
আশ্বিন মাসের পাঁচটা দিন নারীশক্তির রোলমডেল হিসেবে পূজিত হয় দুর্গাপ্রতিমা। ইউনেস্কোর ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ স্বীকৃতি নিয়ে বাঙালির সবথেকে বড়ো উৎসব, দুর্গাপুজো আজ বিশ্বজনীন। বছর বছর তার জমক বাড়ছে। এই যে বিশাল আয়োজন, প্রতিমা গড়া থেকে মণ্ডপ নির্মাণ, এক্ষেত্রে মহিলা শিল্পীদের নাম চোখে পড়ে না কেন? তাঁরা কি বৃহত্তর পরিসরে কোনও গণশিল্পের দায়িত্ব নিতে অপারগ? নাকি, শিল্পের ভাষা কম বোঝেন?
শিল্পী- রূপালী রায়
এরকম হাজারো প্রশ্নকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠে মেয়েরা। শিক্ষা-অশিক্ষা-কুশিক্ষা, ধনী-দরিদ্র, পুরুষতন্ত্র-নারীবাদ, গ্রাম-শহর এক্ষেত্রে ‘ম্যাটার’ করে না। পৃথিবীর কথা ছেড়ে দিলাম, আধুনিক ভারতের ক’জন মহিলা শিল্পীর কথা জানা যায়? জানতে চেষ্টা করে ক’জন? অবহেলা, অবদমন, প্রতিকূলতা, টানাপোড়েন, সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেই তৈরি হয় নারীমন। সেই নারীমনের ভাষা দৃশ্যশিল্পে কেমন প্রভাব ফেলে, দেবীপক্ষের প্রাক্কালে তার কিছু নমুনা দেখা গেছিল আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ, শি কালেক্টিভ গ্রুপের প্রথম প্রদর্শনীতে।
অবহেলা, অবদমন, প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতাকে সঙ্গী করেই তৈরি হয় নারীমন। সেই নারীমনের ভাষা দৃশ্যশিল্পে কেমন প্রভাব ফেলে, তার কিছু নমুনা দেখা গেল সম্প্রতি আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস-এ শি কালেক্টিভ গ্রুপের প্রথম প্রদর্শনীতে।
শিল্পী- অলকানন্দা সেনগুপ্ত
১৪ জন কর্মরত মহিলা শিল্পীর ছবি ও ভাস্কর্য নিয়ে, শি কালেক্টিভ গ্রুপ আয়োজন করেছিল ‘লিমিনাল স্পেসস : উইমেন্স হোম অ্যান্ড দ্য ওয়াইড ওয়ার্ল্ড’ শিরোনামের প্রদর্শনীটি। শিল্পীদের কাজের ভাষা, আঙ্গিক মনে করিয়ে দিচ্ছিল নিউ ইয়র্কের গেরিলা গার্লস গ্রুপ বা ভারতের প্রথম মহিলা শিল্পী গোষ্ঠী দ্য গ্রুপ-এর কথা। ১৯৮১ সাল নাগাদ শিল্পজগতের ‘সেক্সিজম এবং রেসিজম’ নিয়ে নিউ ইয়র্কে গেরিলা গার্লস গ্রুপ তৈরি করেছিলেন সেখানকার প্রতিবাদী মহিলা শিল্পীরা। আমেরিকায় যদি এ অবস্থা হয়, তখন ভারতের অবস্থা ভাবুন!
শিল্পী- অলকানন্দা সেনগুপ্ত
প্রোগেসিভ আর্টিস্ট গ্রুপ, ক্যালকাটা গ্রুপ, সোসাইটি অফ কনটেম্পোরারি আর্টিস্ট, ক্যালকাটা পেইন্টার্স, পেইন্টার্স অর্কেস্ট্রা, ক্যালকাটা স্কাল্পচারস—১৯৫০-৬০ সালের এ দেশে জন্ম নিয়েছিল এরকম একাধিক শিল্পীদল। নেপথ্যে ছিলেন মূলত আর্ট-স্কুলের ছাত্ররাই। উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক ভাবে দেশিয় ঘরানা, নিজস্ব শৈলির বিকাশ ঘটানো। তাছাড়া যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, গণহত্যা, দেশভাগ – সেসময় বিভিন্ন সমস্যা চলছে। শুধুমাত্র নান্দনিকতার মাঝে নিজেদের আবদ্ধ না রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতিও তাদের বিচার্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। তবে, এইসব শিল্পীদলগুলোয় মহিলা শিল্পীদের উপস্থিতি ছিল নামমাত্র। ফাইন আর্টস নিয়ে লেখাপড়া বা চর্চার সুযোগ সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের মেয়েদের ছিল না। যাঁরা সেই সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আন্তর্জাতিক স্তরে পৌঁছেছিলেন। যেমন করুণা সাহা, শানু লাহিড়ী, সন্তোষ রোহতগী, মীরা মুখোপাধ্যায়, শ্যামশ্রী বসু। সেই সময় এই পাঁচজন মহিলা শিল্পী বিভিন্ন দেশ ঘুরে শিল্প সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করে এসেছেন। তাঁরা দেখলেন দেশের মহিলা শিল্পীরা পিতৃতান্ত্রিকতার ছায়া থেকে বের হতে পারছেন না। আর্টের জগতে মেয়েদের স্বতন্ত্রতা প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে না। এই কোণঠাসা অবস্থা থেকে বেরতে চাইলেন তাঁরা। চাইলেন তাঁদের শিল্পভাবনা অনুরণিত হোক অনেকের মধ্যে। তৈরি হলো ‘দ্য গ্রুপ’। ১৯৮৩ সালে এই দলেরও প্রথম প্রদর্শনী হয়েছিল অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ। সেদিক থেকে দেখলে, এই দলের প্রতিষ্ঠা একটা আন্দোলনই। দ্য গ্রুপের সেই সমস্বর, সীমাবদ্ধতা পেরোনো সৃষ্ঠির তাগিদ, বলিষ্ঠ শিল্পভাষার ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে, বোঝা যাচ্ছিল শি কালেক্টিভের প্রদর্শনীতে। ১৪ জন শিল্পীর কাজই ছুঁয়ে যায় এই সময়কে, নারীমনকে।
শিল্পীদের কাজের ভাষা, আঙ্গিক মনে করিয়ে দিচ্ছিল নিউ ইয়র্কের গেরিলা গার্লস গ্রুপ বা ভারতের প্রথম মহিলা শিল্পী গোষ্ঠী দ্য গ্রুপ-এর কথা।
শিল্পী- অনিতা ভট্টাচার্য
ভাস্কর-শিল্পী অলকানন্দা সেনগুপ্তের কাজের কথা বিশেষ করে বলতে হয়। তাঁর ভাস্কর্য সরাসরি আঘাত করে, মননে। অস্বস্তিতে ফেলে। যাঁরা তাঁর কাজের সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানবেন অলকানন্দার ভাস্কর্য কতটা জ্যান্ত ও প্রকট। ধারাবাহিকভাবে তাঁর কাজগুলিতে মূর্ত হয়ে ওঠে যুদ্ধপীড়িত মহিলা ও শিশুদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট অবয়ব; মানবজীবন ও সমাজ জীবনের অদ্ভুদ সব বিড়ম্বনা। মাটি নিয়েই কাজ করতে ভালোবাসেন তিনি। প্রদর্শনীতে ছিল তাঁর বেশ কয়েকটি টেরাকোটার কাজ। অন্যদিকে, জুট ও সুতোর বুননে সুতানুকা গিরি’র স্থাপনাশিল্প মনে করিয়ে দিচ্ছিলো শিল্পী মৃণালিনী মুখোপাধ্যায়ের কথা। প্রখ্যাত শিল্পী-দম্পতি বিনোদ বিহারি মুখোপাধ্যায় ও লীলা মুখোপাধ্যায়ের একমাত্র সন্তান এদেশে তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু পাননি। টেক্সটাইল-বুননশিল্প নিয়ে তাঁর কাজ, বিরাট বিরাট ‘সফট স্কাল্পচার’ নিয়ে গণমাধ্যমে আলোচনা হয়নি আজও।
মহিলা শিল্পীদল শি কালেক্টিভের প্রথম প্রদর্শনী
অলকানন্দা ও সুতানুকা ছাড়াও, ঈশিতা অধিকারীর ডিজিটাল মাধ্যমের কাজ, মৌমিতা সরকারের মিশ্র মাধ্যমের কাজ, সুদেষ্ণা মিত্র বাটিগের গভীর দেখা, জয়শ্রী বন্দ্যোপাধ্যায় দাস ও সঞ্চিতা সেনগুপ্তের কোলাজ-কথা, কৃষ্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালো ভাষা, অনিতা ভট্টাচার্যের চিরুনির আঁচড়, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের উজ্জ্বল বয়ান, সীমা বড়ুয়ার এচিং, সুদত্তা বসু রায় চৌধুরীর শক্তিশালী মন্তাজ, মালিয়া ভট্টাচার্যের টুকরো টুকরো দৃশ্য : এতগুলো শিল্পকর্ম; ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম, তবুও একই গল্প বলছে। যা হয়তো অগোচরে হেলায় হারিয়ে যাবে। আসলে, রূপালী রায়ের ‘লিবারেশন’ নামক শেকল বাঁধা এক মেয়ের ভাস্কর্যই ছিল প্রদর্শনীর মধ্যমণি, যে বলে দিচ্ছিল সারাংশটুকু। মুক্তিই যার একান্ত গন্তব্য।
________
ছবি নিজস্ব

