ষাটের দশকের বাংলা ছবিতে নারী চরিত্র: প্রেম, স্পর্ধা আর বিপ্লবের উচ্চারণ

১।
সিনেমা বিষয়টি তার জন্মলগ্ন থেকেই দৃশ্যত চমক বা Visual Spectacle-এর পিয়াসী। লুমিয়ার ভাইয়েরা যখন প্রথম ফিল্ম শ্যুট করে প্রদর্শন করেন তখন, সেই স্টেশনে ট্রেনের ধেয়ে আসা যে আলোড়ন ফেলেছিল, তা এক প্রকার স্ট্যাম্প পড়ে যাবার মতো একটা ঘটনা। সেই ভাবনাকেই বহু বছর অবধি বয়ে নিয়ে গেছে অন্যান্য সমস্ত দেশ, তার মধ্যে বলাই বাহুল্য, আমেরিকা সব থেকে প্রখর ভাবে এই বিষয়টিকে নিয়ে নাড়া ঘাঁটা করে আজকের যুগের সিনেমায় এনে সেখানে অতিমানবদের দিয়ে বীভৎস রকম সব কীর্তি করিয়ে, বিকিনি সুন্দরীতে মোরা সমুদ্রতট দেখিয়ে, একেবারে প্রায় সার্কাসের পর্যায়ে নিয়ে চলে গেছে। তার সঙ্গে যোগদান করেছে ডিজিটাল স্পেকটাকেল বা ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি। কিন্তু এই লেখায় মূলত সেই সময়ের বাংলা সিনেমা ও তার প্রধান বা সহযোগী নারী চরিত্রদের গঠন ও নির্মাণ নিয়ে কথা বলবো যার প্রভূত সাদৃশ্য মেলে ইতালির নিও রিয়্যালিজম বা নব্য বস্তুবাদ জাত ফিল্মগুলোর। অর্থাৎ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের একটা সময়ের রেশে গড়ে উঠলো স্বাধীনতা উত্তর বাংলার নব্য ফিল্ম চেতনা। একেবারে সাধারণ বা মামুলি কিছু বিষয় বস্তুকে গল্প বলার বা দেখানোর রসদ করে তোলা। যদিও সেই ক্ষেত্রেও পথিকৃত হয়ে উঠেছিল রাশিয়ান ফর্মালিস্টদের কাজ, যার মধ্যে ইজেন্সটাইনের অক্টোবর অন্যতম।

মেলোড্রামা, উপমহাদেশীয়দের কাছে খুব পরিচিত একটা ফর্ম। আমাদের মহাকাব্য জুড়ে ছড়িয়ে আছে মেলোড্রামা, সেটা চিহ্নিত করেছিলেন ঋত্বিক এবং সেই মেলোড্রামাকেই বানিয়েছিলেন তাঁর গল্প নির্মাণের হাতিয়ার। সেই কারণেই নীতা জগদ্ধাত্রী।

কিন্তু ভারতবর্ষের মতো পুরুষ প্রধান দেশে, সিনেমা তৈরি হয় পুরুষ দর্শকদের কথা মাথায় রেখে। এই বক্তব্যকে শক্তিশালী করতে যে উদাহরণটা দেব তাতে এই বক্তব্যের সত্যতা আশাকরি যথাযথ ভাবে প্রমাণিত হবে। হম (১৯৯১) ছবিতে আমিতাভ বচ্চনের বিখ্যাত গান ‘চুম্মা চুম্মা দে দে’। কে চাইছে এই চুমু? একজন পুরুষ। অর্থাৎ হলে বসে তখন সমস্ত পুরুষ দর্শকের কাছে পর্দার কামনীয় নারী মূর্তিটির কাছে তারা চুমুর প্রত্যাশা রাখছে। কাজেই ভারতবর্ষে ফিল্মের ক্ষেত্রে নারীদের কাছেও আকাঙ্খার নিবারণটাও যেন ওই পুরুষের প্রাত্যাশাগুলিকেই নিয়ে চলতে হয়। আবার এই দেশেই ৬০-এর দশক জুড়ে এমন কিছু যুগান্তকারী কাজ হয়েছে যাকে নিয়ে অনেক গভীর আলোচনা করা যেতে পারে, এবং আলোচনার মূলে থাকবে, ওই পরিচালকেরা কীভাবে পুরুষতান্ত্রিক এক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে তাঁদের নারীবাদী বক্তব্যগুলো তুলে এনেছিলেন। অর্থাৎ ষাটের দশকের বাংলা সিনেমায় নারী চরিত্র।

২।
আলোচনার শুরু করতেই হবে সত্যজিৎ রায়ের দেবী (১৯৬০) দিয়ে। প্রভাতকুমার রায়ের এই গল্পের সমস্তটা জুড়ে দয়াময়ী এবং তার দেবী হয়ে ওঠার গল্প এবং চিরকালের একটা অদ্ভুত কুপ্রথাকে জোড়ালো ভাবে প্রশ্ন করার এক প্রচেষ্টার নাম হল দেবী। কী সেই প্রচেষ্টা? নারী চরিত্রকে সব সময় দেখানো হয় তাদের যেন একটা ম্যরাল বা মূল্যবোধের বাহক হয়েই থাকতে হবে, এবং তাদের ওপর এক প্রকার দেবীত্ব আরোপ করে বিভিন্ন রকম জারিজুরি চাপিয়ে দেওয়া – এটাই ছিল বাঙালি কৌলিন্যের মূল ভাবনা। এই ছবির গল্পে আমরা দেখি দয়াময়ী (অভিনয়ে শর্মিলা ঠাকুর)-কে সত্যজিৎ প্রায় এক দৈব শিশুর মতোই নিয়ে আসেন। সে যেমন ভালোবাসে শিশুর বাৎসল্য, তেমনি সে তার শ্বশুর মশাইয়ের খোঁজ রাখে, আবার অপরদিকে তার স্বামীর কাছে ভীষণরকম আকাঙ্খিত মানুষ, তাই সে বলে তার কাছ থেকে প্রতি সপ্তাহে চিঠি না পাঠালে রাগ করবে। আমরা এই অবধি একজন সহজ-সাধারণ মানুষকে দেখছিলাম। সমস্যা হতে শুরু করলো ঠিক যে সময় থেকে যখন সে আর মানুষ রইলো না।

নারীদের এক প্রকার অশুভ শক্তির প্রতীক হিসাবে বহুদিন দেখেছে ইউরোপ, যে কারণে ডাইনি আখ্যা দেবার প্রথা ইউরোপের অন্ধকার যুগের এক প্রকার প্রকাশ বলা যেতে পারে। সেখানে আমরা এক ধাপ এগিয়ে। দেবী যেই কথা মতো পারফর্ম করলেন না, অমনি সে হয়ে গেল রাক্ষসী। দয়াময়ীর ক্ষেত্রেও আমরা তাই দেখতে পাই। প্রথমেই বলকে বাউন্ডারির বাইরে করলেন সত্যজিৎ। হিরো তো বটেই, ভিলেনও এখানে দয়াময়ী। এই কীর্তি তখন উপমহাদেশে খুব বেশি হয়নি। তিলে তিলে দয়াময়ীর মানসিক বিকারের মাধ্যমে গোটা বিষয়টাকে এক অদ্ভুত ফ্রয়েডিয়ান আধুনিক মাত্রা দিয়েছিলেন সত্যজিৎ। এই প্রচেষ্টাই হল বাঙালি মননে এক প্রশ্নের উন্মেষ ঘটানো। বাঙালির ইতিহাসে নারীর স্থান কোথায় এবং যে সমাজ সংস্কারে আমরা সামাজিক ভাবে ব্রতী হতে চাইছি, সেখানে নারী স্বাধীনতার গুরুত্ব কতটা!

সেই আঙ্গিক থেকেই নির্মাণ করা হয় দয়াময়ীর গোটা ন্যারেটিভের চলন। দয়াময়ী ছিল ভালো, শিক্ষিত এক বউ কিন্তু সেখানে একটি স্বপ্ন কী মর্মান্তিক ঘটনায় পরিণত হয়ে যায়। তাই ফিল্মের শেষ দৃশ্যে বা ক্লাইম্যাক্সে এসে, আমরা যখন দেখি শর্মিলা ঠাকুরের সেই বীভৎস রূপ, চোখ থেকে কাজল গলে পড়ছে এবং উন্মাদের মতো সে সাজছে ও সাজিয়ে দিতে বলছে কারণ তাকে চলে যেতে হবে। অর্থাৎ বাংলার ইতিহাস জুড়ে আছে মেয়েদের ভাসিয়ে দেবার করুণ কাহিনি।

৩। 
“আয়ে গো উমা কোলে লই” – সেই একই সত্যকে ধরার চেষ্টা করেছিলেন ঋত্বিক ঘটক, কিন্তু একটু অন্য উপায়ে। ঋত্বিকের অস্ত্র, তিনি সরাসরি কথা বলতে ভালোবাসতেন, সেই কারণেই হয়তো এই অত্যাধুনিক শিল্পীর কাজে থিয়েটার বা যাত্রার যে আবেদন, সেটাকেই হাতিয়ারের মতো ব্যবহার করেন সিনেমাতে, মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০) তার মধ্যে অন্যতম।

মেলোড্রামা, উপমহাদেশীয়দের কাছে খুব পরিচিত একটা ফর্ম। আমাদের মহাকাব্য জুড়ে ছড়িয়ে আছে মেলোড্রামা, সেটা চিহ্নিত করেছিলেন ঋত্বিক এবং সেই মেলোড্রামাকেই বানিয়েছিলেন তাঁর গল্প নির্মাণের হাতিয়ার। সেই কারণেই নীতা জগদ্ধাত্রী। জগৎকে যিনি ধারণ আছেন। জগৎ মানে কিন্তু এখানে ছোট্ট সংসারটা। ঋত্বিক অন্তর্মুখী হতে বলছেন বাঙালিকে, তবে পুরাতনকে দেখে নয়, বর্তমানকে দেখে।

আধুনিক পরিচালক হিসাবে সত্যজিৎ সযত্নে দেখান কীভাবে জাতিগত বৈষম্য ছোটো বেসরকারি সংস্থার মধ্যেও বিরাট এক জায়গা নিতে পারে, এবং তার ফল স্বরূপ সেই বৈষম্য ও বিদ্বেষ ঠেকাতে গৃহলক্ষ্মী আরতি হয়ে ওঠেন দুর্গা।

ঋত্বিক সরাসরি কথা বলতে ভালো বাসতেন, তাই প্রথম থেকেই কোনো রাখঢাক রাখছেন না। আমরা সরাসরি দেখি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবথেকে আধুনিক এক দৃশ্য, যেখানে চরিত্রের প্রবেশিকাকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে একটি বিরাট অশ্বত্থ গাছ। একেবারে সমস্ত দৃশ্য জুড়ে রয়েছে সেই গাছ।

এখান থেকে যেমন ঋত্বিক স্পেকটাকেলকে ভাঙছেন, আবার অন্য দিকে সেই ভারতীয় মেলোড্রামার হাত ধরেই তিনি স্পেকটাকেলকে অন্য মাত্রায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন, যখন দৃশ্যের কন্টিনিউটি না মেনে নীতার মুখ জোড়া আলো এবং মাথার পিছন থেকে দরমার ফাঁক দিয়ে আলো নিক্ষেপ করে দেবীর মুকুট নির্মাণ করে সেই দেবীর বিসর্জনের প্রস্তুতিকে চিহ্নিত করেন ঋত্বিক এবং এক গণ চেতনার দিকে ঠেলে দেন। বাঙালি যুগে যুগে মেয়েদের বিসর্জন দিয়ে এসেছে, আর কবে আমরা থামবো, বা বুঝবো!

নীতা চরিত্রের কাস্টিংয়ের ক্ষেত্রে সুপ্রিয়া চৌধুরীর উপস্থিতি এক বিশেষ মাত্রা দেয়। নীতার বিয়ে নিয়ে সমস্যা, কারণ তার গায়ের রং চাপা। ঋত্বিকের যেন এই ক্ষেত্রে জহুরির চোখ। সারা ফিল্ম জুড়ে আমরা দেখি ঋত্বিকের ক্যামেরা নীতার চোখ দুটোকে বারবার দেখছে। ঠিক যেন দেবীর চোখ। এবং সেই চোখের শোভার জন্য আছে অল্প একটু কাজল।

নীতার নির্মাণ করতে হলে, সেই চরিত্রের কাউন্টার পার্ট ডিজাইন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে মেঘে ঢাকা তারা ছবিটি মাস্টারক্লাস। কীভাবে একটা বৃহত্তর বাঙালি প্যাট্রিয়ার্কিকে ফ্র্যাগমেন্টেড করে দুই ভাই ও বাপের মধ্যে দিয়ে দেখালেন, তা ভাবার বিষয়।

৪।
মরুতীর্থ হিংলাজ (১৯৫৯), বিকাশ রায় পরিচালিত এক মহাকাব্যিক চলচ্চিত্র। সেখানে অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায় যে চরিত্রে উপনীত হয়েছিলেন, তৎকালীন ভারতে যে কোনো মেয়ের প্রেম করা ও তার উদযাপনে যে অন্তরায় রয়েছে, তারই এক অসামান্য বহিঃপ্রকাশ। সাধারণত ৬০-এর দশকের ছবি নিয়ে যখন কথা হয়, সেখানে সাবিত্রী উল্লেখ সব থেকে কম আলোচিত। কুন্তির চরিত্রে সাবিত্রীর অসামান্য চলন দেখতে পাওয়া যায়। কুন্তি বিত্তশালী ঘরের মেয়ে, কিন্তু সে দৈব্যাৎ প্রেমে পড়ে যায় থিরুমলের (অভিনয়ে উত্তম কুমার)। থিরুমলের কোনো ঘর নেই, চাল নেই, চুলো নেই। কিন্তু তারই প্রেমে পড়লো কুন্তি। সত্যিকারের ভালোবাসা যাকে বলে।

মরুভূমির বুকে প্রস্ফুটিত হতে থাকা একটা সম্পর্ক। কুন্তি বিত্তশালী ঘরের হলেও থিরুমলের সঙ্গে সংসার পাতার জন্য রাস্তায় নাচ দেখিয়ে অর্থোপার্জনেও রাজি। কিন্তু বাধ সাধলো আবারও সেই সমাজ। সমাজ ভর্তি লোলুপ পুরুষ, যারা কুন্তির শরীরকে পেতে চায়। কুন্তি তাই ছেড়ে যেতে চায় তার সাধের থিরুমলকে, কিন্তু প্রেম কি অত সহজে ছেড়ে যায়? আধুনিক সময়ে দাঁড়িয়ে মরুতীর্থ হিংলাজ সেই কারণে গভীর প্রশ্নের সামনে এনে ফেলে। নারীদের স্বাধীন ভাবে বাঁচা ও প্রেম করার স্থান কোথায়?

৫।
মহানগর (১৯৬৩)
-এ এসে সত্যজিৎ বোধহয় সবচেয়ে সাবেকি। আধুনিক এক দম্পতিকে দেখালেন, কিন্তু তারা কলকাতার দম্পতি, বাড়ির ক্যালেন্ডারে ক্যালেন্ডারে এদের দেখা যায়। তবে সাধারণ পোশাকে নয়, রঙিন ধুতি, শাড়ি ও গয়নায়। সেই লক্ষ্মী-নারায়ণের যে ইমেজ আমাদের আশেপাশে থাকে সেটাকেই রসদ করলেন, তাঁর গপ্পের হিরো-হিরোইনকে লার্জার দ্যান লাইফ দেখাবার জন্য।

এখানে বাড়ির সাবালক প্যাট্রিয়ার্ক রামচন্দ্র যান-প্রাণ লড়িয়ে চেষ্টা করছেন ব্যাংকে একটি সামান্য কেরানির চাকরি করতে। অন্যদিকে বাড়ির লক্ষ্মী আরতি, তার নারায়ণ, সুব্রতকে সে কোনো রকম সাহায্য করতে পারছে না দেখে এক অদ্ভুত কষ্টে ভুগতে থাকে। সেই দৃশ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ যেখানে আমরা প্রথমবার আরতি ও সুব্রত দুজনকে দেখি, এক সঙ্গে অফিস যাচ্ছে। ঠিক যেন পটে আঁকা লক্ষ্মী-নারায়ণ। কিন্তু সময় বদলেছে। চাকরি করে রোজগার করে তাদের এই নতুন দেশের দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে উঠতে হবে। পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় সমাজ ও পরিস্থিতি। আধুনিক পরিচালক হিসাবে সত্যজিৎ সযত্নে দেখান কীভাবে জাতিগত বৈষম্য ছোটো বেসরকারি সংস্থার মধ্যেও বিরাট এক জায়গা নিতে পারে, এবং তার ফল স্বরূপ সেই বৈষম্য ও বিদ্বেষ ঠেকাতে গৃহলক্ষ্মী আরতি হয়ে ওঠেন দুর্গা। তবে আশুর নিধন হলেও পরিস্থিত সেই দুর্গাকে হারিয়ে দেয়। আমরা রূঢ় বাস্তবের মাটিতে এসে দাঁড়াই আরতি ও সুব্রতকে নিয়ে। যেখানে এই রূঢ় সময়ে দাঁড়িয়ে সাহস দেখাবার জন্য আরতিকে চোখের জল ঝরাতে হয়। ক্রমাগত চলতে থাকে ঘর আর বাইরের দ্বন্দ্ব।

৬।
তপন সিংহের কাজে আমরা সেই আধুনিক নারীকেই দেখি একটি ছায়ার মতো। যদিও তাঁর অন্যান্য কাজে মহিলা চরিত্রদের সাংঘাতিক ফোর ফ্রন্টে আসতে দেখেছি, যেমন গল্প হলেও সত্যি-তে (১৯৬৬) বাড়ির মেয়ে-বউদের আধিপত্য ভীষণ ভাবে লক্ষ্যণীয়। কিন্তু জতুগৃহ (১৯৬৪) ছবিতে অরুন্ধতী দেবী এক ছায়ার মতো।

আধুনিক দাম্পত্য কঠিন ও খানিক জান্তব, তাই সেখানে মনের মিল সহজে হয় না। এই ছবিতে আমরা দেখতে পাই সমস্ত দম্পতিই একে অপরের সঙ্গে লড়ছে। পাশাপাশি শতদল ও মাধুরি যেন সেই পারফেক্ট কাপল (দম্পতি), যাদের মধ্যে পারিবারিক বোঝাপড়া সাংঘাতিক। কিন্তু সেই তাসের ঘর ভেঙে পড়ে, যখন মাধুরি হঠাৎ কাউকে কিছু না বলে চলে যায়।

শতদল ও মাধুরির দুনিয়া, শতদলই আছে মাধুরি নেই। শতদলের জীবনে সে ঠিক করে নিয়েছে, তার ভালোবাসার মানুষকে সে কিছুতেই জীবনের ছন্দ ফিরিয়ে আনতে পারবে না। সম্পূর্ণ ছবিটা আমরা শতদলের আঙ্গিকেই দেখি। তাই অধরা থেকে যায় মাধুরির সুপ্ত ব্যথাগুলো। পরিচালক তাঁর দর্শকদের ভাবাতে ভাধ্য করেন যে স্পেকট্যাকেল দেখে আমরা অভ্যস্ত আমাদের মতো করে, অর্থাৎ এখানে গেজের কথা বলা হচ্ছে, তার অচেতনকে খানিক সুরসুরি দিয়ে ভাবানো যে পুরুষরা কোথায় বুঝতে ভুল করছে।

জতুগৃহ-তে শতদল ও মাধুরি দুজনেই আর্থিক ভাবে স্বাধীন ও সচ্ছল। তাই নির্ভরতার জায়গা খুবই কম। কিন্তু এখানে চলে আসছে অধিকারের প্রশ্ন, দুঃখের অধিকার। সেই আধিপত্য ও নিবিড় এক ভালোবাসার অবস্থান থেকেই হয়তো মাধুরি বারবার অচেতনে শতদলকে ডেকে গেছে, যাতে এই জতুগৃহের আগুন নিভিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

৭।
আবার ১৯৬৪-তে, চারুলতা-র মাধ্যমে আমরা প্রত্যক্ষ করি যে নারীর যে আসল মান তার স্বামীর মনে সেটা যদি নাহয়, তাহলে একটি সংসারের কী চেহারা নেয়।

এই ধ্বংস বাহ্যিক নয়। এই ধ্বংস অন্তরের। চারুলতা প্রাচীনা নয়, সে নবীনা। স্বামীর সামনে সে ঘোমটা দেয় না; রাশভারী, মর্যাদা বোঝা মেয়ে সে। সাধ ছিল কেবল স্বামীর মনে সেই একটা সারাদিন জুড়ে থাকা, উৎসাহ পাওয়া, কিন্তু হায় পুরুষ মন! ভূপতি, চারুর গ্রামীন বেড়ে ওঠার ঊর্ধ্বে তাকে দেখেই উঠতে পারল না। কিন্তু সারা বাড়ি জুড়ে আমরা চারুর রুচিবোধের নিদর্শন দেখে চলেছি। নারীর কী জোর এবং সে চাইলে পুরুষদের দশ গোল দিতে পারে বাইরের কাজে, সেটাই দেখি চারুলতাতে।

“বৌঠান আমি একদম বোকা বনে গেছি” – অমলের মুখে এই সংলাপ বাঙালি পুরুষদের গৌরব ও দর্পকে চূর্ণ করে। তবে চারুলতা শুধুমাত্র ভাবনা প্রকাশের জায়গায় নারীকে মুক্ত করে না, বরং তার মনের আকাঙ্ক্ষাকেও ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। এখানেও সেই প্রশ্ন জোড়ালো হয়ে ওঠে, আজকে চারুর মনে অর্থাৎ এক বিবাহিত নারীর মনে একজন সমবয়সী পুরুষের প্রতি যে ভালোবাসা বা প্রেমের সঞ্চার হবে তার মাত্রাও কি সমাজ ঠিক করে দেবে! নাকি সে অধিকার শুধু তারই আছে! এ প্রশ্ন কি আজও প্রাসঙ্গিক নয়!

Written by