রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতীতে গোশালা!

 

পৌষমেলা থেকে বসন্ত উৎসবের আয়োজন, ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ স্বীকৃতির ফলক স্থাপন, রবি ঠাকুরের বিশ্বভারতীকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে বারবার বিতর্ক হয়েছে। বিতর্কের তালিকায় নবতম সংযোজন শ্রীনিকেতনে গোশালা নির্মাণ-এর সিদ্ধান্ত। ১২ ফেব্রুয়ারি এক সাংবাদিক বৈঠকে বিশ্বভারতীর উপাচার্য প্রবীরকুমার ঘোষ জানান, শ্রীনিকেতনে সুপরিকল্পিত গোশালা নির্মাণ করা হবে। উপাচার্যের এহেন সিদ্ধান্তে তুঙ্গে উঠেছে বিতর্ক। প্রতিবাদে সরব হয়েছে ছাত্র সংগঠন, ছাত্র পরিষদ। অন্যদিকে, এই বিতর্কে মুখ খুলতে রাজি নন বিশ্বভারতীর বর্তমান ছাত্রছাত্রী, অধ্যাপক, প্রাক্তনী থেকে শুরু করে আশ্রমিকেরা। এমনকী শান্তিনিকেতনের বাসিন্দারাও গোশালা নির্মাণ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে নারাজ। সকলের সাফ কথা, ‘‘এই বিষয়টি রাজনৈতিক।’’ তাঁদের আশঙ্কা, মন্তব্য করলে কোনও না কোনও সমস্যা হতে পারে।

বিশ্বভারতীর উপাচার্য অতি সম্প্রতি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, শ্রীনিকেতনে একটি সুপরিকল্পিত গোশালা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত পানীয় জল ও খাদ্যের ব্যবস্থা থাকবে সেখানে।

বিশ্বভারতীর উপাচার্য অতি সম্প্রতি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, শ্রীনিকেতনে একটি সুপরিকল্পিত গোশালা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত পানীয় জল ও খাদ্যের ব্যবস্থা থাকবে সেখানে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, গবাদিপশুগুলিকে দিনের বেলা নির্দিষ্ট সময়ে খোলা চারণভূমিতে ছাড়া হবে এবং রাতে গোশালায় রাখা হবে। গোবর থেকে উৎপন্ন বায়োগ্যাসের মাধ্যমে শ্রীনিকেতন এলাকায় পথবাতি জ্বালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের। গোশালায় উৎপাদিত দুধ ছাত্রাবাস ও ছাত্রীনিবাসে সরবরাহ করা হবে বলেও জানান উপাচার্য।

এই গোশালা নির্মাণের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছে বিতর্ক। শিক্ষাঙ্গণে ল্যাবরেটরি, হস্টেল ইত্যাদির মতো পরিকাঠামো নির্মাণ বা সংস্কারে উদ্যোগী না-হয়ে কেন গোশালা তৈরিতে উঠে পড়ে লাগা হচ্ছে? উঠছে প্রশ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিএইচডি পড়ুয়া বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, ‘‘বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসে গরুদের জন্য অনেক সমস্যা হয়। সর্বত্র গরু ঘুরে বেড়ায়। গোবর পড়ে থাকে। বর্ষায় মারাত্মক অবস্থা হয়। ২০১৮ সাল থেকে এখানে আছি, দেখছি। গরু ঘুরে-বেড়ানোর কারণে একাধিক দুর্ঘটনাও ঘটেছে। তবে গোশালা গড়া কোনও সমস্যার সমাধান নয়।’’

ছাত্রনেতা তথা বীরভূম জেলা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রাক্তন সভাপতি বিক্রমজিৎ সাউ বঙ্গদর্শন.কম-কে বলেন, ‘‘বিশ্বভারতী রবীন্দ্রনাথের মনন, চিন্তনে গড়ে উঠেছে। আমরা কখনও শুনিনি, শিক্ষাঙ্গণে পড়াশোনার বদলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কোনওদিন গোশালাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। গত দশ বছর ধরে কেন্দ্র সরকার নানা ভাবে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিশ্বভারতীকে ব্যবহার করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। অতীতেও প্রতিবাদ হয়েছে। আগামীতেও প্রতিবাদ হবে। দল এবং মত নির্বিশেষে সব ছাত্র ছাত্রীরা প্রতিবাদ করেছে এবং করবেও।’’

বিশ্বভারতীর বাম ছাত্র সংগঠনের তরফে প্রেস বিবৃতি জারি করে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে লেখা হয়েছে, ‘‘শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে এবং অ্যাকাডেমিক পরিকাঠামো উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিনিয়োগের বদলে উপাচার্যের সাম্প্রতিক গোশালা নির্মাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে এসএফআইয়ের বিশ্বভারতী লোকাল কমিটি।

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিভাগে ন্যূনতম ল্যাবরেটরির সুবিধাও নেই, শিক্ষার্থীরা যথাযথ সরঞ্জাম ছাড়াই প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস করতে বাধ্য হন, তখন নন-অ্যাকাডেমিক এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অর্থ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত ছাত্রস্বার্থ বিরোধী এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাবের প্রতিফলন।

যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু বিভাগে ন্যূনতম ল্যাবরেটরির সুবিধাও নেই, শিক্ষার্থীরা যথাযথ সরঞ্জাম ছাড়াই প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাস করতে বাধ্য হন, তখন নন-অ্যাকাডেমিক এবং অপ্রয়োজনীয় খাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অর্থ ব্যয় করার সিদ্ধান্ত ছাত্রস্বার্থ বিরোধী এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন মনোভাবের প্রতিফলন। হস্টেলের পরিকাঠামোগত অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। হস্টেলে কক্ষের অপ্রতুলতা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে। একাধিকবার হস্টেলের খাবারের গুণমান নিয়ে উদ্বেগের কথা জানানো হয়েছে, তবুও কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ করেনি। গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত বই নেই। পাঠ্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় বইয়ের অভাব রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলি সমাধান করার পরিবর্তে, বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল অপ্রাসঙ্গিক উদ্যোগে অপচয় করা হচ্ছে। এই ধরনের সিদ্ধান্তগুলি স্পষ্টভাবে দেখায়, ছাত্র কল্যাণ এবং শিক্ষা সংক্রান্ত অগ্রাধিকারগুলিকে অবহেলা করছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাদের দাবি, উপাচার্য সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করুন। পড়ুয়াদের প্রয়োজনগুলিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হোক।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ বিভাগের দাবি, অতীতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আমলেও গোশালা ছিল। গোশালা বিশ্বভারতীর ঐতিহ্যের অংশ, নতুন কিছু নয়। পাল্টা পড়ুয়াদের অভিযোগ, পড়াশোনা, পরিকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে না-ভেবে গোশালা নির্মাণ নিয়ে বেশি চিন্তিত বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই বিষয়ে কী ভাবছেন অধ্যাপক, পড়ুয়ারা? তাঁদের মত কী? তা জানতে বঙ্গদর্শন.কম তরফে বিশ্বভারতীর বর্তমান ছাত্র, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, গবেষক, অধ্যাপক, প্রাক্তন শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। বাংলা বিভাগের এক প্রাক্তন অধ্যাপক বললেন, ‘‘আমি একটি সেমিনার নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এই বিষয়ে কিছু জানি না। যে বিষয়ে জানি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়।’’

কেউই প্রকাশ্যে মতামত জানাতে রাজি হননি। ছাত্রদের অনেকেই সাফ বলেছেন, ‘বলতে চাই না। এখানে (বিশ্বভারতীতে) পড়তে হবে।’ শ্রীনিকেতনের বাসিন্দারা বলেছেন, ‘আমাদের কোনও মন্তব্য নেই। এটা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে গিয়েছে।’ বস্তুত, রাজনৈতিক কারণে কেউ মুখ খুলতে চাইছেন না। রবীন্দ্রনাথ মুক্ত চিন্তার পীঠস্থান হিসাবে বিশ্বভারতীকে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। নিজের আমলে সে কাজে তিনি সফলও হয়েছিলেন, কিন্তু রবি ঠাকুরের সাধের বিশ্বভারতী কি পথ হারিয়ে ফেলেছে? কর্তৃপক্ষের এক সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে খোলামন নিয়ে সামান্যতম কথা বলতেও ভরসা পাচ্ছেন না পড়ুয়া, অধ্যাপক, আশ্রমিকেরা। খর্ব হচ্ছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার। শিক্ষাঙ্গণে এমন ভয়ের আবহ নিঃসন্দেহে চিন্তার, উদ্বেগের।

কেউই প্রকাশ্যে মতামত জানাতে রাজি হননি। ছাত্রদের অনেকেই সাফ বলেছেন, ‘বলতে চাই না। এখানে (বিশ্বভারতীতে) পড়তে হবে।’ শ্রীনিকেতনের বাসিন্দারা বলেছেন, ‘আমাদের কোনও মন্তব্য নেই। এটা রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে গিয়েছে।’

গোশালা তৈরির সিদ্ধান্ত কেবল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের একটি উদ্যোগ হিসাবে আর আটকে নেই। তাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে রাজনীতি। প্রশ্ন উঠছে, ক্যাম্পাসে মালিকাহীন গবাদিপশুর অবাধবিচরণ কেন নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করা হচ্ছে না? এতদিন কেন কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয়নি? গোশালা নির্মাণকে আর যাই হোক অন্তত ঐতিহ্য ফেরানোর পদক্ষেপ রূপেও মানা যাচ্ছে না! শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার না-দিয়ে গোশালা নির্মাণের মতো কাজে অর্থ ব্যয় করা সমীচিন নয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনকে অবহেলা করা আদতে তাঁদের অপমান করা। ফলে এহেন সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক উত্তরোত্তর বাড়বে ব্যতীত কমবে না।

Written by