নির্জনতা প্রিয় জঙ্গল-প্রেমীদের আদর্শ আলিপুরদুয়ারের চিলাপাতা

“গহন অরণ্যে আর বারবার একা যেতে সাধ হয় না-
শুকনো পাতার ভাঙা নিশ্বাসের মতো শব্দ
তলতা বাঁশের ছায়া, শালের বল্লরী,
সরু পথ
কালভার্টে, টিলার জঙ্গলে একা বসে থাকা কী-করম নিঝুম বিষন্ন”

সুনীল গাঙ্গুলি তাঁর কবিতায় বলেছেন অরণ্যে একা যেতে ইচ্ছে করে না, বিষন্নতার কথাও বলেছেন বটে। তবে পাল্টে যাওয়া সময় বলছে, পাহাড়, মরুভূমি অথবা অরণ্য – একাই একশো! অধুনা Solo Trip-এর চাহিদা নিয়ে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি অবগত। একা কিংবা কয়েকজন, তোর্সার পাড় ঘেঁষে থাকা সবুজ বনানীর নির্জনতা উপভোগ করতে শীত থাকতে দু’চারদিনের জন্য ঘুরে আসুন আলিপুরদুয়ার-এর জলদাপাড়া অভয়ারণ্যের কাছে অবস্থিত চিলাপাতা জঙ্গল (Chilapata Forest) থেকে।

ভাগ্য সদয় থাকলে বাঘ, চিতাবাঘেরও দেখা মিলতে পারে। চিলাপাতা জঙ্গলের মধ্যেই নল রাজাদের গড় ছিল বলে শোনা যায়, যদিও সেটার ভগ্ন প্রায় দশা। গাইডদের কাছেও এই গল্প শুনতে পাবেন। জঙ্গলের মধ্যে সেই কাহিনি শুনলে রোমাঞ্চকর অনুভূতি কয়েক গুণ বেড়ে যায় বৈকি!

তোর্সা নদীর পাড়ে ডুয়ার্সের অন্যতম বড়ো বনাঞ্চল এই চিলাপাতা ফরেস্ট। দীর্ঘ তার পরিসর। তোর্সা ছাড়াও অনেক ছোটো  বড়ো নদী রয়েছে এই চিলাপাতা জঙ্গলে। কালাচিনি, বুড়িবসরা ও বেনিয়া নদী চিলাপাতার বুক চিরে বয়ে গিয়েছে। এতটাই বড়ো এই জঙ্গল যে গাইডরাও একদিনে সব জায়গা ঘুরিয়ে শেষ করতে পারে না। পর্যটকদের সংখ্যাও এখানে অনেকটা কম। যাঁরা জঙ্গল সাফারি বলতেই ডুয়ার্স, জলদাপাড়া, গরুমারা বোঝেন তাঁরা একবার চিলাপাতা ভ্রমণে বেরিয়ে দেখতে পারেন। হাতি সাফারির (Elephant Safari) জন্যও এই জঙ্গল অন্যতম একটি।

চিলাপাতার জঙ্গলের একটা ইতিহাস আছে। জনশ্রুতি আছে এই জঙ্গল ছিল কোচ রাজাদের মৃগয়াক্ষেত্র। কোচ রাজার সেনাপতি ছিলেন চিল্লা। তিনি চিলের মতো ছোঁ মেরে শত্রু নিধন করতে পারতেন। তাঁর নামেই এই অরণ্যের নাম রাখা হয়েছিল চিলাপাতা। রেঞ্জ অফিস থেকে পারমিট করিয়ে তবে এই জঙ্গলে প্রবেশ করা যায়। সকাল ৫টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে জঙ্গল সাফারি।

নল রাজাদের গড়, এখন যা ভগ্নস্তূপ

চিলাপাতা ফরেস্ট এতটাই গভীর এমন অনেক জায়গা রয়েছে সেখানে সহজে আলো পৌঁছায় না। কোচ রাজাদের গড়ের ভগ্নাবশেষেরও দেখা মেলে সেখানে। গণ্ডার, হাতি, গাউরের মত একাধিক জন্তুর দেখা মিলবেই। হরিণ, বাইসন তো আছেই। ভাগ্য সদয় থাকলে বাঘ, চিতাবাঘেরও দেখা মিলতে পারে। চিলাপাতা জঙ্গলের মধ্যেই নল রাজাদের গড় ছিল বলে শোনা যায়, যদিও সেটার ভগ্ন প্রায় দশা। গাইডদের কাছেও এই গল্প শুনতে পাবেন। জঙ্গলের মধ্যে সেই কাহিনি শুনলে রোমাঞ্চকর অনুভূতি কয়েক গুণ বেড়ে যায় বৈকি!

চিলাপাতা জঙ্গলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল বিখ্যাত রামগুয়া গাছ। সেই গাছ এখন বিপন্ন প্রায়। চোরাচালানের জেরে সেই গাছের অস্তিত্ব এখন সংকটের মুখে। চিলাপাতা জঙ্গল কিং কোবরা সাপেদের আঁতুঘর। সেকারণে গাইডরা পর্যটকদের সবসময় সন্তর্পণে পা ফেলতে বলেন। ডুয়ার্সের যেকোনও জঙ্গলের তুলনায় অনেক বেশি আদিম চিলাপাতার জঙ্গল।

যেভাবে যাবেন:
আকাশপথে যেতে গেলে বাগডোগরা বিমানবন্দরে নামতে হবে। সেখান থেকে চিলাপাতা পৌঁছতে প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টার মতো সময় লাগবে। রেলপথে হাসিমারা থেকে চিলাপাতার জঙ্গলের দূরত্ম ৫ কিমি, আলিপুরদুয়ার জংশন থেকে ২৩ কিমি, নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে ২০ কিমি। সড়কপথে গেলে আগে আলিপুরদুয়ার পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে চিলাপাতার দূরত্ব ২০ কিমি।    

থাকার জন্য প্রচুর মনোরম রিসর্ট, আবাসন আছে, যেখান থেকে দারুণ জঙ্গল-ভিউ পাওয়া যায়। যাওয়ার আগে একটু গবেষণা করে, কোনও একটা বুক করে নিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হলো। 

Written by