
সেই বহুদিন আগে লীলা মজুমদার লিখেছিলেন, কাকে যেন এক চায়ের দোকানে পেয়ালা-পিরিচ চাইতে গিয়ে শেষমেশ শুনতে হয়, সোজা বাংলায় কাপ-প্লেট বলতে পারেন না? এই ‘সোজা বাংলা’র যুগে আমাদের ভাষাটি আড়ে-বহরে বেড়ে গেছে অনেক। কিন্তু সেই সমস্ত সীমানা বা সীমানাহীনতার মধ্যে দাঁড়িয়ে ঠিক কেমনভাবে বেঁচে থাকে ভাষা, তাও প্রবাসে? আর প্রবাসে বসে হঠাৎ খবরে জানতে ঠিক কেমন লাগে, নিজের দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের আইনি দপ্তরের কাগজে, নিজের বিশ্ব-স্বীকৃত রাষ্ট্র-স্বীকৃত মাতৃভাষাকে বেনামে ডাকা হয়েছে? এবং তা কোনো সরল ভ্রান্তি নয়? রাজনৈতিক বাছবিচার থেকে উঠে আসা এক বিশেষ জাতিগত এবং নৃতাত্ত্বিক একপেশে পংক্তিবিভাগ, সোজা বাংলায় ‘রেশিয়াল প্রোফাইলিং’ (racial profiling)! (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
দিল্লি পুলিশের থানা ‘বঙ্গ ভবন’-এর সাহায্য চেয়ে লিখে পাঠালেন “বাংলাদেশি” ভাষার কিছু নথিপত্রের অনূদিত রূপ তাঁদের চাই। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে সরকারিভাবে এর বিরোধিতা করেছেন এবং নির্লজ্জভাবে বিভিন্ন জাতীয়-কেন্দ্রীয় মিডিয়া এই বিরোধিতাকে ‘পলিটিসাইজ’ করা বলে দাগিয়ে দিয়েছেন। আবার দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের ‘মাতৃ’-ভাষার মহিমা এমনই যে এই ভাষার নিজেরই এমন সন্তানও তৈরি হয়েছে (পড়ুন, গত দশ বছরে) যারা রাজনৈতিক মতামতের কারণে এ ঘটনার বিরোধিতা তো দূরের কথা, পারলে কেন্দ্রকে প্রায় সমর্থনই করে বসছেন। কেন্দ্রীয় পুলিশের এই ঘৃণ্য রাজনৈতিক জাতিগত বিদ্বেষের পাশাপাশি বাংলা ভাষার আসল দুরাবস্থাটা ভেতর বাড়িতেও! ধর্মীয় জিগির তুলে অথবা পুজোয় আমিষ-নিরামিষ নিয়ে নিচ মন্তব্য থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গকে বিভিন্নভাবে নিচু করে দেখানোর তালিকায় এবার ভারতীয় বাঙালিকে একেবারে বিজাতীয় বলে চালিয়ে দেওয়ার এই ভয়াবহ খেলা গড়িয়েছে অনেক দূর। ইউরোপীয় শাসনের কারণে ইংরিজি একেবারে বাইরে থেকে এসেও গোটা ভারতের ওপর আধিপত্যের কারণে গোটা দেশে বিভিন্ন ভাগে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারি ভাষার স্থান নেয়, এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বায়ন তা দৃঢ় করে। ইদানীংকার যে হিন্দি ভাষার আগ্রাসনের রাজনীতি, তা এমনভাবেই চাপানোর চেষ্টা করা হয় যেন ইংরিজিতে সরকারি কাজটুকু বাদে বাকি আত্মিক ও ব্যক্তিগত স্থান দিয়ে দিতে হবে হিন্দিকেই। কিন্তু ভারতের যে রাজ্য ও বিধানসভা-ভিত্তিক কাঠামো, তাতে দেড়শো-দুশো বছরের ইংরিজিকে মাথায় রেখেই চিরকাল আঞ্চলিক নৃগোষ্ঠীর ‘এথনিক ভাষাটি’ই কথ্যভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারিভাবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ভাষার স্থান পেয়েছে। বাঙালির মনে রাখা দরকার, মানবসভ্যতার আদি সমাজে, সুমেরীয় সভ্যতার সুমেরীয় ভাষাটিই অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল সময়ের সঙ্গে নয়, রাজনৈতিক কারণে। আক্কাদীয় আধিপত্যে, সমস্ত সরকারি কাজ থেকে বাদ পড়ে যায় সুমেরীয় ভাষা, নিজের অঞ্চলেই নিজেদের বাসভূমিতেই। (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
বিদেশি দৃষ্টিভঙ্গি তাহলে আমাদের কীভাবে দেখছে বা দেখবে? দূরবীন লাগিয়ে দেখলে, যতক্ষণ আমাদের অধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব, পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তী, দোলের রং, পৌষের পিঠে-পায়েস, জিরে দিয়ে মাছের ঝোল, সাহিত্যের ক্লাসিকস একই থেকে যাচ্ছে, ততক্ষণ অনায়াসেই তারা আমাদের একটি ‘কমন মেজর এথনিসিটি’ হিসেবেই জানবে।
নৃগোষ্ঠী বনাম জাতি বনাম রাষ্ট্র
তিনটি প্রশ্ন – এই প্রশ্নগুলো বেঁচে থাকুক শান্তিপূর্ণভাবে। সাধারণত বিদেশে প্রবাসীর কোনও আলাপ-পরিচয় এভাবেই শুরু হয়। কোনো আমেরিকান বা বিদেশি কেউ আমাদের পরিচয় চাইলে সাধারণত উত্তর আসে আমি পশ্চিমবঙ্গের, আমি ভারতীয় (বা যেখানে উল্টোদিকের কেউ আগেই বোঝেন যে ভারতীয়), যোগ করি ফ্রম ক্যালকাটা, কারণ আমার শহরের আন্তর্জাতিক মনীষা আমার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়। উল্টোদিকে একজন বাংলাদেশি একজন আমেরিকানকে সাধারণত বলে থাকেন, ‘আই অ্যাম আ বেঙ্গলি’ বা ‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ’। যেহেতু তাঁদের ভাষা ও দেশের নামের সম্পূর্ণ সাযুজ্যই যথেষ্ট ব্যাখ্যা এনে দেয়, হয়তো সে কারণেই ‘আই অ্যাম আ বাংলাদেশি’ কথাটা এখনও সেভাবে প্রাথমিক উত্তর নয় বা আমার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জ্ঞানে প্রচলিত নয়। অনেকসময়ই শুরুতে শুধু ‘বাঙালি’ বললে দেখা যায় তাঁরা জিজ্ঞেস করেন, ‘বেঙ্গলি মানে বাংলাদেশ থেকে, না?’। সেক্ষেত্রে আমি সচেতনভাবে বলি, আমি ভারতের, কলকাতার। যেমন, দুই পারের পাঞ্জাবিরাই সাধারণত নিজেদের পাঞ্জাবি পরিচয় দিয়ে থাকেন, তারপর দেশের নাম যোগ করেন। (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
এই যে ভাষা-উৎসব-খাদ্যাভ্যাস-পোশাক-সংস্কৃতি-লোকাচার-ধর্ম – সমস্ত কিছু মিলিয়ে যে মাটি (এথনিসিটি), তা প্রবাসে প্রত্যেকের কাছে এতই দুর্লভ, অথবা হারাতে বসলে তা এতই সহজে হারিয়ে যাবে, যে তার কণামাত্রও পেলে আঁকড়ে ধরা জরুরি হয়ে পড়ে। এবার প্রশ্ন হলো, বিদেশি দৃষ্টিভঙ্গি তাহলে আমাদের কীভাবে দেখছে বা দেখবে? দূরবীন লাগিয়ে দেখলে, যতক্ষণ আমাদের অধর্মীয়-সাংস্কৃতিক উৎসব, পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্র জয়ন্তী, দোলের রং (দোলপূর্ণিমার পুজো নয়, বসন্তের আগমের উৎসব, রং খেলা), পৌষের পিঠে-পায়েস, জিরে দিয়ে মাছের ঝোল, আমাদের মুখের মূল ভাষা, সাহিত্যের ক্লাসিকস একই থেকে যাচ্ছে, ততক্ষণ অনায়াসেই তারা আমাদের একটি ‘কমন মেজর এথনিসিটি’ হিসেবেই জানবে। আর রাষ্ট্রীয় উগ্রতা ছাড়াও চিনবে-জানবে ভৌগোলিক অবস্থান, আর আমাদের চিরকালীন আত্মপরিচয়ের মূল সূত্রগুলি। (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
ঐতিহাসিক এবং নৃতত্ত্ববিদরা এক বাক্যেই বলেন, অনেক হাজার বছর আগেও যখন দেশ-রাষ্ট্র-সীমানা অনেক সরল এবং সংক্ষিপ্ত ছিল, তখনও তো ভাষা ও সংস্কৃতিই একটা জনগোষ্ঠীর নির্ণায়ক চিহ্ন হয়ে থেকেছে। যেমন, এই যে দুটো রাজ্যের মাঝখান দিয়ে দাগ টেনে দুটি দেশ তৈরি হল – তার ফলে, পাঞ্জাবি আর বাঙালি, এই দুটি প্রাচীন নৃগোষ্ঠী দুটি নবীন রাষ্ট্রের সীমানায় ভাগ হয়ে গেল। নৃতত্ত্ব মানলে, এই মানুষদের পক্ষে নিজেদেরকে পাঞ্জাবি বা বাঙালি ভাবাই স্বাভাবিক, কারণ সেই পরিচয়ই তুলনামূলক প্রাচীন এবং সহজাত। এই সহজাত প্রবণতার মধ্যে প্রাগৈতিহাসিক রাজনীতি নেই। লোকাচার, খাদ্য সংস্কৃতি ভাষা ধর্মাচরণ কাব্য গান মিলিয়ে একটা সার্বিক পরিচয়ের ‘ইউনিট’। (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
দীর্ঘ এক-দেড় শতাব্দী জুড়ে, স্বাধীনতা বিপ্লব জুড়ে, দেশে ও বিদেশের প্রায় সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষাভিত্তিক উচ্চপদে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাই ভারতকে বিদেশের মাটিতে সম্মান ও স্বীকৃতি এনে দিয়েছে নিরন্তর।
ইদানীং অন্তত জনসংখ্যা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিচারে (পশ্চিমি দুনিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্য মিলে) বাংলাদেশের চলিত বাংলার মুখই অদূর ভবিষ্যতে মূল ভূমিকা নেবে এবং এখনই নিচ্ছে। আমাকে বিদেশি বন্ধুদের বোঝাতে হয়েছে, আমি বাংলা বলি মানেই বাংলাদেশি নই। বাংলা তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা। হয়তো একদিন অ-ভারতীয়দের কাছে বাংলা বাংলাদেশের ভাষা বলেই বাইরে পরিচিত হবে। এমনও হতে পারে, গোবলয়ের রাজনৈতিক কারণে, যা এখনই ঘটছে সুচতুরভাবে, ভারতীয় অবাঙালির কাছেও বাংলা ভাষার এইটাই পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে। এরপর হয়তো দেখা যাবে তারা আরও দৃঢ়ভাবে বলছেন, পশ্চিমবঙ্গে কিন্তু আসলে কিছু বাংলাদেশিই থাকে যারা বাংলায় কথা বলে। এবং তাই যদি হয়, তাহলে নিজের দেশে নিজেদের ঐতিহাসিক মূল ভূখণ্ডে একটি জাতিকে ডায়াস্পোরা সাজানো মুখের কথা নয়, বিরাট রাজনীতি। কেন্দ্রীয় বিভাজননীতি এবং সোশ্যাল মিডিয়া ট্রল মিলে সেই অসম্ভবকে বহুদূর সম্ভব করে ফেলছে! (প্রবাসে বাংলা ভাষা)
প্রামাণ্য প্রমিত বাংলা ভাষা কি জরুরি নয়?
আমরা যারা বাংলা ভাষার উদারতা নিয়ে চিন্তিত, তাদের মনে রাখা জরুরি যে উদারতাও একটা ভাষার মৃত্যুর কারণ হতে পারে (যেমন ঘটেছিল ব্যাবলিন ও আসিরিয়ার ভাষায় কথ্য আরামায়িক মেশার ফলে)। অজস্র ইসলাম ধর্মাবলম্বী বাঙালির কথাবার্তায় লক্ষ্য করলে মনে পড়বে, অন্তত গত শতাব্দীতে বা উনবিংশ-বিংশ শতাব্দীর সময়টাতেও এতখানি স্পষ্ট আরবি/ধর্মীয় পরিভাষার ছাপ পড়ত না, আজ পঞ্চাশ বছর পরে বাংলাদেশের বাংলায় তার ছাপ পড়ে। সুষম মিশ্রণ নয়, ব্যাকরণ ঘেঁটে দেওয়া মিশ্রণ। এক-দুই প্রজন্মের মধ্যেই আমাদের বাংলাতেও মিশেছে-মিশবে হিন্দি ভাষা। আগে বিনোদন, তারপর হিন্দিবেল্টের ধর্মের সূত্রে। অথচ এককালে উর্দুভাষী, গৌরবর্ণ পাকিস্তানিরা পূর্ব-প্রান্তের কালো, বেঁটে-রোগা, বাংলা বলা, কপালে টিপ-পরা, পুকুরের স্নান-করা বাঙালিদের কী অকথ্য মনুষ্যেতর গালাগালই না দিয়েছেন। প্রায় যেমন আজকের মধ্যভারত পূর্ব-প্রান্তের এই রাজ্যটিকে দিয়ে থাকে। তারা ভাবতেন পূর্ব-পাকিস্তান যথেষ্ট মুসলমান নয়, আর আমাদের হিন্দিবেল্ট ভাবেন, আমরা যথেষ্ট হিন্দু নই। অথচ দীর্ঘ এক-দেড় শতাব্দী জুড়ে, স্বাধীনতা বিপ্লব জুড়ে, দেশে ও বিদেশের প্রায় সমস্ত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও শিক্ষাভিত্তিক উচ্চপদে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরাই ভারতকে বিদেশের মাটিতে সম্মান ও স্বীকৃতি এনে দিয়েছে নিরন্তর। বাংলাদেশ বনাম পশ্চিমবঙ্গ এই লেখার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু যে সম্মান দীর্ঘ দুই শতাব্দীর অর্জন, তা যে বিস্মৃতির খুব কাছাকাছি এসে পড়েছে, সেটুকু মনে করা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালির পক্ষে সত্যিই জরুরি। কারণ ভাষার যে মৃত্যু আমরা এড়াতে চাই, তা হলো তার শুধুমাত্র একাডেমিক ল্যাঙ্গোয়েজ হয়ে বেঁচে থাকা, যার অনিবার্য ভবিষ্যৎ হলো সম্পূর্ণ বিলুপ্তি।
দীর্ঘকাল এই প্রবাসের শহরে একটুকরো উষ্ণতার মতন যেখানে বাঙালি আনাজপাতি পাই সেটা হলো বাংলাদেশি দোকান আর যেটাকে সবাই চলতি কথায় ‘ইন্ডিয়ান স্টোর’ বলে, সেটা ছিল পাকিস্তানি দোকান। এ দৃশ্য কেবল এদেশেই নয়, ইউরোপেও প্রায় সর্বত্রই প্রযোজ্য।
প্রবাস ও পরিস্থিতি
কাজেই, প্রবাসী হিসেবে মনে হয়, যদি প্রমিত বাংলাকে এতই উদার হতে হয়, তাহলে তার বাঁচার উপায় না থাকাই স্বাভাবিক! যদি গ্রেট ব্রিটেন ভাবত দক্ষিণ ইংল্যান্ড বা পাহাড়ি স্কটল্যান্ড ঘেঁষা লোকও তো বেশ ইংলিশ বলে, তাহলে প্রামাণ্য ইংরিজি ভাষা এভাবে পৃথিবীতে ছড়াতে পারত না। যদি বার্সেলোনা ভাবত চিলে-র স্প্যানিশ থাকুক না, তাহলে সব প্রমিত স্প্যানিশ শিক্ষার স্কুল উঠে যেত! ভাষা যেমন প্রাণের গানের এবং ঘরের, ভাষা তেমনই এক বৃহত্তর বাণিজ্য, শিক্ষা এবং প্রভার প্রসারের অস্ত্র। একটি ভাষার আঞ্চলিকতার বা মিশ্রিত রূপের পাশাপাশি একটা মোটামুটি কাঠামোগত প্রমিত রূপ তার কার্যনির্বাহী ভূমিকার জন্য অত্যন্ত জরুরি! এই জায়গাটা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিকভাবে পুষ্ট না হলে কোনো ভাষার প্রতি শুধুমাত্র ভালোবাসা তাকে বড়ো আকারে টিকিয়ে রাখার পক্ষে যথেষ্ট নয়। বিশ্ববাণিজ্যে বাংলাদেশের যে প্রসার, তা ভারতীয় বাঙালিদের কল্পনাতীত। প্রবাসে দুটো বাঙালি মাছ অথবা দিনাজপুরের সুগন্ধী পায়েসের চাল চাইলেও মনে-মনে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ধন্যবাদ দিতে হয়। দীর্ঘকাল এই প্রবাসের শহরে একটুকরো উষ্ণতার মতন যেখানে বাঙালি আনাজপাতি পাই সেটা হলো বাংলাদেশি দোকান আর যেটাকে সবাই চলতি কথায় ‘ইন্ডিয়ান স্টোর’ বলে, সেটা ছিল পাকিস্তানি দোকান। এ দৃশ্য কেবল এদেশেই নয়, ইউরোপেও প্রায় সর্বত্রই প্রযোজ্য। তেমনি বিদেশের মাটিতে ভারতীয় দোকানে বাংলা ভাষা না থাকলেও বাংলাদেশি প্রোডাক্টের গায়ে বাংলায় লেখা লেবেল রয়েছে। একজন বিদেশি তাই বাঙালি বললে সেই মানুষটার উৎস বাংলাদেশই ধরেই নিতে পারেন। আদতে একটা আলগা উপমহাদেশীয় ঐক্য, যা এই তিনটি দেশের একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল EU-র মতন, তা এই ‘এথনিক আনাজপত্রে’র টানে ইউটোপিকিভাবে তৈরি হয়েছে বিদেশের মাটিতে। কিন্তু ভারতের মতন দেশের কেন্দ্রীয় সরকারি দপ্তর কি তার লিখিত নথিতে সংবিধান-স্বীকৃত ভাষাকে এহেন অবমাননা করার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ দেখাতে পারেন?
এই অজস্র জটিলতার ভিড়ে শেষে ইতিহাস বোধ থেকে একটা ছোট্ট ভাবনা মনে আসে। তিন-চার হাজার বছর পরে আজ স্থূলচোখে যেমন মেসোপটেমিয়া সভ্যতা বলতে ‘আক্কাদ’ আর ‘সুমেরু’কে আলাদা করি না, যেমন লেভান্ত ভাবলে জুডাহ আর ইজরায়েলকে আলাদা করি না, ঠিক সেভাবেই কোনো হাজার-দুহাজার বছরব্যাপী ইতিহাসের মাপকাঠিতে মাপলে, আমাদের এই দেশ দুটির ভাষাও কোনো দিনই আলাদা বলে বিচার্য হবে না। নদীমাতৃক কৃষিভিত্তিক সাংস্কৃতিক বঙ্গদেশ, যাঁর ওপর দেশভাগের তুলনামূলক নতুন দুটি দাগ টানা হয়েছে, সেই জনগোষ্ঠীর ভাষা নথিবদ্ধ থাকবে বাংলা ভাষা হয়েই।
________________
মতামত লেখকের নিজস্ব
