি ওয়াজ আ কাইন্ড ম্যান। তখন পঁচিশ পয়সায় মোমো পাওয়া যেত। যারা ছাত্র ছিলো, তাদের তিনি বিশেষ ছাড়ও দিতেন।” বছর খানেকের মধ্যে আরও কিছু দোকান এখানে গজায়। ‘অর্কিড’, ‘হামরো মোমো’, ‘ব্লু পপি’, ‘সিকিম হাউজ’ – সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে পটু। কারও নুডলস ভালো, তো কারও থুকপা, চপ সুয়ে। উত্তরে ‘গুঞ্জন’, দক্ষিণের ‘ডেনজং’ – সব মিলিয়ে কলকাতা আজও জমজমাট।

শহরের পরিচ্ছদেও বৌদ্ধরা ছাপ রেখেছেন। সামনেই শীত। নভেম্বর আসতেই সার দিয়ে সেজে ওঠে ওয়েলিংটন। ভুটানি ও তিব্বতি বিক্রেতারা এ সময় কাপড় আনে। পশমের মোলায়েম সোয়েটার, কম্বল, কানটুপি, মাফলার ও জ্যাকেটের পসরা! আজও বহু মানুষ সেখানে যান। পছন্দ মতো জিনিস কিনে আনেন। এছাড়া যারা পাহাড় ভালোবাসে, তাদের জন্যও আছে ব্যবস্থা। বাহারি গয়না অথবা শো পিস নিতে আজও কলকাতাবাসীর ভরসা চাম্বা লামা-রা।

এ শহরে এমন বহু পর্ব আছে। গল্প আছে নানান। বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, সকলেই এগিয়ে এসেছে। অবদান রেখেছে যে যার মতো। কলকাতার রন্ধ্রে মিশে আছে বহুত্ববাদ। যেকোনো শুভ কিছুকেই আমরা সহজে আপন করে নিই। ইদের চাঁদ থেকে পরেশনাথ, সান্তাবুড়ো থেকে লাফিং বুদ্ধা যুগ যুগ ধরে এ সবকিছুই বাঙালিকে দৃঢ় করেছে। উদার করেছে আরও। ‘আমাদের চিন্তাভাবনা দিয়ে আমরা পৃথিবী গড়ে তুলি’ – বুদ্ধের এ বাণী সত্য হোক। মিলেমিশে এভাবেই বেঁচে থাক বাঙালি। বেঁচে থাক প্রাণের শহর।

____________________
তথ্যসূত্র: কলকাতা- শ্রীপান্থ | ফুড কাহিনি- ইন্দ্রজিৎ লাহিড়ী | টেলিগ্রাফ | মহাবোধি সোসাইটি | বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকার

Written by