জগৎজোড়া খ্যাতির পরেও কেন্দ্রীয় বাজেটে ব্রাত্য উত্তরবঙ্গের চা-শিল্প

 

ত পয়লা ফেব্রুয়ারি সংসদে টানা নবমবার কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করেন দেশের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ। গোটা দেশ তাকিয়ে ছিল বাজেটের দিকে, অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলেন উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা। এই বুঝি তাঁদের জন্য কোনও ঘোষণা করা হল…। না! ৮৫ মিনিটের বাজেট বক্তৃতায় উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের জন্য কোনও শব্দ ব্যয় করেননি দেশের অর্থমন্ত্রী। বিগত পাঁচ বছর ধরে পর পর পাঁচটি বাজেটে (২০২৪ সালের ভোট অন অ্যাকাউন্ট সহ) একই অভিজ্ঞতা হচ্ছে চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত উত্তর-বাংলার মানুষদের। দেশের সরকার হয়তো তাঁদের রুজি-রুটির অন্যতম প্রধান মাধ্যম চা শিল্প নিয়ে ভাবছেন, হয়তো কেন্দ্রীয় বাজেটে কোনও না কোনও ঘোষণা থাকবে চা শিল্প নিয়ে, এই আশায় বসে থাকেন পাহাড়, তরাই-ডুয়ার্সের মানুষ। শেষে মেলে নিরাশা, উপেক্ষা। এবারেও তাঁরা হতাশ।

আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা, স্বল্প সুদে কার্যকরী মূলধনের জোগান, চা বাগানগুলির নানা উন্নয়নমূলক খাতে ভর্তুকি, বন্ধ বাগান অধিগ্রহণ এবং তা চালু করা, রপ্তানি ভর্তুকি, অবৈধ চা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, কর মকুব, চায়ের নূন্যতম মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদির প্রত্যাশা ছিল বাজেটে। কিছুই ঘোষণা হয়নি।

উত্তরবঙ্গের বন্ধুর পার্বত্য উপত্যকা, সুগভীর গিরিখাদ, পাথুরে জমি প্রথাগত কৃষিকাজের জন্য প্রতিকূল। বাগিচা ফসল চা-কে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বাংলার উত্তরাঞ্চলের কৃষিকাজ। তরাই-ডুয়ার্স আর পর্বতের ঢালে চায়ের বাগানগুলির অবস্থান। চা-বাগানকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে জনবসতি, শহর আর ব্যবসা-বাণিজ্য। উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি চা শিল্পের উপর অনেকখানি নির্ভরশীল। এই বাগানগুলিই কর্মসংস্থান জুগিয়ে এসেছে দীর্ঘকাল ধরে। হাসি ফুটিয়েছে চা শ্রমিকদের মুখে। কিন্তু এই মুহূর্তে চা শিল্পের সমস্যা বহুমুখী। বহু বাগান বন্ধ হয়ে গিয়েছে, কিছু বাগান ধুঁকছে। বর্তমানে উত্তরবঙ্গে চা বাগানে সংখ্যা ৩৩৪, প্রায় সাড়ে চার লক্ষ শ্রমিক এখনও কর্মরত বাগানগুলিতে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কমবেশি ২০-২৫ লক্ষ মানুষ চা শিল্পের উপর নির্ভরশীল। ভারতের ৩৫ শতাংশ চা উত্তরবঙ্গে উৎপাদিত হয়। কিন্তু ধুঁকতে-থাকা চা শিল্পের পুনর্গঠনের জন্য কেন্দ্রের বাজেটে কোনও ঘোষণা নেই! যা অবাক করেছে গোটা বাংলার মানুষকে।

বদলে যাওয়া জলবায়ু, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বাগানে রোগপোকার আক্রমণ, কাঠামোগত, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ও মালিকানার বদল, বাধ্য হয়ে চা শ্রমিকদের পেশা বদল ইত্যাদি নানা সমস্যা রয়েছে। তবে চা শিল্পের ধ্বংসের মুখে দাঁড়ানোর প্রধানতম কারণ কেন্দ্রের উপেক্ষা। কেন্দ্রের পদক্ষেপহীনতা আরও বেশি করে খাদের কিনারে নিয়ে যাচ্ছে প্রায় দেড়শো বছরের বেশি প্রাচীন এই শিল্পকে।

আদত সমস্যা তিনটি। এক, উত্তরের চা শিল্পের প্রতি কেন্দ্র সরকারের উদাসীনতা। বিগত বছরের অক্টোবরে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। চা বাগানগুলি সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছিল। চা শিল্পে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ একশো কোটির গণ্ডি ছাপিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কেন্দ্রের তরফে কোনও রকম আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়নি। পুনর্গঠনের জন্য কোনও নীতিও নেওয়া হয়নি। ভুটানের নদীর জলে উত্তরবঙ্গের চা বাগানে বন্যা প্রায় ফি বছরের সমস্যা, আজও কেন্দ্র সরকার ইন্দো-ভুটান নদী কমিশন গঠনের উদ্যোগ শুরু করেনি।

অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকার সেন্ট্রাল এক্সাইজ ডিউটি নেওয়ার পরও উত্তরবঙ্গের চা বাগান বা চা শ্রমিকদের জন্য কোনওদিনই ভাবেনি। ২০২১-২২ সালে ঘোষিত ‘প্রধানমন্ত্রী চা শ্রমিক প্রোৎসাহন যোজনা’-র ১০০০ কোটি টাকার সুফল উত্তরবঙ্গের শ্রমিকরা পাননি। উল্লেখ্য, ২০২১-’২২ অর্থবর্ষের বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা করা হয়েছিল, অসম ও পশ্চিমবঙ্গের চা শ্রমিক, বিশেষ করে মহিলা ও তাঁদের শিশুদের কল্যাণের জন্য ১০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হবে এবং এজন্য একটি বিশেষ প্রকল্প চালু করা হবে। তিন বছর আগে ঘোষিত হাজার কোটি টাকার অনুদান এখনও পর্যন্ত নামমাত্র বাস্তবায়িত হয়েছে।

দুই, বিদেশে ভারতের চা রপ্তানির পরিমাণ নাগাড়ে কমে যাওয়া। তিন, কেনিয়া ও নেপাল থেকে সস্তায় ভারতের বাজারে চা আমদানির বহর বৃদ্ধি। এই দু’টিও চা শিল্পের প্রতি কেন্দ্র সরকারের উদাসীন মনোভাবের ফসল।

২০২৫-র জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট চা রপ্তানি হয়েছে ৮৫.৭৭ মিলিয়ন কেজি। ২০২৪ সালে ছিল ৮৫.৯৫ মিলিয়ন কেজি। অর্থাৎ বিগত বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ০.১৮ মিলিয়ন কেজি রপ্তানি কম। সদ্য রাজ্যসভায় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রকের রাষ্ট্রমন্ত্রী জিতিন প্রসাদ জানিয়েছেন, গত কয়েক বছরে ইরানে চা রপ্তানির পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে প্রায় ৬৩ শতাংশ। ২০২০ সালে ভারত থেকে ৩৬ হাজার কেজি চা ইরানে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২ হাজার কেজিতে। চা রপ্তানি বাড়ানোর সুনির্দিষ্ট নীতি, পরিকল্পনা অদ্যাবধি গ্রহণ করেনি কেন্দ্র সরকার।

চা বণিকসভাগুলির তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে বিদেশ থেকে চায়ের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩ মিলিয়ন কেজি। বিদেশ থেকে সস্তায় চা আমদানি বেড়ে চলায় আভ্যন্তরীণ চা-বাজারে দেশীয় চায়ের কদর কমছে। দেশের অভ্যন্তরে দেশীয় চায়ের চাহিদা কমে যাওয়ায় কাঁচা চা পাতার দর ক্রমশ কমছে। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন উত্তরের চা চাষিরা। নেপাল সরকার ভারতীয় চা রপ্তানির ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ হারে শুল্ক লাগু করেছে। কিন্তু নেপাল থেকে শুল্ক ছাড়াই চা ভারতে আসছে। নেপালের গুণমানে খারাপ চা শিলিগুড়ির বাজারে ঢোকার পর এক শ্রেণির ব্যবসায়ী দার্জিলিং চা হিসাবে তা বিক্রিও করছেন। কেনিয়া থেকে চায়ের আমদানিও দ্বিগুণ হয়েছে। রপ্তানি হ্রাস এবং আমদানি বৃদ্ধির যাঁতাকলে পেষাই হচ্ছে চা শিল্প। কেন্দ্রীয় সরকারের নজরদারি, সদিচ্ছা, আমদানির ক্ষেত্রে যথাযথ নীতি ছাড়া এ জিনিস বন্ধ করা সম্ভব নয়।

উত্তরবঙ্গের ৬২ শতাংশ চা এখনও ক্ষুদ্র চাষিদের হাত ধরে উৎপাদিত হলেও তাঁদের প্রথাগত কৃষকের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। চা শ্রমিকেরা চেয়েছিলেন কৃষকের মর্যাদা। বাজেট পেশের আগে কেন্দ্রীয় অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রকের কাছে ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির তরফে ‘মেমোরেন্ডাম’ পাঠানো হয়েছিল কৃষকের মর্যাদার দাবিতে।

যেকোনও শিল্পের ক্ষেত্রে আমদানি, রপ্তানি ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উৎপাদিত পণ্যের পরিমাণ। নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে গত এক বছরে বাংলায় চায়ের উৎপাদন বেড়েছে। টি বোর্ডের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্স মিলিয়ে কাঁচা চা পাতার উৎপাদন বেড়েছে ২ কোটি ৯০ লক্ষ কেজি। ২০২৪ সালে বঙ্গে ৩৮.২২ কোটি কেজি চা উৎপন্ন হয়েছিল। ২০২৫ সালে উৎপাদন হয়েছে ৪১.১১৮ কোটি কেজি। উৎপাদন বেড়েছে আট শতাংশ। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের নিরিখে উত্তরবঙ্গে চায়ের উৎপাদন কমেছে। ২০২৩ সালে রাজ্যে উৎপাদিত চায়ের পরিমাণ ছিল ৪৩.৩৫৪ কোটি কেজি। ২০২৪ সালে দার্জিলিংয়ে ৫৭.১ লক্ষ কেজি চা পাতা উৎপাদন হয়। ২০২৫ সালে তা ৫৩ লক্ষ কেজিতে নেমে এসেছে। উৎপাদিত চা নিলামে বিক্রি হচ্ছে না। বিক্রি হলেও দর মিলছে না।

সামগ্রিকভাবে উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের অবস্থা ভালো নয়। প্রত্যক্ষ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা আর বিদেশে চায়ের রপ্তানি বৃদ্ধি উত্তরবঙ্গের চা শিল্পের কাছে এখন সময়ের দাবি। সেই কারণে কেন্দ্রীয় বাজেটের দিকে তাকিয়ে ছিল উত্তরবঙ্গ। বাজেটে অন্যান্য রাজ্যের অর্থকরী বাগিচা ফসল কাজু, নারকেল চাষ নিয়ে ঘোষণা থাকলেও উত্তরবঙ্গের চা শিল্প ব্রাত্য রয়ে গেল। দিল্লিতে চিনি বা গমের মতো চায়ের জন্য কোনও লবি নেই, বঞ্চনার এটিও একটি কারণ বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের।

নির্মলার বাজেটের প্রতি কী কী প্রত্যাশা ছিল চা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের? চা শ্রমিক থেকে বাগান মালিক, উভয় পক্ষই চেয়েছিল, চা শিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য গঠনমূলক পদক্ষেপ করুক কেন্দ্র। বাজেটে তার প্রতিফলন থাকুক। চা বাগানের পরিকাঠামো বা চা শ্রমিকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নেও কোনও বরাদ্দ হয়নি। আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা, স্বল্প সুদে কার্যকরী মূলধনের জোগান, চা বাগানগুলির নানা উন্নয়নমূলক খাতে ভর্তুকি, বন্ধ বাগান অধিগ্রহণ এবং তা চালু করা, রপ্তানি ভর্তুকি, অবৈধ চা আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা, কর মকুব, চায়ের নূন্যতম মূল্য নির্ধারণ ইত্যাদির প্রত্যাশা ছিল বাজেটে। কিছুই ঘোষণা হয়নি। জানুয়ারির শেষে ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করেছে ভারত। ফলে ইউরোপে অনেক বেশি চা রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বাগান মালিকদের আশা ছিল, চা শিল্পের দিকে এবার হয়তো তাকাবে সরকার।

উত্তরবঙ্গের ৬২ শতাংশ চা এখনও ক্ষুদ্র চাষিদের হাত ধরে উৎপাদিত হলেও তাঁদের প্রথাগত কৃষকের মর্যাদা দেওয়া হয়নি। চা শ্রমিকেরা চেয়েছিলেন কৃষকের মর্যাদা। বাজেট পেশের আগে কেন্দ্রীয় অর্থ ও বাণিজ্য মন্ত্রকের কাছে ক্ষুদ্র চা চাষি সমিতির তরফে ‘মেমোরেন্ডাম’ পাঠানো হয়েছিল কৃষকের মর্যাদার দাবিতে। সেক্ষেত্রে তাঁরা কৃষিজীবীদের জন্য থাকা সরকারের একাধিক প্রকল্পের সুবিধা পেতে পারতেন। তাও মেলেনি। কেন্দ্রীয় বাজেটে চা শিল্পের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলির সমাধানে কোনও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই! শ্রমিকদের বকেয়া প্রভিডেন্ট ফান্ডনিয়েও কোনও ঘোষণা করা হয়নি। অভিযোগ, শ্রমিকের জীবন-জীবিকাকে ধারাবাহিকভাবে অবহেলা করছে কেন্দ্র।

দার্জিলিং চা জিআই তকমা পেয়েছে। জগৎজোড়া তার খ্যাতি। জি-২০ সম্মেলনে আসা দেশবিদেশের অতিথিদের উপহারের ঝুলিতে এক কৌটো দার্জিলিং চাও রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। ভারত-গৌরব দার্জিলিং চাও ব্রাত্য বাজেটে। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় বাজেট আরও অনিশ্চিয়তার মধ্যে ঠেলে দিল উত্তরবঙ্গের চা শিল্পকে।

যতদিন চায়ের চাহিদা আছে ততদিন চা বাগান থাকবে। কোনও উপায়ে টিকে থাকা আর শিল্প হয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানো এক নয়! এক একটি চা বাগান আদতে দেশের ক্ষুদ্র সংস্করণ। চতুর্দশীর জ্যোৎস্না মাখা চা বাগান রোমান্টিসিজমের আধার, আবার অনাহার-ক্লেশে থাকা চা শ্রমিকের হাড় জিরজিরে চেহারা কঠোর বাস্তবের কথা বলে। চা বাগানে বহু বদল ঘটে গিয়েছে। চা কেবল উৎপাদন শিল্প নয়, উত্তরের পর্যটন শিল্পের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

গত এক দশকে দেশের রাজনীতি যে খাতে বয়ে গিয়েছে, উত্তরবঙ্গও সেই একই খাতে গা ভাসিয়েছে। ভোটমুখী বিহারের মাখনা চাষিরা ‘উপহার’ পান কিন্তু বাংলার চা শ্রমিকেরা প্যাকেজ পান না! নির্বাচন আসন্ন হলেও, ভোটের বাধ্যবাধকতা সত্ত্বেও উপেক্ষিত হয় বাংলার চা শিল্প। ভোট-রাজনীতির জটিল অঙ্ক-তত্ত্ব পেরিয়ে যাবতীয় আঁধার, উপেক্ষা, বঞ্চনা কাটিয়ে উন্নত শিরে দাঁড়াক উত্তরবঙ্গের চা শিল্প।

Written by