
উত্তমকুমার অভিনীত ‘বিচারক’ আমার জীবনের প্রথম দেখা ছবি। খুব ছোটোবেলা থেকেই মায়ের কাছে সিনেমা দেখা নিয়ে খুব আবদার করতাম। মা খুব প্রশ্রয়ও দিতেন। কারণ মায়ের বাবার অভিনয় করার খুব শখ ছিল। মায়ের সঙ্গেই সিনেমা হলে গিয়েছিলাম উত্তমকুমারের ‘বিচারক’ দেখতে। সেখান থেকেই সিনেমার প্রতি একটা আগ্রহ জন্ম নেয়। ধীরে ধীরে উত্তমকুমার আমার কাছে একরকম নেশার মতো হয়ে উঠতে লাগলেন। সময়টা ছিল সাতের দশকের শেষ দিক। তখন বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম ছাড়া আর কিছু নেই। তাঁর সমসাময়িক ছিলেন বসন্ত চৌধুরী। অমন সুন্দর চেহারা, কণ্ঠস্বর নিয়েও উত্তমের ধারেকাছে টিকতে পারলেন না। তাছাড়া কালী ব্যানার্জী, অসিতবরণ এঁরাও উত্তমের পাশে কেমন যেন ম্লান হয়ে গেলেন। উত্তমকুমার একাই দেবতার জায়গায় চলে গেলেন।

আমরা তখন জমিদার হিসাবে জানতাম ছবি বিশ্বাসকে। কিন্তু উত্তমকুমার ‘ঝিন্দের বন্দি’-তে যখন জমিদার করলেন, কীভাবে যেন একটা অন্য মাত্রা যোগ হল। অর্থাৎ জমিদার মানেই তিনি দুষ্টু প্রকৃতির, তাঁর বিরাট প্রতাপ – এর বাইরে বেরিয়ে নিষ্ঠুরতার মধ্যেও কোথাও একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে ফেললেন উত্তমকুমার।
উত্তমকুমারকে সামনাসামনি দেখার একবার সুযোগ হয়। স্টার থিয়েটারের এক অনুষ্ঠানে উনি এসেছিলেন। দেখে মনে হয়েছিল উনি এই জগতেরই মানুষ নন। ওঁকে যেন দেবদূতের মতো পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে। এমন সেই সৌন্দর্য, সেই ব্যক্তিত্ব, সেই হাসি – এখনও মনে আছে সেদিন সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরেছিলেন। অভিনেতা হিসেবে যে ওঁকে খুব গ্রাহ্য করা হত তা মনে হয় না। কারণ ষাটের দশকের ওই সময় তিনি বাংলার একমাত্র সুপারস্টার। বলিউডে দিলীপকুমার, দেবানন্দ, শাম্মি কপুর-দের রাজত্বের পাশে বাংলায় একমাত্র উত্তম-হাওয়া। একদিন হঠাৎ ‘ঝিন্দের বন্দি’ বা ‘ধন্যি মেয়ে’ দেখে মনে হয়েছিল, একজন তাঁর ক্রাফটকে, তাঁর শিল্পকে দিনের পর দিন কী আশ্চর্যভাবে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করে তুলছেন। আর সেটা কিন্তু সঠিক অনুশীলন ছাড়া হয় না। একটা চরিত্রকে ক্রমশ উনি নিজের আয়ত্তে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। আমরা তখন জমিদার হিসাবে জানতাম ছবি বিশ্বাসকে। কিন্তু উত্তমকুমার ‘ঝিন্দের বন্দি’-তে যখন জমিদার করলেন, কীভাবে যেন একটা অন্য মাত্রা যোগ হল। অর্থাৎ জমিদার মানেই তিনি দুষ্টু প্রকৃতির, তাঁর বিরাট প্রতাপ – এর বাইরে বেরিয়ে নিষ্ঠুরতার মধ্যেও কোথাও একটা ভালোবাসার জায়গা তৈরি করে ফেললেন উত্তমকুমার।
অভিনেতা মানেই তাঁর মধ্যে একটা বুদ্ধিদীপ্ত ছাপ থাকতেই হবে, তার কোনো মানে নেই। যিনি বড়ো অভিনেতা হন, তাঁর একটা পারসেপশন ক্ষমতা আছে। যে কারণে সত্যজিৎ রায় একবার বলেছিলেন, তাঁর অনেক ভুল ছিল, কিন্তু উত্তমকুমারের কোনো ভুল ছিল না।

‘যদুবংশ’-এ উত্তমকুমার যে অভিনয়টা করেছিলেন, তা যদি কেউ দেখিয়েও দেন, তাহলেও ওই অভিনয় করা সম্ভব নয়। যখন চশমাটা ভেঙে পড়ে যাচ্ছে, সেখানে তাঁর একাকিত্ব যেভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন তা আজও মনে রয়ে গেছে। আরেকটা জিনিস, বাঙালির সাধারণ উচ্চতা পাঁচ ফুট আট বা সাড়ে আট, তার পরের যে দুই ইঞ্চি পাঁচ ফুট দশ সাড়ে দশ – সেখানে আবার উচ্চতা অনেকটা বেড়ে যায়। মাত্র দুই ইঞ্চি লম্বা, কিন্তু এতে একটা অন্য ব্যক্তিত্ব চলে আসে। উত্তমকুমার ছিলেন পাঁচ ফুট সাড়ে দশ। স্টার হতে গেলে ক্যামেরা তাঁকে বানিয়ে নেন আবার তিনিও ক্যামেরাকে মানিয়ে নেন। এটা উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে ভীষণভাবে প্রযোজ্য।
এছাড়াও উত্তমকুমারের কণ্ঠস্বর আমাকে অবাক করত। গোড়ার দিকে যখন উনি ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ বা ‘অন্নপূর্ণা মন্দির’ করছেন, ওই সময়ে তাঁর কণ্ঠস্বরের যে রেঞ্জ ছিল, পরেরদিকে এক্সট্রা একটা চার্ম যোগ করেছিলেন। যে কথা উনি বলছেন, তা দর্শককে শুনিয়ে ছাড়ছেন। আর সেটা যেন ‘কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল গো, আকুল করিল মোর প্রাণ’।

পৃথিবীর কোথাও এমন অভিনেতা নেই, যিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে একা ঘাড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন এবং একের পর এক হাউসফুল ছবি দিচ্ছেন। আমরা যাঁরা ওঁর ভক্ত, আমাদের মনে হয় উনি ঠিক সময়েই চলে গেছেন।
আমরা শম্ভু মিত্রকে কাছ থেকে দেখেছি। থিয়েটারে শম্ভু মিত্রের এই কোয়ালিটি ছিল। কিন্তু শম্ভুবাবুকে দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে হত, উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে সেটা হবে ডাবিং আর্ট। ‘সন্ন্যাসী রাজা’-য় যখন তিনি বলছেন, “আমার গান আর আসছে না… আমি আর কেন গান গাইতে পারছি না বলোতো…” – এই যে একটা অনবদ্য জীবন যা আমরা দেখতে চাই, কিন্তু এই জীবনের বাইরেও একটা বৃহত্তর জীবন আছে – সিনেমা সেটাকে দেখায় – এই বাস্তবতাকে যেভাবে প্রয়োগ করছেন উত্তম, সেটা অনবদ্য। এটাকে আমি বলব ধ্যান। আরেকটা হল অসন্তুষ্টি। ‘আজ আমার হল না’ – একজন অভিনেতার মধ্যে এই অসন্তুষ্টিটা থাকা উচিত। তবেই ‘আরও ভালো করতে হবে’-র চার্মটা পাব। একজন পরিচালক হিসেবেও এটা আমার মনে হয়। তাছাড়া উত্তমকুমার যখনই যা কিছু করতেন, সেটাকে একঘেয়েমির মধ্যে ফেলতেন না।
একটা সময় তো সত্যিই এসেছিল, যখন ইন্ডাস্ট্রিকে একা হাতে টেনেছিলেন উত্তমকুমার। আমার মনে হয় পৃথিবীর কোথাও এমন অভিনেতা নেই, যিনি দীর্ঘ তিন দশক ধরে একটা গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে একা ঘাড়ে তুলে নিয়ে যাচ্ছেন এবং একের পর এক হাউসফুল ছবি দিচ্ছেন। আমরা যাঁরা ওঁর ভক্ত, আমাদের মনে হয় উনি ঠিক সময়েই চলে গেছেন।

একেক সময় মনে হয়, উত্তমকুমারকে যদি পেতাম তাহলে কী করতাম! প্রথম যেটা হত, হয়তো পাগলই হয়ে যেতাম। দ্বিতীয়ত, পরিচালক হিসাবে কাজ করতে গেলে ওঁকে কী চরিত্র দিতাম তা হাজারবার ভাবতে হত। আর উনি সেই চরিত্রে অভিনয় করে আমাদের চমকে দিতেন। এই সময়ে যদি উত্তম থাকতেন বোধহয় আরও অনেক ধরনের অভিনয় করার সুযোগ পেতেন। নতুন নতুন পরিচালকদের অনেক সাহায্য করতে পারতেন। কারণ আগেও তিনি অনেকের বৈতরণী পার করেছেন। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করে যেভাবে নিজেকে গর্বিত বলে মনে হয়েছে, সেই একই অনুভূতি তখন উত্তমকুমারের জন্যেও হত। যা আমি বড়াই করে আমার পরের প্রজন্মকে বলে যেতে পারব। এই এত এত বছর পরেও মনে হয়, বাংলা চলচ্চিত্রের একমাত্র স্টার, হিরো বা মহামানব ওই একজনই, তিনি উত্তমকুমার।

