কোরিয়ান খাবারের চল বাড়ছে কলকাতায়—কেন?

মোমো, চপ, ফিশ ফ্রাই, ফুচকা, এগরোল, চাউমিন, বিরিয়ানি প্রেমী কলকাতাবাসীর খাবারের থালায় জায়গা করে নিচ্ছে র‌্যামেন, কিমচি, বিবিমবাপ, কিমবাপ। সত্যি বলতে কী কলকাতা জুড়ে এখন ‘কোরিয়ান ফিভার’। শহরের অলিতে গলিতে দেখা মিলছে কোরিয়ান ফুড ট্রাকের, একের পর এক জায়গায় গড়ে উঠছে কোরিয়ান খাবারের রেস্তোরাঁ।

কলকাতা তথা বাংলা বরাবরই খুব উদার। পার্সিদের ধানশাক, পত্রাণি মাচ্ছি বা অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ঝাল ফ্রেজি, পেপার ওয়াটার, ভিন্দালু অথবা তিব্বতী-নেপালি খানা মোমোকে কলকাতা যেভাবে আপন করে নিয়েছে, একইভাবে কোরিয়াবাসীর জাজাংমিয়েন, বুলগগি, জাপচে, কর্ন ডগ ইত্যাদিকেও কাছে টেনে নিয়েছে।

কর্নফিল্ড রোডের আজুম্মা’স কিমবাপ : দ্য আল্টিমেট কিমবাপ জয়েন্ট

পার্সিদের ধানশাক, পত্রাণি মাচ্ছি বা অ্যাংলো ইন্ডিয়ানদের ঝাল ফ্রেজি, পেপার ওয়াটার, ভিন্দালু অথবা তিব্বতী-নেপালি খানা মোমোকে কলকাতা যেভাবে আপন করে নিয়েছে, একইভাবে কোরিয়াবাসীর জাজাংমিয়েন, বুলগগি, জাপচে, কর্ন ডগ ইত্যাদিকেও কাছে টেনে নিয়েছে।

বাঙালির খাদ্যাভাসে কীভাবে ঢুকে পড়ল কোরিয়ান খানা? এটা কি নিছক হুজুক না-কি কিমবাপ বাঙালির ডাল-ভাতে পরিণত হয়েছে? উত্তর খুঁজতে শহরের কোরিয়ান খানার পীঠস্থানের কর্ণধারদের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল। তাতে যা মানে দাঁড়াল, তা হল রবিবার দুপুরে আলু দেওয়া মাংসের লাল ঝোলের জন্য বাঙালি যেমন হাপিত্যেশ করে থাকে; ঠিক তেমনই কিমবাপের জন্যেও আজকাল ‘ক্রেভিং’ হয় বঙ্গ সন্তানদের।

কলকাতায় কোরিয়ান খাবারের চল নিয়ে আজুম্মা’স কিমবাপ : দ্য আল্টিমেট কিমবাপ জয়েন্ট রেস্তোরাঁর কর্ণধার তিয়াসা বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলছিলাম। কোরিয়ান খাবারের চল নিয়ে তিনি জানালেন, “কোরিয়ান ড্রামা, কোরিয়ান ব্যান্ড বিটিএস ইত্যাদির মাধ্যমে কোরিয়ান সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে এবং ভারতেও। তার থেকেই মানুষের মধ্যে কোরিয়ান খাবারের প্রতি আগ্রহ জন্মাচ্ছে। ওদের ড্রামার মধ্যে ওদের খাবার, রান্নাবান্না, সংস্কৃতি ইত্যাদি দেখায়। আমাদের রোববারের মাংস-ভাতের মতোই ওদের ড্রামাতেও খাবারের প্রতি আবেগ দেখা যায়। এখন অনেক রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে, যারা সুলভমূল্যে কোরিয়ান খাবার পরিবেশন করে। এটাও কলকাতায় কোরিয়ান খাবারের চল বৃদ্ধির অন্যতম একটা কারণ বলে মনে হয়।”

তিয়াসা জানাচ্ছিলেন, তাঁর রেস্তোরাঁর গ্রাহকদের মধ্যে প্রায় আশি শতাংশ মানুষ কোরিয়ান খাবার নিয়ে ওয়াকিবহাল। ওঁরা হয়তো কোরিয়ান ব্যান্ডের অনুরাগী বা কোরিয়ান ড্রামা দেখেন কিন্তু বাকিদের কোরিয়ান খাবার নিয়ে বোঝাতে হয়। বলছিলেন, “অনেকেই ভাবেন কিমবাপ হল সুশি, কিন্তু সেটা নয়। কোরিয়ানদের এটা বললে তাঁরা অসন্তুষ্ট হতে পারেন। তবে অনেকেরই নিত্যদিনের খাদ্যাভাসের মধ্যে কোরিয়ান খাবার ঢুকে পড়েছে। আমার এমন গ্রাহক আছেন, যাঁরা অফিসে চাকরি করেন বা কলেজ পড়ুয়া, তাঁরা হয়তো রোজ একটা কিমবাপ খান লাঞ্চে বা টিফিনে। অফিস যাওয়ার সময় পিক-আপ করে নিয়ে যান।”

ইয়াম ইয়াম কোরিয়ান বাকেট-এর কর্ণধার অর্ঘ্য মুখোপাধ্যায়ের মতে, “কোরিয়ান ফাইন-ডাইন রেস্টুরেন্ট আগেই ছিল কিন্তু সম্প্রতি জনপ্রিয় হয়েছে কোরিয়ান স্ট্রিট ফুড, যেমন কর্ন ডগ, ফ্রায়েড চিকেন, বিভিন্ন ধরনের রাইস। এগুলোর খ্যাতির উৎস কলকাতা-ই। আমরা ফুড ট্রাকে শুরু করেছিলাম। অনেকেই এসেছেন, দেখেছেন, কী করে কোরিয়ান খাবার রাঁধতে হয় শিখেছেন। মানুষ সহজেই মেনু-র অনুকরণ করেছে। অনেক আউটলেট, রেস্তোরাঁ তৈরি হয়েছে।”

আম জনতা আদপে কোরিয়ান ফুড নিয়ে কতটা জানেন? অর্ঘ্যর কথায় একটা স্পষ্ট ধারণা মিলল। যখন তাঁরা কলকাতায় প্রথম শুরু করেছিলেন, তখন একজন কর্মচারী রেখেছিলেন, যিনি খাবার অর্ডার নিতেন। তাঁর ভূমিকাটা ছিল ‘গাইড’-এর মতো। তিন-চার মাসের মধ্যেই তাঁকে আর দরকার পড়েনি। অর্ঘ্য আরও বলেন, “চব্বিশ বছরের কম বয়সীরা বা বিশেষত যাদের বয়স আঠারোর কম, তারা কিন্তু খুবই ওয়াকিবহাল কোরিয়ান খাবার নিয়ে। কোনটা কী, কী অর্ডার করতে হবে, কোনটা খেতে কেমন, তারা সবই জানে। এমনকি কোরিয়ান রান্নার রন্ধনশৈলীও তাদের অজানা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাহকদের বয়স আঠারো থেকে আঠাশ।”

কোরিয়ান খাবার কি হুজুকে চলছে? ব্যবসা শুরুর সময় ধন্দে ছিলেন অর্ঘ্য নিজেও। ভেবেছিলেন আদৌ কি ভারতীয়দের মধ্যে জনপ্রিয় হবে এসব খাবার! ট্রায়াল রানেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছিলেন। কোরিয়ার মানুষ এই খাবারই খান, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ডের স্ট্রিট ফুড দুনিয়ায় রাজত্ব করছে কোরিয়ান খাবার। অর্ঘ্য বলছিলেন, “ভারতীয়দের খাবার এই ধরনের খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে জানে। কারণ, আমাদের খাবার পশ্চিমীদের খাবারের মতো পরিণত নয়। যার জন্য খাবারটা আমরা খাবার হিসাবেই গ্রহণ করেছি। ভালো করে রেসিপি অনুসারে ঠিকঠাকভাবে খাবারটা বানালে মানুষ আসতে বাধ্য। সেকারণেই ইয়াম ইয়াম-এ কোরিয়ান খাবার খেতে বারবার ফিরে আসে আমাদের গ্রাহকরা। বাঙালির আজকাল বাঙালি খাবারের পাশাপশি কোরিয়ান খাবারের জন্যেও ক্রেভিং হয়। যদি মনে করেন এই র‌্যামেনটা খেতে হবে, তাহলে তার বিকল্প নেই। অন্য কিছু খেলেও মন ভরবে না। এটা হুজুক বা ট্রেন্ড নয়। খাবার হিসাবে এর অস্তিত্ব দৃশ্যমান। চাইনিজ বা অন্যান্য প্রাদেশিক খাবারের মতোই কলকাতার মানুষের খাদ্যাভাসে কোরিয়ান খাবার ঢুকে পড়েছে।”

ইয়াম ইয়াম কোরিয়ান বাকেট-এর ফুড ট্রাক

ফ্যাশন থেকে শুরু করে খাবার, সবেতেই এখন কোরিয়ার প্রভাব। এক্কালে সৌরভ, সচিন, শাহরুখদের ছবি লাগানো হত দেওয়ালে এখন বিটিএস আর্মির ছবি কম্পিউটার, মোবাইলের ওয়ালপেপার করা হয়। তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই কোরিয়ার খাবার এ দেশে জনপ্রিয় হয়েছে এবং হচ্ছে। কলকাতার মানুষজন যেমন কোরিয়ান ড্রামা, কোরিয়ান মিউজিককে রপ্ত করতে পেরেছে তেমনই রপ্ত করেছে কোরিয়ান খাবারও। কারণ, বাঙালির ভোজনরসিক স্বভাব। আর সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হল খাবার। সঙ্গত কারণেই ডাল, ভাত, আলু ভাজার পাশাপাশি একদিন কিমবাপ উঠে পড়েছিল বাঙালির পাতে এবং স্বাদের গুণে তা মনে জায়গাও পেয়েছে। সহজলভ্য, সুস্বাদু এবং মোটামুটি নাগালের মধ্যে দাম হওয়ায় বাঙালি আরও বেশিমাত্রায় আপন করে নিচ্ছে কোরিয়ানদের খাবারকে।

Written by