
রেবা হোর (১৯৬০)- ছবি: জ্যোতি ভট্ট [বাঁদিকে], Weary Days/ Reba Hore [ডানদিকে]
একটা সাদামাটা কর্মময় জীবনের নাম রেবা হোর (Reba Hore)। যশোরে জন্ম হলেও কলকাতায় অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। সে সময়েই সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। সমাজকে এত কাছ থেকে দেখার এর চেয়ে ভালো সুযোগ আর হয় না। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। পরে সরকারি চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিল্পের পাঠ নেন। তখনও ডিগ্রি কলেজ নয়, আর্ট স্কুল। পাশ করে পরবর্তী তিন-চার বছর কলকাতার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। পরে স্বাধীনভাবে আজীবন শিল্পচর্চা করেছেন। রেবা হোরের কাজ দেখলে বোঝা যায়, সেগুলি প্রাথমিকভাবে দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ, বিচ্ছেদ, পরিবার থেকে আহরিত। কিন্তু তার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে রয়েছে ‘ভাব’।

রেবা হোরের হাতে লেখা কবিতা
রেবা হোর চিরকাল মানুষের গহীন আবেগ, অনুভূতির অন্বেষণ করেছেন। এর মধ্যে কি আত্মদর্শনও নিহিত নেই? অভিব্যক্তিবাদ বা প্রকাশবাদের সঙ্গে মিলে গিয়েছে অভিজ্ঞতাবাদ। এ মিশেল জীবন্ত হয়েছে রঙের ব্যবহারে।
এক্সপ্রেশনিস্ট বা অভিব্যক্তিবাদের প্রবল প্রভাব রয়েছে ওঁর সমসাময়িকদের মতোই। তবে সে ধারা পালটে ফেলে, আবার ফিরে গিয়েছেন সেখানেই। বলিষ্ঠ লাইনের ব্যবহারে ফিগারেটিভ কম্পোজিশন সাজানো, তাতে অনাড়ম্বর জীবনের প্রকাশ স্পষ্ট। ছবিতে ওঁর মনোজগতের অভ্যন্তরীণ নির্জনতা বারবার এসেছে। এ নির্জনতা অনেক সময়েই একাকীত্ব, আবার অনেক সময় যেন শূন্যতা। তাতে বাহ্যিক অলংকারের প্রাচুর্য নেই। স্বাভাবিকতাবাদের সঙ্গে মিশেল ঘটেছে স্বকীয় বিমূর্ততা। কিন্তু মোটেই ফিগারেটিভ বর্ণনাকে সরিয়ে রেখে সে চিত্রভাষা নয়। তবে বিশুদ্ধ বিমূর্ততা বলতে আমরা যা বুঝি, তার চেয়ে এটি ভিন্ন। এখানে শুধুই সুরের ওঠা-পড়া নেই। রয়েছে মানুষের বলিষ্ঠ উপস্থিতি। উনি কখনোই মানুষকে ছেড়ে যাচ্ছেন না। এ বোধ হয়তো ওঁর সমাজবাদী রাজনৈতিক বিশ্বাসের প্রতিফলন। কমিউনিজমের এ ভাবধারা তিনি আত্মস্থ করেছিলেন। তাই মানুষও যেন ওঁর ছবি ছেড়ে যায়নি। সে মানুষ হতে পারে ওঁর অপরিচিত। কিন্তু দেখে মনে হয় খুব চেনা। হয়তো সকলেই খেটে খাওয়া, লড়াকু মানুষ। এই স্থির হয়ে রয়েছে ছবিতে, একটু পরেই তাকে যেন মানুষের ঢলে নেমে, অধিকারের কথা বলতে হবে। ওঁর ছবির মানুষ সচেতনভাবে রাজনৈতিক ও স্বাধীন। তারা হেরে গেলেও ক্লান্ত হয় না। রেবা হোর চিরকাল মানুষের মনের গহীন আবেগ, অনুভূতির অন্বেষণ করেছেন।
রেবা হোর চিরকাল মানুষের গহীন আবেগ, অনুভূতির অন্বেষণ করেছেন। এর মধ্যে কি আত্মদর্শনও নিহিত নেই? অভিব্যক্তিবাদ বা প্রকাশবাদের সঙ্গে মিলে গিয়েছে অভিজ্ঞতাবাদ। এ মিশেল জীবন্ত হয়েছে রঙের ব্যবহারে। যা ছবিগুলিকে চিন্তা- উদ্দীপক ও স্বতন্ত্র করে তোলে। কাজগুলো দর্শক-মনকে করে তোলে চিন্তাশীল, মস্তিস্ককে করে সচল, স্থির, দৃঢ়।

Pastel and Watercolour on Paper
রেবা হোর মূলত তেলরং, জলরং, মিশ্র মাধ্যম, প্যাস্টেল ও টেরাকোটায় কাজ করেছেন। হ্যাঁ, মূলত চিত্রী হলেও ওঁর বলিষ্ঠ ভাস্কর্যগুলির মান যেকোনো গুণী ভাস্করের সমতুল্য।
বাংলার দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য, হতাশা, অন্ধকারময় যাপনের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য প্রকাশ পেয়েছে ওঁর ছবিতে। সমাজকে উপেক্ষা করে শিল্পীর কল্পলোক গড়ে উঠতে পারে না। রেবা হোরের ক্ষেত্রে তাঁর অন্যথা কখনোই হয়নি। ওঁ সচেতনভাবে হয়তো বৃহৎ তৈলচিত্র থেকে ক্রমে আরও ইন্টিমেট স্পেসে ছবিকে ছোটো ও কাব্যময় করে তুলেছেন। ক্রমে ওঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনদর্শন, চিন্তন যে পরিবর্তিত হয়েছে তার প্রমাণ ছবিগুলিই দেয়। কিন্তু কখনোই আশাহত হয়ে সমাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন না তিনি। অসম্ভব জীবনীশক্তি না থাকলে এ হয় না। বারবার তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, ‘স্থিরতা’ চলমান বা গতিশীল।

The Kitchen , Oil on Canvas, 1953 (বাঁদিকে), রেবা হোরের পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফ (ডানদিকে)
ওঁর ছবি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, ব্যক্তি রেবা হোর নিজে অন্তর্মুখী। অর্থাৎ অনাড়ম্বর জীবন, প্রচারবিমুখী চর্চা তাঁর স্বভাব ছিল। বিশালাকার ক্যানভাসে একরাশ আবেগ ঢেলে দিতে জানতেন। আবেগ সরিয়ে ওঁর ছবি দেখা যায় না। অর্থাৎ কনস্ট্রাকশন, প্রপোর্সন দেখতে চাইলে ওঁর ছবির প্রাণকে ছোঁয়া যায় না। শুধু কাঠামো দেখতে চাইলে হাওড়া ব্রিজ বা কুতুব মিনারের নকশা দেখা ভালো।
১৯৬৭ সালে শান্তিনিকেতনে চলে আসার পরে ওঁর ছবির ভাষা পাল্টে যায়। তবু নগর জীবনের ছিটে ফোটাও কি লেগে রইলো না? ক্যানভাসের স্পেস আরও বিস্তৃত হলো। তবু নানুষ সরে গেল না। ওঁর স্বভাবই তো মানুষের কাছে পৌঁছানোর। কাজেই ছবি হয়ে উঠলো আরও গভীর মনস্তাত্বিক। যেখানে দুঃখ – বিচ্ছেদ হাত ধরে দু-দণ্ড বসতে পারে। ছবিতে একই সঙ্গে বাস্তবতায় স্যুরিয়াল আবেদন কি মিশে ছিল না?

রেবা হোরের পেইন্টিং
১৯৭০-এর দিকে ওঁর শারীরিক কারণে তেলরং ব্যবহার ছেড়ে দেন। এ সময়ে মোমের সঙ্গে রং মিশিয়ে এনকাস্টিক পেইন্টিং চর্চা শুরু করেন। এ নতুন মাধ্যমে স্বাভাবিকভাবেই চিত্রভাষা ফের পালটে গেল। তবে ক্রমে কাজ আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠছিল।
একইসঙ্গে টেরাকোটায় যথেষ্ট কাজ করেছেন। মূলত পোর্ট্রেট। সেগুলো দেখলে বোঝা যায় উনি ত্রিমাত্রিকতাকে করায়ত্ত করে ফেলেছিলেন সহজেই। পোর্ট্রেটগুলোতে এক্সপ্রেশন বা অভিব্যক্তিই গুরুত্বপূর্ণ। আবার সরাসরি মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি। মুখগুলো ভাবলেশহীন, আবার কোনোটি কৌতূহলী, কোনোটির মুখে হতাশার ছায়া, আবার কোনোটি শান্ত, শ্রান্ত। বিষাদ কিন্তু লেগে রয়েছে সর্বক্ষণ। ব্যক্তি-জীবন, পরিবার-পরিজন, সংসার-জীবন ইত্যাদির সঙ্গে সমান তালে কাজ করে গিয়েছেন। কাজের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি অস্থির সময়েও। বরং কাজই ওঁকে স্থির থাকতে সহায়তা করেছে। এ এক অদ্ভুত বুনন-ক্রিয়া, যেখানে দুঃ-সুখের দৈনন্দিন টানাপোড়েন চলেছে। সামাজিক অস্থিরতা, ব্যক্তিগত ক্ষতি ওঁকে ভেঙেছে, চিন্তিত করেছে, বিনিদ্র করেছে, কিন্তু পরাস্ত করতে পারেনি।
ওঁর ছবি দেখতে গিয়ে মনে হয়েছে, ব্যক্তি রেবা হোর নিজে অন্তর্মুখী। অর্থাৎ অনাড়ম্বর জীবন, প্রচারবিমুখী চর্চা তাঁর স্বভাব ছিল। বিশালাকার ক্যানভাসে একরাশ আবেগ ঢেলে দিতে জানতেন। আবেগ সরিয়ে ওঁর ছবি দেখা যায় না।

রেবা হোরের টেরাকোটার কাজ
রেবা হোর যখন যে মাধ্যমকে বেছে নিয়েছেন তখন তাতেই দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। এই বহুমুখীতাই ওঁকে আলাদা করেছে সমসাময়িক শিল্পীদের থেকে। রেবা হোর শুধু প্ৰখ্যাত শিল্পী সোমনাথ হোরের স্ত্রী নন। তিনি ওঁর সহযোদ্ধা। একদিকে যেমন চিত্রী, ভাস্কর, কবি, লেখক, চিন্তক, রাজনৈতিক মানুষ; তেমনই আরেকদিকে নীরব, একাকী, প্রচারবিমুখী শক্তিশালী নারী। ভীষণ বিপরীত দুই স্বভাব হলেও একজন শিল্পে নিমজ্জিত, সমর্পিত মানুষের ক্ষেত্রে এমন স্বভাব স্বাভাবিক। একজন মেধাবী, সচেতন, দৃঢ় চেতনা শিল্পীর কাজের মূল্যায়ণ যে হয়নি, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারী শিল্পীদের অনায়াসে ভুলে যায়। যেন তাঁদের ভুলে গেলে কিছু ক্ষতি নেই। কিন্তু এবার পুনর্বিবেচনা করার সময় এসেছে। শিল্প সমুদ্রের মতন। গভীরতা মাপতে গিয়ে তল মেলে না। রেবা হোরের কাজের বিশালতাও তেমনি ঠাহর করা যায় না। এই প্রচারসর্বস্ব জীবনে ওঁর কথা হওয়া, ওঁর সহজ যাপনের খোঁজ করা ভীষণ জরুরি।
__________________________
ছবি সৌজন্যে: চন্দনা হোর

