
অপর্ণা সেন শুধুমাত্র একজন দক্ষ চলচ্চিত্র পরিচালক বা অভিনেত্রী শুধু নন, বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক পালাবদলের পর্যায়ের সঙ্গেও তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন তাঁর রক্তে। অপর্ণা সেনের বাবা চিদানন্দ দাশগুপ্তের সূত্রে যেমন জানতে পেরেছিলেন বিশ্ব রাজনীতির ক্রমবিবর্তন; তেমনই তাঁর রন্ধ্রে রন্ধ্রে জীবনানন্দের উদাত্ত কবিতা। চরিত্রে তিনি পাশের বাড়ির মেয়েটির মতো সাধারণ হলেও শিল্পচর্চা, শিক্ষা ও নিজস্বতায় হয়ে উঠেছেন অসামান্যা।

সুমন ঘোষ খুঁজে বেড়ান আশির ফেলে আসা সেই কলকাতাকে। অপর্ণা সেনকে সঙ্গী করে ফিরে যান মিস ভায়োলেটের সেই বাড়িতে, যে বাড়িতে একসময় পরিচালক জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন অপর্ণা। শুধু ৩৬ চৌরঙ্গী লেন নয়, ফিরে গিয়েছেন ‘পারমিতার একদিন’-এ ব্যবহৃত সেই বনেদি বাড়িতে।
৩০তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের প্রথম দিন শিশির মঞ্চে প্রদর্শিত হল সুমন ঘোষ (Suman Ghosh) নির্মিত তথ্যচিত্র – পরমা আ জার্নি উইথ অপর্ণা সেন (Parama A Journey with Aparna Sen)। ঘুরেফিরে আসছিল সেই আশির দশক থেকে অপর্ণা সেন নির্মিত একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্রের মন্তাজ। সুচিত্রা সেনের মতো ডাকসাইটে অভিনেত্রী হয়েই আজীবন থেকে যেতে পারতেন অপর্ণা সেন, সে প্রতিভাও তাঁর ছিল; তবে শুধুমাত্র অভিনয় জীবনে নিজেকে আবদ্ধ না রেখে নির্মাণ করেছেন ভারতের অন্যতম নারীবাদী গুরুত্বপূর্ণ সব ছবি। কখনও জনসভায় পাঠ করেছেন জীবনানন্দ, শক্তি বা নবারুণের কবিতা; কখনও প্রতিবাদে সামিল হয়ে আমজনতার সঙ্গে রাস্তায় হেঁটেছেন, স্লোগান তুলেছেন; আবার কখনও মব লিঞ্চিং-এর বিরুদ্ধে চিঠি লিখেছেন প্রধানমন্ত্রীকে। অপর্ণা সেন পিছু হটেননি। নেতৃত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন তিনি শুধুমাত্র টালিগঞ্জের শখের পরিচালক নন, এই বৃহত্তর সমাজের প্রতি তাঁর একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। স্বভাবিক ভাবেই বিতর্ক হয়েছে তাঁর নিত্যকালের সঙ্গী।
সুমন ঘোষের এই তথ্যচিত্রে নানান ঘটনা পরম্পরায় উঠে এসেছে অপর্ণা সেনের ব্যক্তি জীবন ও কর্ম জীবনের নানা বাঁক, নানা বদল। তথ্যচিত্র শুরু হয় ১৯৮১ সালে নির্মিত অপর্ণা সেনের ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর একটি দৃশ্য দিয়ে। আশির দশকের সেই কলকাতা কত বদলে গেল। একজন অ্যাংলো ইন্ডিয়ানের একাকিত্ব যেন শত-সহস্র মূর্ছনায় ফিরে ফিরে আসছে একালের কলকাতায়। তাই সুমন ঘোষ খুঁজে বেড়ান আশির ফেলে আসা সেই কলকাতাকে। অপর্ণা সেনকে সঙ্গী করে ফিরে যান মিস ভায়োলেটের সেই বাড়িতে, যে বাড়িতে একসময় পরিচালক জীবনের যাত্রা শুরু করেছিলেন অপর্ণা। শুধু ৩৬ চৌরঙ্গী লেন নয়, ফিরে গিয়েছেন ‘পারমিতার একদিন’-এ ব্যবহৃত সেই বনেদি বাড়িতে। দোতলার সবুজ কাচের জানলা ছুঁয়ে অপর্ণা তাঁর সৃষ্ট চরিত্রদের যেন নতুন করে আবিষ্কার করছেন। ‘পরমা’ ছবিতে ব্যবহৃত কলকাতার আরেক বনেদিবাড়ির ঠাকুর দালান দেখে থমকে গিয়েছেন কিছুক্ষণ। আর তীব্রভাবে ফিরে এসেছে ওই একই ছবির সংলাপ, যেখানে অপর্ণা একটা সিগারেট টানতে টানতে রাখি গুলজার (পরমা)-কে বলছেন, মেয়ে বলে কি নিজস্ব মতামত থাকবে না? যাকে ভালোলাগছে না, কেন জোর করে তার সঙ্গেই আজীবন কাটাতে হবে?
আজ এ সংলাপ শুনতে মামুলি লাগলেও মাথায় রাখতে হবে, আশির দশকে একজন মহিলার মুখে এমন কথা সমাজের চোখে ছিল বড্ড বেমানান। সেই থেকেই একজন সাধারণ শ্রমজীবী নারীর আপোষহীন সংগ্রাম বারবার উঠে এসেছে অপর্ণা সেনের ছবিতে। এই তথ্যচিত্রের একটি জায়গায় পরিচালক সুমন ঘোষের সঙ্গে কথোপকথনে অপর্ণা বলেন, ফেমিনিস্ট না হয়ে আন্দোলন হিউম্যানিস্ট হতে পারত। বারবার তাই নারীবাদকে নিজের মতো করে ভেঙেছেন, ব্যাখ্যা করেছেন, কখনও নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেন।

প্রামাণ্যচিত্র তথ্যের ভারে ম্লান হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। সুমন ঘোষ এবং তাঁর সহযোগীরা অত্যন্ত দক্ষ হাতে তা সামলেছেন। পরমা আ জার্নি উইথ অপর্ণা সেন-এর শক্তিশালী জায়গা এর “rawness”। চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনায় সুস্পষ্ট হয়েছে তার ছাপ।
ঠিক সুচিত্রা সেন নন, কিন্তু সুচিত্রা সেনের মতোই একটা আলাদা ধারা তৈরি করেছিলেন অপর্ণা। ‘বসন্ত বিলাপ’ ছবিতে পশ্চিমি পোশাক পরে এক উজ্জ্বল তরুণী নেচে উঠছেন, গাইছেন, “আমি মিস ক্যালকাটা নাইনটিন সেভেনটি সিক্স, এখনও তো কেউ জানে না আমার স্ট্যাটিস্টিক্স” – তালে তালে নেচে উঠেছিল বহু পুরুষ-মহিলা। পশ্চিমি পোশাকে এমন স্বতঃস্ফূর্ত নাচ সেযুগের বাংলা ছবিতে নতুন একটা অধ্যায়। পাশাপাশি তিনি সত্যজিতের ‘তিন কন্যা’ ছবির সমাপ্তি। ‘জন অরণ্য’, ‘পিকু’ ও ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’-র চরিত্রাভিনেত্রী তিনি। মৃণাল সেনের ‘আকাশকুসুম’, ‘একদিন আচানক’, ‘মহাপৃথিবী’-র অপর্ণা তিনি। তিনি উত্তমকুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের নায়িকাও।
সুদক্ষ হাতে এই তথ্যচিত্রটি বানিয়েছেন পরিচালক সুমন ঘোষ। কঙ্কনা সেনশর্মা, কল্যাণ রায়, গৌতম ঘোষ, রাহুল বসু, শাবানা আজমি, শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়, সোহাগ সেন, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, রবিরঞ্জন মৈত্র, অঞ্জন দত্ত, কৌশিক সেনের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা অপর্ণা সেনকে তাঁদের মতো করে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেছেন এই তথ্যচিত্রে।
অপর্ণা সেনের রাজনীতি কোন দিকে? নিজেকে লেফট লিবারেল বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন তিনি। বলেছেন পার্টি ভিত্তিক রাজনীতি নয়, তিনি বিশ্বাস করেন ইস্যু ভিত্তিক রাজনীতিতে। আবার ‘সানন্দা’ ম্যাগাজিন সম্পাদনার সময় মেয়েদের না বলতে পারা কথাগুলো অবলীলায় বলে গিয়েছেন নিজের মতো করে। এসবই উঠে এসেছে তথ্যচিত্রটিতে।
‘পারমিতার একদিন’-এ অপর্ণা সেন দেখিয়েছেন শাশুড়ি-বৌমার চিরন্তন বন্ধুত্ব। দুটো আলাদা আলাদা প্রজন্ম নয়, এ যেন অসমবয়সের বন্ধুত্ব। অচেতনে কেউ কাঁধে হাত রাখছে, চুলে বিনুনি করে দিচ্ছে, ব্লাউজ খুলে কখনও পিঠে তেল মালিশ করে দিচ্ছে, একসঙ্গে স্নান করছে। এই অপর্ণাই আবার ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এ আরও সোচ্চার হচ্ছেন। ভারতের একমাত্র সত্য যে মানবতাবাদ, তা এই ছবিতে প্রকট হয়ে উঠছে। সেখানে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যে রাজনীতি, তাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছিলেন। অন্যদিকে ‘সোনাটা’ ছবিতে তিন বন্ধুর গল্প বলতে গিয়ে দেখিয়েছেন কর্পোরেট মেট্রো সিটির রঙে তাদের জীবন কতটা রঙিন আর কতটা অন্ধকারময়। ‘দ্য রেপিস্ট’ ছবিতে উঠে এসেছে ধর্ষণের মতো সামাজিক ব্যাধির অন্ধরকারতম অধ্যায়। ধর্ষণের রাজনীতি আজকের নয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ এক সামাজিক ক্ষয়। সবসময়ই নিজের মতো করে গল্প বলতে চেয়েছেন অপর্ণা। তাঁর চলচ্চিত্রের ভাষ্যে আমরা পেয়েছি মেয়েদের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থান। স্বাধীন ভারতের মেয়েদের তিনি নানাভাবে ভেঙেছেন গড়েছেন। যেমন ‘৩৬ চৌরঙ্গী লেন’-এর ভায়োলেট স্টোনহ্যাম বা নন্দিতা রায়, ‘পরমা’-‘পারমিতা’ কিংবা ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আইয়ার’-এর মীনাক্ষি আইয়ার, ‘দ্য জাপানিজ ওয়াইফ’-এ সন্ধ্যা ও মিয়াগে, ‘সোনাটা’-র তিন অবিবাহিতা মহিলা প্রত্যেকেই একা। কিন্তু অসহায় নন। তাঁদের দিয়ে লড়িয়েছেন সাহসী অপর্ণা।

প্রামাণ্যচিত্র তথ্যের ভারে ম্লান হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। সুমন ঘোষ এবং তাঁর সহযোগীরা অত্যন্ত দক্ষ হাতে তা সামলেছেন। পরমা আ জার্নি উইথ অপর্ণা সেন-এর শক্তিশালী জায়গা এর “rawness”। চিত্রগ্রহণ, সম্পাদনায় সুস্পষ্ট হয়েছে তার ছাপ। নিজের ছবিগুলি নিয়ে স্মৃতিরোমন্থন করার জায়গাগুলি যেভাবে সম্পাদনা করা হয়েছে তা অভাবনীয়। বিশেষ আলাদা কিছু জোর করে আরোপ করা হয়নি, তাই স্মৃতিরোমন্থনে আমরাও ঢুকে পড়েছি অবলীলায়। ফিরে গিয়েছি আশির দশকের মধ্যরাতের ভিক্টোরিয়ায়, বনেদিবাড়ির পলেস্তারা খসা দেওয়ালের গায়ে, রংচটা সিঁড়ি বেয়ে আমরাও ফিরে গিয়েছি চল্লিশ বছর আগের সেই সেটে।
এই তথ্যচিত্রে সংগীত পরিচালনার কাজ করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (International Film Festival Rotterdam) হয়েছে এ ছবির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার। মায়া লীলা ফিল্মস প্রযোজিত এ ছবির চিত্রগ্রহণ করেছেন সৌমিক হালদার, সম্পাদনায় শঙ্খজিৎ বিশ্বাস, সংগীত পরিচালনা করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র, সাউন্ড ডিজাইনার অমিত দত্ত। উল্লেখ্য, এ তথ্যচিত্র শেষও হয় ৩৬ চৌরঙ্গী লেনের দৃশ্য দিয়ে। মধ্যরাতের কলকাতার ফুটপাথ ঘেঁষে হেঁটে যাচ্ছেন ভায়োলেট স্টোনহ্যাম, সঙ্গী একটি কুকুর। শেষ থেকে শুরুর যাত্রা। রীনা সেন ঠিক যেন ফিরে যেতে চাইছেন ফেলে আসা নিয়ন আলোর সেই কলকাতায়। শুরু থেকেই আবার একটা শুরু।
_____
৩ জানুয়ারি, ২০২৫ বড়োপর্দায় মুক্তি পাবে এই তথ্যচিত্রটি

