
“ভেসে যায় আদরের নৌকো/ তোমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়” বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর “আদরের নৌকা” গানটির এই লাইন দুটি এই মুহুর্তে কতটা প্রাসঙ্গিক, তার একটা আন্দাজ দিতেই এই লেখা। নৌকার সঙ্গে নাগরিক জীবনের আর কোনও প্রত্যক্ষ সম্পর্ক নেই। এককালে ছিল। পাতাম, ডিঙ্গি, লম্বা পদি, বাচারি, নায়রী, ইলশা, সওদাগরী, কোষা, গয়না, পানসি, ছুঁইওয়ালা বা একমালাই, বজরা, ময়ূরপঙ্খী – এদের তখন কত দর! একসময় এরাই ছিল মারুতি সুজুকি, হন্ডাই, টাটা, মহিন্দ্রা, মার্সিডিজ, বিএমডাব্লু অথবা অডি। ভিন্ন ভিন্ন নাম, ভিন্ন ভিন্ন মান, ভিন্ন ভিন্ন দাম, ভিন্ন ভিন্ন প্রয়োজনীয়তা। সে এক অন্য সভ্যতা। আর এখন? এখন শুধু নদীতীর ও চরগ্রামের মানুষের বন্ধন ধরে রেখেছে নৌকা (Nouka)। তাই আজও নৌকার জোগান দিয়ে চলেছে নৌকাশিল্পের পীঠস্থান বলাগড় (Balagarh)।

গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে অবস্হিত, হুগলি জেলার (Hoogly District) অর্ন্তগত বলাগড়। নৌশিল্প ছাড়া প্রাচীন মন্দির-পুরাকীর্তির জন্যও বলাগড়কে ঐতিহাসিক স্থান বলা চলে। কাছেপিঠে ঘোরাঘুরির জন্য তো বটেই ঐতিহাসিকদের গবেষণার জন্যেও বাংলার এই স্থানটি প্রসিদ্ধ। দুশো বছরেরও বেশি প্রাচীন নৌশিল্পের আস্তানা। ইতিহাস ঘাঁটলে এর সঙ্গে জুড়ে যাবে প্রাচীন সপ্তগ্রাম বন্দর, আকবরের শাসনকাল, পর্তুগিজ দস্যু আর বারো ভুঁইয়াদের কালপঞ্জি। ব্রিটিশ আমলের আগে থেকে চলে আসা এই শিল্পের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে এ রাজ্য ছাড়িয়ে, ভিন রাজ্যেও। কথিত আছে ভাস্কো-দা-গামা’র সময় থেকে এখানে গড়ে উঠেছে প্রাচীন নৌশিল্প। গ্রামের পথে হাটঁতে হাঁটতে দেখতে পাওয়া যাবে ছোটো বড়ো মিলিয়ে প্রায় পঞ্চাশ বা ষাটটি কারখানা।

হুগলির বলাগড়ের শ্রীপুর ও তেঁতুলিয়া গঙ্গা উপকূলবর্তী এলাকায় প্রায় ৩০০টি পরিবার এই নৌশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই এলাকার তৈরি হওয়া নৌকা আগে এ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হত। ঠিক তেমনই রাজ্যের বাইরে উত্তরপ্রদেশ, বিহার, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ড প্রভৃতি জায়গায় প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ হত। নৌশিল্প বলাগড় অঞ্চলে এক ঐতিহ্যবাহী শিল্প ছিল ঠিকই কিন্তু যতদিন যাচ্ছে এই শিল্প বিলুপ্তির পথে এগোচ্ছে। বিভিন্ন কারণ আছে এর নেপথ্যে।

বর্ষার সময় নৌকা তৈরির মাত্রা একটু বাড়লেও অন্য সময় তা দেখা যায় না। নৌকা-শিল্পীদের অভিযোগ, ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁরা কোনও ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পান না। তার ফলে নৌব্যবসায়ীদের যাঁর যা পুঁজি থাকে তাই দিয়ে কোনওরকমে ব্যাবসা চলছে। কাঁচামালেরও অভাব দেখা দিয়েছে। এর জন্যও নৌকা উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকেরা এই এলাকায় কাজ ছেড়ে সমুদ্র উপকূল অঞ্চলের নৌকা তৈরির কারখানায় যোগ দিচ্ছেন। তার ফলে এই কারখানাগুলি না চলার একটি বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে শ্রমিক সমস্যা।
তাছাড়া আগে শাল, সেগুন কাঠ দিয়ে শক্তপোক্ত কাঠের নৌকা তৈরি করা হত। এখন এই সব কাঠের আকাশছোঁয়া দাম হয়ে যাওয়ায় খরচও পোশাতে পারছেন না নৌশিল্পীরা। তাই তাঁরা নৌকা তৈরিতে ব্যবহার করছেন বাবলা, শিরিস এবং হার্ডউড কাঠ। কিন্তু এই কাঠগুলিও যথাযথ না পাওয়া যাওয়ায় এদিকেও তাঁরা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আর যে সমস্ত শ্রমিকেরা অন্যত্র যেতে পারছেন না তাঁরা পরিবার বাঁচাতে এলাকায় এলাকায় ১০০ দিনের কাজে দিনমজুরের কাজ করছেন। কেউ আবার চাষের ক্ষেতে কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

ব্যবসায়ীরা বলছেন প্রায় দু’বছর ধরে চলা লকডাউনে কাঁচা মালের অভাব বেড়ে গিয়েছিল। করাত কল থেকে আরম্ভ করে মার্কেট, সবকিছুই বন্ধ হয়ে পড়েছিল দীর্ঘ দু‘বছর। ট্রেন-বাস বন্ধ থাকার কারণে ক্রেতারাও আসতে পারছিলেন না এখানে। ফলে ব্যবসায়ে কার্যত ধস নেমেছিল, যার ক্ষত এখনও সেরে ওঠেনি। তাহলে, উপায় কি কিছুই নেই?

কুটির শিল্পের উন্নতির জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) সরকার একের পর এক নানা অভিনব পদক্ষেপ করেছে। বলাগড়ের সুপ্রাচীন নৌকাশিল্পের পুনরুজ্জীবন সেই তালিকায় নতুন সংযোজন। কয়েক বছর আগে বলাগড়ের নৌকাশিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য একটি নৌকা হাব (boat industry) তৈরির পরিকল্পনা করে ক্ষুদ্রকুটির শিল্পদপ্তর। সেইমতো দপ্তরের মন্ত্রী বলাগড়ের নৌকাশিল্পীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ নিয়ে আলোচনাও করেন। সেই কাজ চলছে। এছাড়া, সুদীর্ঘ এক ভৌগোলিক ইতিহাস জড়িয়ে থাকার জন্য বলাগড়ের সুপ্রাচীন নৌশিল্প এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে, নৌশিল্পীরা নতুন উদ্যোমে লড়াই চালাচ্ছেন ‘জিআই’ ট্যাগ পাওয়ার লক্ষ্যে। ‘জিআই’ ট্যাগ এবং নৌকা হাব, এই দুইই এখন বলাগড় নৌশিল্প বাঁচিয়ে রাখার মূল মন্ত্র।
__________________
তথ্যসূত্র: ইচ্ছেপূরণ ব্লগ- প্রীতম সাঁতরা, আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান এবং বলাগড়ের স্থানীয় মানুষ

.jpg)