
চারিদিকে পাহাড়, ক্যাকটাস ও ইউফোর্বিয়ার বন, মাঝে মাঝে গ্রানাইড পাথরের স্তূপ। খাবার নেই, পানীয় জল নেই। মাথার উপর আগুনের মতো সূর্য, পায়ের নিচে উত্তপ্ত বালি। জনমানবশূন্য মরুভূমিতে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলছেন এক বাঙালি যুবক, নাম যার শঙ্কর। রহস্যময় আফ্রিকার বুকে তার দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প লেখা আছে চাঁদের পাহাড়ের পাতায়। ছোটোবেলায় সেই গল্প পড়ে শঙ্করের মতো আফ্রিকায় পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অবশেষে ‘চাঁদের পাহাড়’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ পাওয়ার প্রায় ৮৮ বছর পর জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস চড়েছেন চাঁদের পাহাড় (জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস চাঁদের পাহাড়)। আফ্রিকা মহাদেশের উগান্ডার রুইনজারি পর্বতশ্রেণি, বরফঢাকা চূড়ার জন্য স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত ‘চাঁদের পাহাড়’ নামে। বুক ভরা সাহস আর ইচ্ছার জোরে নদিয়ার বছর ২৯-এর জ্যোতিষ্ক পৌঁছে গিয়েছেন সেখানেই, সঙ্গী একটিমাত্র সাইকেল।

এক অলস দুপুরে ক্লাস সিক্সের কিশোর ক্লাসে বসে প্রথম পড়েছিল ‘চাঁদের পাহাড়’ গল্পের ‘অগ্নিদেবের শয্যা’ অংশটি। তখন থেকেই গল্পের শুরু। শঙ্করের মতো আফ্রিকার জনশূন্য প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্নকে সেই সময় থেকেই লালন করেছেন তিনি।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র আন্তর্জাতিক বিমানমন্দর, সেখান থেকে মুম্বাই হয়ে আফ্রিকার নাইরোবি, অবশেষে নাইরোবি থেকে ট্রেনে করে মোম্বাসা — জ্যোতিষ্কের গন্তব্যের শুরু এখান থেকেই। কিন্তু গল্পের শুরু? বেশ কয়েকবছর পিছিয়ে যাওয়া যাক। এক অলস দুপুরে ক্লাস সিক্সের কিশোর ক্লাসে বসে প্রথম পড়েছিল ‘চাঁদের পাহাড়’ গল্পের ‘অগ্নিদেবের শয্যা’ অংশটি। তখন থেকেই গল্পের শুরু। শঙ্করের মতো আফ্রিকার জনশূন্য প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্নকে সেই সময় থেকেই লালন করেছেন তিনি। অরুণাচলের নামসাইতে বড়ো হওয়া জ্যোতিষ্ক ছোটোবেলায় পেয়েছেন পাহাড়ের সান্নিধ্য। খেলাধুলার প্রতি আগ্রহের পাশাপাশি অ্যাডভেঞ্চারের নেশাও ছোটো থেকেই। তাই হয়তো দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অভিযাত্রী মন দিন গুনছিল আফ্রিকার মাটিতে পা দেওয়ার। মোম্বাসা থেকে অক্লান্তভাবে সাইকেল চালিয়ে অবশেষে রুইনজোরি পর্বতের চেকপয়েন্ট, অদূরেই স্বপ্নের চাঁদের পাহাড়। ভাগ্য সুপ্রসন্ন, তাই যাত্রা শুরুর ২৪ দিন পর জ্যোতিষ্ক প্রথমবারের জন্য দেখা পান চাঁদের পাহাড়ের। অবশেষে ২৫ জুলাই সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিওর মাধ্যমে তিনি দর্শকদের জানান, সফল হয়েছে তাঁর অভিযান। কাদা, জঙ্গল, তুষারঝড় পেরিয়ে ৫,১০৯ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট রুইনজোরি পর্বতমালার মার্গেরিটা পিক স্পর্শ করেছেন তিনি।

তবে শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরে অন্য একটি মহাদেশে গিয়ে এত বড়ো অভিযানের পরিকল্পনা করা সম্ভব না৷ পাশাপাশি প্রয়োজন শারীরিক, মানসিক সর্বোপরি আর্থিক সক্ষমতার। বিগত কিছু বছর ধরে ভারতের অনেক ছোটো বড়ো পাহাড়ে ট্রেক করেছেন জ্যোতিষ্ক। নিজেকে প্রস্তুত করেছেন শারীরিক ও মানসিকভাবে। কিন্তু খরচ? অকপটে তিনি জানিয়েছেন, এই যাত্রায় এখনও অবধি তাঁর যা খরচ সেই অঙ্ক শুনলে যে কেউ হয়তো পিছিয়ে আসবেন। প্রশ্ন আসে জ্যোতিষ্ক তাহলে স্পনসরশিপের কথা কেন ভাবেননি? বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় জ্যোতিষ্ক বলেছেন, “নিঃসন্দেহে দুর্মূল্য এই যাত্রা, কিন্তু তার চেয়েও দুর্মূল্য আমার স্বপ্ন।” শুধু শঙ্কর না, বিভূতিভূষণের অধিকাংশ চরিত্রই স্বাবলম্বী। তাই জ্যোতিষ্কও স্পনসরের দ্বারস্থ হওয়ার বদলে তাঁর এই অভিযানকে সেলফ সাপোর্টেড ট্রিপ হিসাবে ঘোষণা করেছেন। এই যাত্রা সংক্রান্ত সমস্ত পরিকল্পনা যেমন তাঁর একার, ঠিক তেমনই ব্যয়বহুল এই যাত্রার যাবতীয় খরচও স্বেচ্ছায় তিনি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন।

চাঁদের পাহাড় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৯৩৭ সালে। কাহিনির সময়কাল যদিও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে, ১৯০৯ সালে। তার প্রায় একশো বছর পর জ্যোতিষ্ক আফ্রিকায় পা রাখলেন। এর মধ্যেই আফ্রিকা স্বাধীন হয়েছে, বদলেছে আফ্রিকার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও। গল্পের আফ্রিকার সঙ্গে বাস্তবের আফ্রিকার কতটা মিল পেলেন তিনি? উত্তরে জানিয়েছেন, “চাঁদের পাহাড়-এর আফ্রিকার সঙ্গে বাস্তবের আফ্রিকার বড়ো একটা মিল নেই। যেমন, গল্পে উল্লিখিত রিখটারসভেল্ট আসলে একটি মালভূমি, উচ্চতা প্রায় ১৪০০ মিটার। ওই উচ্চতায় কিন্তু কোনো বনভূমি নেই। ফলে বিভূতিভূষণ যে বনানীর কথা লিখেছেন বাস্তবে রিখটারসভেল্টে তা অনুপস্থিত। সর্বোপরি শঙ্কর চড়েনি চাঁদের পাহাড়। গল্পের কোথাও কোনো নির্দিষ্ট পর্বতশ্রেণিকে চাঁদের পাহাড় বলে চিহ্নিতও করেননি লেখক। কাহিনি জুড়ে চাঁদের পাহাড় ‘মিথ’ হিসাবেই উপস্থিত থেকেছে।”
জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস জানিয়েছেন, “চাঁদের পাহাড়-এর আফ্রিকার সঙ্গে বাস্তবের আফ্রিকার বড়ো একটা মিল নেই। যেমন, গল্পে উল্লিখিত রিখটারসভেল্ট আসলে একটি মালভূমি, উচ্চতা প্রায় ১৪০০ মিটার। ওই উচ্চতায় কিন্তু কোনো বনভূমি নেই। ফলে বিভূতিভূষণ যে বনানীর কথা লিখেছেন বাস্তবে রিখটারসভেল্টে তা অনুপস্থিত।”

বদলেছে আফ্রিকা। বদলেছে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো। বাস্তবের রিখটারসভেল্ট ও রুইনজোরির প্রাকৃতিক পরিবেশ বিভূতিভূষণের বর্ণনা থেকে অনেক আলাদা। এত পার্থক্যের মধ্যে বদলায়নি শুধু অভিযাত্রী মনের স্বপ্ন, ইচ্ছা এবং সাহস। যে স্বপ্ন দেখে শঙ্কর ঘর ছেড়ে বেরিয়েছিল সুদূর আফ্রিকা, সেই স্বপ্নের বীজ বিভূতিভূষণ বুনে দিয়েছেন বহু বাঙালির মনে। স্বপ্ন সকলেই দেখেছে শুধু সাহসের অভাবে তার বাস্তবায়ন হয়নি। বাকিদের সঙ্গে জ্যোতিষ্কের পার্থক্য ঠিক এইখানেই, তিনি তাঁর ইচ্ছা পূরণের ঠিক আগের মুহূর্ত অবধি থামেননি। ভয় না পেয়ে এগিয়ে যাওয়া, প্রাণভরে বেঁচে নিয়ে শেষে হারিয়ে যাওয়া, এই পৃথিবীর মাটিতেই মিশে যাওয়া — জ্যোতিষ্কের কাছে এটাই জীবন। এই অভিযান তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরিয়েছে, আলাপ করিয়েছে কত নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি, রীতিনীতির সঙ্গে, নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছেন তিনি। গল্পের একেবারে শেষে বম্বেগামী জাহাজের ডেকে দাঁড়িয়ে শঙ্করের মনে পড়েছে চীনদেশের প্রচলিত এক প্রাচীন ছড়া — “ছাদের আলসের দিব্যি চৌরস একখানা টালি হয়ে অনড় অবস্থায় সুখে-স্বচ্ছন্দে থাকার চেয়ে স্ফটিক পাথর হয়ে ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়াও ভালো, ভেঙে যাওয়াও ভালো।”
জ্যোতিষ্কর জীবনেরও মূলমন্ত্র এটাই। স্বাচ্ছন্দ্য নয়, শুধুই অভিযান।
______________________
ছবি সৌজন্যে: জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস

