ঝাড়গ্রামে খোয়াবগাঁর দেওয়াল চিত্রে হাতি-সচেতনতার পাঠ

“হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া…” – বাংলার রূপকথার গল্পে রাজবাড়ির বর্ণনা অনেকটা এমনই হয় তাই না? কিংবা ধরুন পৌরাণিক কাহিনিতে, সেখানেও তো দেবরাজ ইন্দ্রের বাহন এক বিশাল হাতি, নাম ঐরাবত। আবার, পুজোর ঠিক আগে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাও হাতির পিঠে চড়েই আবির্ভূত হন প্যান্ডলে প্যান্ডলে। আবার হাতি আর মানুষের বন্ধুত্ব নিয়েও অনেক মিষ্টি গল্প শোনা যায়। তাহলে বোঝাই যায়, হাতির সঙ্গে মানুষের বেশ সম্পর্ক কিন্তু সেই প্রাচীন কাল থেকেই বেশ নিবিড়। মানুষের নানা কাজেও সাহায্য করেছে এই বৃহৎ চতুষ্পদ প্রাণীটি। পৌঁছে যাওয়া যাক ঝাড়গ্রামের পশ্চিম প্রান্তে কনেডোবা গ্রামে। যেখানে অবিবেচক মানুষের কাজকর্মের ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে হাতির বৈরিতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু কিছু মানুষের শুভ বুদ্ধি এই বৈরিতা ভুলিয়ে আবার স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচেষ্টা করছে।

পাহাড়ে অরণ্য ধ্বংসই এর মূল কারণ।‌ খাবারের অভাবে ক্ষুধার্ত হাতি মাঝে মাঝেই চলে আসে লোকালয়ে, এদিকে গ্রামবাসী ভয় পেয়ে হাতিকে আঘাত করে, আবার শিশুরাও মজা পেয়ে খেলতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই তাদের বিরক্ত করে।

ঝাড়গ্রামের লালবাজার গ্রাম। লোধা অধ্যুষিত এই গ্রাম এখন ‘খোয়াবগাঁ’। এই গ্রামকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন শিল্পী মৃণাল মণ্ডল। গ্রামের প্রান্তজনের হাতে তিনি তুলে দিয়েছিলেন রং-তুলি, চোখে বুনে দিয়েছিলেন রঙিন স্বপ্ন। ২০১৮ সাল থেকে লোধা-শবর অধ্যুষিত লালবাজার গ্রামকে দত্তক নিয়ে খোয়াবগাঁর যে স্বপ্ন দেখতে এবং দেখাতে শুরু করেছিলেন মৃণাল মণ্ডল, সেই স্বপ্নই এখন ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশের গ্রামেও।‌

সেরকমই একটি গ্রাম কনেডোবা। যে গ্রামে এখন বর্তমান সমস্যা হাতি। খবরের কাগজের পাতায় বা সমাজ মাধ্যমে মাঝে মধ্যেই দেখা যায় হাতি মৃত্যুর খবর, অন্তঃসত্ত্বা হাতিকেও মেরে ফেলছে মানুষ। কিন্তু কেন? এর পিছনে কি শুধুই মানুষের ক্রুরতা? একটু ভেবে দেখলে হয়তো দেখা যাবে কিছু ক্ষেত্রে মানুষও বাধ্য হয়েই হিংস্র হয়ে উঠছে হাতির প্রতি। তবে এই পারস্পরিক হিংস্রতার কারণ কী? এই ব্যাপারে মৃণাল মণ্ডল বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “আমরা ছোটোবেলায় দেখেছি একটা নির্দিষ্ট সময়ে দলমা পাহাড় থেকে হাতিরা আসতো, মাস দুয়েক থেকে আবার চলে যেত। কিন্তু ইদানীং কালে প্রায় প্রতিদিনই হাতিরা লোকালয়ে ঢুকে ফসলের অনেক ক্ষতি করছে এমনকি হাতির কারণে অনেকের প্রাণহানিও ঘটছে।” কিন্তু কেন? হাতিদের আচরণে এহেন পরিবর্তনের কারণ কী? মৃণাল জানাচ্ছেন, পাহাড়ে অরণ্য ধ্বংসই এর মূল কারণ।‌ খাবারের অভাবে ক্ষুধার্ত হাতি মাঝে মাঝেই চলে আসে লোকালয়ে, এদিকে গ্রামবাসী ভয় পেয়ে হাতিকে আঘাত করে, আবার শিশুরাও মজা পেয়ে খেলতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই তাদের বিরক্ত করে। ফলে হাতিরাও সম্ভবত আতঙ্কিত হয়ে আত্মরক্ষার তাগিদে মানুষকে আক্রমণ করছে। এমনকি ভয় পেয়ে নিরীহ মানুষের ওপরেও চলছে আক্রমণ।‌

মানুষ বনাম হাতির এই দ্বন্দ্বই ভাবিয়ে তুলেছিল মৃণালকে। কী উপায়ে এই দ্বৈরথের মোকাবিলা করা যায় ভাবতে ভাবতে তাঁরা ঠিক‌ করেন শিশুদের মধ্যেই রোপণ করতে হবে সচেতনতার বীজ। সেই মতো চলতি বছরের জুন মাস থেকে শুরু করেন সচেতনতার প্রসার। কীভাবে চলছে সচেতনতা প্রসারের কাজ? মৃণাল জানান, “আমরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছি তারা যেন অযথা হাতিকে কোনো রকম বিরক্ত না করে।” এই সচেতনতার শিক্ষার ক্ষেত্রে তারা বেছে নিয়েছেন শিশুদের। কনেডোবা এবং সংলগ্ন আরও তিনটি গ্রামের শিশুরা গাছতলায় সমবেত হয়ে হাতির সঙ্গে মোকাবিলার পাঠ নিচ্ছে। গান‌, চিত্রকলা প্রভৃতির মাধ্যমে শিশু-সহ সকলকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

চিত্রশিল্পী কৌস্তভ চক্রবর্তী বঙ্গদর্শনকে জানান, “হাতিকে বিরক্ত না করে দূর থেকে আগুন দেখিয়ে হাতি তাড়ানো, হাতি এলে তাকে অযথা আঘাত না করা এই কথাগুলোই আমরা ঘরের দেওয়ালে চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরছি। এছাড়াও হাতি সামাজিক প্রাণী হিসাবে কতটা উপকারী, ভারতীয় সংস্কৃতিতে হাতির স্থান ইত্যাদি বোঝানোর চেষ্টা করছি।” তিনি আরও জানান, হাতি আকৃতিতে বড়ো হলেও আদপে বেশ নিরীহ প্রাণী। কিন্তু খিদের জ্বালায়, মানুষের ভয়ে তারা এখন হিংস্র হয়ে উঠছে।

চিত্রশিল্পী কৌস্তভ চক্রবর্তী বঙ্গদর্শনকে জানান, “হাতিকে বিরক্ত না করে দূর থেকে আগুন দেখিয়ে হাতি তাড়ানো, হাতি এলে তাকে অযথা আঘাত না করা এই কথাগুলোই আমরা ঘরের দেওয়ালে চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরছি।”

যাদের জন্য এই সচেতনতার ব্যবস্থা সেই গ্রামবাসীরা কতটা উপকৃত হচ্ছেন? কনেডোবার বাসিন্দা সুনীল কিস্কু, সঞ্জয় কিস্কুর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল হাতির উপদ্রব চলছেই, কিন্তু হাতিদের মোকাবিলা করার এই শিক্ষা ছোটো থেকে বড়ো সকলের কাছে খুব উপকারী ও গ্রহণযোগ্য। প্রকৃতির খাদ্য শৃঙ্খলে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক চিরন্তন। তৃণভোজী প্রাণীরা‌ খাদ্যের জন্য নির্ভর করে উৎপাদক অর্থাৎ গাছের ওপর। কিন্তু মানুষের অপরিসীম লোভে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বহু অরণ্য। ফলে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে খাদ্য-খাদক সম্পর্কের শৃঙ্খল।‌ আর তার প্রভাব পড়ছে পরিবেশে, নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কও। মুষ্টিমেয় মানুষের জন্য বিপদের সম্মুখীন হচ্ছে অনেক নিরীহ মানুষ। মৃণাল বলেন, “গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা অনুরোধ করছি সরকার তথা প্রশাসন অরণ্য রক্ষার জন্য কড়া পদক্ষেপ নিক।”

এই পৃথিবীর ওপর মানুষের অধিকার যতটা, ঠিক ততটাই অন্য প্রাণীদেরও। কিন্তু প্রাণীজগতের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর লালসা তাকে ভুলিয়ে দিয়েছে এই সহজ সত্যটা। মানুষের শুভবুদ্ধিই পারে এই ভারসাম্য আবার ফিরিয়ে আনতে, আর আশাতেই স্বপ্ন দেখছে খোয়াবগাঁয়ের স্বপ্নসন্ধানীরা।

Written by