
ষাটের দশকে তাঁর বাবা রাম আইয়ারের কেরালাতে একটি রেশন দোকান ছিল। প্রকৃত অর্থে তাঁরা ছিলেন তামিলনাড়ুর লোক। কিন্তু কেরালাতে তাঁদের বসবাস চার পুরুষের। সে-যুগে রেশন দোকানের মালিক হওয়া সত্ত্বেও কমিউনিস্ট ভাবধারায় জারিত রাম আইয়ার সংসার চালাতেন খুবই কষ্ট করে। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, আত্মীয়স্বজন নিয়ে প্রায় সতেরোটা পেট। রাম আইয়ারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, একইরকম পরিশ্রম করে সংসারের জোয়াল কোনও ভাবে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন স্ত্রী লক্ষ্মী আম্মালও। তাঁরা লক্ষ্য করেছিলেন পাঁচ সন্তানের মধ্যে তাঁদের মুখচোরা বড়ো ছেলেটি একটু ভাবুক গোছের। টানা টানা দুটো চোখ, ছোট্ট আকৃতি, এদিক ওদিক দৌড়ে বেরালে মনে হয় এক্কেবারে কৃষ্ণ ঠাকুরটি! ওর নাম ভেঙ্কটরমণ। সকলে আদর করে ভেঙ্কিট বলে ডাকে। সে সবকিছুর মধ্যে আছে কিন্তু মাঝে মাঝে কী যেন ভাবে অন্যমনস্ক হয়ে! মা একদিন সেই ছেলেকে তার ভাবনার কথা জিজ্ঞেস করতে সে স্পষ্ট উত্তর দিয়েছিল যে বড়োদিদি পদ্মিনীর মতো সেও সৃজনশীল কিছু করতে চায়। আর সেটা বাড়িতে বসে থাকলে হবে না। তাহলে? সে চায় দিদির মতো কেরালা কলামণ্ডলমে গিয়ে ভর্তি হতে। (গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট)
কেরালা কলামণ্ডলমের দিনগুলি
ছেলের এ-হেন ইচ্ছের কথা জেনে মা-বাবা বারণ করলেন না। পদ্মিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হল। দিদির মতো ভাই ভেঙ্কিটও গিয়ে ভর্তি হল কলামণ্ডলমে। দিদি ছিলেন সেখানে মোহিনীআট্টমের উজ্জ্বলতম ছাত্রীদের একজন। ভাই গিয়ে প্রথমে ভর্তি হল সংগীত বিভাগে। কণ্ঠস্বর তার বেশ ভালো। কিন্তু সেখানকার শিক্ষকরা তার সৃজনশীল চিন্তাভাবনা উপলব্ধি করে পরামর্শ দিলেন নাচে ভর্তি হতে। ভেঙ্কটরমণ, অতএব, যোগ দিল কথাকলি নৃত্যবিভাগে। প্রখ্যাত মালয়ালি কবি ভল্লাতল নারায়ণ মেনন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত কেরালা কলামণ্ডলমের শিক্ষাপ্রণালী জগৎজুড়ে প্রসিদ্ধ। ভেঙ্কটরমণ যখন ভর্তি হল তখন ছিল ডিপ্লোমা কোর্স কিন্তু ছয় বছর সেখানে আবাসিক হয়ে থেকে শিখতে হত- সংগীত হোক আর নৃত্য। অনেক বড়ো বড়ো ডিগ্রির থেকেও বেশি চাপের সেই ডিপ্লোমা ট্রেনিং। ভোর চারটেতে উঠে সারাদিন চলত শিক্ষা ও মহড়া। খাবার বলতে যৎসামান্য। মাড়-ভাত যেটাকে মালয়ালিরা বলেন ‘কন্নু’, তাই-ই ছিল প্রধান খাদ্য। তাতে আবার মাঝে মাঝে চালের পোকা ভেসে উঠত! সদ্য তরুণ, মা-বাবা, ভাইবোনদের প্রিয় ভেঙ্কিটের অচিরেই জন্ডিস রোগ দেখা দিল। (গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট)
৭ জুলাই গুরুজির শুভ জন্মদিন। আর ১২ জুলাই কলকাতার এক নামী প্রেক্ষাগৃহে এ-শহরে তাঁর নৃত্যজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান হবার কথা। কিছুদিন আগে অবধি ক্রমাগত মহড়া চলেছে স্বয়ং গুরুজির তত্ত্বাবধানে। সমস্ত প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে গুরুজি আর রইলেন না।
ভাই-বোনদের সঙ্গে
এত অবধি বলে আন্টি অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। কারণ, কলামণ্ডলম ভি. আর ভেঙ্কিটের স্ত্রী প্রীতা ভেঙ্কিট আসলে তখনও ঠিক পরিষ্কার করে জানেন না গুরুজির সিরোসিস অফ লিভার হল কেন। ৩০ জুন, ২০২৫ গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট পরলোক গমন করেছেন। কলকাতার নৃত্য জগতে প্রায় নক্ষত্রপতন। সমাজমাধ্যম তাঁর স্মৃতিতে, প্রশস্তিতে ভেসে যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে গুরুজির মেয়ে সঙ্গীতা আর ছেলে অভিরাম এসেছে। ৭ জুলাই গুরুজির শুভ জন্মদিন। আর ১২ জুলাই কলকাতার এক নামী প্রেক্ষাগৃহে এ-শহরে তাঁর নৃত্যজীবনের পঞ্চাশ বছর পূর্তির অনুষ্ঠান হবার কথা। কিছুদিন আগে অবধি ক্রমাগত মহড়া চলেছে স্বয়ং গুরুজির তত্ত্বাবধানে। সমস্ত প্রস্তুতি যখন তুঙ্গে গুরুজি আর রইলেন না। পরিবারে স্বভাবতই শোকের বিরাট ছায়া। রাজ্য সংগীত একাডেমিতে তাঁর মরদেহে শেষ শ্রদ্ধা অর্পণ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ছাত্রছাত্রীরা ছুটে এসেছে। কলকাতা আর কথাকলিকে সমার্থক করে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে-কজন শিল্পী, গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট তাঁদের মধ্যে অন্যতম। সেই মানুষটির মৃত্যুতে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হবে, তা বলা বাহুল্য। এত সবের মধ্যে প্রীতা আন্টির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম যখন তিনি স্মৃতির ঝাঁপি উজাড় করে দিলেন। (গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট)
দিদি কলামণ্ডলম পদ্মিনীর সঙ্গে
ভেঙ্কটরমণ ভেঙ্কিট গত শতকের চুয়াত্তর-পঁচাত্তর সনে কলকাতায় এসেছিলেন কাজের খোঁজে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউতে তাঁর এক দাদা থাকতেন। কিন্তু অন্য কাজ তিনি করবেন কী করে? তিনি যে নাচ ছাড়া আর কিছু জানেন না! কেরালা কলামণ্ডলমের স্নাতক ছাত্রটিকে কাছে টেনে নিলেন গুরু গোবিন্দন কুট্টি ও গুরু শ্রীমতি থাঙ্কমণি কুট্টি। তখন ওঁদের নৃত্যবিদ্যালয়ের নাম ক্যালকাটা কথাকলি সেন্টার। ভেঙ্কটরমণ ভেঙ্কিট কথাকলি শেখাতে শুরু করলেন ওই সেন্টারে। কিন্তু থাঙ্কমণি কুট্টি বুঝেছিলেন শুধু কথাকলি নয়, ভরতনাট্যম নৃত্যও তাঁর স্নেহের ভেঙ্কিটের অধ্যয়ন করা জরুরি। না-হলে আরও ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব নয়। গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির কাছে তাঁর ভরতনাট্যম শিক্ষা শুরু হল। শুধু তিনি নন, অভয় পাল, অনিতা মল্লিক আর উমা নামের একটি মেয়ে যে কুট্টি পরিবারের আত্মীয়- এই চারজনের যেন একটা জুটি হয়ে গেল। গুরু থাঙ্কমণি কুট্টির স্কুলের নৃত্যানুষ্ঠান যেখানেই হয় এই চারটি ছেলেমেয়ে সেথা জয় করে আসে। ভেঙ্কটরমণ আর উমার যুগলবন্দি ধীরে ধীরে সারা ভারতে খ্যাতি অর্জন করল। কেবল নাচের মঞ্চে দুজন আটকে থাকলেন না। অচিরে সংসার বন্ধনেও বাধা পড়লেন। ভেঙ্কটরমণ আর উমার বিবাহ হল গুরু গোবিন্দন কুট্টি ও গুরু শ্রীমতি থাঙ্কমণি কুট্টির তত্ত্বাবধানে। নৃত্যে, আনন্দে, সুখে তাঁদের জীবন চলছিল। কিন্তু ভাগ্য বেশিদিন সহায় হল না। উমা ভেঙ্কিট কেবল সাতাশ বছর বয়সে পথদুর্ঘটনায় নিহত হলেন। তাঁদের একমাত্র কন্যা সঙ্গীতার বয়স তখন মাত্র পাঁচ। প্রায় কোলের শিশু। সেই সময় প্রীতা এগিয়ে এলেন।
নারীবেশম কথাকলি নৃত্যে মহাকাব্যের নারীচরিত্রগুলির চিত্রণ। সারা বিশ্বে এই নারীবেশমের যত নৃত্যবিদ আছেন গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর কৃত ‘পুতনামোক্ষম’ নৃত্যনাট্য একটি অতি উচ্চমার্গের শিল্প।
ফ্যামিলি অ্যালবাম
আন্টির কথায়, তোমাদের গুরুজির সঙ্গে আমার বয়সের তফাৎ প্রায় আঠারো বছরের। আমি তো আঙ্কেল বলে ডাকতাম। আমার বাড়িতে স্বভাবতই আপত্তি ছিল। কিন্তু আমার মা-বাবা তোমাদের গুরুজির নাচের একরকমের ফ্যান ছিলেন। বাবার বিশ্বাস ছিল তোমাদের গুরুজি আমাকে যত্ন করবেন সন্তানের মতো। সেটা সত্যিই করেছেন। আমাদের বিয়ের পর অনেকগুলি ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। আমি আন্টি মানে থাঙ্কমণি কুট্টির স্কুলে টিচার ছিলাম। তোমাদের গুরুজি তো ছিলেনই। কিন্তু যে-কোনও কারণেই হোক আমাদের ওই স্কুল ছাড়তে হল। একটু উথালপাতাল সময়। কিন্তু ওই সময়ই গুরুজির চাকরিটা রবীন্দ্রভারতী ইউনিভার্সিটিতে পার্মানেন্ট হল। আমরা কষ্টেসিষ্টে বিক্রমগড়ে এই ফ্ল্যাট নিলাম। অভিরাম হল। বহু স্টুডেন্ট শিখতে আসতে শুরু করল। আমরা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। কিন্তু তোমাদের গুরুজি কোনও আঁচ আমার ওপর লাগতে দেননি কখনও। আমি ভরতনাট্যম নাচ শেখাই। আমার কলাক্ষেত্র-স্টাইল। দুজনে মিলে গড়ে তুললাম ‘উমা কলালয়াম’। আমিই উমাদির নামে স্কুল হোক চেয়েছিলাম। সত্যি কথা বলতে তোমাদের গুরুজি শিক্ষক এবং অধ্যাপক ঠিকই কিন্তু উনি ভেতরে ভেতরে প্রকৃত পারফর্মার যাকে বলে, একদম তাই। কিন্তু উমাদি চলে যেতে উনি নিজের পারফর্মার সত্ত্বাটাকে বিসর্জন দিয়েছিলেন। ওঁরা একসঙ্গে যখন স্টেজে উঠতেন মনে হত রাধা-কৃষ্ণ!’ (গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট)
তবে গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট-এর একক নৃত্য বিশেষত কলকাতা তারপরেও দেখেছে এবং দেখে মুগ্ধ হয়েছে। কেরালা কলামণ্ডলমে ভেঙ্কিটজির গুরু যাঁরা ছিলেন সেই গুরু কলামণ্ডলম বিজয়ণ আসান, গুরু কলামণ্ডলম পদ্মনাভন নায়ার আসান এবং গুরু কলামণ্ডলম রমণ কুট্টি নায়ার আসান তাঁদের প্রিয় ছাত্র ভেঙ্কিটকে উপদেশ দিয়েছিলেন সে যেন নারীবেশমে মনোনিবেশ করে। নারীবেশম কথাকলি নৃত্যে মহাকাব্যের নারীচরিত্রগুলির চিত্রণ। সারা বিশ্বে এই নারীবেশমের যত নৃত্যবিদ আছেন গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট ছিলেন তাঁদের অন্যতম। তাঁর কৃত ‘পুতনামোক্ষম’ নৃত্যনাট্য একটি অতি উচ্চমার্গের শিল্প। বিশ্বের নানা প্রান্তে তো বটেই এমনকি কেরালা কলামণ্ডলমের হীরক জয়ন্তী বর্ষে তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন এই বিশেষ নৃত্য পালা দেখাবার জন্য। তুরস্ক, জাপান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও তিনি এ-নৃত্য পরিবেশন করেছেন। রবীন্দ্রভারতীর নৃত্যবিভাগের প্রধান ছিলেন বহু বছর। অগণিত ছাত্রছাত্রী তাঁর। শুধু নৃত্য জগত নয়, কলকাতার নাট্য জগতের অনেক শিল্পী নাট্যশাস্ত্র শিক্ষা করতে আসত তাঁর কাছে। তিনি কিছু নৃত্যনাট্য নিজেও নির্মাণ করেছিলেন। ‘ভস্মাসুর মোহিনী’, ‘গীতোপদেশম’, কথাকলি আঙ্গিকে ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’ ছিল বেশ জনপ্রিয়। কিন্তু অবসরের এক বছরের মাথায় তাঁর সিরোসিস অফ লিভার ধরা পড়ল। আর কিছু বছরের মধ্যেই তিনি পরলোকগত হলেন।
ভি.আর ভেঙ্কিট এবং তাঁর নারী-বেশম্
কেরালা কলামণ্ডলমের প্রতিষ্ঠাতা মালয়ালি কবি ভল্লাতল নারায়ণ মেননের জন্মদিন ১৬ অক্টোবর। বিশ্বের সমস্ত কথাকলি নৃত্যবিদ, নৃত্য বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা ওই দিনটিকে কথাকলি দিবস হিসেবে পালন করে। কিন্তু কলকাতায় দক্ষিণ ভারতের কথাকলি নৃত্যকে একার হাতে জনপ্রিয় যদি কেউ করে থাকেন তিনি গুরু কলামণ্ডলম ভি.আর ভেঙ্কিট। গত ৩০ জুন রাজ্য সঙ্গীত আকাদেমিতে তাঁর মরদেহ যখন শায়িত ছিল তাঁর সমস্ত ছাত্রছাত্রীরা এ-কথাই বলছিল। আর প্রীতা আন্টি বললেন, উনি বুঝেছিলেন শরীরটা ভাঙছে। শেষ কালে সব পুরোনো মানুষদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ওঁর শরীরটা ভালো যাচ্ছে না শুনে আন্টি মানে থাঙ্কমণি কুট্টিজিও ডেকে পাঠিয়েছিলেন। বহু বছরের জমানো কান্না বুক ফেটে বেরিয়েছিল দুজনের। প্রথম প্রথম বাংলা নিয়ে তোমাদের গুরুজির ভয় ছিল যদি তিনি ছাত্রছাত্রীদের ঠিক বোঝাতে না পারেন। অথচ তাঁর ছাত্রছাত্রীরা বেশিরভাগ সব বাঙালি। আজ যে সম্মান তিনি বাংলা ও বাঙালিদের কাছ থেকে পেয়েছেন তা কোনও রাজ্য, কোনও জাতি হয়তো এমন করে দিতে পারত না। আমরা আপ্লুত। এখানে থাকতে থাকতে আমরা যেন বাঙালিই হয়ে গিয়েছি। তবে হ্যাঁ, ওঁর চলে যাওয়াও এক অপূরণীয় ক্ষতি। অবশ্য ওঁর ছাত্রছাত্রীরা কথাকলিকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
পঞ্চাশ বছর আগে কেরালার যে-ছেলেটি কলকাতায় কাজের খোঁজে এসে বাংলা আর বাঙালির হয়ে গিয়েছিল তাঁকে কখনওই ভোলার নয়। তাঁর পূণ্যস্মৃতির যাপন বাঙালির কাছে আসলে প্রত্যেকদিনকার কথাকলি দিবস!

