জলশ্রী : বাংলার প্রথম ভাসমান রেস্তোরাঁয় বাঙালি, চিনা, ইতালিয়ান পদের দোদুল্যমান স্বাদ


খাবার ছাড়া বাঙালি বাঁচে না।  কিন্তু আমার মতো যারা ততটা খাদ্যরসিক নয়, যতটা ভ্রমণরসিক – তাদের জন্য পাত পেড়ে খাওয়াটা শরীরকে খানিক ব্যতিব্যস্ত করাই বটে। যদিও ফরাসডাঙার মনোরম আবহাওয়ায় মিশে গিয়ে অত্যাচারিত হলাম না, বরং খাতির-যত্নের অভাব হল না মোটেই। গত আড়াই বছর চন্দননগরের গঙ্গাবক্ষে চালু হয়েছে ভাসমান রেস্তোরাঁ জলশ্রী। বাংলার প্রথম ভাসমান রেস্তোরাঁ এটিই। এখানেই আমাদের টেবিল ভরে উঠল একের পর এক সুস্বাদু খাবারে। বাংলায় বসে বাঙালি খানাপিনার স্বাদ তো আছেই, তবে যাঁরা খাবার নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা করতে ভালোবাসেন, পছন্দ করেন অথেন্টিক গুণের পদ চেখে দেখতে – তাদের জন্য অপেক্ষারত দোদুল্যমান জলশ্রী। গঙ্গাবক্ষে ভাসতে ভাসতে আন্তর্জাতিকতার স্বাদ।

ডিপ ব্লু সি (বাঁদিকে), গন্ধরাজ ভেটকি কাটলেট (ডানদিকে)

জলশ্রীর খাবার-এর কথায় পরে আসছি। আপাতত পাঠকদের উদ্দেশে জানাই, পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের অধীনস্ত জলশ্রী (The Rivière Habitat) রেস্তোঁরা বোটটি ৩৩ মিটার লম্বা, ৪.৮৭ মিটার চওড়া এবং ১.৪০ মিটার গভীর। ১৬০ পিসি-র ইঞ্জিনে গতিবেগ ৬ নট। কমবেশি ৫০ জন লোক অনায়াসে একসঙ্গে বসে খেতে পারেন রেস্তোরাঁয়। ছোটোখাটো অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নেওয়া যেতে পারে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত নিচের ডেকে সাউন্ড সিস্টেমের বন্দোবস্ত আছে। মৃদু লয়ে চলছে রবীন্দ্র সংগীত। এছাড়াও বিনামূল্যে ওয়াইফাই তো রয়েছেই। গঙ্গার ওপর ছোটো অফিস মিটিংয়ের জন্য আদর্শ এই জায়গা। জলশ্রীর ম্যানেজার কৌশিক বিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এই বোট রেস্তোরাঁটি ব্যবহার করা যায় ছোটোখাটো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মিটিং, কনফারেন্সের জন্য। চন্দননগর তো বটেই, পাশাপাশি হাওড়া-হুগলি-কলকাতার বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ এখানে নিয়মিত আসছেন। গাইড, বোট সার্ভিস প্রোভাইডার, ট্যুরিজম হেল্পারের কাজ করে স্থানীয় অনেকের উপার্জনের একটা পরিসরও খুলে গিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন দপ্তরের এই উদ্যোগের ফলে।

খাবারের টেবিল থেকে বাইরের অপূর্ব দৃশ্য

প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর। এক সময়ে দুর্ধর্ষ জলদস্যুরা দাপিয়ে বেড়াত এখানে। শোনা যায়, তা সত্ত্বেও চন্দননগরের বেশ কিছু বণিক পরিবারের ময়ূরপঙ্খী জাহাজ পাড়ি দিত দূর-দূরান্তে। প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গার বুকে যুদ্ধ-রক্তক্ষয়-বাণিজ্যযাত্রার সাক্ষী চন্দননগর। এখানকার এবং গোটা বাংলার পুরোনো ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেবে রেস্তোরাঁ বোট জলশ্রী। ঐতিহাসিক চন্দননগর স্ট্র্যান্ডের পাশেই জেটিতে রাখা হয়েছে এটি। মাঝেমধ্যে ঘাট বদলায়। হেরিটেজ ক্রুজ ট্যুরিজমকে কেন্দ্র করে এখানে বেড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানও।

হেঁশেলে রান্নার প্রস্তুতি

চন্দননগর স্টেশন থেকে টোটো করে মাত্র দশ মিনিটের রাস্তা স্ট্র্যান্ড। নামলেই আপনার চোখের সামনে পড়বে ঐতিহাসিক রানিঘাট। দুই মাস আগে ওই রানিঘাটেই সংসার পেতেছিল জলশ্রী। তবে মাস দুয়েক হল সামান্য একটু সরে এসেছে। দু-পা হাঁটলেই আপনার বাঁ পাশে পড়বে ভাসমান এই রেস্তোরাঁ। ৫০ টাকার টিকিট সংগ্রহ করতে হবে প্রথমে। তবে পরে এই টিকিটের দাম খাবারের সঙ্গে সংযোগ করে দেওয়া হয়।

জলশ্রীতে প্রায় ৫০ জন ব্যক্তির বসবার জায়গা রয়েছে। ভিতরে খাবার টেবিল থেকে উপভোগ করুন বাইরের অপরূপ গঙ্গার সৌন্দর্য আর ওপারের উত্তর চব্বিশ পরগনার জগদ্দল সংলগ্ন বন-জঙ্গল-ঘাট। কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শনিবার অথবা রোববার বাদে সপ্তাহের যে কোনও দিন পারিবারিক অনুষ্ঠান পালন করার জন্য এই রেস্তোরাঁটি বুক করা যায়। তবে সেক্ষেত্রে সদস্য সংখ্যা ৩০ জনের মতো হতে হবে এবং প্রত্যেক সদস্যের জন্য খরচ হবে মাথাপিছু ১৫০০ টাকা। যার মধ্যে থাকবে কিছু মুখরোচক খাবার এবং থাকবে মধ্যাহ্নভোজের বাহারি আয়োজন। অতিরিক্ত গরমের জন্য এই মুহূর্তে বন্ধ রয়েছে দোতলা। তবে চাইলে এমনি ঘুরে আসা যায়।

জলশ্রীর দোতলা

প্রাক্তন ফরাসি উপনিবেশ চন্দননগর। এক সময়ে দুর্ধর্ষ জলদস্যুরা দাপিয়ে বেড়াত এখানে। শোনা যায়, তা সত্ত্বেও চন্দননগরের বেশ কিছু বণিক পরিবারের ময়ূরপঙ্খী জাহাজ পাড়ি দিত দূর-দূরান্তে। প্রাচীনকাল থেকেই গঙ্গার বুকে যুদ্ধ-রক্তক্ষয়-বাণিজ্যযাত্রার সাক্ষী চন্দননগর। এখানকার এবং গোটা বাংলার পুরোনো ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেবে রেস্তোরাঁ বোট জলশ্রী। ঐতিহাসিক চন্দননগর স্ট্র্যান্ডের পাশেই জেটিতে রাখা হয়েছে এটি। মাঝেমধ্যে ঘাট বদলায়। হেরিটেজ ক্রুজ ট্যুরিজমকে কেন্দ্র করে এখানে বেড়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক আদানপ্রদানও।

এবার আসি এখানকার খাবারের কথায়। জলশ্রীতে গিয়ে দেখলাম ইন্ডিয়ান, চাইনিজ, ইতালিয়ান সবরকমের খাবারই পাওয়া যায়। জামাই ষষ্ঠীর মরশুমে যাওয়ায় মেনু কার্ডে দেখা গেল বড়ো বড়ো করে লেখা ‘জামাই ষষ্ঠী স্পেশাল মেনু’ – আর তাতে রয়েছে তোপসে মাছ ভাজা, লুচি, ছোলার ডাল, মাছের মাথা দিয়ে মুড়ি ঘণ্ট, ভাপা ইলিশ, সরষে ইলিশ, কাঁচা আমের চাটনি। দোদল্যুমান রেস্তোরাঁয় এমন খাবার বাঙালি মাসি-পিসি আর খাদ্যরসিক জামাইয়ের কাছে স্বর্গীয়, সঙ্গে কর্মীদের জামাই আদর তো রয়েছেই। আমরা তিন বন্ধু এই জামাই আদরে ভাগ না বসিয়ে চেখে দেখলাম জলশ্রীর সবচেয়ে জনপ্রিয় কয়েকটি পদ – তিনজনের জন্য তিনটে ভিন্ন স্বাদের মকটেল অরেঞ্জ সানরাইস, ডিপ ব্লু সি আর ভার্জিন মোহিত – অতঃপর আমপোড়া শরবৎ। একে একে এল শেজওয়ান চিকেন, গন্ধরাজ ভেটকি কাটলেট, মাহি হরিয়ালি টিক্কা, বাসন্তি পোলাও-এর সঙ্গে গন্ধরাজ মটন কষা, বেইজিং ফ্রায়েড রাইস, শেষ পাতে গাজরের হালুয়া।

বেইজিং ফ্রায়েড রাইস

গন্ধরাজ ভেটকি কাটলেটের মূল উপাদান ভেটকি মাছ, এবং তা টাটকা না হলে খেতে ভালো লাগবে না। এক্ষেত্রে দেখা গেল একেবারে টাটকা ভেটকি আমাদের পাতে দেওয়া হল। মুখে কামড় দিতেই বোঝা গেল ভিতর থেকে যতটা তুলতুলে, বাইরে থেকে ততটাই মুচমুচে। এই পদে উপরি পাওনা গন্ধরাজ লেবুর সুঘ্রাণ।

মাহি হরিয়ালি টিক্কা প্রথমবার খেলাম। তাই পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। এটিও তৈরি হয়েছে ভেটকি মাছ দিয়ে। এই পদে কোনো কোটিং নেই, পুরোটাই চৌকো মাপের একটি মাছের টুকরো। দৈর্ঘ্যে ও প্রস্থে এক ইঞ্চি। চামচে করে ভাঙলেই বোঝা যায় কতখানি নরম এ পদ। জিভে অনেকক্ষণ লেগেছিল বিভিন্ন ভারতীয় মশলার অপূর্ব স্বাদ। সঙ্গে ছিল পুদিনার বিশেষ চাটনি।

জলশ্রীর বাইরে সন্ধেবেলার আড্ডা

বেইজিং ফ্রায়েড রাইস চিনের অন্যতম জনপ্রিয় খাবার। নুডলস ও রাইসের মিশ্রণ। বেসিল পাতার সুগন্ধে ম-ম করছিল পুরো পদ। উপরে সাজানো ছিল টুকরো করা ডিম সেদ্ধ, গাজর আর বেসিল পাতা। এই পদে মেশানো ছিল ডিম, চিকেন, চিংড়ি ও মাশরুম। ঝাল-ঝাল মশলাদার এ খাবারের স্বাদ অভূতপর্ব।

আর শরবতের কথা না বললেই নয়। প্রত্যেকটিতেই শুদ্ধ ফলের স্বাদ – যেমন অরেঞ্জ সানরাইসে ভেসে ওঠা কমলালেবু কুচি, আবার আমপোড়া শরবতে ছিল শুদ্ধ কাঁচা আমের ক্কাথ আর ভাজা মশলার অপূর্ব ঘ্রাণ।

বৃষ্টিতে ভেজা জলশ্রীর উঠোন

ফরাসডাঙায় এমন অপূর্ব খাবার খেয়ে রীতিমতো পাগল পাগল অবস্থা। আসলে চন্দননগরে ফরাসিদের স্থাপত্যকীর্তি আর বাঙালি বাবুদের বিলাস-ব্যসনের ছবি যেকোনো বাঙালিকেই মুগ্ধ করবে। তাতে যুক্ত হওয়া জলশ্রী যেন স্বাদের তুফান তুলেছে মাঝগঙ্গায়। যৎসামান্য খরচে এমন স্বর্গীয় খাবার খেতে খেতে সদ্য প্রেমে পড়া যুগলের চোখ যায় অদূরে ভাসমান ইলিশের নাও-এ। আর আমি ভাবি, এ দৃশ্য আর এসব খাবারের কথা লেখায় বর্ণনা করা বেজায় কঠিন। ফরাসডাঙায় বাংলার প্রথম ভাসমান রেস্তোরাঁ আপনাকে ডাকছে…

কীভাবে যাবেন রেলপথে চন্দননগর যাওয়ার জন্য হাওড়া থেকে মেইন লাইনের লোকাল ট্রেন ধরুন। চন্দননগর স্টেশনে পৌঁছাতে সময় লাগবে চল্লিশ মিনিট। তারপর সেখান থেকে যেকোনো টোটো ধরে বলুন স্ট্র্যান্ড। রানি ঘাটের আশেপাশেই দেখতে পাবেন ভাসমান জলশ্রী।

কলকাতা থেকে সড়ক পথে চন্দননগর যাওয়ার প্রবল সুবিধে রয়েছে। দিল্লি রোড ধরলে কমবেশি দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় চন্দননগর। এই রাস্তায় তেমন একটা ট্রাফিক নেই। দু-পাশের সবুজ দেখতে দেখতে সপ্তাহান্তে একটা ছোটোখাটো ট্যুর করে জলশ্রী থেকে লাঞ্চ বা ডিনার করাই যায়।

প্রবেশের সময়
প্রতিদিন সকাল ১১:৩০টা থেকে থেকে রাত্রি ১০টা অবধি এই রেস্তোরাঁটি খোলা থাকে।

Written by