
“গিরি, এবার আমার উমা এলে, আর উমা পাঠাব না/ বলে বলবে লোকে মন্দ, কারো কথা শুনবো না।”
সাধক কবি দ্বিজ রামপ্রসাদের কলমে উঠে আসা এই আগমনী গানের স্তবকই বলে দেয়, বাঙালির কাছে দুর্গা শুধুই দেবী নন, বরং ঘরের মেয়ে উমা। আর বছর বছর এই মেয়েকে ঘরে আনার উৎসবেরই পোশাকি নাম দুর্গাপুজো। তাই ক্যালেন্ডার বা পঞ্জিকার পাতায় থাকা এই চারদিন বাঙালির কাছে বিশেষ গুরত্বপূর্ণ। এই শারদ পার্বণের জন্যু বাঙালির প্রস্তুতি, আবেগ, উন্মাদনা বিশ্বের দরবারে রাজ্যের নাম উজ্জ্বল করে অর্জন করেছে সাফল্যের নতুন মুকুট। ২০২১ সালের ১৫ ডিসেম্বর ইউনেস্কো কলকাতার দুর্গাপুজোকে ‘Intangible Cultural Heritage of Humanity’ সম্মানে ভূষিত করেছে, ফলে দুর্গাপুজোর পরিধি হয়েছে আরও বড়ো। তাই এখন শুধু বাঙালি নয়, দেশ বিদেশের পর্যটকদের কাছেও কলকাতার দুর্গাপুজো আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
ভ্রমণপ্রেমী মানুষের কাছে কলকাতা চিরকাল আকর্ষণীয়। তবে ঐতিহ্যি, আধুনিকতা ও সংস্কৃতির সঙ্গম কলকাতা শরতের এই চারদিন আরও রঙিন হয়ে ওঠে। শুধু পুজোর দিনগুলোই নয়, তার আগে মণ্ডপ তৈরির প্রস্তুতি, কুমোরটুলির ব্যনস্ততা উৎসাহী মানুষকে বারবার টেনে আনে কলকাতায়। তাই শুধু আবেগ নয়, পর্যটন শিল্পের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটেও কলকাতায় দুর্গাপুজো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই দুর্গাপুজো কোনো নির্দিষ্ট জাতিধর্মের উৎসব নয়, বরং বৃহত্তর মানবতার উৎসব। তাই কলকাতার এই মহোৎসব পেয়েছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি। ফলে বিশ্বের দরবারে কলকাতার দুর্গাপুজো আরও পরিচিতি লাভ করেছে। শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের মতে বিশ্বের দরবারে এই উৎসব শুধু প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্যও জনপ্রিয়তা অর্জন করেনি, পাশাপাশি সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবও অস্বীকার করা যায় না।

বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব মূলত চারদিনের হলেও এর প্রস্তুতি পর্ব এবং পুজোর পরের আনুষ্ঠানিকতা মিলিয়ে পুজো পুজো গন্ধ কলকাতার বাতাসে মিশে থাকে বছরের অনেকটা সময় জুড়েই। মাত্র কয়েকদিনের জন্য তৈরি মাটির প্রতিমা, চোখধাঁধানো অস্থায়ী মণ্ডপ, আলোকসজ্জা প্রভৃতি প্রতিটি শিল্পের পেছনে থাকে বহু শিল্পীর পরিকল্পনা আর অক্লান্ত পরিশ্রম। আর এই পরিশ্রমই কয়েকদিনের জন্য কলকাতাকে করে তোলে আর্ট গ্যালারি। শিল্প ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্ত জানাচ্ছেন, “মাতৃকেন্দ্রিক এই উৎসবে থাকে না কোনো জাত-পাত, ধর্মাধর্মের বেড়াজাল। তাই আনন্দময়ীর আগমনে বেজে ওঠা ঢাক ডাক পাঠায় দেশ দেশান্তরের উৎসবপ্রেমী মানুষদের।”
মাতৃকেন্দ্রিক এই উৎসবে থাকে না কোনো জাত-পাত, ধর্মাধর্মের বেড়াজাল। তাই আনন্দময়ীর আগমনে বেজে ওঠা ঢাক ডাক পাঠায় দেশ দেশান্তরের উৎসবপ্রেমী মানুষদের।
কলকাতার দুর্গাপুজোর পরম্পরার দিকে তাকালে দেখা যায়, দুর্গা বাঙালির ঘরের মেয়ে হলেও দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে আপামর মানুষের অংশগ্রহণ খুব বেশিদিনের পুরোনো ইতিহাস নয়। আগে দেবী আসতেন অভিজাত বাড়ির স্থায়ী ঠাকুর দালানেই। সে সময় পুজো ছিল আভিজাত্যে র প্রদর্শনী। দক্ষিণ কলকাতার সাবর্ণ রায়চৌধুরীর বাড়ির পুজো, মধ্যর কলকাতায় রানি রাসমণির বাড়ির পুজো, উত্তর কলকাতার শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজো, হাটখোলার দত্ত বাড়ির পুজো এরকম আরও অনেক বনেদি বাড়ির পুজো কলকাতার দুর্গাপুজোর জৌলুসের গোড়াপত্তন করেছিল। বিশিষ্ট শিল্পী পার্থ দাশগুপ্তের বলেন, “দুর্গাপুজো আসলে ‘For the elitists’, কারণ চারদিনের এই ব্যতয়বহুল পুজো অনুষ্ঠিত করা সকলের পক্ষে সাধ্যাততীত। এছাড়াও অনেক বনেদি পরিবার সেকালে দুর্গাপুজোকে করে তুলেছিলেন শাসক ইংরেজদের তোষামোদের আসর। সেইসব পুজোয় সাধারণ মানুষের ভূমিকা ছিল নগন্য।

উনিশ শতকের নবজাগরণ মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখালো। গিরিকন্যা, শিবপত্নী উমা হয়ে উঠলেন ভারতমাতা। ঘরে ঘরে আগমনীর মাতৃবন্দনার সুর মিশে গেল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম্’-এর সুরের সঙ্গে। চোরবাগানে চাটুজ্জে পরিবারের তিনটি তোরণে উল্লিখিত হল আনন্দমঠের তিনটি লাইন, যেমন: “বাহুতে তুমি মা শক্তি”, “হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি”, “তোমারি প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে”। এই শতকেই অপমানিত কিছু যুবকের জেদে শুরু হল বারোয়ারি দুর্গাপুজো। ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট রোডে কলকাতার প্রথম বারোয়ারি দুর্গাপুজোর সূচনা হয়। এরপর শ্যাামপুকুর, শিকদার বাগান প্রভৃতি অঞ্চলে বারোয়ারি পুজোর প্রচলন হয়। কলকাতার চতুর্থ বারোয়ারি পুজো নেবুবাগান বারোয়ারি পুজো। পরবর্তীকালে এই পুজোই হয়ে উঠল সর্বজনীন- নেবুবাগান বারোয়ারি পুজোই হয়ে উঠল ঐতিহ্যনবাহী বাগবাজার সর্বজনীন দুর্গোৎসব। অভিজাত বাড়ির সজ্জিত স্থায়ী মণ্ডপ ছাড়াও দুর্গা এসে দাঁড়ালেন অস্হায়ী পুজো মণ্ডপে, সকলের সঙ্গে আরও নিবিড় হলো তাঁর যোগাযোগ।

কলকাতায় দুর্গাপুজো সর্বজনীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুজোপ্রাঙ্গনগুলো হয়ে উঠলো মিলনমেলা। ধীরে ধীরে বদলায় সময়। কলকাতার পুজো ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে থিম নির্ভর। সাবেকিয়ানার পাশাপাশি থিম নির্ভর পুজোতে লেগেছে সমকালীনতার ছোঁয়া। শিল্প ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্তের মতে এই পরিবর্তন আসলে ‘Philosophical Change’, “মাকে আমি এবছর যেমন ভাবে দেখছি পরের বছর ঠিক তেমনভাবেই দেখব তার নিশ্চয়তা নেই” – জানান তিনি। তাই পরিযায়ী শ্রমিকের হাহাকার থেকে ভ্যাটিকান সিটি অথবা স্বাধীনতার ৭৫ বছর এরকম অনেক কিছুই কলকাতার বুকে ফুটে ওঠে শারদ পার্বণে।
ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও চর্চা প্রয়োজন, তাহলে আরও বেশি সংখ্যক পর্যটক-গবেষক কলকাতায় এসে কাজ করার উৎসাহ পাবেন।
ভারতীয় সংস্কৃতি চিরদিনই অতিথি পরায়ণ। আর মায়ের টানে যখন দেশ-বিদেশ থেকে সন্তান ছুটে আসে এই শহরের বুকে, তখন শহর আক্ষরিক অর্থেই হয়ে ওঠে মহামানবের মিলনক্ষেত্র। পার্থ দাশগুপ্তের মতে, ঐতিহ্যের যথাযথ সংরক্ষণ ও পরবর্তীকালে চর্চার উপযুক্ত পরিকাঠামো গঠনের মাধ্যমেই এই স্বীকৃতির সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব। তাহলে আরও বেশি সংখ্যক পর্যটক, গবেষক কলকাতায় এসে কাজ করার উৎসাহ পাবেন। খুলে যাবে হেরিটেজ ট্যুরিজমের নতুন দিগন্ত। পাশাপাশি আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও দুর্গাপুজো আরও লাভজনক পর্যটন শিল্প হয়ে উঠবে আর মায়ের টানে কলকাতাবাসী প্রতিবছর উপলব্ধি করবে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম্’-এর অর্থ।

