
মাঝ গঙ্গায় ভাসা মেয়েটির নিথর দেহ পাড়ে তুলে আনা হল। মেয়েটির মা বলে উঠলেন, “ওকে সিঁদুর পরালে কেন? ও এ সব মানত না। এত ফুল! ওর লাগবে না তো!’’ এমনই এক দৃশ্য নির্মাণ করেছিলেন পরিচালক দেবেশ চট্টোপাধ্যায় (Debesh Chatterjee) তাঁর ‘নাটকের মতো’ ছবিতে। সেদিনের নিথর সেই মেয়েটির নাম কেয়া চক্রবর্তী। বাংলা থিয়েটারের (Theatre) কিংবদন্তি অভিনেত্রী।
উত্তর কলকাতার (North Kolkata) এক বনেদি পরিবারে জন্ম কেয়া চক্রবর্তীর। শিশু বয়েস থেকেই মায়ের কাছে মানুষ। স্কটিশ চার্চ কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্রী ছিলেন কেয়া। ইংরাজিতে এমএ পাশ করে ওই কলেজেই অধ্যাপনার কাজ নেন। থিয়েটারে যোগ দেন কলেজ জীবন থেকেই। থিয়েটার দল ‘নান্দীকার’ (Nandikar)। নিয়মিত চলছে ‘তিন পয়সার পালা’, ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’, ‘শের আফগান’, ‘মঞ্জরি আমের মঞ্জরী’, ‘নটী বিনোদিনী’, ‘ভালোমানুষ’ – প্রত্যেকটি প্রযোজনাই সুপারহিট। সবেতেই প্রধান চরিত্রে কেয়া চক্রবর্তী (Keya Chakrabarty)। জানা যায়, দুপুর তিনটে ও সন্ধে সাড়ে ছ’টার ডবল শো থাকলেও একটুও ক্লান্ত হতেন না তিনি। কেয়া চক্রবর্তী তাঁর দলের ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছিলেন, ভালো মানুষ না হলে ভালো থিয়েটার করা যায় না। তাই আজও যখন ‘নান্দীকার’ প্রযোজিত ‘ভালোমানুষ’ নাটকের প্রসঙ্গ ওঠে, সবার আগে মনে পড়ে কেয়ার দুর্দান্ত অভিনয়ের কথা। শুধু কি অভিনয়! কী অসামান্য গানও গেয়েছিলেন তিনি। ‘সংসৃতি’ নাট্যদল ২০২০ সালে একটি ভিডিও পোস্ট করেছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়, যেখানে কেয়া চক্রবর্তীর গলায় ভালোমানুষের একটি অসামান্য গান শোনা গিয়েছিল।

থিয়েটারের মঞ্চে দাপুটে অভিনেত্রী
শোনা যায়, একদিকে নিজের বিয়ের গয়না আর মায়ের জমানো গয়না বেচে দাঁড় করাতে চাইছিলেন অজিতেশ-রুদ্রপ্রসাদের ‘নান্দীকার’। অন্যদিকে নিজের খরচ চালাতে এক জুতোর কোম্পানিতে বসে বিজ্ঞাপনের কপি লিখেছেন নীরবে। কোনোরকমে টাকা জমিয়ে মা-কে নিয়ে বেড়াতেও গেছেন। মায়ের বুকে পেস-মেকার বসানোর খরচ সামলাতে জীবনের শেষ পর্যায়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
কেয়া চক্রবর্তী তাঁর দলের ছেলেমেয়েদের শিখিয়েছিলেন, ভালো মানুষ না হলে ভালো থিয়েটার করা যায় না। তাই আজও যখন ‘নান্দীকার’ প্রযোজিত ‘ভালোমানুষ’ নাটকের প্রসঙ্গ ওঠে, সবার আগে মনে পড়ে কেয়ার দুর্দান্ত অভিনয়ের কথা।
শিল্পীর জীবন বুঝি রঙ্গমঞ্চকেও হার মানায়। ঠিক কীভাবে কেয়া চক্রবর্তীর মৃত্যু হল, তার উত্তর আজও পাওয়া যায়নি। ওই ‘জানা যায়’, ‘শোনা যায়’-এর মধ্যেই আটকে থাকবে সমস্ত উত্তর। তবুও আমাদের ধরে নিতে হবে জলে ডুবে মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। মাত্র ৩৪ বছর বয়সে। ১৯৭৭ সালের ১২ মার্চ। অভিনেত্রীর মৃত্যু সংবাদে শোকগ্রস্ত কলকাতার রাস্তাঘাট। জীবন নাট্যের যবনিকা টানলেন কেয়া। সাঁকরাইল থেকে পাঁচ মাইল দূরে হীরাপুরে ভেসে এসেছিল কেয়া চক্রবর্তীর কাদামাখা, কচুরিপানা জড়ানো নিথর দেহ। কবিতা সিংহ মৃত্যুবর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন, “কেয়ার দেহ পচতে আরম্ভ করেছে৷ অনেকক্ষণ জলে ছিল, এখন রোদে। আমি তার ঈষৎ নীলবর্ণ মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম৷ মুখের বাঁ পাশ সুন্দর৷ ডান পাশ ফুলে ঝুলে পড়েছে৷ সেখানে একটি গভীর দাগ।”

অভিনেত্রীকে নিয়ে কিছু বই
অভিনয় ছাড়াও কেমন ছিল কেয়া চক্রবর্তীর জীবন? এক নাট্যপত্রিকায় ‘মিসেস আরপি সেনগুপ্ত’ শিরোনামে রম্যরচনা লিখছেন কেয়া। তাতে পাওয়া যাচ্ছে সাংসারিক খুঁটিনাটির চিত্র। যা খুব একটা সুখের নয়। কেয়া লিখছেন, “এই নিয়ে ছয় বার উঠলাম। মানে এই লিখতে বসে আধ ঘণ্টার মধ্যে৷ একবার গয়লা এল, সদর দরজা খুললাম। স্বামী গেঞ্জি খুঁজে পাচ্ছিলেন না, খুঁজে দিলাম। টেলিফোন এল দুটো৷”
লিখেছেন, “আজ সন্ধ্যায় ফিল্ম সোসাইটির একটা ছবি দেখতে যাব ভেবেছিলাম। আকাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ (Academy of Fine Arts)৷ উনি মানা করেছেন।”

অজিতেশ ও কেয়া
কেয়া চক্রবর্তীর প্রয়াণের পর সে সময় বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখালেখি হয়েছে। কেয়ার মৃত্যুর পর ১৪ মার্চের ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ জানাচ্ছে, “১৩ মার্চ রবিবার সকাল দশটায় পোর্ট পুলিশের লঞ্চ সাঁকরাইল থেকে এক ঘণ্টার উজানে হীরাপুরের কাছে কেয়া চক্রবর্তীর মৃতদেহ উদ্ধার করে।” ২০ মার্চ ‘যুগান্তর’ পত্রিকা লিখেছিল, “কেয়ার মৃতদেহে তিন চারটি ক্ষত দেখা দেয়। তাঁর হাত দুটি ভাঙা। মুখে আঘাতের চিহ্ন। তাঁর হাত ভাঙলোই বা কী করে? …গঙ্গার জলের তোড়ে, স্টিমারের প্রপেলারের ঘায়ে? না ধস্তাধস্তির চোটে…?” – এসব উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি।” উৎপল দত্ত এই মৃত্যু সংবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। লিখেছিলেন, “চলচ্চিত্রের কিছু ক্রিমিনালের গাফিলতিতে বাংলা নাটকের কত বড়ো ক্ষতি হয়ে গেল, সেটা কি চলচ্চিত্রের অভিনেতৃবৃন্দ কোনোদিন বুঝবেন? এ যেন নাট্যকর্মীদের বৃহত্তর আত্মহত্যার প্রতীক।”
‘জীবন যে রকম’ ছবির শ্যুটিং করতে গিয়ে মাঝগঙ্গায় তলিয়ে যান কেয়া চক্রবর্তী। তারপর তাঁর মৃত্যু নিয়ে দীর্ঘদিন চাপানউতোর চলে। কতগুলো প্রশ্ন এসে জড়ো হয়। মাঝগঙ্গায় শ্যুটিং করার অনুমতি আদৌ ছিল কিনা? ডামির জায়গায় অভিনেত্রীকেই কেন জলে ঝাঁপ দিতে হল? জলে জাল পাতা ছিল কিনা? সাঁতার না-জানা কেয়া এই ঝুঁকি নিলেন কেন? ছবির ইউনিট কি তাঁকে জোর করেন, না কি কেয়াই জোর করেন পরিচালককে? নিছক দুর্ঘটনা? নাকি আত্মহত্যা? হত্যা নয় তো? কেউ কি ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল?
‘তিন পয়সার পালা’ দেখে মুগ্ধ হয়ে সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ বলেন, ‘‘সবরকম চরিত্রে আমি কিন্তু তৃপ্তিকে এমন সাবলীল অভিনয় করতে দেখিনি। …কেয়াকে আমি দুই ক্ষেত্রেই দেখেছি, বিশেষ করে বলব, ‘তিন পয়সার পালা’র কথা।’’
কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই। ‘নাটকের মতো’ ছবিতে দেবেশ চট্টোপাধ্যায় অভিনেত্রীর মৃত্যুদৃশ্যে দেখিয়েছিলেন, দূরে পোস্টার হাতে দাঁড়িয়ে ‘নান্দীকার’ (ছবিতে অন্য একটি প্রতীকী নাম ব্যবহার করা হয়েছিল)-এর বন্ধুরা। তাতে লেখা, ‘‘কেয়াদি, তুমি কাজ করতে করতে চলে গেলে,/ আমরা কাজ করতে করতে তোমাকে মনে রাখব।”
শঙ্খ ঘোষ (Sankha Ghosh) স্মৃতিচারণায় লিখেছিলেন, ‘‘কেয়ার মৃত্যুর পরদিন সকালে কোনও এক বাড়ির পরিচারিকা তার কর্ত্রী গৃহিণীকে এসে বলেছিল, শুনেছেন কেয়া চক্রবর্তী মারা গেছেন? একটু অবাক হয়ে গৃহিণী তাকে জিজ্ঞেস করেন: শুনেছি, কিন্তু তোমরা জানলে কী করে? বাঃ আমরা শুনব না? খবর পেয়ে আমাদের বস্তিসুদ্ধ লোক কেঁদে সারা। আমরা যে সব দল বেঁধে ওর ‘ভালোমানুষ’ দেখতে গিয়েছিলাম। উনি তো আমাদের কথা বলতেন। উনি তো আমাদেরই লোক ছিলেন। আমরা জানব না?’’

একটি বিখ্যাত থিয়েটারে অজিতেশ ও কেয়া
এটাই অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীর জয়। রঙ্গমঞ্চের অভিনেত্রী মেকআপ করে আলোর সামনে শুধু মঞ্চেই কেন থাকবেন? আম-জনতার সঙ্গে না মিশলে, না কথা বললে, জীবনবোধ তৈরি হবে কীভাবে! এই ভাবনায় দীক্ষিত ছিলেন কেয়া। তাই তাঁকে যে চরিত্রই দেওয়া হয়েছে, সেখানেই তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। শহরের বাবুরা যেমন তাঁর থিয়েটার দেখেছেন, তথাকথিত নিচুতলার মানুষরাও বাদ যাননি সেই তালিকা থেকে।
গুণিজনরা বলতেন তৃপ্তি মিত্রের (Tripti Mitra) পর এত বড়ো অভিনেত্রী বাংলায় কম এসেছেন। ‘তিন পয়সার পালা’ দেখে মুগ্ধ হয়ে সাংবাদিক-সাহিত্যিক গৌরকিশোর ঘোষ বলেন, ‘‘সবরকম চরিত্রে আমি কিন্তু তৃপ্তিকে এমন সাবলীল অভিনয় করতে দেখিনি। …কেয়াকে আমি দুই ক্ষেত্রেই দেখেছি, বিশেষ করে বলব, ‘তিন পয়সার পালা’র কথা।’’ কবিতা সিংহ লিখেছেন, ‘‘শরীর, যৌনতা, সতীত্ব এ সব ব্যাপারে তার বোধ অভ্যস্থ সংজ্ঞার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। খুব সহজেই— সাবলীলতার সঙ্গে— পুরুষের সামনে, এমনকি নিজের ছাত্রদের উপস্থিতিতেও, সে শরীর বা ঋতু সংক্রান্ত এমন কথা বলতে পারত, যা কোনও বাঙালি মেয়েই উচ্চারণ করতে পারে না।’’

দেবেশ চট্টোপাধ্যায়ের ‘নাটকের মতো’ চলচ্চিত্রে কেয়া চক্রবর্তীর চরিত্রে পাওলি দাম
অভিনেত্রী কেয়া চক্রবর্তীকে (Keya Chakrabarty) শ্রদ্ধা জানাতে সম্প্রতি আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস মেরিটাইম অ্যাকাডেমির অধ্যাপিকা মধুবাণী ঘোষ (Madhubani Ghosh) ফেসবুকে একটি প্রোফাইল শুরু করেছেন অভিনেত্রীর নামে। সেখানে অভিনেত্রীর নানান দুর্মূল্য কাজ সংগ্রহ করা হচ্ছে। এমনকি স্ব-উদ্যোগে কেয়া চক্রবর্তীর নামে একটি পুরস্কারও দেওয়া শুরু করেছেন মধুবাণী ঘোষ। পাশপাশি একটি ওয়েবসাইটও শুরু হয়েছে তাঁর উদ্যোগে, যেখানে এক জায়গায় অভিনেত্রীর দুষ্প্রাপ্য কিছু সংগ্রহ পাওয়া যাচ্ছে। কেয়াকে নিয়ে বিখ্যাত কবিদের কবিতা, নিবন্ধও পড়া যাবে ওয়েবসাইটে গেলে। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী একটি উদ্যোগ। আসলে এই অভিনেত্রীকে নিয়ে আজ আর তেমন আলোচনা হয় না। বাংলা থিয়েটারে তা সেই যতই পালাবদল আসুক না কেন, কেয়া চক্রবর্তীর নাম লেখা থাকবে স্বর্ণাক্ষরে।
__________________________________
তথ্যসূত্রঃ
১। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘কেয়ার মতো’ শীর্ষক নিবন্ধ (১ জুলাই, ২০১৫)
২। আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত ‘জীবনের মতো’ শীর্ষক নিবন্ধ (১১ নভেম্বর, ২০১৩)
৩। কেয়া চক্রবর্তী.কম ওয়েবসাইটে প্রকাশিত অশোক মুখোপাধ্যায়ের ‘কেয়া : জীবন ও মৃত্যুতে স্বাতন্ত্রে চিহ্নিত’ শীর্ষক নিবন্ধ
৪। এমত্রিভুবন.ব্লগস্পট.কম-এ প্রকাশিত ‘কেয়া চক্রবর্তী: মৃত্যু – হত্যা? দুর্ঘটনা? আত্মহত্যা?’ শীর্ষক নিবন্ধ
৫। এই সময় সংবাদপত্রে প্রকাশিত ‘অভিনয়ের মাঝখানে তলিয়ে গেলেন কেয়াদি’ শীর্ষক নিবন্ধ (৩ অগাস্ট, ২০১৩)
৬। ‘সংসৃতি’ থেকে প্রকাশিত কেয়া চক্রবর্তী-র গলায় ‘ভালোমানুষ’ নাটকের গান, সৌজন্যে: দেবেশ চট্টোপাধ্যায়
