‘ঘটিয়া’ বাংলা ছবি, কলকাতা, ঋতুপর্ণ আর দেশের কুয়্যার-কণ্ঠ : খোলামনে পরিচালক ওনির

নির (অনির্বাণ ধর – Onir) সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম উজ্জ্বল ও গুরুত্বপূর্ণ ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক। কর্মসূত্রে মুম্বইয়ে থাকলেও বাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক অচ্ছেদ্য। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, তারপর উচ্চশিক্ষার জন্য বার্লিনে চলে যাওয়া। কিন্তু দেশ ছাড়েননি। ভারতে ফিরে এসে নির্মাণ করতে থাকেন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র। তাঁর ছবিগুলির মধ্যে অন্যতম : মাই ব্রাদার নিখিল (২০০৫), আই অ্যাম (২০১১), পাইন কোন (২০২৪)। ২০১২ সালে ‘আই অ্যাম’ ছবির জন্য পান জাতীয় পুরস্কার। সম্প্রতি বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ওনির জানিয়েছেন দেশ ও দশের নানান কথা। প্রশ্ন করছেন ও শুনছেন বঙ্গদর্শনের এক্সকিউটিভ এডিটর সুমন সাধু।


_______

আপনার জন্ম ও শৈশব ভুটানের থিম্পুতে। তারপর পড়াশোনার সূত্রে কলকাতায় আসেন। ভুটানের ওই জীবন ছেড়ে কলকাতার মতো ব্যস্ত শহরে নিজেকে মানিয়ে নিতে সমস্যা হত না?

ওনির: ভুটান থেকে যখন কলকাতায় এলাম, প্রথম তখন নানান সমস্যায় পড়লাম। আমি একেবারেই শহুরে ছিলাম না। বাসে চড়তে পারতাম না বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতাম। কলকাতায় তখনও খুব গরম, তারমধ্যে ভীষণ ভাবে কারেন্ট যেত। রাত্রে হাতপাখা নিয়ে ঘুমাতে যেতাম। এমন অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল যে, ঘুমানোর মধ্যেও হাতটা অটোমেটিক্যালি চলত। তখন সেলিমপুর রোডের একটা বাড়িতে ভাড়া থাকতাম। ভুটানের ওই পরিবেশ ছেড়ে কলকাতায় থাকতে একেবারেই ভালো লাগত না। কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন কিছুদিন পর আস্তে আস্তে কলকাতাকে ভালোবেসে ফেললাম। সেই ভালোবাসা আজও আছে।

মুম্বাই আমার কুয়্যার সত্তা যতখানি সহজে গ্রহণ করতে পেরেছে, হয়তো কলকাতা সেটা এখনও পারেনি। কিন্তু আমি আশাবাদী। কখনও নিশ্চয় বাংলা ছবি বানানোর চেষ্টা করব।

অনির্বাণ ধর থেকে কীভাবে ওনির হয়ে উঠলেন? এই নাম পরিবর্তনের কারণ?

ওনির: মুম্বাইয়ে যখন চলে গেলাম, একটু একটু করে কাজ শুরু করলাম, তখন বন্ধুরা অনেকেই অনির্বাণ থেকে ‘ওনির’ বলতে শুরু করল, হয়তো উচ্চারণের সমস্যার জন্য। আমারও বেশ ইউনিক লাগলো নামটা। তাই নিজের নাম নিজেই বদলে ফেললাম পুরোপুরি।

অনির্বাণ ধর নামে আপনি কখনও ছবি বানিয়েছেন?

ওনির: না।

আপনি দীর্ঘদিন কলকাতায় থেকেছেন। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন। এখনও কলকাতায় নিয়মিত আসেন। কিন্তু বাংলা ছবি এখনও বানালেন না কেন?

ওনির: উচ্চশিক্ষার জন্য যখন জার্মানিতে গেলাম, তখন মনে হত আমি কলকাতাতেই আবার ফিরে যাব আর ওখানেই ছবি বানাব। কিন্তু সমস্যাটা হল আমাকে তখন বয়সের তুলনায় খুবই তরুণ লাগত। আর বাঙালিদের মধ্যে চিরকাল ‘দাদাগিরি’ করার প্রবণতা আছে। নিজের কথা যে বিভিন্ন মানুষের কাছে পৌঁছে দেব, সেটা সম্ভবই হত না, কেউ পাত্তা দিত না। কিন্তু যখন মুম্বাইয়ে গেলাম কাজ করতে তখন সবচেয়ে যেটা ভালোলাগলো, ওখানে এসব কিছুই দেখা হত না। তোমার বয়স কত, কোত্থেকে এসেছ এসবের থেকেও প্রাধান্য পেত তোমার প্রতিভা।

আমার মা এখনও জিজ্ঞাসা করেন, কেন বাংলা ছবি করলি না! কিন্তু খেয়াল করে দ্যাখো সুমন, ছবি না করলেও কলকাতার সঙ্গে একটা সম্পর্ক কিন্তু আছেই। আমার বেশ কয়েকটা ছবি কলকাতায় শ্যুটিং করা। একেবারেই যে বাংলা ছবি বানানোর চেষ্টা করিনি তা নয়। সমস্যাটা হচ্ছে বাংলা ইন্ডাস্ট্রির প্রায় কারোর সঙ্গেই আমার পরিচয় নেই। আমি তো কাউকে নিজে থেকে অ্যাপ্রোচ করতে পারি না, আর কোনোদিন কলকাতা থেকেও কোনো অ্যাপ্রোচ আসেনি। তাছাড়া পৃথিবীর সব জায়গায় আমার ছবি দেখানো হয়, কলকাতায় কি তেমনভাবে দেখানো হয়? এমনকি কলকাতার কুয়্যার ফিল্ম ফেস্টিভ্যালগুলোও আমার ছবি দেখাতে চায় না। হয়তো আমায় পছন্দ করেন না তাঁরা। মুম্বাই আমার কুয়্যার সত্তা যতখানি সহজে গ্রহণ করতে পেরেছে, হয়তো কলকাতা সেটা এখনও পারেনি। কিন্তু আমি আশাবাদী। কখনও নিশ্চয় বাংলা ছবি বানানোর চেষ্টা করব।

সম্প্রতি অনুরাগ কাশ্যপ বাংলা ছবিকে ‘ঘটিয়া’ বলেছেন। আপনারও কি তাই মত?

ওনির: না, একেবারেই সহমত নই। একটা সময় বাংলা ছবিই ছিল ভারত সেরা। সেটা আর্টহাউস হোক বা কমার্শিয়াল ছবি। সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটকের ছবি দেখে আমরা বড়ো হয়েছি। রীনাদি (অপর্ণা সেন), ঋতু (ঋতুপর্ণ ঘোষ) আমার খুব প্রিয় পরিচালক। এঁদের যদি বাদও দিই, আমার সময়ের পরিচালকদের মধ্যে কৌশিক গাঙ্গুলি, পরমব্রত চ্যাটার্জি এরকম বেশ কয়েকজনের কাজ ভালো লাগে। একটা বড়ো সময় ধরে বাংলা ছবি শুধু রিমেক করে গেছে। আর সেখানেই ক্রমশ তার জৌলুষ ম্লান হয়ে গেছে। তবে এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, মালয়ালাম ছবি যেকোনো ভাষার থেকেই সেরা।

তুমি খেয়াল করে দ্যাখো, বলিউডে সুজিত সরকার, অনুরাগ বসু, দিবাকর ব্যানার্জি, সুজয় ঘোষ, কঙ্কনা সেন শর্মা, কিছু ক্ষেত্রে অপর্ণা সেন এরকম বেশ কয়েকজন পরিচালক রাজত্ব করছেন। এবং এঁদের আসল পরিচয় এঁরা বাঙালি। বাংলা ছবির সেই স্বর্ণযুগ হয়তো আর নেই, কিন্তু আমার বিশ্বাস বাংলা ছবি আবার সেই সময়টা ফিরে পাবে। অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট পরিচালকরা বাংলায় দারুণ কাজ করছেন, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

সমকামী চরিত্রে সমকামীদেরই নেওয়া উচিত বলে আপনার মনে হয়? তাতে সমকামী অভিনেতার গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়তে পারে? ঠিক যেমন ট্রান্সজেন্ডারের চরিত্রে একজন ট্রান্সজেন্ডারকেই নির্বাচন?

ওনির: এটা সবক্ষেত্রে জরুরি নয়। কিন্তু বিষমকামী কোনো অভিনেতা বা অভিনেত্রী অনেকসময় সমকামী বা তৃতীয়লিঙ্গ চরিত্রে কমফোর্টেবল হন না। একজন সমকামীর অনুভবও বাস্তবিক হয়ে ওঠে না অনেকক্ষেত্রে, একটা জড়তা কাজ করে। যদি তিনি সবদিক থেকেই চরিত্রটা এঞ্জয় করেন তাহলে সমস্যা হবার কথা না। পাশাপাশি এটাও ঠিক, কারোর সেক্সুয়ালিটি গে বা লেসবিয়ান হলেই তো তিনি ভালো অভিনেতা নাও হতে পারেন। সুতরাং আমাকে কাস্ট করার সময় অনেকগুলো দিক ভাবতে হয়। ভালো অভিনয়ও করবেন আবার কোনোরকম ফোবিয়া বা ট্যাবু থাকবে না। কিন্তু আমি বলব, একজন তৃতীয়লিঙ্গের চরিত্রে তাঁদেরই কাস্ট করা উচিত। কারণ স্ট্রেট চরিত্রে তাঁরা কখনও সুযোগ পাবেন না। তাহলে তাঁদের জায়গাটা অন্য কাউকে দেওয়া হবে কেন? ভারতে দুর্দান্ত সব ট্রান্স অভিনেতারা রয়েছেন, যাঁরা যোগ্য সম্মান বা সুযোগ পান না।

এলজিবিটিকিউআইএ+ কমিউনিটির মানুষরা এখনও প্রকাশ্যে আসতে ভয় পান। সেক্ষেত্রে আপনার ছবি অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা। ৩৭৭ ধারা পাশ হওয়ার এত বছর পর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?

ওনির: আশা আছে বলেই তো কাজ করে যাচ্ছি। ছবি বানাবার পর বারবার ভয় করে যে সেন্সর বোর্ড কী বলবে। তারপরেও তো ছবি বানিয়ে যাচ্ছি, আর বারবার কুয়্যার ছবিই বানাচ্ছি। আগের থেকে আমরা অনেকটাই উন্মুক্ত হতে পেরেছি। আমাদের লড়াই আজ অনেকাংশে সফল। সিনেমা, সাহিত্য, আর্টের মাধ্যমে অনেক মানুষই নিজেকে চিনতে পারেন। কুয়্যার মানুষদের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমি আশাবাদী। পৃথিবীটা একদিন আমাদের হবেই।

একটা বড়ো সময় ধরে বাংলা ছবি শুধু রিমেক করে গেছে। আর সেখানেই ক্রমশ তার জৌলুষ ম্লান হয়ে গেছে। তবে এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলি, মালয়ালাম ছবি যেকোনো ভাষার থেকেই সেরা।

আপনি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র। এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে নানাবিধ বিতর্ক চলতে থাকে বছরভর। যাদবপুর আপনাকে কীভাবে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে?

ওনির: যাদবপুর এমন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানে সিলেবাস ভিত্তিক পড়াশোনার পাশাপাশি আরও অনেক বিষয়কে সমান ভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফিল্ম ক্লাব, ফটোগ্রাফি ক্লাব, ড্রামা ক্লাব সবকিছুই আছে। আমি যখন পড়তাম তখন জাপানি, ইরানি, কোরিয়ান নানান বিখ্যাত ছবি নিয়ে আসতাম আর্কাইভ থেকে। দেখতাম, দেখাতাম এবং আলোচনা করতাম। সেইসঙ্গে আমার জীবনে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছেন আমার সেই সময়কার অধ্যাপকরা, যেমন: শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভা চট্টোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন। সেই সময় আমি খুব লাজুক ছিলাম। ওই উন্মুক্ত পরিবেশ আমাকে কথা বলতে শিখিয়েছে। নিজের স্বপ্নগুলো দেখতে শিখিয়েছে। তাছাড়া তুলনামূলক সাহিত্য তো শুধুমাত্র সাহিত্য নয়, সেখানে শিল্পের সমস্ত মাধ্যমই রয়েছে। এগুলোই তো একজন মানুষের বোধটাকে তৈরি করে।

তুমি জানো, যাদবপুরের আগে আমি আশুতোষ কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম ইংরেজি বিভাগে! একমাস ছিলামও। তারপর আর পারলাম না। আমি কখনও গোলাপি টি-শার্ট পরে গেলে সবাই হাসাহাসি করত, আড়চোখে দেখত। এমনকি এটার জন্য শুনতে হয়েছে, আমার বাবা-মা নাকি সঠিক শিক্ষা দেননি, তাই এরকম রুচি। তখনকার বাম ছাত্র সংগঠন বলত, তুমি কি ড্রাগ অ্যাডিক্টেড যে ছেঁড়া জিনস পরে এসেছে? এইভাবে বিচার করা হত। কিন্তু যাদবপুর কখনও জাজমেন্টাল নয়, অন্তত আমার সেক্সুয়ালিটি আমার চিন্তাভাবনাকে সবসময় সম্মান করেছে এই প্রতিষ্ঠান।

আপনার আত্মজীবনী ‘আই অ্যাম ওনির অ্যান্ড আই অ্যাম গে’। সাধারণত মধ্য বয়সে আত্মজীবনী লেখা খুব একটা দেখা যায় না। আপনি এই বয়সে কেন ভাবলেন?

ওনির: আমি বুড়ো হয়ে গিয়েছি (হাসি)। যাইহোক, পেঙ্গুইন আমাকে প্রস্তাবটা দেয়। আমি তখন ভাবিওনি যে কখনও আত্মজীবনী লিখব। তখন কোভিড শুরু হয়েছে। আমরা সকলেই গৃহবন্দি। তখন ভাবলাম শুরু করা যেতেই পারে। পুরোটাই আমার দিদির উৎসাহে সম্ভব হয়েছে। দিদি বলেছিল, আমার জার্নিটা তরুণ প্রজন্মের অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণা হতে পারে। পরে যখন বইটা প্রকাশ পেল, মানুষের কাছে পৌঁছাল, দেখলাম আমার ‘গে’ সত্তাটাকে কত মানুষ উদযাপন করছেন। খুব ভালো লেগেছিল।

আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে এলজিবিটিকিউ+ মানুষদের নিয়ে এত কথাবার্তা হত না। মানসিকতাও ছিল অনেকখানি পিছিয়ে। সেই সময় আপনার পরিবার কীভাবে আপনাকে গ্রহণ করেছিলেন?

ওনির: দ্যাখো সুমন, আমি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা একজন মানুষ। তারপরেও বলব আমাকে নিয়ে পরিবারে কোনো সমস্যা হয়নি। বাবার বয়স এখন ৮৫, মায়েরও অনেক বয়স হয়েছে। দিদি, ভাই সকলেই খুব ছোটো থেকে আমার দারুণ বন্ধু। ভাই আর আমি একই স্কুলে পড়তাম। হঠাৎ আমি নিজেকে গে হিসেবে বুঝতে পারি, আমার ভাই স্ট্রেট। বাবা-মা কখনও এই নিয়ে প্রশ্ন করেননি। কিন্তু আমার বিষয়ে সবটাই জানতেন। ২০১৮ সালে যখন ৩৭৭ ধারা পাশ হল, বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। এখন ভাই ব্যাঙ্গালোরে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক। ওখানে আমার ছবির স্ক্রিনিংও হয়েছে। ভাই, আমি, ওখানকার ছাত্ররা সবাই খোলামেলা কথা বলেছি স্ক্রিনিংয়ের পর। কারোর দিক থেকেই কোনো সমস্যা হয়নি। বলতে পারো, আমার ভাগ্য খুবই ভালো যে এরকম একটা পরিবার পেয়েছি।

আমাকে কলকাতার এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনি সবসময় কুয়্যার ছবি বানান কেন! আমি বলেছিলাম, এটা আপনার সমস্যা। একজন বিষমকামী পরিচালককে জিজ্ঞাসা করা হয় না যে, কেন আপনি বারবার স্ট্রেট রিলেশনশিপের কথা বলছেন! তাহলে আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করা হবে? ভালোবাসা তো ভালোবাসাই, সেখানে গে, স্ট্রেট বিচার কেন এত লড়াইয়ের পর? 

শোনা যায়, মহাভারতের শিখণ্ডী চরিত্রটিকে নিয়ে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছবি বানাতে চেয়েছিলেন, যে ছবি আপনার পরিচালনা করার কথা ছিল। কী হল তারপর?

ওনির: তার কিছু মাস পর ঋতুপর্ণ মারা গেল। ঋতু চেয়েছিল এখানে অভিনয় করতে। আমাদের অনেক দূর কথাও এগিয়েছিল। ঋতু ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ দেখে খুব প্রশংসা করেছিল। এবং চেয়েছিল একসঙ্গে একটা কাজ করার। মাই ব্রাদার নিখিল আন্তর্জাতিক স্তরেও ভীষণভাবে সমাদৃত হয়েছিল। ঋতু তখন সব আর্টিকেল, ইন্টারভিউগুলো পড়ছে। আমি মুম্বাইয়ে আর ঋতু কলকাতায়, তাই ঘনঘন দেখা হওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তারপর ঋতু টেলিভিশন শো ‘ঘোষ অ্যান্ড কোম্পানি’-তে আমায় ডেকেছিল একটা পর্বে। সেদিন অনেক গল্প করেছিলাম আমরা। ঋতু আমার একজন সহকর্মীর চেয়েও ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছিল।

একজন বিষমকামী পরিচালককে জিজ্ঞাসা করা হয় না যে, কেন আপনি বারবার স্ট্রেট রিলেশনশিপের কথা বলছেন! তাহলে আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করা হবে যে, কেন বারবার কুয়্যার ছবি বানাচ্ছেন? ভালোবাসা তো ভালোবাসাই।

প্রায় কুড়ি বছর আগে আপনি ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ বানিয়েছিলেন। এখনও এই ছবি নিয়ে মানুষ কথা বলে, সেলিব্রেট করে। সময়ের থেকে অনেকখানি এগিয়ে থাকা ছবি বলেই কি এটা সম্ভব হয়েছে?

ওনির: আসলে সমাজটা পিছিয়ে, সেটার এগনো বেশি জরুরি৷ ১৯৯৬ সালে দীপা মেহতা ‘ফায়ার’ বানিয়েছিলেন। ভারতে তখনও সে অর্থে সমপ্রেমীদের নিয়ে ছবি ছিল না। তার অনেক বছর পর ২০০৫ সালে ‘মাই ব্রাদার নিখিল’ বানালাম। দ্যাখো, আমরা পৃথিবীর জন্মলগ্ন থেকেই ছিলাম, কিন্তু সমাজব্যবস্থা আমাদের প্রকাশ্যে আসতে দেয়নি এতদিন। আমার সাম্প্রতিক ছবি ‘পাইন কোন’ দেখে লোকে হয়তো সময়ের থেকে পিছিয়ে থাকা ছবি বা বোরিং বলবে। কিন্তু কেন? ঘৃণা, দাঙ্গা বা প্রতিহিংসা তো আমি দেখাচ্ছি না, দেখাচ্ছি ভালোবাসার গল্প। আর ভালোবাসা যেকোনো সময়ের জন্যই সত্যি। ভালোবাসার মতো উদার আর কীই বা হতে পারে। ভবিষ্যতেও বারবার এই ধরনের গল্প বলে যাব। ভালোবাসা কখনও বোরিং হয় নাকি!

‘পাইন কোন’ ছবির গল্পের সঙ্গে কি আপনার জীবনের কোনও মিল রয়েছে?

ওনির: হ্যাঁ, অনেকটাই। ২০২২ সালে আমার আত্মজীবনী নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। তখনই চিত্রনাট্য নিয়ে একটা নিষেধাজ্ঞা আসে। তখন মনে হল, আমার জীবনের কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে একটা ছবি তৈরি করা যেতেই পারে।

ছবির পুরোটাই মোবাইল ফোনে শুটিং করলেন কেন?

ওনির: আমি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমার অংশ। তাই নিজের মতো কাজ করায় বিশ্বাসী। তাছাড়া, স্টিভেন স্পিলবার্গ, স্টিভেন সোডরবার্গের মতো বিশ্বের জনপ্রিয় পরিচালকেরাও এখন মোবাইলে ছবি তৈরি করছেন। সেটা আমাকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাই মনে হল, মোবাইলেই চেষ্টা করা যাক।

জাতীয় বা আন্তর্জাতিক স্তরে কোন পরিচালকদের কাজ আপনাকে উদ্বুদ্ধ করে?

ওনির: পেদ্রো অ্যালমোদোবার, লুই বুনুয়েল, জঁ লুক গোদার, আন্দ্রেই তারকোভস্কি। তাছাড়া ইরানিয়ান ছবি খুব ভালোবাসি। ভারতীয় পরিচালকদের মধ্যে প্রিয় শ্যাম বেনেগাল, ঋত্বিক ঘটক।

_________ 
পরিচালক ওনিরের সাক্ষাৎকার | Interview with director Onir

Written by