
শূন্য দশকের বিশিষ্ট কবি-সাংবাদিক অভিমন্যু মাহাত রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’-র অনুবাদ করেছেন কুড়মালি ভাষায়। গ্রন্থের নাম ‘গিতেক নেহর’। কুড়মালি ভাষাভাষী মানুষদের কাছে এ এক প্রাপ্তি। যাঁরা কুড়মালি ছাড়া অন্য কোনো ভাষা তেমন জানেন না, তাঁরা নোবেলজয়ী এই বইকে জানতে পারবেন, অনুধাবন করতে পারবেন রবীন্দ্রনাথকেও (Rabindranath Tagore)। প্রায় চার বছর ধরে একটু একটু করে অনুবাদ করেছেন অভিমন্যু।
কুড়মালি (Kurmali) আদি জনজাতিদের ভাষা। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, ওড়িষ্যা, আসাম, ছত্তিশগড়, বিহার-সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এই কুড়মালি ভাষা প্রচলিত। সারা ভারতে এখনও এই ভাষায় কথা বলেন প্রায় চার কোটি মানুষ। কুড়মি জনজাতিদের মাতৃভাষা কুড়মালি। বাংলাদেশেও কুড়মালি ভাষাভাষীরা রয়েছেন, তবে সংখ্যায় কম। ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই কুড়মালি ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার এখনও সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়নি। আশির দশক থেকেই ঝাড়খণ্ডের রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষোত্রীয় আদিবাসী ভাষা বিভাগে কুড়মালি পড়ানো হয়। পরে আরও দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (উড়িষ্যার কোলহান ও ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগ) পড়ানো শুরু হয়েছে। ঝাড়খণ্ডের বেশ কিছু স্কুলে নবম শ্রেণি থেকে কুড়মালি ভাষা পড়ানো হয়। পশ্চিমবঙ্গের সিধু-কানহু-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ও দুটি কলেজে স্নাতকস্তরে পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। যদিও কুড়মালি ভাষার নিজস্ব কোনও লিপি নেই। অঞ্চল বিশেষে বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া ও ওড়িশি হরফ ব্যবহৃত হয়। এই বইয়েও অভিমন্যু কুড়মালি উচ্চারণে ব্যবহার করেছেন বাংলা ভাষা। যদিও এই প্রথমবার নয়, এর আগেও কুড়মালি ভাষায় কবিতা লিখেছেন অভিমন্যু। ‘জোহার’ নামে একটি বইও প্রকাশ করেছিলেন কিছু বছর আগে।

আদিবাসী কুড়মি সমাজ
কবি অভিমন্যু মাহাত বলেন, “কবিতার পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কুড়মালি ভাষাতেও কবিতা লিখি। ২০১২ সালে কর্মসূত্রে আমি যখন বাঁকুড়ায়, কুড়মালি ভাষায় লেখা কবিতাগুলি নিয়ে একটি বই প্রকাশের পরিকল্পনা নিই। সেই সময় থেকেই রবীন্দ্রনাথের অনুবাদ করি। যা ছাপা হয়েছিল কুড়মালি ভাষার সাহিত্য পত্রিকায়। কর্মসূত্রে কৃষ্ণনগর (Krishnanagar) চলে আসার পর মাঝেমধ্যে কলকাতায় যেতাম কবি-সম্পাদক গৌতম ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গে দেখা করতে। তিনি একবার অনুবাদ কবিতাগুলি দেখতে চেয়েছিলেন।”
পশ্চিমবঙ্গের সিধু-কানহু-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ও দুটি কলেজে স্নাতকস্তরে পঠনপাঠন শুরু হয়েছে। যদিও কুড়মালি ভাষার নিজস্ব কোনও লিপি নেই। অঞ্চল বিশেষে বাংলা, হিন্দি, অসমিয়া ও ওড়িশি হরফ ব্যবহৃত হয়। এই বইয়েও অভিমন্যু কুড়মালি উচ্চারণে ব্যবহার করেছেন বাংলা ভাষা।
পরে তিনিই অভিমন্যুকে পরামর্শ দেন, গীতাঞ্জলি (Gitanjali) অনুবাদ করতে। চেয়েছিলেন, কুড়মালি ভাষার মানুষদের কাছে এই বই পৌঁছে যাক। এর ফলে কুড়মালি ভাষাভাষীরা রবীন্দ্রনাথকে জানতে পারবেন।

ইংরেজি গীতাঞ্জলির কুড়মালি অনুবাদে গিতেক নেহর
২০১৪ সাল। প্রায়শই পুরুলিয়ার (Purulia) ঝালদা এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন অভিমন্যু। কারণ এই এলাকায় কুড়মি জনগোষ্ঠীর বসবাস সবচেয়ে বেশি। তাঁর সঙ্গী হতেন বন্ধু যুধিষ্ঠির মাহাতো। কাঁসাই, সুবর্ণরেখার পাড়ে কেটেছে কত কত দিন! এরই মাঝে অভিমন্যু রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ নৃত্যনাট্য ছৌ-পালায় আনার পরিকল্পনা করেন। ‘চিত্রাঙ্গদা’ অনুবাদে ব্যবহৃত হয়েছিল মানভূম ভাষা। কলকাতায় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে সেখানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কবি শঙ্খ ঘোষ। ‘চিত্রাঙ্গদা’ দেখার পর তিনি অভিমন্যুকে বলেছিলেন, “রবীন্দ্রনাথের আরও নৃত্যনাট্য ছৌয়ে আনার চেষ্টা করো। যদিও চিত্রাঙ্গদার পর কোনও কাজ করতে পারিনি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম গীতাঞ্জলির অনুবাদটা এবার করব।”
২০১৮ সালের নভেম্বরে শেষ হয় ‘গিতেক নেহর’-এর অনুবাদের কাজ। কবিবন্ধু শক্তি মাহাতর কাছে লেখাগুলি দিয়ে এলেন ভুলভ্রান্তি দেখার জন্য। কিছুদিন পর গেলেন শঙ্খ ঘোষের (Shankha Ghosh) বাড়িতে। যদিও তাঁর সঙ্গে এ বিষয়ে আগেই কথা হয়েছিল। অভিমন্যু বলেন, “শঙ্খবাবুর কাছে বারবার জানতে চেয়েছিলাম আক্ষরিক অনুবাদ নাকি ভাবানুবাদ? তিনি ভাবানুবাদের পক্ষে মতামত দিয়েছিলেন। গিতেক নেহরের ফাইল তাঁর হাতে তুলে দিয়ে আবদার করেছিলাম গ্রন্থের ভূমিকা লেখার জন্য। তিনি ফেরালেন না। বলেছিলেন একমাস পর নিয়ে যেও।”

শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে অভিমন্যু মাহাত
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এটি বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’র অনুবাদ নয়, ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’র মতোই মোট ১০৩টি কবিতা আছে এই গ্রন্থে। বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’তে ছিল ১৫৭টি কবিতা। এ গ্রন্থের ভূমিকায় শঙ্খবাবু লিখেছেন, “এই ভেবে আনন্দ বোধ করতে পারি যে সাম্প্রতিক একজন কবির হাতে ভিন্ন আরও এক ভাষায় ইংরেজি গীতাঞ্জলির অনুবাদ হতে পারল। যে বইটির অনুবাদ এর মধ্যে বহু ভাষাতেই ঘটে গেছে, (যার মধ্যে অন্তত সাতাশটি ভাষায় অনুবাদ এই মুহূর্তে রবীন্দ্রভবনে রক্ষিত) কুড়মালি ভাষাতেও সেটা পাওয়া যাবে আজ।”
মূল কবিতাগুলির ভাবানুবাদ করতে গিয়ে কোথাও ছন্দপতন হয়নি। এখানেই অনুবাদ-পাঠের আনন্দ। ‘তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী’ কবিতার কুড়মালি অনুবাদে অভিমন্যু লিখছেন, “তঞ কেসন করিকে গিত গাউ/ অহে গুমান, তঞ কেসন করিকে গিত গাউ/ থির হেইকে হামে অনাউ…”। এরকম অসম্ভব সুন্দর অনুবাদে সেজে উঠেছে অভিমন্যুর ‘গিতেক নেহর’। যাঁরা কুড়মালি বোঝেন না, এ বই ভালো লাগবে তাঁদেরও। কারণ রবীন্দ্রনাথের মূল ছন্দ-ভাব-বিন্যাস কোথাও অপরিবর্তিত হয়নি।

ছৌ নৃত্যশিল্পী অভিমন্যু মাহাত
শূন্য দশকের বিশিষ্ট কবি অভিমন্যু মাহাত। প্রকাশিত কবিতা-বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘খিলিপান’, ‘মাটি’, ‘লাঙল, শুনছ?’, ‘আওলা বরষা ধনি’। ‘মাটি’ বইয়ের জন্য ২০১৪ সালে পেয়েছেন সাহিত্য অকাদেমি যুব পুরস্কার। পুরুলিয়ার শরবেড়িয়া গ্রামে তাঁর বড়ো হয়ে ওঠা। মাতৃভাষা কুড়মালি। লেখালেখির পাশাপাশি অভিমন্যু একজন ছৌ শিল্পীও। নিজেদের একটি পারিবারিক দলও আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘Song Offerings’-এর কুড়মালি অনুবাদ তথাকথিত প্রান্তিক মানুষদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে। ভারতের সংবিধান স্বীকৃতি না পেলেও কুড়মিদের প্রতিবাদ এখনও ফুরোয়নি। তাঁদের সোচ্চার কণ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করছেন অভিমন্যু মাহাত।

