দুর্গাপুজোর চালচিত্র শিল্পে নবজাগরণ আনছেন বাঁকুড়ার সুমিত দে

‘নায়ক’ ছবিতে সত্যজিৎ রায়, অরিন্দম অর্থাৎ উত্তমকুমারের মুখ দিয়ে একখানা সংলাপ বলিয়েছিলেন, “শঙ্করদা বলত ওই চালচিত্তির, ডাকের সাজ, ড্যাবড্যাবে চোখ না হলে ঠিক ভক্তি আসে না।” সত্যিই দুগ্গা বলতে মনে পড়ে বিরাট চালচিত্রের কথা। নীল রঙের চাল জুড়ে হরেক কিসিমের রঙিন চিত্র। আর তার সামনে থাকা মূর্তি হয়ে ওঠে দেবী। খড়িমাটি, চকখড়ি, নীল, হলুদ, ভুষোকালি, মেটে সিঁদুরে আঁকা হয় পট। চালের ক্যানভাসে ফুটে ওঠে নানান কাহিনি, দশমহাবিদ্যা, নবর্দুগা, চণ্ডীর কাহিনি, দশাবতার, কৃষ্ণলীলা, মহাভারতের, রামায়ণের নানাবিধ ঘটনা।

চালচিত্রের নানা রকমফের রয়েছে। বাংলা চালি, চালাটি প্রায় গোল। একেবারে নীচে নেমে আসে চাল। মার্কিনি চালি, চালটি অর্ধচন্দ্রাকৃতি। এখন যে চালচিত্র আঁকা হয় বা দেখা যায়, প্রায় সবই মার্কিনি। মঠচৌড়ি চালি, দেবীর মাথার উপরে তিনটি চূড়ার মতো চালি। মঠের মতো দেখতে হওয়ায় চালির নাম মঠচৌড়ি। রামদুলাল নিবাস অর্থাৎ ছাতুবাবু লাটুবাবুর পুজোয় এমন চালি দেখা যায়। দর্জিপাড়ার মিত্রবাড়ির চালিও মঠচৌড়ি। টানাচৌড়ি চালিতে আবার আলাদা খোপ থাকে না। টানা কার্নিশের মতো চালচিত্রের মাথায় তিনটে চূড়া থাকে। আবার কোথাও কোথাও তিনটে অর্ধবৃত্ত থাকে। আন্দুলের দত্ত চৌধুরী বাড়িতে টানাচৌড়ি চাল দেখা যায়। এছাড়াও হারিয়ে গিয়েছে সর্বসুন্দরী চালি, গির্জে চালি, দোথাকি চালি, খোপ চালি।

সুমিত চালচিত্রকে খানিক আধুনিক করে তুলেছেন। তিনি চালচিত্র আঁকেন আর্ট পেপারে, সিন্থেটিক রং দিয়ে। বাড়িতে বানিয়ে ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে গ্রাহকদের চালচিত্র পৌঁছে দেন। গত বছর প্রায় চল্লিশের বেশি চালচিত্র এঁকেছেন সুমিত।

একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো যুগে দুগ্গার চালচিত্র স্মরণ করায় বেঁধে বেঁধে থাকার কথা। কেবল দুর্গা নয়, যেকোনও দেবীর মূর্তির পিছনেই শোভা পায় চালচিত্র। দিন যত এগোচ্ছে পুজোর অনুষ্ঠানিকতা বাড়ছে। থিম, খুঁটি পুজোর ভিড়ে হারাতে বসেছে পুজোর আদত আমেজ। তবু চালচিত্র দাঁড়িয়ে রয়েছে সাবেকিয়ানার সাক্ষ্য হয়ে। বনেদি বাড়ির পুজোয় এখনও চালচিত্রের দেখা মেলে। সর্বজনীন পুজোগুলোয় এখন প্রতিমাও হয় থিমের, ফলে ধীরে ধীরে মূর্তির নেপথ্যে থাকা চালচিত্র সেপিয়া টোনে চাপা পড়ে যাওয়ার স্মৃতিতে পরিণত হচ্ছে। দিন দিন রুগ্ন হতে হতে এ শিল্প তলানিতে এসে ঠেকেছে। শিবরাত্রির সলতে হয়ে অদ্যাবধি গুটি কয়েকজন আগলাচ্ছেন এই শিল্পকে। তেমনই একজন হলেন বাঁকুড়া বিষ্ণুপুরের তরুণ চিত্রশিল্পী সুমিত দে। তিনি মার্কিনি ঘরানার চালচিত্র আঁকেন। মূলত বাড়ির দুর্গাপুজোর চালচিত্র-ই আঁকেন সুমিত।

বঙ্গদর্শন.কম-কে সুমিত জানিয়েছেন কীভাবে তিনি চালচিত্র আঁকার সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেন। সুমিতের কথায়, ‘‘আমি ছোটো থেকেই আঁকার কাজের সঙ্গে যুক্ত। ‘প্রফেশনালি’ কাজ করছি প্রায় আট বছর। বংশ পরম্পরায় চালচিত্র আঁকছি না কিন্তু, আমিই শুরু করেছি। পুজোর থিমও করি। গত বছর দুর্গা পট আঁকার বরাত পাই। আসানসোলের এক দুশো বছরের পুরোনো বনেদি বাড়ির পুজোর তরফে এই প্রস্তাব আসে। পটের মধ্যে চালচিত্র ছিল। কাজটা করি। সমাজ মাধ্যমে কাজের ছবি পোস্ট করি তখন, একজন যোগাযোগ করে বলেন তাঁকেও একটি চালচিত্র এঁকে দিতে হবে। তারপর আমি চালচিত্র নিয়ে পড়াশোনা, গবেষণা শুরু করি। খোঁজ পাই রেবা পাল বলে একজন শিল্পীর। তিনি কৃষ্ণনগরের ঘূর্ণিতে থাকেন। বৃদ্ধ বয়সেও তিনি চালচিত্র এঁকে চলেছেন। তাঁকে নিয়ে তৈরি একটি তথ্যচিত্র থেকে আমি চালচিত্র সম্পর্কে অনেক ধারণা পাই। এভাবেই শুরু হয়।’’

খন থেকেই ভালো সংখ্যায় বরাত আসতে শুরু হয়েছে। শুধু দুর্গাপুজো নয়, বিভিন্ন পুজোর আগেই চালচিত্রের বরাত আসে সুমিতের কাছে। জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী, অন্নপূর্ণা ও অন্যান্য পুজোর চালাও তিনি তৈরি করেন।

সুমিত বলছিলেন, খবরের কাগজের উপর কাঁচা রং দিয়ে চালচিত্র আঁকা হয়। কিন্তু সব জিনিস সহজলভ্য নয়। সুমিত চালচিত্রকে খানিক আধুনিক করে তুলেছেন। তিনি চালচিত্র আঁকেন আর্ট পেপারে, সিন্থেটিক রং দিয়ে। বাড়িতে বানিয়ে ক্যুরিয়ারের মাধ্যমে গ্রাহকদের চালচিত্র পৌঁছে দেন। গত বছর প্রায় চল্লিশের বেশি চালচিত্র এঁকেছেন সুমিত। চালার মাপ অনুযায়ী পারিশ্রমিক নেন সুমিত। জানাচ্ছিলেন, এখন থেকেই ভালো সংখ্যায় বরাত আসতে শুরু হয়েছে। শুধু দুর্গাপুজো নয়, বিভিন্ন পুজোর আগেই চালচিত্রের বরাত আসে সুমিতের কাছে। জগদ্ধাত্রী, সরস্বতী, অন্নপূর্ণা ও অন্যান্য পুজোর চালাও তিনি তৈরি করেন।

সুমিত বললেন, ‘‘অনেকের ধারণা থাকে, যিনি মূর্তি গড়েন তিনিই চালচিত্র আঁকেন; এমনটা হয় না। দুর্গার মূর্তি গড়ার ক্ষেত্রে তিন ধরনের শিল্পীর প্রয়োজন হয়। একজন মাটির কাজ করবেন, একজন সাজসজ্জা যেমন ডাকের সাজের কাজ করবেন আর একজন চালচিত্র আঁকবেন। কুমারটুলির মতো জায়গায় সবই করে দেওয়া হয়। কিন্তু বাড়ির পুজোয় আলাদা আলাদা হয়। অগাস্ট মাসে কাজের চাপ বাড়বে। গত বছর রাত তিনটে অবধি কাজ করেছি। আবার পরদিন সকাল আটটায় বসেছি।’’

তিনি আরও বলেন, ‘‘আমি পেশাগতভাবে আঁকার নানান কাজ করি। আমার উদ্দেশ্য ভারতের যেসব প্রায় হারিয়ে যেতে বসা শিল্পরীতি রয়েছে, সেগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা। আঁকা শেখাইও। প্রতি মাসে অন্তত একটা ক্লাস করাই ভারতীয় শিল্পরীতি নিয়ে, যাতে হারিয়ে যাওয়া শিল্প বেঁচে থাকে। চালচিত্র এক ধরনের পটচিত্র। ভারতের নিজস্ব শিল্পরীতি।’’ সুমিত বলছেন, আগামীতেও তিনি চালচিত্র আঁকা চালিয়ে যাবেন। এক কথায় চালচিত্র ঘরানাকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি বদ্ধপরিকর।

জরা আসা মানেই মৃত্যু। যেকোনও শিল্পের ক্ষেত্রে জরা আসে দুটি কারণে, এক তার কদর করার লোক কমে যাওয়া, অর্থাৎ ব্যবহার কমে আসা। দুই, সংশ্লিষ্ট শিল্পের চর্চাকারীর সংখ্যা হ্রাস পাওয়া। দুটোই কিন্তু একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। চালচিত্র পড়ে গিয়েছে সেই ঘূর্ণিপাকে। থিমের ঠাকুরের চালার বালাই নেই। চালচিত্র আঁকার শিল্পীরাও কাজ না-পেয়ে অন্য পেশায়। কিছু বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে বংশ পরম্পরায় শিল্পীরা আছেন, তাঁরা এঁকে চলেছেন। চালচিত্র শিল্পের চাই তারুণ্য। নতুন প্রজন্মের শিল্পীরা যত এগিয়ে আসবেন ততই পুষ্ট হবে শিল্প। চালার সামনে দেবী মৃন্ময়ী থেকে চিন্ময়ী হয়ে উঠবেন। বাংলার দুগ্গাপুজোর আরও একটি ঐতিহ্য রক্ষা পাবে।

Written by