হাওড়ার এই আস্ত গ্রাম হয়ে উঠেছে দুর্গা প্রতিমার সাজ ও অস্ত্র নির্মাণের কারখানা

“জাগো তুমি জাগো/ জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিনী…”

শ্বিনের শারদপ্রাতে দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে আকাশবাণীর মহিষাসুরমর্দিনী অনুষ্ঠানে শিল্পী দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে ধ্বনিত এই গান নিছকই মাতৃবন্দনা নয়, বরং মাতৃবৎসল জাতির মায়ের কাছে অভয় প্রার্থনা। দুর্গাপুজো আসতে ঢের দেরি। কিন্তু তার আগের প্রস্তুতি পর্ব চলে সারা বছর ধরে। কাদা, মাটি, কাঠ দিয়ে প্রতিমাকে ঘরের মেয়ের রূপ দেন মৃৎশিল্পীরা‌। সেই ঘরের মেয়েকে সাজিয়ে তার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে তাঁকে সব আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করেন হাওড়া জেলার গুটিনাগোড়ী গ্রামের বাসিন্দারা। বছরের যেকোনো সময় হাওড়া দক্ষিণ-পূর্ব শাখার ট্রেন ধরে বীরশিবপুর স্টেশনে নেমে টোটো বা বাসে বোয়ালিয়ায় পৌঁছে সেখান থেকে আরও কিছুটা পায়ে হেঁটে বা টোটোতে গুটিনাগোড়ী গ্রামে পৌঁছালে কানে আসে আগমনী সুর। দু-চোখ ভরে দেখা যায় কোথাও প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিমার সাজসজ্জা আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে অস্ত্র। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে গ্রামের প্রায় সকলেই প্রতিমার সাজসজ্জা এবং অস্ত্র তৈরির কাজকেই বেছে নিয়েছেন পেশা‌ হিসাবে।

কীভাবে গুটিনাগোড়ী হয়ে উঠলো দেবীর সাজঘর? প্রতিমার গহনাশিল্পী সুকান্ত অধিকারী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “প্রায় ২৫ বছর ধরে এই গ্রামে আমরা মায়ের সাজসজ্জা আর অস্ত্র তৈরি করছি। যদিও তার আগে কলকাতার কুমোরটুলিতেই এই কাজ হতো, কিন্তু পরে বিভিন্ন সমস্যার কারণে এখন ওখানে এই কাজ কম হয়। ওখান থেকে কাজ শিখেই আমরা গ্রামে এই কাজ শুরু করি। এখন গ্রামের অনেকেই এই কাজের সঙ্গে যুক্ত।” কিন্তু পুজোর মরশুম ছাড়া এই কাজ থেকে কতটা আয় সম্ভব? এই প্রসঙ্গে তিনি জানান, “অস্ত্র ও সাজ তৈরির ব্যস্ততা আমাদের সবসময়ই থাকে, দিনরাতের পরিশ্রমে আমরা নিখুঁত ভাবে বানানোর চেষ্টা করি দেবীর হাতের অস্ত্র ও সাজ। তাই অন্য কোনো কাজে মনোনিবেশ করার সময়ই থাকে না। দুর্গাপুজোর পর থেকেই আমরা পরের বছর পুজোর প্রস্তুতি শুরু করি, আর এর মাঝে থাকে কালীপুজো, জগদ্ধাত্রী পুজোর অর্ডার। এছাড়াও বছরের অন্যান্য সময় কালীপুজোর (যেমন ফলহারিণী কালীপুজো, রক্ষাকালীপুজো) অর্ডারও থাকে। সবমিলিয়ে আমাদের হাতে সবসময়ই কাজ থাকে। এখান থেকে আমরা কলকাতার কুমোরটুলি এবং অন্যান্য অনেক জায়গায় যেখানে ঠাকুর তৈরি হয়, সেখানে দেবীর সাজ ও অস্ত্র সরবরাহ করি।”

বীরশিবপুর স্টেশনে নেমে টোটো বা বাসে বোয়ালিয়ায় পৌঁছে সেখান থেকে আরও কিছুটা পায়ে হেঁটে বা টোটোতে গুটিনাগোড়ী গ্রামে পৌঁছালে কানে আসে আগমনী সুর। দু-চোখ ভরে দেখা যায় কোথাও প্রস্তুত হচ্ছে প্রতিমার সাজসজ্জা আবার কোথাও তৈরি হচ্ছে অস্ত্র।

কীভাবে তৈরি হয় সাজসজ্জা? কীভাবেই বা তৈরি হয় অস্ত্র? শিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল সাজসজ্জার উপকরণ মূলত আসে কলকাতার বড়োবাজার থেকে। তারপর বিভিন্ন সাইজে বিভিন্ন ডিজাইনে কাটিং করে তৈরি হয় গয়না, চালচিত্রের নকশা। শিল্পীরা কখনও সেই গয়না বানান নিজের মতো, কখনও ক্রেতার ফরমাইশে তাদের পছন্দ অনুযায়ী। চার-পাঁচজন দক্ষ কারিগরের প্রায় এক সপ্তাহের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রস্তুত হয় দুর্গা ও তাঁর পরিবারবর্গের সাজসজ্জা। প্রায় পাঁচ হাজার থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকার গয়না তৈরি হয় এখানে।

অস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রেও থাকে এরকমই পরিশ্রমের আখ্যান। টিনের পাতের ওপর প্রথমে অস্ত্রের আকার এঁকে তারপর কাটিং করে, ডিজাইন করে রং করার পর তৈরি হয় অস্ত্র। এক অস্ত্র শিল্পী জানালেন, “পুজোর আগে ব্যস্ততা বাড়ে, এখন আমরা প্রতিদিন প্রায় দশ ঘণ্টা কাজ করি, পুজোর আগে সেটা হয়ে যায় দুই রোজ।”

প্রতিযোগিতামূলক পুজোর ভিড়ে সরকারি বেসরকারি নানান সংস্থা থেকে বিভিন্ন ক্লাব পুরস্কার হাতে তুলে নেয়। মৃৎশিল্পীরাও পুরস্কৃত হন, কিন্তু এই সজ্জা বা অস্ত্রশিল্পীরাও কি পান শিল্পীর সম্মান? এই প্রসঙ্গে আক্ষেপের সুর শোনা গেল শিল্পী নমিতা অধিকারীর কণ্ঠে। তিনি জানান, “একটি প্রতিমা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে চোখ আর অলংকারের সজ্জায়। কিন্তু প্রতিমার সাজশিল্পীদের নাম মানুষের কাছে অজানাই থেকে যায়। দিনরাত পরিশ্রমের আর্থিক মূল্য আমরা পাই ঠিকই, কিন্তু কখনোই জোটে না শিল্পীর সম্মান।” জাঁকজমকপূর্ণ পুজোর জৌলুসে প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতোই উপেক্ষিত থাকেন এই শিল্পীরা।

মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের উদাত্ত কণ্ঠে দেবীর অস্ত্রদানের পৌরাণিক ব্যাখ্যা শুনে অভ্যস্ত আপামর বাঙালি। কিন্তু বাংলার মাটির শিল্পীদের হাতে যে মেয়ে তৈরি হয়, পৌঁছে যায় মণ্ডপে মণ্ডপে — তাকে সালঙ্কারা করে যুদ্ধের সাজে সাজিয়ে তোলেন যারা, তাঁরা থাকেন বাংলার গ্রামে। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির কথা ভুলে সৃষ্টির আনন্দে মেতে থেকে নিজেদের অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের সংস্থান করেন তাঁরা। শিল্পীরা বলেন, তাঁদের তৈরি অস্ত্র শক্তি জোগায় দেবীকে। সশস্ত্র সালঙ্কারা দেবীর দিকে তাকিয়ে ভক্তিতে হাত জোড় করে শক্তি আর বরাভয় প্রার্থনা করেন জীবনযুদ্ধে রণক্লান্ত এই সাধারণ মানুষরা।

Written by