ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের গতিপথ কোন দিকে?

লকাতার এক প্রতিবাদী মঞ্চের তরফে বাংলাদেশের গায়িকা শায়ানকে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি বলেছিলেন, তিনি আসতে অত্যন্ত আগ্রহী, কিন্তু দেশের পরিস্থিতির জন্য ভিসা পাবেন না। এই শায়ান-এরই একটি গান ‘এই মেয়ে শোন, এই রাত এই ভোর, যতখানি পুরুষের, ততখানি তোর’ প্রায়শ’ সেই প্রতিবাদী মঞ্চে গাওয়া হয়৷ দুই দেশকে ভাষা আর সংস্কৃতির মতো বেঁধেছে প্রতিস্পর্ধাও৷

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি রাষ্ট্র—ভারত ও বাংলাদেশ। তারা কেবল ভৌগোলিক প্রতিবেশী নয়, স্মৃতি ও ভাষার অন্তরঙ্গতায় গাঁটছড়া বাঁধা দুই দোসর। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখার তাদের আলাদা করার কথা; কিন্তু তা যেন সান্নিধ্যেরই সেলাই ফোঁড় দেওয়া সুতো। রাজনৈতিক কারণে কখনও দুই বাংলার যোগাযোগ দৃঢ় হয়েছে, কখনও সে বুনন এলোমেলো হয়ে গেছে। তবু এ কথা কী করে অস্বীকার করবেন রাজনীতিবিদরা যে ভূগোল পুব আর পশ্চিম বাংলাকে চিরসঙ্গী করেছে, আর দেশভাগের ঐতিহাসিক যন্ত্রণা তাদের করেছে আত্মার আত্মীয়?

 ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

শুরুর দিনগুলি
একথা কারও অজানা নয় যে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সামরিক ও কূটনৈতিক সাহায্য স্বাধীন বাংলাদেশের রূপায়নে ভূমিকা নিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ শরণার্থী ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় পেয়েছিলেন। কেউ বলতেই পারেন, ভূ-রাজনীতিতে আবেগের স্থান নেই, ভারত যা করেছিল, তাতে তারও স্বার্থ ছিল। কিংবা বাংলাদেশের মুক্তি পাকিস্তানকে দুর্বল করেছিল বলেই ভারত তাতে মাথা ঘামিয়েছিল। কিন্তু একাত্তর-পূর্ববর্তী সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের অত্যাচার ও বিমাতাসুলভ আচরণ তাতে মিথ্যা হয়ে যায় না। সেই যুদ্ধের স্মৃতি দুই দেশের আবেগঘন সম্পর্কের ভিত্তি হয়ে উঠেছিল একাত্তর-উত্তর কয়েকটি বছরে। যাঁরা যুদ্ধের দিনগুলি প্রত্যক্ষ করেছেন, তাঁদের কাছে ভারত শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র ছিল না, ছিল মুক্তিপথের সহযোদ্ধা। তাই সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ ও সহযোগিতামূলক।

কিন্তু ১৯৭৫ সালের পর বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ভূরাজনীতির টানাপোড়েনে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে জটিল হয়। ১৯৯০-এর দশক থেকে এই জটিলতা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সময়ে, যখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় ছিল, তখন দুই দেশের সম্পর্কে এক শীতল পর্ব শুরু হয়। বিএনপি সাংস্কৃতিকভাবে ভারতের প্রভাব থেকে পৃথক এক জাতিপরিচয়কে গুরুত্ব দেয়। তাদের আদর্শে সরাসরি ভারত-বৈরিতা ছিল না, কিন্তু সম্পর্কের ভাষা ও সুরে দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, ভারতের উদ্বেগ ছিল প্রধানত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কারণে। বিএনপি জোট করেছিল কিছু অতি-ইসলামিক গোষ্ঠীর সঙ্গে। ভারতের অভিযোগ ছিল, উত্তর–পূর্ব ভারতের কিছু বিদ্রোহী সংগঠন, যেমন উল্ফা, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। অস্ত্র চোরাচালানের ঘটনাও ঘটছে। ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে বিপুল অস্ত্র বাজেয়াপ্ত হয়। এই ঘটনা দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট গভীরতর করে। বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সব অভিযোগ অস্বীকার করলেও সন্দেহের আবহ সহজে ঘোচেনি।

২০০৫ সালে সারা ভারতে একযোগে বোমা হামলা চালায় জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ বা জেএমপি। যদিও পরবর্তী কালে বিএনপি সরকার তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে, তবু ভারতের মনে হয়, বড়ো দেরি করে ব্যবস্থা নেওয়া হল। ভারতের অবিশ্বাস পোক্ত হয়। একই সঙ্গে তিস্তা নদীর জলবণ্টনসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে অগ্রগতি না হওয়ায় সম্পর্কের উষ্ণতা বাড়েনি। আবার সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্নও হয়নি। কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় ছিল, পারস্পরিক বাণিজ্য চলছিল এবং আনুষ্ঠানিক বৈঠকও হচ্ছিল। সম্পর্ক ছিল শীতল, তা বলে ভঙ্গুর নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মানচিত্রে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দু’টি রাষ্ট্র—ভারত ও বাংলাদেশ। তারা কেবল ভৌগোলিক প্রতিবেশী নয়, স্মৃতি ও ভাষার অন্তরঙ্গতায় গাঁটছড়া বাঁধা দুই দোসর। প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তরেখার তাদের আলাদা করার কথা; কিন্তু তা যেন সান্নিধ্যেরই সেলাই ফোঁড় দেওয়া সুতো।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ

২০০৯–এর পরের অন্তরঙ্গতা
২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের উন্নতি ঘটে। সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা বাড়ে। ভারত কয়েকজন সন্ত্রাসবাদী নেতাকে ফেরত চায়, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সেই হস্তান্তর করা হয়। ২০১৫ সালে ঐতিহাসিক স্থল-সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হয়। দীর্ঘদিনের সীমান্ত সমস্যার সমাধান হয়৷ ছিটমহল অঞ্চল সংক্রান্ত সংকটের অবসান ঘটে। জ্বালানি সহযোগিতা, বিদ্যুৎ সংযোগ বাড়ে। সড়ক ও রেল যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রানজিট ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। বাংলাদেশের জন্যও এই যোগাযোগ ব্যবস্থা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে এই ঘনিষ্ঠতার মধ্যেও একটি বিরোধাভাস তৈরি হয়। উল্লেখ্য, বিএনপি তখন বিরোধী দল এবং সরকারে আসীন পার্টির বিরোধিতা করতে গিয়ে আবার তারা জামাতের সঙ্গে আঁতাত জারি রাখে। বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দল ও তরুণদের একাংশের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে ভারত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে (আওয়ামি লীগ) অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ। কূটনীতি যখন পার্টিনির্ভর হয়ে ওঠে, তখন দুই দেশের সম্পর্কের স্থায়িত্ব সংকটে পড়ে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিও নড়ে যেতে পারে।

বিএনপির প্রত্যাবর্তন ও পুনর্গঠনের ইঙ্গিত
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন জি প্রজন্মের আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পতন হল। কিন্তু যে অন্তর্বর্তী সরকার এল, দাঙ্গায়, মন্দায়, জামাত-তোষণে তা বাংলাদেশের নাগরিককে অতিষ্ঠ করে তুলল৷ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন করে সরকার গঠিত হয়েছে এখন৷ আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ হওয়ায় বিএনপির জয় ছিল অবধারিত। নতুন করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর এবার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেমন হয়, সেটা ভবিষ্যতই বলতে পারবে। অতীতের অভিজ্ঞতা দু তরফের নীতিনির্ধারকদেরই অতিসতর্ক, সন্দেহপ্রবণ করে রাখতে পারত।

কিন্তু দ্রুত দেখা গেল, দু’তরফেই ধাপে ধাপে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। নরেন্দ্র মোদি তথা ভারত সরকার নতুন সরকারকে টুইট করে অভিনন্দন জানান। বলা বাহুল্য, এর মাধ্যমে কূটনৈতিক যোগাযোগ সক্রিয় রাখা হল। অন্যদিকে নতুন প্রধানমন্ত্রী, খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান ভারতীয় ভিসা ও মৈত্রী বাস পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে তৎপরতা দেখিয়েছেন। বাংলাদেশের বহু নাগরিক ভারতে চিকিৎসার জন্য আসেন। তাই প্রথম পদক্ষেপটি প্রয়োজনীয় ছিল। তা না হলে নাগরিক অসন্তোষ দেখা যেত। পরিবর্তে বাংলাদেশ ভারতীয় নাগরিকদের জন্য পূর্ণ ভিসা পরিষেবা পুনরায় চালু করে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাস, বিশেষ করে কলকাতা–ঢাকা–আগরতলা রুটের বাসগুলি এখন ট্রায়াল রান করছে। এগুলি হল কূটনৈতিক সংকেত যে, জামাতের মতো ভারত বিদ্বেষের পালে হাওয়া দেওয়ার কোনো আশু পরিকল্পনা হয়তো তারেক সাহেবের নেই৷

তবে একথা অনস্বীকার্য যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জামাতের প্রভাব আর ভারত বিদ্বেষ দুই-ই বেড়েছিল। অতি-ইসলামিক যুবনেতা ওসমান হাদির মৃত্যুর পর গণ-উন্মাদনা এবং ভারতবিদ্বেষের বিষ আমরা সোশাল মিডিয়ায় প্রত্যক্ষ করেছি৷ তার প্রভাব খানিক এখনও মানুষের মনে রয়ে গেছে হয়ত বা৷ দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাজটা তাই এখন খুবই কঠিন। তাঁদের পদক্ষেপগুলো সুচিন্তিত হতে হবে। মানুষে–মানুষে যোগাযোগ পুনরুদ্ধার হবে কিনা, দেশে-দেশে আস্থা পুনর্গঠন হবে কিনা, তা তাঁদের আচরণের উপর অনেকখানি নির্ভর করছে। এখন পর্যন্ত যা দেখা গেছে, তাতে মনে হয়েছে দুই সরকারের সম্পর্কে আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, কিন্তু আছে বাস্তববাদী, মাপা সহযোগিতার ইঙ্গিত।

বাংলাদেশে বিএনপি-র প্রত্যাবর্তন

অর্থনীতি, বাণিজ্য, জল প্রশ্ন
ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। কিন্তু বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্য ঘাটতির মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় বিএনপি সরকারকে অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসে জোর দিতে হবে। সেক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে আগে হওয়া চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে দেখতে পারেন তাঁরা, সেগুলোকে রাজস্ব ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উপায় হিসেবে কাজে লাগছে কিনা। এই প্রক্রিয়া যদি স্বচ্ছভাবে পরিচালিত হয়, তবে চুক্তিগুলোর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।

তিস্তা নদীর জলবণ্টন প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে চুক্তিটি এগোয়নি। বাংলাদেশের জনমনে তিস্তা জলবণ্টন একটি সংবেদনশীল ইস্যু। এর সমাধান আশু হওয়া প্রয়োজন।

নিরাপত্তা, সীমান্ত ও রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ
সন্ত্রাসবিরোধিতা ও সীমান্ত অঞ্চলের স্থিতিশীলতা দুই দেশেরই অভিন্ন স্বার্থ। এব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সীমান্ত ব্যবস্থাপনার চেষ্টা পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন করতে পারে। সর্বোপরি দু’দেশেরই উচিত সীমান্তে বেসামরিক মানুষের মৃত্যুহার হ্রাসে উদ্যোগ নেওয়া। অতীতের অভিজ্ঞতা হয়ত ভারতকে অতিসতর্ক রাখবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় আবার নতুন করে চেষ্টা করা বাঞ্ছনীয়। রোহিঙ্গা সংকটের যৌথ মানবিক মোকাবিলাও সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে। বাংলাদেশ দশ লক্ষেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁদের অনেকে ভারতেও এসে পড়েছেন। মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে আন্তির্জাতিক চাপে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ভারত যদি মায়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক কথাবার্তায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক ভারসাম্য
বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এইটি কি ভারতবিরোধী অবস্থান? হতেও পারে। তবে বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতি ছোটো রাষ্ট্রের কৌশলগত বাস্তবতা। প্রশ্ন হল, ভারত কি আরও আকর্ষণীয় অর্থনৈতিক প্রস্তাব ও সহযোগিতার মাধ্যমে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে?

তরুণ প্রজন্মের একাংশের মন থেকে, তাদের সমষ্টিগত অবচেতন থেকে (‘কালেক্টিভ আনকনশাস’-এর কথা বলেছিলেন মনস্তাত্ত্বিক ইউং) মুক্তিযুদ্ধ পুরোপুরি মুছে গেছে৷ তাদের জাতীয়বাদ হয়ে উঠেছে ধর্মাশ্রয়ী। অন্যদিকে ভারতের তরুণ প্রজন্মেরও হাল একই, তারাও সংখ্যাগুরু ধর্মাশ্রয়ী একরকম জাতীয়তাবাদে উদ্দীপ্ত।

ভারত-বাংলাদেশ রোহিঙ্গা

তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম ডিজিটাল যুগে বেড়ে উঠেছে। তাদের সার্বভৌমত্ব, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক সম্মানের দৃষ্টিকোণ থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক মূল্যায়ন করা সমীচীন ছিল। সেটাই কাঙ্ক্ষিত ছিল। কিন্তু সোশাল মিডিয়া ঘৃণার জাগরণে যতটা ভূমিকা নেয়, গঠনমূলক ভাবনার জাগরণে হয়ত ততটা নয়। তরুণ প্রজন্মের একাংশের মন থেকে, তাদের সমষ্টিগত অবচেতন থেকে (‘কালেক্টিভ আনকনশাস’-এর কথা বলেছিলেন মনস্তাত্ত্বিক ইউং) মুক্তিযুদ্ধ পুরোপুরি মুছে গেছে৷ তাদের জাতীয়বাদ হয়ে উঠেছে ধর্মাশ্রয়ী। অন্যদিকে ভারতের তরুণ প্রজন্মেরও হাল একই, তারাও সংখ্যাগুরু ধর্মাশ্রয়ী একরকম জাতীয়তাবাদে উদ্দীপ্ত। ইসলামবিরোধী ঘৃণার স্রোত তাদেরও রক্তে নাচে।

সারা বিশ্বব্যাপী যে দক্ষিণপন্থী ঝোঁক দেখা দিয়েছে, তাতে হয়ত এটাই অনিবার্য ছিল। সোশাল মিডয়ায় দেখা যাচ্ছে, দুই দেশের তরুণ প্রজন্ম যেন ভাষা ও সংস্কৃতির সাম্য-কে তুড়ি মেরে উড়িয়ে, শুধু ও শুধুমাত্র নিজ নিজ ধর্মপরিচয়ের বাহক হয়ে, দাঁতমুখ খিঁচিয়ে পরস্পরের সামনে দাঁড়াচ্ছে৷ এই পরিস্থিতিতে দুই সরকারের দায় বেড়ে যায় নিরপেক্ষ কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার। ভারতের দায় হয়ে ওঠে ওদেশের কোনো নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ধারণাকে ভেঙে নতুন বন্ধুতার ভাষ্য তৈরি করার। আর দুই দেশের সচেতন নাগরিকের বেড়ে যায় পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের কথা অনবরত বলে যাওয়ার দায়৷

সংস্কৃতির সেতুবন্ধন
রাজনীতির উত্থান-পতনের বাইরে, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি দুই দেশকে গভীরভাবে বেঁধে রেখেছে, সে কথা আমরা অস্বীকার করি কী করে? দুই দেশে একই ভাষায় সাহিত্য রচিত হয়, একই ভাষায় সিনেমা নির্মাণ হয়। সাহিত্যিক ও কলাকুশলীদের মধ্যে আছে নিবিড় যোগাযোগ। বাংলাদেশের ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রটি দেখতে কলকাতার তরুণ প্রজন্ম নন্দন প্রেক্ষাগৃহের সিঁড়িতেও বসে পড়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুই দেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা। আর নজরুল ইসলাম দুই বাংলারই আদর্শগত অক্সিজেন। কলকাতা ও ঢাকার বইমেলায় উভয় দেশের লেখকরা অংশ নেন। পহেলা বৈশাখের উদ্যাপন হয় দু’দেশেই। ভাষাদিবসে শুধু বাংলাদেশ নয়, আমরাও আবেগবিহ্বল হয়ে পড়ি। মনে হয়, সংস্কৃতির এই আদানপ্রদানকেও কূটনীতিতে কাজে লাগানো যায়। সংগীত, চলচ্চিত্র ও ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি নেওয়াই যায়।

বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম

শেষ কথা
ঐতিহাসিক ভাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে এক নেতৃত্বের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অন্তরঙ্গ হয়েছে, অন্য নেতৃত্বের আমলে সন্দেহ বেড়েছে। এই চক্র ভাঙতে হলে সম্পর্ককে পার্টিগত পছন্দের বদলে প্রাতিষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় ভিত্তি অবলম্বন করতে হবে। ভারত ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রায়কে সম্মান জানিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শক্তির প্রতি পক্ষপাত এড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশও উদ্যোগ নেবে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার, এমন আশা করাই যায়। সরকার যাবে আসবে। কিন্তু তাদের কাজকর্মে প্রভাবিত হয়ে, দুই দেশের নাগরিকের মনে সন্দেহের মেঘ জমলে উপমহাদেশের পরিবেশ কলুষিত হয়। আশা করা যায় ভাষার নদী, সংস্কৃতির স্রোত এবং ইতিহাসের স্মৃতি দুই বাংলার মধ্যে বহমান থাকবে।

____________________
মতামত লেখকের নিজস্ব

Written by