
“যদি আজ মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করি, তখন আমি নন্দিনী। রাস্তায় দাঁড়িয়ে যখন প্রতিবাদ করি, তখনও নন্দিনী। আজ আমার গৃহ-পরিচারককে রোজা রাখার সময় না দিলে তিনি যদি প্রতিবাদ করেন, তখন তিনিও নন্দিনী। নন্দিনী আমার কাছে প্রতিবাদের রূপক, প্রতিরোধের স্বর!” — শতবর্ষে রক্তকরবী পরিচালনা করতে গিয়ে কেন ‘রক্তকরবী’-ই বেছে নিলেন, তার উত্তরে এমনটাই ব্যাখ্যা করলেন চৈতী ঘোষাল।
‘রক্তকরবী’ মঞ্চ প্রযোজনার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এক সময় তিনি বহুরূপীর প্রযোজনায়, তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনায় ‘ডাকঘর’-এ অমলের চরিত্রে অভিনয় করতেন। সেই যোগসূত্রেই একাডেমির উইংস-এ বসে দেখেছিলেন, শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী। সেই থেকে তাঁর শিল্পী সত্তায় রক্তকরবীর আভা মিশে। বেশ কিছু পরে আশির দশকের শেষে, আরব্ধ-র ব্যানারে, তৃপ্তি মিত্রের নির্দেশনাতেও তিনি নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

নবরূপে রক্তকরবীর মঞ্চসজ্জা
শতবর্ষে রক্তকরবী, রক্তকরবীতে নন্দিনী, চৈতী ঘোষাল, শম্ভু মিত্রের রক্তকরবী, রক্তকরবীর শেষ সংলাপ বিশু পাগলের, রক্তকরবী প্রকাশের শতবর্ষ, শতবর্ষে রক্তকরবীর প্রযোজনা
একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, ১৯৫৪ সালে বহুরূপীর ব্যানারে হওয়া যে রক্তকরবী, গ্রুপ থিয়েটার অভিনীত প্রথম রক্তকরবীর মর্যাদায় আসীন, যে রক্তকরবীতে নন্দিনী — তৃপ্তি মিত্রের কণ্ঠে, “আমাকে এত করে ডাকিস কেন কিশোর, আমি কি শুনতে পাইনে?” আজও নাট্যমোদী মানুষের মননে অমলিন, তার যোগ্য উত্তরসূরী হলেন চৈতী ঘোষাল।
এর অনেক পরে, তিনি ২০১০ সাল থেকে গৌতম হালদার-এর নির্দেশনায়, রক্তকরবীতে নন্দিনীর ভূমিকায় মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছেন বহুবার! সে স্মৃতিও দর্শক মননে উজ্জ্বল। এ-কথা বললে বোধহয় অত্যুক্তি হবেনা, সম্ভবত তৃপ্তি মিত্রের পর তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যিনি এতবার নন্দিনীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এহেন নন্দিনী, শতবর্ষে রক্তকরবী পরিচালনা করছেন, নতুন আঙ্গিকে। চৈতী ঘোষালের শিল্পী জীবনে থিয়েটার পরিচালনায় রক্তকরবী দিয়েই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল।
এখন ‘নতুন আঙ্গিক’ শুনলেই শিউরে ওঠার কথা। কারণ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ‘বাজারে’ নতুন কিছু করতে গিয়ে যে পরিমাণ অসভ্যতা হয়, সেখানে রবীন্দ্রনাথ এবং নতুন ভাবে শুনলে আঁতকে ওঠাই স্বাভাবিক। আসলে অনেক নির্মাতা ভুলে যান, রবীন্দ্রনাথ যা লিখেছেন সেটাই আধুনিক, আজ এবং একশো বছর পরেও! কিন্তু চৈতী ঘোষাল নির্দেশিত রক্তকরবীর মহড়া দেখে, এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, যোগ্য হাতেই রক্তকরবী একুশ-শতকে পরিচালিত হচ্ছে। যেখানে খোদার উপর খোদকারি নেই (অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ-এর লেখাকে আরও আধুনিক করার চেষ্টায় আপন মনের মাধুরী মেশানো নেই), পাশাপাশি মূল টেক্সট-এর প্রতি সৎ থেকে সম্পাদনার মাধ্যমে তাকে আরও সময়-উপযোগী করে নিয়েছেন, পরিচালক ও নাটকের অন্যান্য কলাকুশলীরা।

মহড়ার একটি দৃশ্যে চৈতী ঘোষাল ও বিশু পাগলের ভূমিকায় অমিত আচার্য
এই ‘সময়-উপযোগী’-র মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে অপরিবর্তিত রেখে, অভিনয়, মঞ্চভাবনা, আলো ও সংগীতে কলাকুশলীদের নিজস্ব প্রয়োগ। একটি ক্লাসিকের পুনঃনির্মাণে এই স্বাধীনতাই বোধহয় ক্লাসিককে যুগ-যুগান্ত ধরে আরও তীব্র ভাবে সমকালীন করে রাখে। সম্পূর্ণ টেক্সট অবিকৃত রেখে পরিচালক মূলত দুই জায়গায় সৃষ্টিশীল সম্পাদনা করেছেন। আমরা জানি, রক্তকরবীর সূচনা হয়, কিশোরের সঙ্গে নন্দিনীর সংলাপে, কিন্তু মহড়ায় দেখা গেল, সূচনা অংশে যক্ষপুরী ও তার বাসিন্দাদের একটি পরিচয় অংশ, যা মূলত মঞ্চ, আলো ও অভিনয়ের সম্মিলনে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক— এখনই এটা পড়ে, রাবীন্দ্রিক অচলায়তন গোষ্ঠীর তেড়ে আসার কথা। কিন্তু, আক্রমণের আগে একটি আগ্রহব্যঞ্জক বিষয় বইয়ের পাতা উল্টে দেখে নিন।
পরিশেষে নাটকের সমস্ত চরিত্ররা মঞ্চে একটি নির্দিষ্ট কম্পোজিশনে এসে উপস্থিত হন পরস্পরের হাতে-হাত রেখে। যেন যক্ষপুরীর এই লড়াইয়ের শেষে সকলে মিলেছেন মানব বন্ধনে। তাঁরা সকলেই নিজের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াইয়ে জিতে গেছেন।
রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশায় রক্তকরবী নিজে মঞ্চস্থ না করলেও, ১৯৩৪ সালে, দ্য টেগোর ড্রামাটিক গ্রুপ-এর আয়োজনে প্রথমবার মঞ্চস্থ হয়েছিল রক্তকরবী। এর পুরোভাগে ছিলেন ঠাকুর পরিবারের সদস্যরাই— যেমন বিশু পাগলের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই অভিনয় স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও দেখেছিলেন, অসুস্থ শরীরে শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় এসে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, একটি ভূমিকা, যা রবীন্দ্রনাথ স্বহস্তে সম্পাদনা করে দেন। এদিন রক্তকরবীর সূচনাংশ দেখে মনে হল, তা সেই ভূমিকারই নাট্যরূপ।

মহড়ায় চৈতী ঘোষাল ও অধ্যাপকের ভূমিকায় অশোক মজুমদার
পরিচালককে এ বিষয়ে প্রশ্ন করাতে, তিনি বললেন, এ তার সচেতন নির্মাণ, রক্তকরবী সম্পর্কিত ভূমিকা, নাট্যপরিচয় তাঁর কাছে বরাবর গুরুত্বপূর্ণ। নাটকে তো রবীন্দ্রনাথের বাইরে বেরোতে পারেন না, তাই মনে হয়েছে, এই ভূমিকাকেই যদি নাট্যরূপ দেওয়া যায় — যা আদপে নাটকের বক্তব্যকেই সুদৃঢ় করবে। প্রসঙ্গত, এই ভূমিকা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ অবন ঠাকুরকে বলেছিলেন, “তোমার ‘রক্তকরবী’র ভূমিকাটির পরে একটু আমার কলম বুলিয়ে দিলুম ওটাতে নাটকের অর্থ বোঝাবার সহায়তা করবে।”
এছাড়া, এই সূচনাংশেই ধ্বনিত হয় রবীন্দ্রনাথ লিখিত নাট্যপরিচয়ের অংশ — “নাটকটি সত্যমূলক।” যা নাটক শুরুর অংশে রেখে, পরিচালক নাটকের সমকালীন আবেদন আরও স্পষ্ট করে দেন। অর্থাৎ পরিচালক সংযোজিত ভূমিকা— বাইরের কিছু নয় জেনে অচলায়তনের দ্বারীদের আশাহত হওয়ারই কথা। এছাড়া পরিচালক স্বাধীনতা নিয়েছেন, নাটকের একদম শেষে, বলা ভালো, এটি তাঁর নিজস্ব ভাষ্য। রক্তকরবীর শেষ সংলাপ বিশু পাগলের, “… এই নিতে হল, তার শেষ দান” — এর পরে শোনা যায় দূর থেকে ভেসে আসা পৌষের গান। চৈতীর প্রযোজনায়, সংলাপ অনুযায়ী নাটক শেষ হওয়ার পর আমরা দেখব, এই গান ভেসে আসে এক শিশুর কণ্ঠে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ— পরিশেষে নাটকের সমস্ত চরিত্ররা মঞ্চে একটি নির্দিষ্ট কম্পোজিশনে এসে উপস্থিত হন পরস্পরের হাতে-হাত রেখে। যেন যক্ষপুরীর এই লড়াইয়ের শেষে সকলে মিলেছেন মানব বন্ধনে। তাঁরা সকলেই নিজের বিরুদ্ধে নিজেদের লড়াইয়ে জিতে গেছেন। দেখা যায়, নন্দিনী সকলের হাতে-হাত রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন।
পরিচালক চৈতী ঘোষালকে এই নির্মাণ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে বলেন, “আসলে রাজাও তো শেষ পর্যন্ত মাঠে নিজের বিরুদ্ধেই লড়াইয়ে নামে, যে লড়াইতে নন্দিনী সবার আগে ছুটে যায়। আমি দেখাতে চেয়েছি, এই লড়াইতে আদপে কারও মৃত্যু নেই! এ আসলে সবার জিতে যাওয়ার লড়াই! নন্দিনীর কথায় রঞ্জন-এর যেমন মৃত্যু নেই, তেমনই আমি দেখাতে চেয়েছি — নন্দিনী, বিশু, ফাগুলাল, এমনকী সর্দারও— যক্ষপুরীর সকলেই শেষ পর্যন্ত বাঁচেন। কিন্তু, সর্দারের এই বাঁচা নিজের বিরুদ্ধে লড়াইতে জিতে গিয়ে বাঁচা। তাই সর্দারও শেষ পর্যন্ত গজ্জুর হাতে-হাত রেখে বসে থাকেন নিজের পুরোনো সত্তাকে হারিয়ে দেওয়ার স্মারক স্বরূপ—যে সত্তা একদিন ক্ষমতার দম্ভতে গজ্জুকে পিষে দিতে চেয়েছিল।”

আবহ নির্মাণের মুহূর্তে দেবজ্যোতি মিশ্র ও পরিচালক চৈতী ঘোষাল
সমগ্র প্রযোজনাটির আবহ নির্মাণ করেছেন দেবজ্যোতি মিশ্র। এই নির্মাণে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যর যন্ত্র-সংগীতের মিলন ও প্রয়োগ সত্যিই প্রশংসনীয়। বিশেষ কিছু দৃশ্যে ‘মম চিত্তে’ গানটির সুরের প্রয়োগ যক্ষপুরীর আবহে নন্দিনীর প্রাণবন্ত সত্তাকে আরও স্পষ্টতর করেছে। নাটকের বিশেষ কিছু মুহূর্তে দেখা যায় নন্দিনীর সংলাপ জৈবিক, বাকি সব শব্দ-সংলাপ যান্ত্রিক। পরিচালক এ-প্রসঙ্গে বলেন, “যেহেতু যক্ষপুরীতে নন্দিনীই প্রাণ, যাকে অধ্যাপক বলছেন, পাকা দেওয়ালের ফাটল দিয়ে যে আলো আসে, নন্দিনী সেই আলোর মতো বিস্ময়-স্বরূপ। এই কারণেই বিষয়টি এভাবে ভাবা হয়েছে।”
রক্তকরবী প্রকাশের শতবর্ষ চলছে। শুরু হয়েছিল ২০২৪-এ, চলবে ২০২৬ সাল পর্যন্ত। ৩ বছর ধরে শতবর্ষ! ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ থেকে ইংরেজি অনুবাদ হয়ে বাংলায় গ্রন্থাকারে প্রকাশ পেতে-পেতে ৩ বছরই লেগেছিল এবং এই তিন বছরই ছিল ‘রক্তকরবী’ হয়ে ওঠার সময়। রক্তকরবীর পাণ্ডুলিপি-খসড়া সংখ্যা ১০টি— সমগ্র রবীন্দ্র সৃষ্টিতে এই একটি নাটকই বোধহয় রবীন্দ্রনাথ এত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে গড়েছেন। প্রসঙ্গত, ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’, এই নামগুলি পেরিয়ে নাটকের নাম হয় ‘রক্তকরবী’।
রবীন্দ্রনাথ এ-প্রসঙ্গে প্রমথনাথ বিশীকে চিঠিতে লিখেছিলেন, তাঁর ঘরের পাশে, লোহালক্কড় জাতীয় আবর্জনার স্তুপ ছিল, তার নিচে চাপা পড়েছিল ছোট্ট করবী গাছ। প্রথম-প্রথম সেই চারার খোঁজ পাওয়া যায়নি। কিন্তু বেশ কিছুদিন পরেই দেখেন, সেই জঞ্জালের স্তুপ ভেদ করে করবী শাখা লাল ফুল বুকে নিয়ে ফুটে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের কথায়, “প্রচুর আঘাতে যেন তার বুকের রক্ত দেখিয়ে সে মধুর হেসে প্রীতির সম্ভাষণ জানাতে এলো। সে বললে ভাই মরিনি তো আমাকে মারতে পারলে কই? তখন আমার মনের মধ্যে এই বিষয়ের প্রকাশ বেদনা দিল। নাটকটাকে তাই ‘যক্ষপুরী’, ‘নন্দিনী’ প্রভৃতি বলে আমার তৃপ্তি হয়নি, তাই নাম দিলাম ‘রক্তকরবী’।”

রক্তকরবীর পোস্টার, নির্মাণ: একতা ক্রিয়েটিভ টেলস
নাটকের শেষে চৈতী ঘোষাল সম্পাদিত নির্মাণে যে কম্পোজিশন আমরা দেখব, তা যেন ‘রক্তকরবী’ নামকরণের এই কাহিনির কথাই বলে, যেখানে যক্ষপুরী পেরিয়ে, নন্দিনীর লড়াই পেরিয়ে রক্তকরবীর রং বুকে শত যুদ্ধের শেষে সবাইকে নিয়ে জিতে যাওয়ার কথাই শুধু ব্যক্ত হয়। শতবর্ষে রক্তকরবীর প্রযোজনা যেমন রবীন্দ্রতর্পণ ও সমকালীন প্রেক্ষাপটে বিশেষ, একইসঙ্গে শতবর্ষের খাতিরে ঐতিহাসিকও।

