বীরভূমের সেরপাই : ভোলানাথ কর্মকার ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে এই শিল্প

 

ছবি- শ্রায়ান বসু

সেরপাই বা কুনকে অথবা পাইলা হচ্ছে ভারত ভূখণ্ডের একটি অতি প্রাচীন শস্য পরিমাপক আধার বা Grain Measure। যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেত দিয়ে তৈরি হতো। তবে কিছুক্ষেত্রে এই সের ধাতু দিয়েও তৈরি হতো। পাই এসেছে ‘পোয়া’ শব্দ থেকে। সের এবং পোয়া দুইই পরিমাপের একক। আর এই দুই মিলেই হয়েছে সেরপাই। এর ব্যবহারিক প্রয়োগ এখন আর নেই। এখন মূলত গৃহসজ্জার উপকরণ হিসেবে বা পুরোনো ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে জিনিসটি অনেকে সংগ্রহ করে থাকেন। আগে কাঁচা পিতলের কারুকার্য করা কাঠের নির্মিত সেরপাই বাংলা বিখ্যাত ছিল। তার কদর ছিল আলাদা। তবে, বীরভূম জেলার খয়রাশোলের কাছে লোকপুর বা প্রাচীন লক্ষীপুর গ্রামের একটি মাত্র পরিবারের সদস্যরা এখনও প্রাণপনে চেষ্টা করে চলেছেন অলংকৃত সেরপাই বা সিউড়ি বোলকে বাঁচিয়ে রাখতে, আমরা ক’জন তার খোঁজ রাখি?

সেরপাই কারুকাজ, ছবিঋণ- সত্যশ্রী উকিল

ব্লকের গর্বের এই কুটির শিল্পকে বাঁচাতে বিভিন্ন কর্মসূচি না নেওয়া হলে অদূর ভবিষ্যতে ‘সের-পাই’ বা ‘সিউড়ি বোল’ (অনেকেই এই নামে চেনেন) শিল্পের কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।

বীরভূম জেলার খয়রাশোলের ঝাড়খণ্ড সীমান্তবর্তী গ্রাম লোকপুর ছোটোনাগপুর মালভূমির একটি অংশ। প্রান্তিক এই গ্রামটি সেরপাই শিল্পের জন্য বিশেষ পরিচিত। চল্লিশের দশকে লোকপুরের বাসিন্দা কমলাকান্ত কর্মকারের হাত ধরে সৃষ্টি হয়েছিল ওই শিল্পের। আগেকার জিনিস মাপার পরিচিত মাধ্যম ‘সের’ ও ‘পাই’কে আলাদা রূপ দিয়েছিলেন তিনি। কাঠের সের ও পাইয়ের উপর পিতলের কারুকার্য করে প্রশংসা পেয়েছিলেন সকলের। নিজের সৃষ্ট ওই শিল্পকে নিয়ে ব্যবসায়িক ভাবে সফলও হয়েছিলেন। শিল্প সৃষ্টির জন্য ১৯৬৫ সালে পেয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি পুরস্কার। বংশ পরম্পরায় সেরপাই শিল্পকে আকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করেছে কর্মকার পরিবারের তিন প্রজন্ম।

বয়স বেড়ে যাওয়ায় কমলাকান্তবাবুর নাতি প্রয়াত কার্তিক কর্মকার সে ভাবে আর ওই কাজ করতে পারছিলেন না। অন্য দিকে, কার্তিকবাবুর দুই ছেলেও ওই শিল্পকর্মে সে ভাবে উৎসাহী ছিলেন না। কাজটি মূলত চালাচ্ছেন কার্তিকবাবুর শিষ্য তথা জামাই ভোলানাথ কর্মকার এবং মেয়ে রুমা কর্মকারেরা। তাঁরাই এখনও পর্যন্ত কমলাকান্তের যোগ্য উত্তরসূরি। সেরপাই কাঠ, লোহা ও পাথর দিয়ে নির্মিত হয়। ভোলানাথ কর্মকারের কথায়, “আগে কাঠের কাজ করে নিতে হয়। মানে, সেরপাই তৈরির জন্য মূল কাঠামোটা হয় কাঠের। সেই কাঠের কাঠামোর ওপর বসানো হয় লোহা বা পিতলের পাত। তার ওপর করা হয় কারুকাজ। একদম শেষে রং এবং পালিশ হয়। এভাবেই ধাপে ধাপে কাজটা হয়।” ভোলানাথ আরও জানালেন, যে রং তাঁরা ব্যবহার করেন সেটি ভুষোকালি দিয়ে নির্মিত সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক রং। নিজেরাই বাড়িতে বানিয়ে নেন। অলঙ্করণের মোটিফে নজরে পড়বে সূর্য্যফুল, মাছ, শঙ্খ বা ঘুর্ঘুরে পোকা।

ভোলানাথ কর্মকার

কিন্তু, ভোলানাথবাবুদের পরবর্তী প্রজন্ম যে শেষ পর্যন্ত এই পেশায় আসবে, এমন নিশ্চয়তা না থাকার জন্যই ২০১৩ সাল নাগাদ উদ্যোগী হন খয়রাশোলের তৎকালীন বিডিও মহম্মদ ইসরার। তাঁর ভাবনাতেই ব্লক থেকে প্রকাশিত ২০১৩ সালের ডায়েরির প্রচ্ছদে জায়গা পেয়েছিল বিপন্ন সের-পাই শিল্পের ছবি। জেলা আধিকারিকদের সঙ্গে কথা বলে তিনিই নিশ্চিত করেছিলেন শিল্প বাঁচাতে স্বনির্ভর দলের সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যাপারে।

বিপন্ন ও কুটির শিল্পকে বাঁচাতেই মহিলা স্বনির্ভর দলের সদস্যদের ওই শিল্পে প্রশিক্ষিত করার কর্মসূচি শুরু করে প্রশাসন। বিভিন্ন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ২৩ জন মহিলাকে একমাসের প্রশিক্ষণ দেন বিশিষ্ট সের-পাই শিল্পী ভোলানাথ কর্মকার। প্রশিক্ষণ শিবিরে সঙ্গে ছিলেন তাঁর স্ত্রী রুমাদেবীও। শিল্পী দম্পতির কথায়, কাজের চাহিদা আছে কিন্তু, একটি পরিবারের পক্ষে বেশি পরিমাণে সেরপাই উৎপাদন সম্ভব ছিল না। এই পরিস্থিতিতে সরকারি উদ্যোগে প্রশিক্ষিত মহিলা সদস্যেরা সাহায্য করতে পারলে দু’পক্ষেরই লাভ হবে।

প্রশিক্ষণ শিবির থেকে উৎপাদিত দ্রব্য সবলা মেলার মতো নানা মেলায় প্রদর্শন করে ভালো সাড়া পাওয়া গিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতিবছরই এই প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করে বীরভূম জেলা প্রশাসন, ব্লক প্রশাসন। উদ্দেশ্য একটাই, বীরভূমের গর্বের ‘সেরপাই’ শিল্প যেন বাঁচে। আশা করা যাচ্ছে, মহিলাদের স্বনির্ভরতার পাশাপাশি এর মাধ্যমে বেঁচে থাকবে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই কুটিরশিল্পটি।

পাই, সের, আধসের, প্রভৃতি মাপে এর সাতরকম পাত্র, একদম উপরেরটি সিঁদুর কৌটো হিসেবেও ব্যবহৃত হয়

প্রসঙ্গত, বীরভূমের ঐতিহ্যবাহী এই লোকশিল্পটি নিয়ে আদিত্য মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘লোকপুরের সেরপাই শিল্প’, তিলক পুরকায়স্থের ‘বাংলার লোকশিল্প : শিল্পী ও শিল্পের সন্ধানে’ ও ১৯৯১ সালে বোলপুর-স্থিত অখিল ভারত ভূবিদ্যা ও পরিবেশ সমিতির পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মলয় মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘কোপাই নদীর কাদা পায়ে’ বইটিতে বিশদ বিবরণ আছে।

Written by