
মিছিল-মিটিং-স্লোগান, গগনচুম্বী ফ্ল্যাটের সারি, ট্রাফিক জ্যাম, কর্পোরেট ডেড লাইন, নন্দন-লেক-কফি হাউস-কলেজ স্ট্রিট-অ্যাকাডেমির কলকাতায় উঠে এসেছে এক টুকরো সুন্দরবন, তাও একেবারে কলকাতার প্রাণকেন্দ্র লেনিন সরণিতে। ধর্মতলার জোন্স লি মেমোরিয়াল স্কুলের একটি দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে রামিল বর্গীর আঁকা ম্যুরাল (Remille Bargi)। প্রায় চল্লিশ ফুট দৈর্ঘ্যের এই শিল্পকর্মের মাধ্যমে সুন্দরবনের নারী এবং বাদাবনের রক্ষাকর্ত্রী দেবী বনবিবিকে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে।
সুন্দরবন যেন এক রহস্যময়ী, অপরূপ তার সৌন্দর্য্য, বাঁকে বাঁকে মৃত্যু, মানুষ ও বন্যপ্রাণের এক অদ্ভুত সহাবস্থান, একই সঙ্গে জীববৈচিত্রের ভাণ্ডার। সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্র এবং বাসিন্দাদের ভ্রাতৃত্ববোধই হয়ে উঠেছে রামিলের আঁকা ম্যুরালের মূল বিষয়বস্তু। বঙ্গদর্শন.কম-কে রামিল জানিয়েছেন, “নারীবাদী সংস্থা ‘ফিয়ারলেস কালেক্টিভ’-এর একটা গ্র্যান্ট প্রোগ্রাম ছিল এটি। সংস্থাটি মূলত দক্ষিণ এশীয় মহিলা ম্যুরাল শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে। ২০২৫ সালে কলকাতা থেকে এই গ্র্যান্টটা আমি পেয়েছি। এই গ্র্যান্টগুলো যাঁরা পান, তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করেন। তারপর ওই মানুষগুলোকে ‘ভিজ্যুয়ালি রিপ্রেসেন্টেশন’ দেওয়ার জন্য ম্যুরালগুলো আঁকা হয়। এই গ্র্যান্ট পাওয়া পর প্রথমে শ্রীলঙ্কা গিয়েছিলাম। সেখানে নানান সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করে ওখানেও ম্যুরাল এঁকেছি। আমি কলকাতায় বড়ো হয়েছি, ওখান থেকে ফিরে ঠিক করলাম যে, সুন্দরবনের ওপর ম্যুরালটা আমি করতে চাই।”
বঙ্গদর্শন.কম-কে রামিল জানিয়েছেন, “নারীবাদী সংস্থা ‘ফিয়ারলেস কালেক্টিভ’-এর একটা গ্র্যান্ট প্রোগ্রাম ছিল এটি। সংস্থাটি মূলত দক্ষিণ এশীয় মহিলা ম্যুরাল শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে। ২০২৫ সালে কলকাতা থেকে এই গ্র্যান্টটা আমি পেয়েছি। এই গ্র্যান্টগুলো যাঁরা পান, তাঁরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে কাজ করেন।”

সুন্দরবন বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানালেন, ‘‘এখন পরিবেশ নিয়ে সংকটের শেষ নেই। ওই বিষয়গুলোকে তুলে আনার জন্য আমি বিষয়টা নির্বাচন করি। ওখানে ‘ওয়ার্কশপ’ করেছি। সাতজেলিয়া দ্বীপে গিয়েছিলাম। ওখানে থাকা। ওখানকার মহিলাদের নিয়ে কাজ করা। তাঁদের সঙ্গে গল্প করে, তাঁদের অভিজ্ঞতা জানা। ওঁদের মধ্যে থেকেই চারজনকে এঁকেছি ম্যুরালে।”
আরও বলছিলেন, ওখানে (সুন্দরবনে) নানান সম্প্রদায়ের মানুষ থাকেন। ওখানে থাকা খুবই কঠিন। প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকা। ওঁদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, এত সমস্যার মধ্যেও ওঁরা কলকাতার বদলে ওখানে থাকতেই ভালোবাসেন। কলকাতায় কাজের জন্য আসলে ওঁরা বাজে ব্যবহারের সম্মুখীন হন। ওঁরা ওখানেই জন্মেছে, ওখানেই থাকতে চান। আমার বাবার বাড়ি ক্যানিং, সুন্দরবনের কথা শুনে বড়ো হয়েছি। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ সুন্দরবনেরই। সব সময় একটা টান ছিল। ঘুরতে গেছি। ওখানে থেকে কাজ করা হল এবার।” নানান সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে, তাঁদের নিয়ে ম্যুরাল আঁকেন রামিল। পড়াশোনা শান্তিনিকেতনে, কলাভবনের প্রাক্তনী রামিলের পেশা ছবি আঁকা। ২০১২ সাল থেকে তিনি ম্যুরাল, গ্রাফিতি ইত্যাদি পাবলিক আর্ট করছেন।

গোটা ম্যুরালটা চারদিনে এঁকেছেন রামিল। তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছেন করিশ্মা সিদ্দিক রায়, সোমা কবিরাজ এবং রাজনীল বর্গী। ক্রেন ভাড়া করে এনে, সেই ক্রেনে উঠে ম্যুরাল এঁকেছেন রামিল।
সুন্দরবনের কাহিনি কলকাতার বুকে কেন? এ-প্রশ্নের উত্তরে রামিলের মত, “আমি সুন্দরবনেই ম্যুরালটা আঁকতে পারতাম কিন্তু আমরা কলকাতায় আঁকার সিদ্ধান্ত নিলাম। যাঁরা এই শহরে থাকি, আমরা ভুলে যাই সুন্দরবন কতটা কাছে আমাদের থেকে। কলকাতার মানুষকে সুন্দরবন নিয়ে সচেতন করার কথা ভাবলাম। যদি কলকাতার মানুষজন এই ম্যুরাল দেখে একবারের জন্য হলেও সুন্দরবনের কথা ভাবেন…! লেনিন সরণিতে করেছি কারণ, আমি সেন্ট্রাল কলকাতায় করতে চেয়েছিলাম। যেখানে নানা জায়গা থেকে অনেক লোকজন কাজ করতে আসে। আমি অনেক জায়গায় দেওয়াল খুঁজেছিলাম। লি মেমোরিয়াল আমায় অনুমতি দিল কাজটা করার।”
গোটা ম্যুরালটা চারদিনে এঁকেছেন রামিল। তাঁকে এই কাজে সাহায্য করেছেন করিশ্মা সিদ্দিক রায়, সোমা কবিরাজ এবং রাজনীল বর্গী। ক্রেন ভাড়া করে এনে, সেই ক্রেনে উঠে ম্যুরাল এঁকেছেন রামিল। দেওয়ালচিত্র সম্পর্কে তিনি জানাচ্ছিলেন, “মহিলাদেরকে ছাড়াও আমি বনবিবিকে এঁকেছি। সব ধর্মনির্বিশেষে মানুষ বনবিবিকে পুজো করেন। যাঁরা জঙ্গলে যান, যাঁরা মাছ ধরতে যান সবাই বনবিবিকে পুজো করেন। একজন ভগবান আছে, যাকে সবাই পুজো করতে পারে- এটা জানানোর জন্যেও আঁকাটা দরকার ছিল। আর চারজন মহিলা, যাঁদের এঁকেছি; ওঁরা ওখানকার বাসিন্দা। মাছ ধরে, চাষ করে, যখন দরকার পড়ে ওখানকার ইকো ট্যুরিজম রিসর্টে কাজ করে। আমি ‘ইকো ট্যুরিজম’-কে আঁকায় রাখতে চেয়েছিলাম।’’
এক সময় প্রকৃতিকে মানুষ ঈশ্বর জ্ঞানে পুজো করতো। নেপথ্যে থাকতো প্রাণরক্ষার প্রার্থনা। লোকায়ত বাংলায় অরণ্য, নদী, পাহাড় আজও পূজিত হয় কোথাও কোথাও। পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতাকে বছরের পর বছর রক্ষা করে চলছে সুন্দরবন। ঘূর্ণিঝড়ের দাপট রুখে দেয় ম্যানগ্রোভেরা। সুন্দরবনে মানুষ বেড়াতে যান, বাঘ দেখেন, ঘূর্ণিঝড় পীড়িত সুন্দরবনকে দেখে আহা-উহু করেন। কিন্তু কৃতজ্ঞতা জানান কি?

কলকাতার বুকে এক ইটের দেওয়ালে রামিল এঁকেছেন সুন্দরবনের জীবন, সুন্দরবনের যাপন। কেবল বাদাবনের মানুষ, বনবিবিই নন দেওয়ালচিত্রের উপাদান হয়ে উঠেছে লবণাম্বু উদ্ভিদ, বাঘ, সাপ, কুমির, সুন্দরবনের ঐতিহ্যবাহী নৌকা, কাঁকড়া, শুশুক, সুন্দরবনে বেঁচে থাকার লড়াই ও প্রাকৃতিক পরিবেশ। এ যেন এক প্রকার কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনই। বিপুল সংখ্যক মানুষ লেনিন সরণি ধরে যাতায়াত করছেন, হয়তো থমকে দাঁড়াচ্ছেন ম্যুরালটি দেখে। ব্যস্ত সময়ের মধ্যে এক দণ্ডের জন্য হলেও সুন্দরবনকে নিয়ে ভাবছেন, তখনই সার্থক হয়ে উঠছে শিল্পীর শিল্প-ভাবনা এবং পরিশ্রম।

