
বাঙালির শীতকাল আসে নলেন গুড়ের গন্ধে। রসগোল্লা, সন্দেশের মতো শ্বেতশ্রভ্র মিষ্টিকে লালচে আভায় রাঙিয়ে তোলে নলেন গুড়। সদ্য বাংলার নলেন গুড়ের সন্দেশ পেল জিআই ট্যাগ। সন্দেশ তো কোনও একটি বা দুটি মিষ্টি নয়। মিষ্টির এক গোত্রের নাম সন্দেশ। যার সদস্য অসংখ্য। মা ষষ্ঠীর কৃপায় দিনে দিনে সে পরিবারের ছেলেপিলে বাড়ছে। ছানার বঙ্গ বিজয় সন্দেশের ভোল বদলে দিয়েছে।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে, মঙ্গলকাব্যে বারবার সন্দেশের কথা এসেছে। দুধ শুকিয়ে ক্ষীর আর নারকেল দিয়ে তৈরি হত সে যুগের সন্দেশ। কবি রূপরাম রচিত ধর্মমঙ্গল কাব্যে প্রমাণ মেলে, বাঙালির ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলিতেও সন্দেশের জন্য দোর খোলা থাকত। ধর্মমঙ্গলে সাধ অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে রয়েছে, “ছয় মাস গত হৈল সাতেতে প্রবেশ।/ সাধ করি খায় রানি অপূর্ব সন্দেশ।।” কিন্তু এই অপূর্ব সন্দেশ কী দিয়ে তৈরি হয়েছিল তা জানার উপায় নেই। একাধিক মঙ্গলকাব্যে নারকেল, মধু, চিনি এবং ক্ষীরের সন্দেশের উল্লেখ রয়েছে।
দুধকে ছিন্ন করে সৃষ্ট ছানাকে সহজে এন্ট্রি দেয়নি বাংলা। তাই ছানার চট করে সম্মানজনক আসন পায়নি। দেবসেবায় ছানাকে প্রত্যাখান করেছিল তামাম আর্যাবর্ত। ছানা দেবদাস হয়নি, বরং রাজের সিমরণকে পাওয়ার মতোই সে জয় করেছে বঙ্গদেশকে। অমরেশ পুরীর মতো গোঁড়ামি ছেড়ে হিঁদুরা দেখল আরে এ জিনিসের স্বাদ তো মন্দ নয়! বাঙালির হাতে পড়ে দেবভোগ্য হয়ে উঠল ছানা ও ছানার তৈরি সন্দেশ ও মিষ্টি।
এর জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় পর্তুগিজ ও ওলন্দাজদের। সে বেচারারা ভারতে এসে চিজ খুঁজছিল। চিজ ছাড়া যে বাবুদের চলত না। দুধ কেটে ছানার জল সরিয়ে চিজ বানিয়ে ফেলল রোলান্ডর দেশের লোকেরা। এদেশের মাটিতে নিজেদের কলোনি ব্যান্ডেলের নামে ব্যান্ডেল চিজ নাম রাখল। দুধ কেটে তারা মিষ্টিও বানাতে শুরু করল। বাঙালিরা খানিক দূরেই থাকল প্রথমটায়। নৈব নৈব চ মনো ছেড়ে একদিন কাছে টেনে নিল ব্যান্ডেল চিজকে। স্বাদের জন্য নোনতা চিজে দিয়ে দিল চিনি, গুড়। অন্যদিকে, ওলন্দাজ পাদ্রিদের থেকে জার্মান পট-চিজ তৈরির কায়দাকানুন শিখা হয়ে গেল। ব্যস্ আর কী চাই! অশ্বমেধের ঘোড়া ছোটালেন ময়রারা।
সন্দেশের নাম কেন সন্দেশ হল?
প্রাচীন বাংলায় সন্দেশ কথাটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হত। প্রথমত সংবাদ এবং অন্য ক্ষেত্রে মিষ্টি জাতীয় খাবার অর্থে। চৈতন্যচরিতামৃতে সংবাদ অর্থে সন্দেশের ব্যবহার হয়েছে অন্তলীলায় – “শ্রীকান্ত আসিয়া গৌড়ে সন্দেশ কহিল।/ শুনি ভক্তগত মনে আনন্দ হইল।।” আবার আদিলীলায় মিষ্টি হিসাবেও সন্দেশের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায় – “আপনি চন্দন পরি পরেন ফুলমালা।/ নৈবেদ্য কাড়িয়া খান সন্দেশ চালু কলা।।”
দুধকে ছিন্ন করে সৃষ্ট ছানাকে সহজে এন্ট্রি দেয়নি বাংলা। তাই ছানার চট করে সম্মানজনক আসন পায়নি। দেবসেবায় ছানাকে প্রত্যাখান করেছিল তামাম আর্যাবর্ত। ছানা দেবদাস হয়নি, বরং রাজের সিমরণকে পাওয়ার মতোই সে জয় করেছে বঙ্গদেশকে।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “সন্দেশ বাংলাদেশে বাজিমাত করিয়াছে, যা ছিল খবর, বাংলাদেশ তাকেই সাকার বানিয়ে করে দিল খাবার। সেখানকার সন্দেশেও খবর-খাবারে অর্থাৎ সাকার-নিরাকারের শিবশক্তির মিলন।” খবর আর খানা, এই দুই কীভাবে মিলেমিশে গেল? তাঁর উত্তর দিয়ে গিয়েছেন পানিহাটির কৃতি সন্তান যম দত্ত।
প্রাচীন বাংলায় লৌকিক সাংবাদিকের মর্যাদা পেত নাপিতরা। স্বামীজির ভাই মহেন্দ্রনাথ দত্তের লেখা থেকে জানা যায়, মধ্যযুগের বাংলায় কাগজে লাল কালি দিয়ে লেখা হত শুভ সংবাদ। চিঠিটি লাল সুতো দিয়ে বেঁধে নাপিতের হাতে পৌঁছে দেওয়া হত। সঙ্গে কিছু মিষ্টিও দেওয়া হত।
এত মানুষ থাকতে তাদের হাতেই কেন শুভ সংবাদ বিলির দায়িত্ব দেওয়া হত? গ্রামে গ্রামে ঘুরে নাপিতরা চুল কাটত। তাদের মাধ্যমে সকলে সুসংবাদের চিঠি পেয়ে যেতেন। কেবল সুসংবাদ দেওয়া হবে, তাও খালি হাতে? তা হয় না। তাই খবরের সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি দেওয়া হত। মিষ্টি যেত থালায় করে তাই নিয়ে যাওয়ার সুবিধার জন্য শুকনো মিষ্টি হিসাবে সন্দেশই দেওয়া হত। খবর আর মিষ্টির আগমন একসঙ্গে ঘটত বলে সন্দেশ নামটির উৎপত্তি। দেখা যেত থালার সন্দেশ কমে যাচ্ছে তাই হাঁড়ির আগমন হল। হাঁড়ির জন্য সরা এল। তাতেও কমছে সন্দেশ। তাহলে উপায়? ময়দা গুলে হাঁড়ি এবং সরা আটকে দেওয়ার রীতি শুরু হয়ে গেল বঙ্গদেশে, যাকে ‘ওলপ’ দেওয়া বলা হয়। এর থেকেই বাংলা ভাষার চলে এল মুখে কুলুপ আঁটা প্রবাদটি।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি এবং পরে উনিশ শতক থেকে খাস কলকাতা ও তামাম বাংলায় সন্দেশ নিজের রাজত্ব কায়েম করল। প্রথমে সন্দেশ ছিল সাদামাটা। ছানা ও গুড় বা পাটা চিনির মেলবন্ধন তৈরি হত মাখা সন্দেশ, গোল্লা সন্দেশ, কাঁচা গোল্লা। তারপর একে একে এল গুপো, গুলি, গুটকে ইত্যাদি সন্দেশ। কাটোয়ায় পাওয়া হাতে লেখা মহাভারতের তালপাতার পুঁথির মধ্যে ১৭৮০ সালের দুর্গাপুজোর খরচের একটি ফর্দ পাওয়া যায়। সেই ফর্দ অনুযায়ী দুর্গাপুজো করতে ৮০ টাকার মতো খরচ হয়েছিল। যার মধ্যে পুজো উপলক্ষ্যে সাত টাকার সন্দেশ কেনার হিসাবও উল্লেখ ছিল। অমৃতলাল বসুর লেখায় রয়েছে, কলকাতায় কুড়ি টাকার মধ্যে এক মণ সন্দেশ পাওয়া যেত। দেবেন ঠাকুরের বাজারের সব সন্দেশ কিনে ফেলা, ১৮৫৫ সালে ৪ জুন সংবাদ প্রভাকরের প্রতিবেদনে প্রকাশিত সন্দেশের বাজার আগুন হওয়ার খবর… ইত্যাদি প্রমাণ করে সন্দেশ কী হারে জনপ্রিয় ছিল! সন্দেশ এই বিজয়রথ আজও গড়গড়িয়ে চলছে। নলেন গুড়ের সন্দেশে জিআই প্রাপ্তির মাধ্যমে তাতে নয়া পালক যোগ হল।
আঠারো শতকের মাঝামাঝি এবং পরে উনিশ শতক থেকে খাস কলকাতা ও তামাম বাংলায় সন্দেশ নিজের রাজত্ব কায়েম করল। প্রথমে সন্দেশ ছিল সাদামাটা। ছানা ও গুড় বা পাটা চিনির মেলবন্ধন তৈরি হত মাখা সন্দেশ, গোল্লা সন্দেশ, কাঁচা গোল্লা। তারপর একে একে এল গুপো, গুলি, গুটকে ইত্যাদি সন্দেশ।
সন্দেশের অন্যতম সেরা পীঠস্থান গিরিশ চন্দ্র দে ও নকুড় চন্দ্র নন্দী-র অন্যতম কর্ণধার রানা নন্দী জানালেন, ‘‘অত্যন্ত ভালো খবর, (নলেন গুড়ের সন্দেশ) সন্দেশের জন্য পশ্চিমবঙ্গ স্বীকৃতি পেয়েছে। মিষ্টি সারা ভারতেই হয় কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মতো সন্দেশ অন্যান্য জায়গায় পাওয়া যায় না। টেস্টে অনেক ফারাক থাকে। এই স্বীকৃতি বিশাল বড়ো ব্যাপার! মিষ্টি সারা ভারতবর্ষে পাওয়া গেলেও গুড়ের সন্দেশ বাংলা ছাড়া কোথাও পাওয়া যায় না। অন্য রাজ্যে আখের গুড়ের মিষ্টি বেশি প্রচলিত। বাংলায় খেজুর গুড়ের সন্দেশের চাহিদা অনেক।’’ তিনি আরও জানালেন, তাঁর প্রতিষ্ঠানে নলেন গুড়ের মিষ্টির চাহিদা চিনির মিষ্টির তুলনায় বেশি। নলেন গুড় থেকে তাঁরা প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ রকমের সন্দেশ বানান। কালী পুজো থেকে দোল অবধি তাঁরা নলেন গুড়ের মিষ্টি বানান। তিনি বললেন, ‘‘লোকেরা সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে শীতকালে গুড়ের মিষ্টি খাওয়ার জন্য। সীমিত সময়ের জন্য পাওয়া যায় বলে, ‘ক্রেজ’ বেশিই থাকে।’’
রানার মতে জিআই পাওয়া বাংলার নলেন গুড়ের সন্দেশকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেবে। তাঁর কথায়, ‘‘অন্য রাজ্যের লোকেদের কাছে গুড়ের মিষ্টি বলতে শুধু আখের গুড়। আমরা জানি গুড়ের সন্দেশ মানে খেজুরের গুড়। এটা এবার বাংলা থেকে গোটা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়বে। এবার সারা বিশ্ব জানবে।’’
পুজোর পর পরই বঙ্গের ভেনঘরের ময়রাদের দৌলতে সন্দেশ লাল হয়ে উঠতে শুরু করে। নভেম্বর পড়তেই ছানায় এসে পড়ে জিরেন কাঠের নলেন গুড়। ছানা আর খেজুরের গুড়ের শুভ পরিণয়ে জন্মানো সন্দেশ তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করে পেটুক বাঙালি। এবার জিআই তকমা মেলায় গোটা বিশ্বে পরিচিতি পাবে বাংলার নলেন গুড়ের সন্দেশ।

