
অক্টোবর হল নোবেলের মাস। এই সময়টায় নোবেল প্রাপকদের নাম ঘোষণা করে রয়্যাল সুইডিস অ্যাকাডেমি। চলতি বছরের অক্টোবরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে বাঙালির। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেলপ্রাপ্তির ১১৩ বছর পর সাহিত্যে দ্বিতীয় বাঙালির নোবেল পাওয়ার স্বপ্নে বুক বেঁধেছিল বাংলা। কিন্তু তা অধরা থেকে গেল। ২০২৫ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেলেন হাঙ্গেরির লেখক লাজলো ক্রাসনাহোরকাই (László Krasznahorkai)। সুইডিশ অ্যাকাডেমি জানিয়েছে, সাহিত্যে ক্রাসনাহোরকাইয়ের সামগ্রিক অবদান মহাপ্রলয়ের ভয়াবহতার মধ্যেও যেন শিল্পের শক্তিকে স্বমহিমায় তুলে ধরে। রয়্যাল সুইডিস অ্যাকাডেমির মতে, ক্রাসনাহোরকাইয়ের সৃষ্টি ‘মনোমুগ্ধকর’ এবং ‘দূরদর্শী’।

‘ডেসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হ্যাভেনস’ হল ভ্রমণ কাহিনি। একুশ শতকের গোড়ায় চিন ভ্রমণ করেছিলেন ক্রাসনাহোরকাই। ২০০৪ সালে সেই ভ্রমণ কাহিনি প্রকাশ করে বুডাপেস্টের ‘ম্যাগভেটো পাবলিশিং’। ২০১৬ সালে তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে সিগাল বুকস।
এ-বছর সাহিত্যে নোবেল বাংলায় না এলেও, নোবেলপ্রাপক ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে কলকাতা তথা বাংলার। কলকাতায় গড়ে ওঠা এক বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা ‘সিগাল বুকস’ লাজলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের একমাত্র ‘নন ফিকশন’ বইয়ের প্রকাশক। বইটির নাম ‘ডেসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হ্যাভেনস’ (Destruction and Sorrow Beneath the Heavens)। সিগাল বুকসের সফর শুরু হয় আটের দশকে। প্রকাশনা সংস্থাটি ভারতীয় পাঠকদের কাছে বিদেশি সাহিত্যের ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ করে চলেছে গত চার দশক ধরে। ক্রাসনাহোরকাইয়ের নোবেল প্রাপ্তিতে ‘সিগাল বুকস’ উচ্ছ্বসিত। সমাজমাধ্যমেও তারা এই খবর ভাগ করে নিয়েছেন। তারা জানাচ্ছেন, ক্রাসনাহোরকাইয়ের বইয়ের প্রকাশক হিসাবে তারা গর্বিত।
ক্রাসনাহোরকাই মূলত ‘ফিকশন’ লেখেন। ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির গিউলা শহরে ক্রাসনাহোরকাইয়ের জন্ম। আইনের ছাত্র ক্রাসনাহোরকাই লেখাকেই পেশা হিসাবে বেছে নেন। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘সটানটাঙ্গো’। প্রথম উপন্যাসেই পাঠকদের মনে ছাপ ফেলেন তিনি। তাঁর ‘হার্শট ০৭৭৬৯’ উপন্যাসের কথা উল্লেখ করেছে নোবেল কমিটি। তাঁর লেখা, ‘ওয়ার অ্যান্ড ওয়্যার’, ‘মেলাঙ্কলি অফ রেজিস্ট্যান্স’, ‘এ মাউন্টেন টু দ্য নর্থ, ও লেক টু দ্য সাউথ, পাথস টু দ্য ওয়েস্ট, এ রিভার টু দ্য ইস্ট’, ‘সিয়োবো দেয়ার বিলো’ ইত্যাদি পাঠক মহলে সমাদৃত। ‘সিয়োবো দেয়ার বিলো’ শীর্ষক বইটির জন্য ক্রাসনাহোরকাই ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন।

‘ডেসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হ্যাভেনস’ হল ভ্রমণ কাহিনি। একুশ শতকের গোড়ায় চিন ভ্রমণ করেছিলেন ক্রাসনাহোরকাই। ২০০৪ সালে সেই ভ্রমণ কাহিনি প্রকাশ করে বুডাপেস্টের ‘ম্যাগভেটো পাবলিশিং’। ২০১৬ সালে তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করে সিগাল বুকস।
সিগাল বুকসের অন্যতম সম্পাদক সায়নী ঘোষ বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, ‘‘বইটা (‘ডেসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হ্যাভেনস’) ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। আমরা ২০১২ সালে লেখককে পেয়েছিলাম। ওঁর (ক্রাসনাহোরকাই) যে মার্কিন প্রকাশক নিউ ইয়র্কের ‘নিউ ডিরেকশনস’ তারা ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাবলিশার, আর ‘সিগাল বুকস’ও তাই। আমরা মার্কিনি, ইউরোপীয় লেখকদের বইয়ের অনুবাদ প্রকাশ করি। সেই সুবাদে আমাদের আর ‘নিউ ডিরেকশনস’-এর আলোচনা হয়েছিল। যার মাধ্যমে আমরা ওঁর নন ফিকশন বই পাই। ক্রাসনাহোরকাই ততদিনে খুবই বিখ্যাত একজন লেখক। আমাদের প্রকাশক নভীন কিশোর আগে থেকে ক্রাসনাহোরকাইয়ের লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ওই ২০১২-তে আমরা ‘নিউ ডিরেকশনস’-র মাধ্যমে ওঁর নন ফিকশন বইটা পাই। কাজ শুরু হয়। বইটার সফর শুরু হয় ২০১২ সালেই। ‘নিউ ডিরেকশনস’ ওঁর সব ‘ফিকশন’ লেখা প্রকাশ করে। এটা ওঁর চিন ভ্রমণ নিয়ে লেখা ভ্রমণ কাহিনি। এটা যখন বই আকারে প্রকাশের ভাবনা চিন্তা হচ্ছিল তখন ‘নিউ ডিরেকশনস’ প্রস্তাব দেয় ‘নন ফিকশন’ বইটা ‘সিগাল বুকস’ নিতে পারে।’’
সায়নী জানালেন, ২০১৬ সালে ‘ডেসট্রাকশন অ্যান্ড সরো বিনিথ দ্য হ্যাভেনস’-র প্রথম ‘হার্ড ব্যাক’ সংস্করণ ছাপা হয়। এখন দ্বিতীয় সংস্করণ রয়েছে যা ‘পেপার ব্যাক’ সংস্করণ। বইটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন এবং সম্পাদনা করেছেন সিগাল বুকস-এর সুনন্দিনী বন্দ্যোপাধ্যায়। ক্রাসনাহোরকাইয়ের নোবেল প্রাপ্তি প্রসঙ্গে সায়নী বলছেন, ‘‘খুবই আনন্দের খবর। একটা উত্তেজনা থাকেই, আমাদের লেখক স্বীকৃতি পেলেন। কেউ সারা জীবনের কাজের স্বীকৃতি পাচ্ছেন, এটা খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক। আমাদের সবার জন্য আনন্দের মুহূর্ত!’’

কেবল প্রকাশনা সংস্থার নয়, এ গর্ব কলকাতারও। আস্ত একটা বইপাড়া আছে বাঙালির, বইমেলাকে সে পার্বণের মতো উদযাপন করে। হাজার হাজার তরুণ লিটল ম্যাগাজিন করে। শতাব্দী প্রাচীন প্রকাশনা সংস্থার পাশাপাশি ফি বছর গড়ে ওঠে নতুন নতুন প্রকাশনা। বাঙালি বইয়েই বাঁচে। কলকাতার এক প্রকাশনা সংস্থা সাহিত্যে নোবেলজয়ী ক্রাসনাহোরকাইয়ের বইয়ের প্রকাশক, এ জিনিস জানতে পেরে বইপ্রেমী বাঙালিরাও আনন্দিত।

