রবীন্দ্রবংশোদ্ভূত হয়েও মীনা কুমারীর ভাগ্যে জুটেছিল দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, প্রত্যাখ্যান, একাকীত্ব

যাঁরা পুরোনো সিনেমা ভালোবাসেন, সিনেমা নিয়ে পড়াশোনা করছেন অথবা এ প্রজন্মের নন, তাঁরা ব্যতীত এই প্রজন্মের কাছে ‘মীনা কুমারী’ শুধুমাত্র অচেনা একটি নাম। যাঁরা তাঁকে চেনেন না, গুগল করলে হয়তো জানতে পারবেন এই নামটি ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের একজন কিংবদন্তি অভিনেত্রীর, একজন কবির। কিন্তু, গভীরে না গেলে তাঁরা হয়তো উপলব্ধি করতে পারবেন না জনপ্রিয় এই নামের অন্তরালে রয়েছে অপরিমেয় একাকীত্ব – একা একা বেঁচে থাকার লড়াই। সেই বেঁচে থাকার আয়ু ছিল মাত্র ৩৯ বছর। শুধু তাই নয়, ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে মীনা কুমারীর নাড়ির টান ছিল, তাও জানেন না অনেকেই।

হিসেব মেলে না। নিজ গুণে জনপ্রিয়তার শিখর ছুঁয়েছিলেন তবু, রূপালি পর্দার ট্র্যাজেডিকেও হার মানায় তাঁর জীবন। দেশবিদেশের দর্শকের কাছেও পরিচিত ছিলেন ‘ট্র্যাজেডি কুইন’ নামে। গৌরব নয়, রবীন্দ্রবংশোদ্ভূত হয়েও মীনা কুমারীর জন্মমুহূর্তে জুটেছিল অপরিমেয় দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, প্রত্যাখ্যান। একটি সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল “মাত্র ছ’বছর বয়সে সিনেমাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন আপনি, এ কথা কি ঠিক?” উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন, “জীবনই আমায় সিনেমার জন্য বেছে নিয়েছিল।”

কিছুদূর যেতে না যেতেই শিশুটির তীব্র কান্নার আওয়াজে ফিরে আসেন আলি। দেখেন, বারান্দায় অবহেলায় পড়ে থাকা মেয়ের সারা গায়ে লালপিঁপড়ে ভর্তি। মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে মায়া হয় আলির। ফিরিয়ে আনেন মেয়েকে।

একটি সিনেমার দৃশ্যে মীনা কুমারী ও দিলীপ কুমার 

মীনা কুমারীর জন্ম ১ অগাস্ট, ১৯৩২ (মতান্তরে ১৯৩৩)। জন্মলগ্ন থেকে সেই যে তাঁর সঙ্গে বিষাদ জুড়ে বসেছিল, আজন্ম পিছু ছাড়েনি।

রবীন্দ্রনাথের এক জ্ঞাতি ভাইয়ের মেয়ে হেমসুন্দরী। তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম। বাল্যবৈধ্যব্যের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে পরে খিস্টান হন। বাংলা ছেড়ে চলে যান মেরঠে। বিয়ে করেন হিন্দিভাষী সাংবাদিক ও গল্পকার পেয়ারেলালের সঙ্গে। তাঁদের একটি মেয়ে হয়। প্রভাবতী। ভালোই গান গাইতো সে। কৈশোর পেরতে না পেরতেই তার সাধ জাগে গায়িকা হবে। বোম্বে পাড়ি দেয় সে।

সেখানেই প্রভাবতী দেবীর সঙ্গে আলাপ পেশায় হারমোনিয়াম-বাদক ও সঙ্গীতশিক্ষক মাস্টার আলি বক্স-এর। প্রেমে পড়েন। নিকাহ্ করেন দুজনে। ধর্মান্তরিত হয়ে প্রভাবতী হন ইকবাল বানো।

ইকবাল বানো আর আলি বক্সের টানাটানির সংসার। আলির গান বাজনা সঙ্গে ছোটোখাটো চরিত্রে ইকবালের অভিনয়, নাচ, গান -এই ছিল তাঁদের আয়ের উৎস। তা দিয়ে কোনওরকমে দু’জনের চলে যাচ্ছিল। তাঁদের অনিশ্চিত জীবনে আসে নতুন সদস্য। জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান, কন্যাসন্তান। আলি আশা করেছিলেন, দ্বিতীয়বার নিশ্চয়ই পুত্রসন্তানই হবে। তা হয় না। আবারও জন্ম নেয় একটি কন্যাসন্তান। হতাশ হয়ে আলি বক্স বোম্বের কোনও এক অনাথ আশ্রমে রেখে আসেন শিশুটিকে। কিন্তু, ভাগ্যের কী পরিহাস! কিছুদূর যেতে না যেতেই শিশুটির তীব্র কান্নার আওয়াজে ফিরে আসেন আলি। দেখেন, বারান্দায় অবহেলায় পড়ে থাকা মেয়ের সারা গায়ে লালপিঁপড়ে ভর্তি। মেয়ের এহেন অবস্থা দেখে মায়া হয় আলির। ফিরিয়ে আনেন মেয়েকে। নাম রাখা হয়- মেহজবিন।

তাঁর ছোটোবেলা আর যাই হোক, সুখের ছিল না। মীনা নিজে রাজ্যসভা টিভির সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, খুব ছোটোবেলা থেকেই পাথরের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের কথা। দুই বোন ছাড়া তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল- পাথর। পাথর কুড়িয়ে আনতেন, পাথরের সঙ্গে কথা বলতেন এমনকি ঘুমানোর সময় পাথরের টুকরো পাশে রাখতেন। বাবা-মায়ের দৈনন্দিন ঝগড়া তাঁর মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল, যা আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। পুতুল খেলার বয়সেই মেহজবিনকে নিয়ে যাওয়া হয় সিনেমার অডিশন দিতে। সেই শুরু।

শিশুবয়সে ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখার পর মেহজবিনের নাম পাল্টে হয়- বেবি মীনা। সেসময়ের একাধিক সিনেমায় এই নামেই তাঁকে দেখা যায়। বাড়িতে আবার তাঁর ডাকনাম ছিল ‘মুন্না’। ছেলে আশা করে মেয়ে, সেকারণেই হয়তো এহেন নামকরণ। মেহজবিন পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন, চেয়েছিলেন মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতে। শুরুও করেছিলেন। বাধ সাধে শুটিং-এর ব্যস্ততা। বেবি মীনার হাতেই তো তখন গোটা সংসার! প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পর্ব সেখানেই সমাপ্ত হয়। কিন্তু হাল ছাড়েননি। বাড়িতেই শিক্ষক রেখে চলতে থাকে পড়াশোনা। শুটিং ফ্লোরে তাঁর নাম হয়ে গেছিল ‘রিডিং মেহজবিন’, কারণ হাতে সবসময়ই কোনও না কোনও বই দেখা যেত, শুটিং-এর ফাঁকে ফাঁকে পড়তেন। মীনার যখন তেরো বছর বয়স, মুক্তি পায় ‘বাচ্চো কা খেল’। সেই ছবিতেই প্রথম ‘মীনা কুমারী’ নামে আত্মপ্রকাশ। বাকিটা ইতিহাস।

বেবি মীনা

বিয়ে করেছিলেন পরিচালক কামাল আমরোহীকে। সেই বিয়ে টেকেনি। ১৯৬৪-তে বিবাহবিচ্ছেদ হয়। মদ আর কবিতা হয়ে ওঠে তাঁর আমৃত্যু সঙ্গী। ১৯৬৮-তে তিন মাস লন্ডনে চিকিৎসাধীন থাকার পর শহরে ফিরে সঞ্চিত অর্থে ওই বছরই বান্দ্রায় বারো তলায় একটি ফ্ল্যাট কেনেন। নাম রাখেন- ‘ল্যান্ডমার্ক’। শেষ তিন বছর সেটাই ছিল মীনার আশ্রয়।

নার্গিস ছিলেন মীনার প্রিয় বা-জি, দিদিতুল্য বন্ধু। তাঁর মৃত্যুর পর ‘অভিনন্দনবার্তা’ জানিয়ে একটি কবিতার শেষে লিখেছিলেন- “মীনা, মওত মুবারক হো! আর কখনও এ পৃথিবীতে ফিরো না। এ জায়গা তোমার মতো মানুষের জন্য নয়।”

মীনা কুমারীর শায়েরির বই

ঠাকুর পরিবার বা তাঁর বাবা-মা তাঁকে কিছু দিতে না পারলেও উত্তরাধিকার সূত্রে মীনা পেয়েছিলেন সৃষ্টিশীল মনন। ‘নাজ়’ ছদ্মনামে শায়েরি লিখতেন মীনা। তিনি যখন সিরোসিস অব লিভারে আক্রান্ত, সঙ্গীত পরিচালক খৈয়ামের পরিচালনায় একটি রেকর্ড বেরোয়, নাম ‘আই রাইট, আই রিসাইট’— মীনার লেখা ও গাওয়া কবিতাংশগুলির সঙ্কলন। ১৯৭১-এ মুক্তি পায় গুলজ়ার নির্মিত ছবি ‘মেরে আপনে’। অন্যতম প্রধান চরিত্রে মীনা কুমারী। মীনা তখন আরও অসুস্থ। তাঁর লেখার খাতাটি তিনি গুলজ়ারকে দিয়ে যান। তাঁরই সম্পাদনায় মীনার মৃত্যুর পর প্রকাশ পায় কবিতাগুলি। সঙ্কলনের নাম ‘তন্হা চাঁদ’। একাকী নিঃসঙ্গ চাঁদের মধ্যে নিজেকেই খুঁজতেন আর জীবনের যত বিষ… যত বিষাদ লাঘব করতে চাইতেন হয়তো।

রেহমতাবাদ কবরস্থানে শায়িত রয়েছেন মীনা

৩১ মার্চ ১৯৭২ তারিখে মারা যান মীনা কুমারী। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয় মুম্বইয়ের রেহমতাবাদ কবরস্থানে। মীনার প্রিয় বা-জি, দিদিতুল্য বন্ধু ছিলেন নার্গিস। নার্গিসও আপনজনের মতো স্নেহ করতেন তাঁকে। সেকারণেই হয়তো মীনার মৃত্যুর পর ‘অভিনন্দনবার্তা’ জানিয়ে একটি কবিতার শেষে লিখেছিলেন- “মীনা, মওত মুবারক হো!”; একটি জনপ্রিয় উর্দু পত্রিকায় ‘ইয়ে উন দিনো কি বাত হ্যায়’ শিরোনামের একটি ধারাবাহিকে স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে অশ্রু-কালিতে লিখেছিলেন, “মীনা, আর কখনও এ পৃথিবীতে ফিরো না। এ জায়গা তোমার মতো মানুষের জন্য নয়।”

তথ্যসূত্রঃ

অবন্তিকা পাল,আনন্দবাজার পত্রিকা

scroll.in

thewomb.in

Nivedita Mishra, Hindustan Times

 

Written by