মৃত্যু আর যা-ই পারুক, তাঁর ঔজ্জ্বল্য কাড়তে পারেনি

দুপুর সোয়া তিনটে। বর্ণালীদি সহ অন্যরা নিচে গিয়েছেন। থার্ড ফ্লোরের ওয়েটিং লাউঞ্জে একা আমি। ভেতরে একা আরেকজন। ভেতরের উনি বাইরে আসতে পারবেন না। অগত্যা আমারই যাওয়া, আবার। শুয়ে আছেন ভেন্টিলেশনে। ঘণ্টাদেড়েক আগেও যে-মনিটরে ফুটে উঠছিল সংখ্যা, প্রবল জিজ্ঞাসাচিহ্ন এখন সেখানে। তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতা বোধহয় এটিই। সব প্যারামিটার-মাপজোক-হিসেবনিকেশ মুছে, জিজ্ঞাসাচিহ্ন ফুটিয়ে রাখা।

তাঁর কবিতায় যে-শব্দগুলি সবচেয়ে বেশি ঘুরে-ঘুরে এসেছে, তার একটি ‘দেহ’। শরীর নয়। ‘বিষণ্ণ তোমার প্রীতি টের পাই, যেন মৃত, এই সন্দেহে’। এই যে তাঁর পাশের চেয়ারে বসে আছি, টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই!

দুটো পাঁচেই ডাক্তার জানিয়েছেন, দেহ প্রাণহীন। অর্থাৎ, জড়। তবু তা দেহ। তাঁর কবিতায় যে-শব্দগুলি সবচেয়ে বেশি ঘুরে-ঘুরে এসেছে, তার একটি ‘দেহ’। শরীর নয়। ‘বিষণ্ণ তোমার প্রীতি টের পাই, যেন মৃত, এই সন্দেহে’। এই যে তাঁর পাশের চেয়ারে বসে আছি, টের পাচ্ছেন নিশ্চয়ই! মাথার ভিতরে কী ঘুরছে, ধরে ফেলছেন কি? যতক্ষণ-না দেহ অস্তিত্ব হারাবে, আগুনের হবে, ততক্ষণ তিনিই। প্রাণ থাকুক বা না-থাকুক, একা ছাড়তে পারি না।

বসে আছি। হাসপাতালের স্টাফেরা উঁকি দিয়ে দেখছেন। চলে যাচ্ছেন। বসে আছি। পনেরো মিনিট, তিরিশ মিনিট, পঁয়তাল্লিশ মিনিট। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে কি? চাদর থেকে বেরিয়ে আছে বাঁ-হাত। হাত রেখে দেখছি। অতটাও ঠান্ডা নয়! হাওয়া নেই, তবু পেটের কাছে চাদরটা ফুলে উঠল, কেন? একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকার ফল এসব। চোখ অর্ধোন্মীলিত তাঁর, যেন ধ্যানে। জোর করে তখনও পাতা বুজিয়ে দেয়নি কেউ। ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে মণি। জ্বলজ্বলে। শরীর যেমনই থাকুক— ভালো বা খারাপ, চোখজোড়া উজ্জ্বল বরাবর। এখনও তাই। মৃত্যু আর যা-ই পারুক, সেই ঔজ্জ্বল্য কাড়তে পারেনি। মাঝে একজন স্টাফ এসে মুখ থেকে নল খুলে দিয়ে গেলেন। এবার সামান্য হাঁ। যে-বাতাস ভেতরে ঢুকছে, কী দেখছে? ইনফেকশনের ঝিরঝির? কবিতা নয়, নিশ্চিত?

মনে-মনে কবিতা ভাসিয়ে দিচ্ছি। তরঙ্গ ইত্যাদিতে বিশ্বাস নেই। তবে জীবিত-মৃতের বোঝাপড়াও হতে পারে, যদি দিনটা হয় ২৫ জুলাই, সময় হয় শেষ-দুপুর। বই নেই কাছে। স্মৃতি থেকে উদ্ধার করছি কবিতা-পঙক্তি, শব্দবন্ধ। ‘প্রতিটা শ্রমের পাশে তোমার ফ্যাকাশে মুখ, হাসে’। যথেষ্ট শ্রম গেল এতদিন। নল খুলে নেওয়ার পর ওই যে সামান্য হাঁ, চন্দ্রবিন্দু ফেলে একটা ‘সি’ জুড়ে দিই। দেখি, কেমন হাসি হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে সন্দেহ, যা তাঁর ভাবনাপথের অন্যতম উপকরণ। ‘এই দেহ, প্রবল সন্দেহ’। দেহ আর সন্দেহের এই দোলাচল, সাদা আলো, নীল চাদর, কবিশরীর। বেলঘরিয়ায় ফিরবে না একবার?

নল খুলে নেওয়ার পর ওই যে সামান্য হাঁ, চন্দ্রবিন্দু ফেলে একটা ‘সি’ জুড়ে দিই। দেখি, কেমন হাসি হয়ে ওঠে। হয়ে ওঠে সন্দেহ, যা তাঁর ভাবনাপথের অন্যতম উপকরণ। ‘এই দেহ, প্রবল সন্দেহ’।

বেলঘরিয়া। আমাদের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা। নাগেরবাজার তত জমাতে পারছে না। নিচে নামার আগে, চাদর টেনে পা ঢেকে দেওয়া। ‘এখনও আছে’ আর ‘নেই’-এর মধ্যেকার সময় বেড়ে চলেছে। লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করেছে— নেই। মনিটরে, ব্লাডপ্রেশারের জায়গায় তখনও সেই জিজ্ঞাসাচিহ্ন। পালসের জায়গায় শূন্য। জিজ্ঞাসাচিহ্নের আঁকশিতে শূন্যকে গলিয়ে দেওয়ার খেলা একা-একা খেলতে থাকুক। নিচে যাই।

‘অতঃপর ধীরগতি, প্রতি শ্বাসে তুমি চিহ্নহীন
জেগে ওঠো, মূর্ছা যাই, বসন্ত রঙিন’

_______________
রাহুল পুরকায়স্থ-এর ছবি: সন্দীপ কুমার

Written by