বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য: নদিয়া জেলার চোখ জুড়নো বন-বিনোদন

শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ঘণ্টা চারেকের পথ। স্টেশন থেকেই মিলবে টোটো, অটো, রিক্সা। মিনিট দশ পরে পোঁছে যাওয়া যাবে গন্তব্যে। চারিদিকে ঘন সবুজ বনানী। সোঁদা মাটির গন্ধে কেমন যেন নেশা লেগে যায়। জায়গাটি নদিয়া জেলার অন্তর্গত বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য। একেবারে জঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝেই এখানে রয়েছে জঙ্গলবাসীদের সঙ্গে মোলাকাতের সুযোগ। সপ্তাহান্তে ছুটি কাটাতে তাই কম খরচে ঘুরে আসতেই পারেন বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য থেকে। বন্যপ্রাণী এবং নাম না জানা হরেক প্রজাতির গাছের মাঝে কাটিয়ে আসুন একান্তে নিরিবিলি একমুঠো অবসর। এখানে শাল, সেগুন, পিয়াল, তমাল, মেহগনি, অর্জুন আর নাগকেশর গাছ আর হরেক প্রজাতির গুল্ম মিলে সবুজ করে দেবে আপনার অবসরযাপন। জানা-অজানা হরেক প্রজাতির পাখির ডাক ভুলিয়ে দেবে আপনার শহুরে সত্তাকে।

‘বেথুয়া’ একটি শাকের নাম, আর ডহরী মানে জলাশয়। এই শাকের জলাভূমি ছিল বেথুয়াডহরি। নামকরণ হয় সেখান থেকেই। জঙ্গলের মধ্যে আছে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের নামাঙ্কিত মিউজিয়াম। প্রাণী সংরক্ষণ সম্বন্ধিত অনেক তথ্য পাওয়া যায় সেখানে। অভয়ারণ্যে ঢোকার মুখেই রয়েছে আরও একটি চমক। তা হল, ‘নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার’। যেখানে সযত্নে রাখা আছে নানা প্রজাতির প্রজাপতি থেকে পাখি, সাপ, বাঘ, সিংহ প্রভৃতি পশুপাখির রঙিন ছবি। নজরকাড়ে ছবির সুন্দর ধারাবিবরণী।

অভয়ারণ্যের নিয়মাবলী

রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক একটি ফেসবুক বিবৃতিতে বলেছেন, বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য বাংলার গর্ব। তাই পরিকাঠামোর উন্নয়নে বছর কয়েক আগেই রাজ্যের তরফে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়।

বিশেষত বিপন্ন পশু, পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য প্রায় চার দশক আগে নদিয়ার নাকাশিপাড়ায় তৈরি হয়েছিল বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য। ১৬৭ হেক্টর সবুজ এলাকা জুড়ে এখানে সোনাজঙ্ঘা, চিতল হরিণ, ময়ূর, মুনিয়া, চন্দনাদের রাজত্ব। অরণ্যে ঢুকলে বোঝা যায়, এখানকার বাসিন্দাদের তালিকাটা আরও লম্বা। পাইথন, কচ্ছপ, ঘড়িয়াল- মিলেমিশে রয়েছে সবাই। সুন্দরবনের আয়লার সময় বিপন্ন হয়ে পড়া বিরল প্রজাতির সারস সোনাজঙ্ঘাও আশ্রয় পেয়েছে এখানে। তবে দৈত্যাকৃতির পাইথন কিম্বা শান্ত চিতল হরিণীই বেথুয়াডহরির মূল আকর্ষণ।

বর্তমানে রাজ্য সরকারের তত্ত্বাবধানে আরও সেজে উঠেছে বেথুয়াডহরির বনাঞ্চল। সময়ের সঙ্গে তাই পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বেথুয়াডহরি। বর্তমানে শুধু আমাদের রাজ্য নয়, পাশাপাশি বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, আসাম ছাড়াও দিল্লি ও মুম্বই থেকেও বহুমানুষ আসছেন এই অভয়ারণ্য দেখতে। রাজ্য বনদপ্তরের ফেসবুক পেজ থেকে জানা যায়, করোনা পরবর্তীতে বহুদর্শক এখানে এসেছিলেন সবুজের টানে, যা গত তিন বছরের তুলনায় রেকর্ড।

বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্যে তোলা ময়ূরের ছবি 

১৯৫৮ সালে এই বিশাল বনভূমি প্রথম সরকারের অধীনে নথিভুক্ত হয়। যদিও একাধিক টানাপোড়েনের ফলে বেশ কয়েকবছর তার কোনও সংস্কার কাজ শুরু হয়নি এখানে। এরপর ১৯৮০ সালে একে সরকারিভাবে বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হয়ার পর থেকেই নতুন আঙ্গিকে সেজে ওঠে পশিমবঙ্গের অভয়ারণ্যগুলি। বেথুয়াডহরিও তার ব্যাতিক্রম নয়। উল্লেখ্য, গত কয়েকবছর আগে এক সরকারি সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, এই অভয়ারণ্যের গভীরে রয়েছে বহু দুষ্প্রাপ্য ভেষজ উদ্ভিদ। পরবর্তীকালে প্রতিবছরের অরণ্যসপ্তাহে আরও বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যায় জোর দিয়েছে বনবিভাগ।

 

রাজ্যের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক একটি ফেসবুক বিবৃতিতে বলেছেন, বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য বাংলার গর্ব। তাই পরিকাঠামোর উন্নয়নে বছর কয়েক আগেই রাজ্যের তরফে প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ করা হয়। তিনি আরও জানান, নার্সারি বিভাগে আধুনিক প্ল্যান্টেশন পদ্ধতিতে বিভিন্ন গাছের চারাকে কিভাবে তৈরি করা হয় এবং কীভাবে সমস্তুরকম পদ্ধতি মেনে পরিচর্যা করা হয় বন্যপ্রাণীদের সেগুলিও প্রত্যক্ষ করা সুযোগ রয়েছে এখানে।

বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্যে জঙ্গলের পথে

বর্তমানে নদিয়ার পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিয়েছে এই অভয়াণ্য। জানা গিয়েছে, গত ১ জানুয়ারি সাতশোর বেশি পর্যটক ভিড় করেছিলেন এখানে। ওই একদিনেই প্রায় এক লক্ষ টাকা প্রবেশ মূল্যের টিকিট বিক্রি হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে পর্যটন খাতে সরকারের আয়ও। বিশেষ করে শীতের মরশুমে ভিন জেলার পর্যটকদের আনাগোনা লেগেই থাকে। এখানে জঙ্গলের পথে নিশ্চুপে ঘুরতে ঘুরতে, মনের ক্যামেরায় আঁকা হতে থাকে ছবি। কোথাও অর্ধেক রোদ, কোথাও আবার ছায়া যেন বনপথের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। জঙ্গলের গন্ধ বুকে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অচিরেই হারিয়ে যেতে হয় গাছের ফাঁকে, ধূসর-সবুজ পথে। প্রজাপতি রঙ নিয়ে আসে পাখায় পাখায়, ঘিরে ধরে আচমকাই। ঠিক তখনই মনে হয় ফিরে না যাওয়াই ভালো। তবুও ফিরে যেতে হয়…

কীভাবে যাবেন?

রেলপথে শিয়ালদহ থেকে লালগোলাগামী ট্রেনে করে পৌঁছে যান বেথুয়াডহরি। এছাড়াও এসপ্ল্যানেড থেকে বাসে করে সরাসরি যাওয়া যায়। আর গাড়িতে হলে এন.এইচ ৩৪ হয়ে কৃষ্ণনগর হয়ে পৌঁছে যান বেথুয়াডহরি অভয়ারণ্য।

নেচার ইন্টারপ্রিটেশন সেন্টার

কোথায় থাকবেন?

ডব্লিউ.এস.এফডি-এর কটেজ আছে জঙ্গলের মধ্যেই। রয়েছে বেদুইন যাত্রীনিবাস। তবে ছুটির মরশুমে সমস্যা এড়াতে যাওয়ার আগে থেকে বুকিং করে যাওয়াই ভালো।

_____________

সূত্র – রাজ্য বনবিভাগ

Written by