দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির : বাংলার প্রাচীন ভক্তিবাদের এক পুনঃপ্রকাশ

চৈতন্যদেবের দর্শন বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি আজও বাংলার মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অসাম্য, বিভেদ, অনাচার, মোহ ও কুসংস্কারের বিপরীতে সামাজিক সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করে চৈতন্যদেব ভক্তিবাদের সূচনার মধ্যে দিয়ে সমাজ-বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দির যেন বাংলার প্রাচীন ভক্তিবাদেরই এক পুনঃপ্রকাশ। লিখিত ইতিহাস থেকে জানা যায়, চৈতন্যদেব ছিলেন জগন্নাথের পরম ভক্ত, যিনি তাঁর জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জগন্নাথের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিলেন এবং তাঁর ভক্তি ও উপাসনা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চৈতন্যদেবের পরম্পরায় যে দর্শন একদিন বাংলার মাটিতে জন্ম নিয়েছিল, একুশ শতকে সেই দর্শনই ভাষা পেল নবরূপে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে দিঘায় উদ্বোধন হচ্ছে জগন্নাথ মন্দিরের। আজ তারই মহাযজ্ঞ এবং বুধবার অর্থাৎ অক্ষয় তৃতীয়ায় জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধন করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জগন্নাথ মন্দিরের হাত ধরে দিঘা-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে বলেই মনে করছেন হোটেল ব্যবসায়ী থেকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা।

দিঘা-সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে বলেই মনে করছেন হোটেল ব্যবসায়ী থেকে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা।

বাঙালির দি-পু-দা (অর্থাৎ দিঘা-পুরী-দার্জিলিং)-র অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘা। দু-তিন দিনের ছুটিতে বেড়ানোর জন্য রাজ্যবাসীর অন্যতম পছন্দ দিঘা। শীত হোক বা বর্ষা, গ্রীষ্ম হোক বা বসন্ত, সপ্তাহান্তের ছুটিতে সৈকতশহরে পর্যটকের ভিড় থাকে নজরকাড়া। দিঘার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং আধ্যাত্মিকতার মেলবন্ধনে আরও প্রাণবন্ত ও আকৃষ্ট হবেন পর্যটকেরা। জগন্নাথ মন্দিরের জন্য দিঘায় পর্যটক আকর্ষণ বাড়বে বলে মনে করছেন পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। তাঁদের বক্তব্য, একটা সময় যাতায়াতের সমস্যা, পরিকাঠামোগত অনুন্নয়নের কারণে দিঘায় পর্যটকদের বিশেষ আনাগোনা ছিল না। সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারে ডুবে যেত দিঘার সমুদ্রসৈকত। ওল্ড দিঘা থেকে নিউ দিঘায় যেতে চাইতেন না অধিকাংশ পর্যটক। এখন সময় বদলেছে। মুখ্যমন্ত্রীর হাত ধরে আমূল বদলেছে দিঘার চেহারা। ওল্ড দিঘা থেকে নিউ দিঘার বিস্তীর্ণ সৈকত এখন বাঁধানো, আলো ঝলমলে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অস্থায়ী স্টলগুলি এখন সাজানো-গোছানো। পাকা রাস্তা থেকে শুরু করে পর্যটকদের জন্য সুরক্ষাব্যবস্থা, উন্নত মানের হোটেল সব কিছুই রয়েছে দিঘায়। রেলপথে উত্তরবঙ্গ-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত জুড়ে যাওয়ায় দিঘার জনপ্রিয়তাও বেড়েছে। পরিকাঠামোগত উন্নয়নের কারণেই দিঘায় পর্যটকের ভিড় আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। জগন্নাথ মন্দিরের কারণে ওই জনপ্রিয়তা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন হোটেল ব্যবসায়ীদের একাংশ।

জগন্নাথ মন্দিরের দ্বারোদঘাটন এবং মহাযজ্ঞের প্রস্তুতির পর্যবেক্ষণের জন্য সোমবার, দিঘায় সরেজমিনে উপস্থিত হন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। দিঘার সমুদ্রতটের এই সৃষ্টি অর্থাৎ নবনির্মিত এই জগন্নাথ মন্দির- বাংলার নতুন কৃষ্টি, সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ এবং সম্প্রীতির মেলবন্ধনের প্রতিরূপ হয়ে ফুটে উঠবে, সামাজিক মাধ্যমে এমনটাই জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কথায়, “ভারত তথা বিশ্বের বহু জগন্নাথদেবের ভক্তের আগমন হবে এই বাংলায়। তাঁদের যাতায়াত, থাকার ব্যবস্থা এবং আহারের যাতে কোনোরূপ অসুবিধে না হয় সেদিকে নজর দিতে পরামর্শ দিলাম। পরিবহণ ব্যবস্থা সচল এবং যানজট মুক্ত রাখতে নির্দেশ দিয়েছি প্রশাসনিক আধিকারিকদের। আধ্যাত্মিকতার আলোয় এবং সমুদ্রের সৌন্দর্যে বাংলার পুণ্যভূমি আন্তর্জাতিক পর্যটনক্ষেত্র রূপে ধরা দেবে বিশ্ববাসীর মনে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস বাংলার কৃষ্টি, সৃষ্টি, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে চির আবদ্ধ থাকব আমরা।”

Written by