
‘বাবু-বিবি’, ‘বীণাবাদিনী’, ‘শ্যামাকান্ত পট’, ‘মোহন্ত-এলোকেশী’, ‘বেড়াল তপস্বী’ — বাংলার শিল্পকলার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হল কালীঘাট পট (Kalighat Pot)। কালীঘাট পট আজও সমান মাত্রায় জনপ্রিয়। এখনও মানুষের মধ্যে উন্মাদনা রয়েছে এই বিশেষ ঘরানার পটকে ঘিরে। আটপৌরে সারল্য এর অন্যতম বিশেষত্ব। সমসময়কে ধরে রাখতে পারাই শিল্পের আদত সাফল্য। কালীঘাট পট ঠিক সেই ভূমিকাই পালন করেছিল।

কালীঘাটের পট হল উনিশ শতকের কলকাতার জীবন্ত দলিল। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশের প্রথমভাগ ছিল কালীঘাট পটের সোনালি দিন। আজ তা অনেকটাই ম্লান। সাড়ে তিন-চার দশক ধরে কালীঘাট পট এঁকে চলেছেন ভাস্কর চিত্রকর। বংশপরম্পরায় কালীঘাট পটের শিল্পীদের মধ্যে বর্তমানে তিনিই একমাত্র কালীঘাটের পট আঁকিয়ে।
কালীঘাট মন্দির সংলগ্ন বাজার ঘিরে এই পটের সফর শুরু হয়েছিল। তীর্থযাত্রীরা কালীঘাটে এলে নিছক তীর্থপণ্য হিসেবে অর্থাৎ ভ্রমণ-স্মারক হিসেবে এই পট কিনে নিয়ে যেতেন। চৌকো আকৃতির এই পটকে কালীঘাটের ভাষায় বলা হত ‘চৌকশ’। পটে উঠে আসতো শিব, কালী, রাম-সীতা, দেবদেবী। কেবল ধর্মীয় বা পৌরাণিক বিষয়ে আটকে থাকেনি কালীঘাটের পট। পটের বিষয় হয়ে উঠেছিল নানান সামাজিক ঘটনা, বাবু সংস্কৃতি, কেচ্ছা, তৎকালীন সময়। সব মিলিয়ে কালীঘাটের পট হল উনিশ শতকের কলকাতার জীবন্ত দলিল। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিংশের প্রথমভাগ ছিল কালীঘাট পটের সোনালি দিন। আজ তা অনেকটাই ম্লান। সাড়ে তিন-চার দশক ধরে কালীঘাট পট এঁকে চলেছেন ভাস্কর চিত্রকর (Bhaskar Chitrakar)। বংশপরম্পরায় কালীঘাট পটের শিল্পীদের মধ্যে বর্তমানে তিনিই একমাত্র কালীঘাটের পট আঁকিয়ে। কালীঘাটের পটুয়া পাড়ায় থাকেন। তাঁর পট আঁকার হাতেখড়ি বাবার কাছে। ১৩-১৪ বছর বয়স থেকে পট আঁকছেন। বঙ্গদর্শন.কম-এর মুখোমুখি পটশিল্পী ভাস্কর চিত্রকর।
_________________
আপনার পরিবার কী ভাবে পটচিত্র আঁকার সঙ্গে যুক্ত হল?
আমরা বংশ পরম্পরায় পটচিত্র আঁকি। আমার বাবা, দাদু এই-ই করে এসেছেন। আমারও সেই ভাবে পটচিত্র আঁকতে চলে আসা।
আপনার পরিবার কত কাল ধরে কালীঘাট পটচিত্র আঁকছে?
সময়টা সাড়ে তিনশো-চারশো বছর হবে।
আঁকার ক্ষেত্রে কেমন রং ও কাগজ ব্যবহার করেন?
প্রাকৃতিক গুঁড়ো রং ব্যবহার করি। এমনি পাউডার কালার। আর ‘ফ্যাবিয়ানো পেপার’-এ আঁকা হয়।
কোন কোন জিনিসগুলো আপনার আঁকা পটের বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে?
আমার বেশিরভাগ আঁকাই দেবদেবী, উনিশ শতকের কলকাতার বাবু কালচার নিয়ে।

পট ছাড়াও কি আপনি অন্য কিছু আঁকেন?
না, পট-ই আঁকি। আর মূর্তি তৈরি করি। পট আঁকা আর মূর্তি তৈরি করাই আমার পেশা।
অন্যান্য ঘরনার পটচিত্রের সঙ্গে কালীঘাটের পটচিত্রের ফারাকটা কোথায়?
পট দুই প্রকারের হয়। একটা ‘রোলিং’ হয়। আর একটা ‘স্কোয়ার’ হয়। রোলিং হল মেদিনীপুরের পট। যেটা মনসামঙ্গল, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির গান শুনিয়ে শুনিয়ে করা হয়… লম্বা, রোলিং পট। আর স্কোয়ার পট হল কালীঘাট পেইন্টিং। যেটা এক-দুটো ফিগারের মধ্যে বুঝিয়ে দেবে ঘটনাটা কী! একগাদা যে ফিগার থাকবে তা কিন্তু নয়। দুটো, তিনটে, চারটে ফিগারের মধ্যে ঘটনাটা বুঝিয়ে দেওয়া হয়, কে, কী করছে, বিষয়টা কী ইত্যাদি।

কালীঘাট পটচিত্র শিল্পের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? পটের সঙ্গে কালীঘাট জুড়ে গেল কী করে?
কালীঘাটের পট বিখ্যাত হয়েছে কালী মন্দিরের কারণে। পট তারও আগে থেকে আছে। কালীঘাটে মন্দির যখন স্থাপিত হল তখন গ্রাম থেকে এসে ছবি এঁকে সব বিক্রি করত। এখানে একটা বাজার বসত। সেখানেই সবাই ছবি আঁকত। বিক্রি হত সেই ছবি। কালীঘাটের বাজারে বসে আঁকা হত বলেই নাম হয়ে গেল কালীঘাট পট।
কালীঘাটের পটে বরাবর উনিশ শতকের কলকাতা উঠে এসেছে, কেন কলকাতা এই পটের বিষয়বস্তু হয়ে উঠল?
তখন তো গ্রামে উপার্জন কম। সব কিছুর জন্যেই শহরে চলে আসত মানুষ। পেটের টান তো সাংঘাতিক। আঁকার জন্যেও শহরে চলে আসত। সে ভাবেই শহরের ছবি পটে উঠে এলো।
কালীঘাটের পট নিয়ে এখন আগ্রহ কেমন?
পট নিয়ে আগ্রহ আগাগোড়া একই আছে। দুর্গাপুজোর প্যান্ডেলে দেখবেন পটের প্যান্ডেল। রেস্তোরাঁ, ক্যাফেও সাজানো হচ্ছে পট দিয়ে।
শিল্প নিয়ে আগ্রহ আছে, কিন্তু বাণিজ্যিক চাহিদা কেমন?
পট এঁকে কিন্তু বাঙালিদের কাছে টাকা পাওয়া যায় না। পট যাঁরা কেনে, তাঁরা মূলত অবাঙালি। প্রবাসীরা কেনেন, প্রবাসীদের মধ্যেও অবাঙালি। ওঁরা কেনে বেশি। বাঙালিরা কেনে কম। কালীঘাট পট তো বাংলার কিন্তু কিনছে নন-বেঙ্গলিরা। বাঙালি কিনছে খুবই কম। দশটার মধ্যে নটা অবাঙালি কিনছে। একটা হয়তো বাঙালি কিনছে। আমি মাঝে মাঝে ভাবি বাংলার জিনিস কী করে ওঁরা পছন্দ করে, পয়সা দিয়ে কিনছে!

তরুণ প্রজন্মের শিল্পীরা, নতুনরা কি শিখতে আসছেন?
শেখার জন্য অনেকেই আসেন। আমি কাউকে শেখাতে পারি না। সময় নেই। আমি যদি শেখাতে যাই তাহলে নিজের কাজ হবে না। আমাকেও তো উপার্জন করতে হবে। আমি পয়সার যুগে জন্মগ্রহণ করেছি, রাজার যুগে জন্মগ্রহণ করিনি যে রাজা আমাদের দায়িত্ব নিয়ে নেবে।
আপনি কি প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন?
হ্যাঁ। যাঁরা আমার কাছ থেকে ছবি নেয় তাঁরাই করে। গ্যালারি থেকে। আমি গ্যালারিকে বেছে দিই, ওরা শো করে।
আপনিই কি কালীঘাট ঘরানার শেষ পটচিত্র শিল্পী?
এই মুহূর্তে কালীঘাটের মধ্যে আমি একা ছাড়া আর কেউ নেই। আমি শেষ শিল্পী, ঘরানাটাকে বাঁচিয়ে রেখেছি, সেভাবে না। আমার কাছে এটা ঠিক কথা নয়। এখন আমি একা আছি ঠিক আছে। পরবর্তীকালে যে কেউ আসবে না, তা কে বলতে পারে! তবে তাঁরা পরিবারিকভাবে শিখে আসবে না। তাঁরা কাজকে অনুকরণ করবে। তাঁরা এই ঘরানার হবেন না।

