
ক্রিকেট আদতে একটা জীবন্ত রূপকথা। কখনও সেই রূপকথার নাম সুনীল গাভাস্কর, কখনও সচিন তেন্ডুলকর, কখনও বিরাট কোহলি, আজ শুভমন গিল, আকাশ দীপ। বিদেশের মাটিতে ভারতীয় ব্যাটার, বোলারদের একাধিক দুরন্ত ‘পারফরম্যান্স’ দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব, কিন্তু প্রতিপক্ষকে নিয়ে গান বাঁধা হয়েছে এমন নজির বিরল। প্রায় পাঁচ দশক পর ফের এমন ঘটনার সাক্ষী থাকল ভারতীয় ক্রিকেট। ৮৩-র বিশ্বকাপ, সৌরভ-দ্রাবিড়দের অভিষেক, ন্যাটওয়েস্ট ট্রফি জিতে লর্ডসের ব্যালকনিতে মহারাজের জামা ঘোরানো, ২০১৩-র চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি… ইংল্যান্ডের মাটি ভারতীয় ক্রিকেটকে মনে রেখে দেওয়ার মতো বহু মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। তাতে নয়া সংযোজন শুভমন গিলের নেতৃত্বে এজবস্টনে টেস্ট জয় এবং আকাশ দীপ, আকাশ দীপ, আকাশ দীপ…!

বিলেতে ক্রিকেটের জন্ম। সেই দেশের মাটিতে সাহেব ব্যাটারদের মাটি ধরিয়েছেন বাংলার ফাস্ট বোলার আকাশ দীপ। দুই ইনিংস মিলিয়ে আকাশ দীপ দশখানা উইকেট শিকার করেছেন, ভেঙে খান খান করে দিয়েছেন প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইন-আপের মেরুদণ্ড, ছুঁয়ে ফেলেছেন কিংবদন্তি চেতন শর্মাকে, তখন চুপ করে বসে থাকেনি বার্মিংহাম।
বিলেতে ক্রিকেটের জন্ম। সেই দেশের মাটিতে সাহেব ব্যাটারদের মাটি ধরিয়েছেন বাংলার ফাস্ট বোলার আকাশ দীপ। দুই ইনিংস মিলিয়ে আকাশ দীপ দশখানা উইকেট শিকার করেছেন, ভেঙে খান খান করে দিয়েছেন প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইন-আপের মেরুদণ্ড, ছুঁয়ে ফেলেছেন কিংবদন্তি চেতন শর্মাকে, তখন চুপ করে বসে থাকেনি বার্মিংহাম। ইংল্যান্ড আকাশ দীপকে নিয়ে বেঁধে ফেলেছে গান, “Akash Deep, Akash Deep, Akash Deep, Akash Deep, bowling England out Akash Deeep…”
১৯৭১ সালে গাভাস্কারকে নিয়ে ক্যালিপসো বেঁধেছিল পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজে আগুনে ক্যারাবিয়ান বোলিংয়ের সামনে হ্যাট পরা গাভাস্কার ৭৭৪ রান করেছিলেন। ব্যাটিং গড় ছিল ১৫৪.৮০! সম্ভ্রমে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ গেয়ে উঠেছিল, “It was Gavaskar/ De real master/ Just like a wall/ We couldn’t out Gavaskar at all, not at all/ You know the West Indies couldn’t out Gavaskar at all…”
৫৪ বছর পর সাসারামের টিলা থেকে এসে এজবস্টন কাঁপানো আকাশ দীপও আজ সেই একই জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছেন। সাতের দশকের গাভাস্কারের মতো ২০২৫-এর আকাশ দীপকে দেখেও মোহিত ক্রিকেট দুনিয়া। শিষ্যের সাফল্যে কী বলছেন আকাশ দীপের প্রাক্তন প্রশিক্ষক সৌতম মিত্র?
প্রায় দুই দশক যাবৎ ক্রিকেট প্রশিক্ষণের সঙ্গে যুক্ত সৌতমবাবু। খেলা ছাড়ার পর থেকে তিনি প্রাক্তন ভারত অধিনায়ক সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভিডিওকনের ক্রিকেট অ্যাকাডেমির সঙ্গে যুক্ত। সেখানেই ক্রিকেট প্রশিক্ষণ দেন। সাসারাম থেকে দুর্গাপুর, তারপর কলকাতায় এসে ভিডিওকনেই যোগ দেন আকাশ দীপ। আকাশ দীপের গুরু সৌতম মিত্র জানালেন, “শিষ্যের সাফল্যে সব সময় আনন্দিত হই। আজ বলে নয় যখন ও অনুর্দ্ধ ২৩ বেঙ্গল খেলেছে তখন থেকেই। ফোনও করেছিল কালকে (৭ জুলাই) আমায়। আকাশ দীপ এখনও খুব সরল। প্রত্যেক দিনই (টেস্ট চালাকালীন) ওকে টেক্সট করতাম আমি। ও উত্তর দিত খেলার শেষে।”

ক্রিকেট কোচ সৌতমবাবু আরও বললেন, “আকাশ দীপ খুবই পরিশ্রমী ছেলে। যতটা খাটাবেন ততটাই ও খাটবে। সবচেয়ে বড়ো কথা, ও যে স্তরে পৌঁছে গিয়েছে, ও যদি আমায় পাত্তা না দেয়, ওর কিচ্ছু যায় আসে না। ভালো লাগে ও এখনও মনে রেখেছে। এখনও যোগাযোগ রাখে। মাস তিনেক আগে বাড়ি করলো সাসারামে। আমায় টিকিট কেটে পাঠিয়ে দিয়েছে। বললাম, আমার কোমরে লেগেছে যেতে পারবো না। বললো, ‘জানি না স্যার, আমার বাড়ি হচ্ছে আপনাকে আসতেই হবে।’ বাধ্য হয়ে কোমরে বেল্ট লাগিয়ে যেতে হয়েছিল। যেভাবে ও আপ্যায়ন করেছে, বলে বোঝানো যাবে না। সারা রাত জেগেছে, ভোরবেলা ট্রেন আমার। ও-ই টিকিট কেটে রেখেছিল। ভোর ছটায় ফোন করেছে, বলছে ‘স্যার ট্রেনে বসেছেন তো?’ আমি বললাম তুই সারা রাত জাগা। আমি পরে ফোন করতাম। বললো, ‘এটা আমার কাজ স্যার।’ কে করবে বলুন তো? কথায় বলে না পরিশ্রমের বিকল্প নেই। ও হচ্ছে তা-ই। এখনও যে মাটিতে পা রেখে দিয়েছে। খুব কম লোকেরই থাকে। এখনও অবধি ও পরিবারের লোকজন ছাড়া কাউকে বোঝে না। বাড়ির লোকেরাও ভালো। দিদি আছে।”
আকাশ দীপের প্রথম দিকের সফর সম্পর্কে তাঁর কোচ বলছিলেন, “ও খুব কষ্ট করেছে। যখন কলকাতায় এসেছে, এখানেও কষ্ট করেছে। ও ২০১৫-২০১৬ সালে প্রথম আসে। ভিডিওকনে ভর্তি হয়েছিল। আমি তখন কোচ ছিলাম ভিডিওকনে, এখনও আছি। ইউনাইটেড ক্লাবে দু-তিন বছর খেলেছে। ওর বলে খুব ‘পেস’ (জোর) ছিল। ওর শেখার আগ্রহ খুব। ক্লাবের প্রাকটিস হয়ে যেত, তারপরেও আধ ঘণ্টা ‘সিঙ্গেল উইকেট’ রেখে বোলিং করতো। খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে খুব মানতো। উল্টোপাল্টা কিছু খেত না।” এ প্রসঙ্গেই এক গল্প বলছিলেন সৌতমবাবু, “ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে খেলা ছিল কালীঘাট মাঠে। ও-ই (আকাশ দীপ) ম্যাচটা একা হাতে জিতিয়ে দিচ্ছিল। চার ওভারে ষোল রান দিয়ে দুই উইকেট নিয়েছে! সেকেন্ড হাফে খেলা ছিল। সবাই বললো, স্যার পার্কস্ট্রিট থেকে কাঠিরোল আর কোল্ড ড্রিঙ্কস আনতে বলুন। আমি বললাম। আকাশ দীপ বললো, ‘আমি খাবো না।’ খেলোই না।”
আকাশ দীপের প্রথম দিকের সফর সম্পর্কে তাঁর কোচ বলছিলেন, “ও খুব কষ্ট করেছে। যখন কলকাতায় এসেছে, এখানেও কষ্ট করেছে। ও ২০১৫-২০১৬ সালে প্রথম আসে। ভিডিওকনে ভর্তি হয়েছিল। আমি তখন কোচ ছিলাম ভিডিওকনে, এখনও আছি। ইউনাইটেড ক্লাবে দু-তিন বছর খেলেছে।

একেবারে প্রথম দিকের কোচ হিসাবে সৌতমবাবুর চাওয়া, “ওর আরও সাফল্য আসুক। ভগবান ওকে আরও ভরিয়ে দিক। ও খুব ঠাকুর বিশ্বাসী। খুব ভালো লাগে একটা ছেলে কোন জায়গা থেকে কোথায় গেছে। এখনও মানসিকতা ওই একই আছে। এটাই বড়ো ব্যাপার! অনেক খেলোয়াড় তো দেখেছি। এখনও আকাশ দীপ বদলে যায়নি।”
ভারতে ক্রিকেট নিছক একটি খেলা বা বিনোদনের পরিচয় ভেঙে ধর্ম হয়ে উঠেছে। একশো চল্লিশ কোটি দেশবাসীর কাছে পূজিত হন দেশের জার্সি পরে মাঠে নামা এগারো জন। একটা সেঞ্চুরি বা পাঁচ উইকেট নিলেই জন্ম হয় নায়কের। যাবতীয় আলো এসে পড়ে তাঁর উপর। সে আলো উপেক্ষা করে নিজের খেলা যাঁরা এগিয়ে যেতে পারেন, তাঁরাই হয়ে ওঠেন কিংবদন্তি। আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেলেই বিনোদ কাম্বলিদের জন্ম হয়। আকাশ দীপের উত্তরণের সফর অব্যহত থাক। আরও আলোয় আলোকিত হোন তিনি। তাঁর কোচের কথায়, আকাশ দীপের পা থাকুক মাটিতেই।

