
গভীর লাল নীল সবুজ বেগুনি জমি, তার উপর উজ্জ্বল সুতোয় যত্ন করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রজাপতি, নানান পাখি, গাছ, ফুল, শঙ্খ আরও কত কী! এ যেন শুধু শাড়ি নয়, আস্ত নকশি কাঁথার মাঠ-এর সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছেন দর্শক। শাড়িপ্রেমীদের কাছে আজন্মই অত্যন্ত আকর্ষণের বস্তু এই কাঁথাস্টিচ শাড়ি। বীরভূমের স্থানীয় শিল্পীদের অন্যতম মুখ্য জীবিকাই হল কাঁথাস্টিচ শাড়ি (Kantha Stitch Saree) তৈরি করে তা ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু এক বিশেষ ধরনের সেলাইয়ের নাম ‘কাঁথাস্টিচ’ হল কেন? এর জন্মের গল্পটাই বা কী?
বহুকাল ধরে গ্রামবাংলার মহিলারা পুরোনো কাপড় স্তরে স্তরে সাজিয়ে, তাতে মোটা সুতোর সেলাই দিয়ে তৈরি করতেন কাঁথা। কাঁথা গায়ে জড়ালে মায়ের স্নেহমাখা ওম যেন শরীরকে শান্ত করে দেয়, শীতের সঙ্গে যেন দূর করে দেয় নিরাপত্তাহীনতার অস্বস্তিকেও। হাতে সেলাই কাঁথা হল মূলত শীত নিবারণকারী আচ্ছাদন বস্ত্রবিশেষ। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের গঞ্জগ্রামে গেলে ‘খেতা’, ‘কেন্থা’ অথবা ‘শুজনি’-র মতো অদ্ভুত নামে আখ্যায়িত হতে শোনা যায় একে। কাঁথা যেমন গায়ে জড়ানো যায়, তেমনই পেতে শোয়াও যায় এর ওপর।

কাঁথাস্টিচ শাড়ি যেন এক অনবদ্য শিল্পসৃষ্টি, সংরক্ষণের কাজটিও নেহাৎ সহজ নয়। প্লাস্টিকের প্যাকেটে রাখবার বদলে কাঠের বাক্সে রাখলে দীর্ঘদিন অবিকৃত রাখা যায় এই শাড়ি। কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে এর সূক্ষ কাজ রক্ষা করতে ন্যাপথলিনের মতো কৃত্রিম সংরক্ষকের বদলে ব্যবহার করা যেতে পারে দারুচিনি ও লবঙ্গ ভরা ছোটো কাপড়ের পুঁটলি।
কাঁথার জন্মের মূল উদ্দেশ্য ছিল, পুরোনো কাপড়কে পুনরায় ব্যবহারযোগ্য করে তোলা। গ্রামের প্রান্তিক মানুষ পুরোনো পরিধেয় বাতিল করে দিতে চাইতেন না, ফলে কাঁথা তৈরি করে তা আরও কিছুকাল ব্যবহারের উপযোগী করে নিতেন। লোকশিল্প ও সাহিত্যে কাঁথার উল্লেখ বারংবার পাওয়া যায়। কাঁথার উপরে যে সেলাই করা হয়, তা সাধারণভাবে কাঁথাফোঁড় বা কাঁথাস্টিচ নামে পরিচিত। শিল্পীদের নিজস্ব ভাষা অনুসারে আবার, কাঁথাফোঁড় দুই প্রকার – পাটি বা চাটাই ফোঁড় ও কাইত্যা ফোঁড়। সাধারণত তরঙ্গ আকৃতির সেলাই দেওয়া হলেও, পরবর্তীকালে সুতোর সাহায্যে নানান নকশা করা হয় কাঁথার উপর। কবি জসিমউদ্দীন রচিত ‘নকশি কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থের প্রকাশের পর কারুকাজ করা কাঁথাগুলি ‘নকশি কাঁথা’ নামে পরিচিত হতে শুরু করে।
কাঁথার উপর যে বিশেষ ধরনের নকশা করা হত, তা যখন শাড়ির উপর ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন তা কাঁথাস্টিচ শাড়ি নামে বাজারজাত করে থাকেন কারিগরেরা। বর্তমানে কাঁথাস্টিচ শাড়ি তৈরি গ্রামবাংলার বিশেষত বোলপুর শান্তিনিকেতনের অন্যতম জনপ্রিয় লোকশিল্প হয়ে উঠেছে। এখানকার বহু কারিগর বাড়িতেই শাড়ির উপর কাঁথাস্টিচ করেন ও তারপর তা স্থানীয় হাটে বিক্রি করেন, অথবা রপ্তানি করেন অন্যান্য জনবহুল বাজারগুলিতে। শান্তিনিকেতনের খোয়াই লাগোয়া শনিবারের হাট-সহ অন্যান্য স্থানীয় দোকান ও হাটগুলিতে বিপুল পরিমাণে কাঁথাস্টিচ শাড়ি বিক্রি করতে দেখা যায় স্থানীয় গৃহবধূদের। বছর জুড়ে এই শাড়ির চাহিদা থাকে শাড়িপ্রেমীদের মধ্যে।

একই সঙ্গে বীরভূমের কয়েকটি প্রত্যন্ত গ্রামের মহিলারা কাঁথাস্টিচ শাড়ি তৈরিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বাজারচলতি সাধারণ নকশার পাশাপাশি তাঁদের কাছে প্রতিফলিত হতে দেখা যায় নিতান্তই জটিল কারুকাজ, যেখানে শড়ির উপর সেলাই করে কোনো বিশেষ ঘটনা, কাহিনি বা দৃশ্যপট ফুটিয়ে তোলেন তাঁরা। বঙ্গে তৈরি কাঁথাস্টিচ শাড়ি রপ্তানি হয় পাঞ্জাব, ব্যাঙ্গালোর, দিল্লি, মুম্বাই প্রভৃতি জায়গায়। নকশার ধরনের উপর ভিত্তি করে লহরী কাঁথা, পাড়তোলা কাঁথা, আসন কাঁথা, শুজনি কাঁথা প্রভৃতি নামকরণ করা হয়েছে। তসর, সিল্ক এবং সুতি – তিন রকমের শাড়ির উপরেই কাঁথাস্টিচ করা যায়। সুতির শাড়ি পাতলা হওয়ার কারণে এ জাতীয় বেস-এর উপর অপেক্ষাকৃত হালকা নকশা করা হয়। তাঁত মেশিনে শাড়ির প্রাথমিক বুননের কাজ সম্পন্ন হলে তাঁতিদের কাছ থেকে সেই শাড়িগুলি সংগ্রহ করেন নকশাকার শিল্পীরা। তারপর তাঁরা মানানসই রঙিন সুতো ব্যবহার করে ইচ্ছেমতন ফুল, পাতা, গাছ, মাছ, পদ্ম, পালকি, সূর্য, চাঁদ, কলসি, নৌকো, জাহাজ, আয়না, ম্যান্ডালা ইত্যাদি ফুটিয়ে তোলেন। একটি সুতির শাড়ির উপর কাঁথা স্টিচের কাজ করতে প্রায় একমাস সময় লেগে যায় একজন কারিগরের।
অন্যদিকে তসর বা সিল্কের শাড়ির ‘বেস’ অপেক্ষাকৃত ভারী হওয়ায় এসব শাড়ির সমগ্র জমি জুড়ে ভরাট নকশা করা যায়। তা চোখে দেখতেও যেমন সুন্দর লাগে, তেমনই দাবি রাখে নিখুঁত কারিগরিত্বের। তসর বা সিল্কের শাড়িতে কাঁথাস্টিচ করতে পাঁচ মাস অবধি সময় লেগে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। একই সঙ্গে এই শাড়ির বাজারদর হয় সুতির কাঁথাস্টিচ শাড়ির চাইতে অনেকখানি বেশি। বর্তমান সময়ে অনেকে সুতির কাঁথাস্টিচ শাড়ি পছন্দ করলেও, তসর ও সিল্কের কাঁথাস্টিচ শাড়ির চাহিদা সর্বদাই বেশি।

কাঁথাস্টিচ শাড়ি যেন এক অনবদ্য শিল্পসৃষ্টি, সংরক্ষণের কাজটিও নেহাৎ সহজ নয়। প্লাস্টিকের প্যাকেটে রাখবার বদলে কাঠের বাক্সে রাখলে দীর্ঘদিন অবিকৃত রাখা যায় এই শাড়ি। কীটপতঙ্গের আক্রমণ থেকে এর সূক্ষ কাজ রক্ষা করতে ন্যাপথলিনের মতো কৃত্রিম সংরক্ষকের বদলে ব্যবহার করা যেতে পারে দারুচিনি ও লবঙ্গ ভরা ছোটো কাপড়ের পুঁটলি। তবে বেশিদিন একভাবে বাক্সে রাখলে শাড়ির গা জুড়ে থাকা নকশাকার সুতোগুলি ফেঁসে যেতে পারে। তাই কয়েক মাস অন্তর নিয়ম করে সেগুলি বাক্স থেকে বের করা উচিত, ও রাখবার আগে একেবারে খুলে অন্যভাবে ভাঁজ দেওয়া উচিত।
কলকাতার ‘দ্য বেঙ্গল স্টোর’ নামক বিপণনী সংস্থা অফুরন্ত শাড়ির সম্ভারে সম্প্রতি যোগ করেছে নানাবিধ কারুকাজে সমৃদ্ধ সুতি, সিল্ক ও তসরের কাঁথাস্টিচ শাড়ি। এছাড়াও ভিন্ন ভিন্ন রং ও ধাঁচের সুতির শাড়ি রয়েছে এখানে, ইতিমধ্যেই যা ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছে।
______
ছবি সৌজন্যে: দ্য বেঙ্গল স্টোর


