
হুগলি নদীর পূর্বপাড়ে অবস্থিত কলকাতা শহরটির কথা এলে, আমাদের প্রথমেই মনে ধরে আবেগ। বাংলা তথা বাঙালির এই সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্রটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম। আজকের শহর বলতে এই প্রজন্ম মূলত হাওড়া ব্রিজ, প্রিন্সেপ ঘাট-ময়দান, দ্য ফর্টি টু কিংবা হলুদ ট্যাক্সি বুঝলেও, সেকেলে কলকাতা ছিল অনেকটাই আলাদা। তখন ব্রিটিশ আমল। দেশজুড়ে হুকুমত চালাচ্ছে কোম্পানি। সামান্য তিন গ্রামের ইজারা থেকে ভূ-ভারতের রাজধানী, ব্যাপারটা কিন্তু কম রোমাঞ্চকর নয়।
রাজা উজিরের যুগ আজ নেই। স্বাধীনতা পেয়েছে ভারত। তবু এখনও এ শহরে এমন কিছু গলি বর্তমান যেখানে থমকে আছে সময়। হারিয়ে গেছে কাল। মিলিয়ে গেছে দিনক্ষণের হিসেব। মধ্য কলকাতার ৮৭ নম্বর কলুটোলা স্ট্রিটে স্থিত এমনই এক খুশবু বিপণি, লোকমুখে সুপ্রসিদ্ধ হাজি খুদা বখ্শ নবী বখ্শ (Haji Khuda Bukhsh Nabi Bukhsh), দ্বিশতবর্ষ পেরিয়েও রীতিমতো ব্যবসা করে চলেছে রমরমিয়ে।

সাল ১৮২৪। লখনউ তখন জ্বলছে। চারদিকে অশান্তি, অস্থিরতা। কনৌজের কারখানা থেকে সামান্য কিছু সুগন্ধী নিয়ে কলকাতায় পাড়ি দেন এক পিতা-পুত্র জুটি। হাজি খুদা বখ্শ ও তাঁর ছেলে নবী বখ্শ। বর্তমান কলুটোলার এক ছোট্ট দোকান থেকে ব্যবসা শুরু হয়।
নাখোদা মসজিদ সংলগ্ন এলাকাটিতে বছরভর চোখে পড়ে ব্যস্ততা। ফুটপাথের পাড় জোড়া দোকান। অসংখ্য পসরা। সকাল থেকেই উপচে পড়ে ভিড়। মানুষে মানুষে সমাগম। ছেলে-বুড়ো, নর-নারী, হিন্দু-মুসলমান কে নেই! সকলেই বিক্রি করে চলেছেন নানান সামগ্রী। তবে সবকিছু ছাপিয়ে যেন চোখ যায় আতরে- এক আশ্চর্য মহার্ঘ্য ঘ্রাণ! গায়ে দু-ফোঁটা মাখতেই খুশ করে দেয় মন। ফুরফুরে হয়ে যায় বদ্ধ মেজাজও। তবে সে প্রসঙ্গে আসার আগে কিছুটা ইতিহাস জেনে নেওয়া দরকার।
সময়টা উনিশ শতক। উপমহাদেশে তখন ক্রান্তিকাল। ক্ষয়িষ্ণু দেশীয় শক্তির অবক্ষয়কে কাজে লাগিয়ে, একে একে এলাকা দখলে মত্ত কোম্পানি। ইংরেজদের মূল ঘাঁটি তখন বাংলা। ১৭৫৭-র পলাশি এবং ১৭৬৪-র বক্সার যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বঙ্গদেশের দেওয়ানি লাভ করে। এর ফলে কলকাতা ধীরে ধীরে ব্রিটিশ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ১৭৭২ সালে গর্ভনর ওয়ারেন হেস্টিংস কলকাতাকে প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। সুতরাং আরও গুরুত্ব বাড়ে অঞ্চলটির।

সে যুগে বহু মানুষ জীবিকার তাগিদে দেশত্যাগ করতেন। নব নির্মিত রাজধানীই ছিল তাদের নতুন ঠিকানা। সাল ১৮২৪। লখনউ তখন জ্বলছে। চারদিকে অশান্তি, অস্থিরতা। কনৌজের কারখানা থেকে সামান্য কিছু সুগন্ধী নিয়ে কলকাতায় পাড়ি দেন এক পিতা-পুত্র জুটি। হাজি খুদা বখ্শ ও তাঁর ছেলে নবী বখ্শ। বর্তমান কলুটোলার এক ছোট্ট দোকান থেকে ব্যবসা শুরু হয়। চিৎপুরে তখন খুব একটা আতরের দোকান ছিল না। ফলত অল্পদিনেই ছড়িয়ে যায় বিপণির সৌরভ।
সেকালে আতরের প্রধান ক্রেতা ছিলেন কলকাতার বাবু সমাজ। টেরিকাটা চুল, নাগড়া জুতো আর গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবিতে সুগন্ধী মেখে, জুড়িগাড়ি চেপে তারা হেঁকে বেড়াতেন সারা রাত। কখনও গঙ্গার ঘাট, থিয়েটার কিংবা বাঈজিবাড়ির শাম-এ-মেহফিল। এভাবেই দিন কাটতো। শৌখনিতার সঙ্গে কখনোই আপোষ করতেন না বাবুরা। আশ্বিন, ১৩২৯-এর সন্দেশ পত্রিকায় এই নিয়ে একটি চমৎকার কবিতা লেখেন সুকুমার রায়:

অতি খাসা মিহি সুতি/ ফিনফিনে জামা ধুতি,/ চরণে লপেটা জুতি জরিদার।/ এ হাতে সোনার ঘড়ি,/ ও হাতে বাঁকান ছড়ি,/ আতরের ছড়াছড়ি চারিধার।/ চকচকে চুল ছাঁটা/ তায় তোফা টেরিকাটা-/ সোনার চশমা আঁটা নাসিকায়।
সময় হিসেবে আতর মাখতেন বাবুরা। আজও কিছু কিছু অভিজ্ঞ মানুষ সে প্রথা মেনে চলেন। গ্রীষ্ম, বর্ষা, শীত অনুযায়ী পালটে যেত আতরের ঘ্রাণ। গরমে মূলত ফ্লোরাল সেন্ট মাখা হয়। এই যেমন বেল, জুঁই, গোলাপ, রজনীগন্ধা প্রভৃতি। অন্যদিকে শীতের সময়ে প্রাধান্য পায় শামামা, মুস্ক ও উদ। অনেক সময় রাত দিনেরও বিভেদ থাকে আবার।
কিছুটা আলাপ সারতে বঙ্গদর্শন.কম হাজি খুদা বখ্শ নবী বখ্শ-এ পৌঁছে গিয়েছিল। বর্তমানে দোকানটি চালাচ্ছেন তাঁদের সপ্তম বংশধর – নিয়াজউদ্দিন আল্লাবক্শ ও তাঁর ভাই সফিকউদ্দিন আল্লাবক্শ। পাশাপাশি পরের প্রজন্মও প্রস্তুত। দোকানটি মোটের ওপরে বড়ো। বেশ গোছানো। থরে থরে সাজানো রয়েছে হরেক কিসিমের আতর। ছোটো, বড়ো, মাঝারি; কড়া, হালকা; কম দামি, বেশি দামি যার যেমন চাই। এছাড়াও আছে সু্রমা, কেশ তেল, গোলাপ জল, ক্যাওড়া জল ও বিরিয়ানি তৈরির মিঠা আতর। দোকানের কর্মচারীদের থেকে সে যুগের বেশ কিছু কিসসা আমরা শুনি।
আতর শব্দটি ফার্সি শব্দ ‘ইতির’ (it’s’r) থেকে এসেছে, যার অর্থ সুগন্ধি বা সুগন্ধ। পারফিউম প্রস্তুত করতে যেমন অ্যালকোহল লাগে, তেমনই আতর তৈরির মূল উপাদান তেল। ঐতিহ্যগতভাবে বাষ্প পতন প্রক্রিয়ার দ্বারা এটি বানানো হয়। অবশ্য আজকালকার দিনে অনেকে কেমিক্যাল ব্যবহার করলেও, মুশাইদ-উদ্দিন আল্লাবক্শ (অষ্টম প্রজন্ম)-এর মতে, “আমাদের সবকিছুই ন্যাচারাল। লখনউ আর কলকাতায় আমাদের কারখানা আছে। সেখানেই সবটা তৈরি করা হয়।” প্রস্তুতি ও পদ্ধতির ওপর আতরের দাম নির্ভর করে। ৩০০ টাকা ভরি (১০ গ্রাম) থেকে শুরু। এরপর ৪০০, ৫০০, ১০০০, ১৫০০- ফেলো কড়ি মাখো তেল। দোকানে বিভিন্ন সাইজের প্যাকেটজাত আতর আছে। তাছাড়া কেউ খুচরো চাইলে সেই ব্যবস্থাও হয়।
বর্তমানে দোকানটি চালাচ্ছেন তাঁদের সপ্তম বংশধর – নিয়াজউদ্দিন আল্লাবক্শ ও তাঁর ভাই সফিকউদ্দিন আল্লাবক্শ। পাশাপাশি পরের প্রজন্মও প্রস্তুত। দোকানটি মোটের ওপরে বড়ো। বেশ গোছানো। থরে থরে সাজানো রয়েছে হরেক কিসিমের আতর।

সে যুগে বাবুদের পাশাপাশি বনেদি বাড়িগুলোতেও নিয়মিত আতর যেত। পুজোর মুখে ভিড় হতো ঢালাও। রীতিমতো হিমশিম খেতেন খোদা বক্শরা। শোনা যায়, জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে বরাত আসত। এমনকী স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও নাকি ব্যবহার করতেন এখানকার আতর। হালকা গোলাপ আর জুঁইয়ের গন্ধ ছিল তাঁর খাস প্রিয়। এছাড়াও বিখ্যাতদের তালিকায় রয়েছেন – নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহিদ সুরাবর্দি, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকাত আলি খান ও রাজ্যপাল নুরুল হাসান-সহ আরও অনেকেই। হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে এমন উদযাপন আজকাল খুব একটা আর চোখে পড়ে না।
সে দিন আজ আর নেই। যুগ বদলাচ্ছে। বিশ্বায়নের আবহে পালটে চলেছে চারপাশ। এখন কেমন বিক্রি হয়? বর্তমান প্রজন্ম কি আতর কেনে? এ প্রশ্নের জবাবে মুশাইদজির বক্তব্য বেশ ইতিবাচক। যদিও পারফিউম আর আতরের কাস্টমার আলাদা। যারা নিয়মিত আতর মাখেন তারা বোঝেন। আতর হলো Raw, অয়েল বেসড। এতে তেল থাকার কারণে কিছুটা ভারি হয়। ফলে অনেকটা সময় ধরে গন্ধ থাকে। তিনি আরও জানান, “উদ আমাদের বেস্টসেলার। হোয়াইট উদ নিতে বহু মানুষ এখানে আসেন। রুহ-খস, বৃষ্টি ভেজা সোঁদা ঘ্রাণ- সবটাই আমাদের এখানে পাবেন।”

হালফিলে সাবেক রুচির পাশাপাশি নতুন গন্ধের সঙ্গেও এক্সপেরিমেন্ট করছেন তাঁরা। বর্তমান প্রজন্মের কথা ভেবে, ঝুঁকেছেন অনলাইনেও। ইউটিউব, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম- এখন সর্বত্রই বিরাজমান হাজি খোদা বকশ নবী বকশ। তাছাড়া হোয়াটস্যাপ কিংবা ওয়েবসাইট থেকেও সরাসরি অর্ডার করা যায়। মাত্র এক ক্লিকে সামান্য ক্যুরিয়ার চার্জের বিনিময়ে, পছন্দের ঘ্রাণ আপনার ঘরে। মোটামুটি সারা দেশেই আতর পাঠান তাঁরা। বিদেশের ক্ষেত্রে রয়েছে বাংলাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্য।
এভাবেই কালের চক্রকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, প্রজন্ম পর প্রজন্ম ধরে বাঙালিকে মাতিয়ে রেখেছে এই খুশবুঘর। কে বলেছে টাইম মেশিন হয় না? সময়যন্ত্র নাকি মিথ – যারা বলে তাদের গায়ে কিছুটা আতর ঘষে দেওয়া যাক।
_______________
ছবি: লেখক

