
বাংলাতেই রয়েছে গান্ধিজির ‘দ্বিতীয় বাড়ি’, সোদপুরের খাদি প্রতিষ্ঠান। যা গান্ধি মেমোরিয়াল আশ্রম নামে পরিচিত। যদিও আম সোদপুরবাসী একে ‘খাদি ভবন’ নামে ডাকে। বাড়িটির সঙ্গে গান্ধিজির স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, একুটুই জানে বৃহত্তর সোদপুর-পানিহাটির এই প্রজন্মের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজন। টালির চালায় ছাওয়া আশ্রমটি, ‘U’ আকৃতির। মোট ন’টি ঘর। প্রথম ঘরটিতে থাকতেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি। সামনে উঠোন। বাগানের মাঝেই রয়েছে গান্ধিজির আবক্ষ মূর্তি। স্থানীয়রা অনেকেই জানেন না বাড়িটির ইতিহাস। এমনকি ঠিকানা জিজ্ঞাসা করলে চেনেনও না।
গান্ধিজয়ন্তীর প্রাককালে পৌঁছে গিয়েছিলাম বাড়িটিতে। দেখলাম পরিষ্কার, পরিচ্ছন্নের কাজ চলছে। কয়েকজন মহিলাকে নিযুক্ত করা হয়েছে। খাদি প্রতিষ্ঠানের প্রহরী চেতনরবি দাসের সঙ্গে দেখা হল। তিনি ১৯৬২ সাল থেকে সেখানে আছেন। বললেন, “সব পরিষ্কার করা হচ্ছে। কাল নেতারা আসবে। ঘর-দোর সব খোলা হবে।” বুঝলাম গান্ধিজয়ন্তী উপলক্ষ্যেই সাফাই করা হচ্ছে।


খসে পড়ছে প্লাস্টার, ভাঙা টালি, চোটে যাওয়া রং, ফাটল ধরা মেঝে, দেওয়াল; দেখলেই মনে হয় সময় কোথাও যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। নিজেকেই প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, এই বাড়িটিকেই নিজের ‘দ্বিতীয় বাড়ি’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন গান্ধিজি? চরম অবহেলায়, অনাদরে পড়ে রয়েছে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধির প্রিয় সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠান। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের ছাত্র, সুলেখা কালির জনক সতীশচন্দ্র দাশগুপ্ত প্রতিষ্ঠানটি তৈরি করেন। বিশ শতকের তিনের দশক থেকে এই প্রতিষ্ঠানটি দানা বাঁধতে শুরু করে। সতীশচন্দ্রই, গান্ধিজির আদর্শকে উপজীব্য করে প্রায় দু’লক্ষ টাকা দিয়ে সোদপুর স্টেশনের পাশে ৩০ বিঘা জমি কিনে গড়ে তোলেন খাদি প্রতিষ্ঠান। ১৯২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানের হস্তশিল্প বিভাগ ‘কলাশালা’র উদ্বোধনে আসেন গান্ধি। ১৯২৭ সালের ২ জানুয়ারি থেকে পথ চলা শুরু, প্রথম চেয়ারম্যান হন প্রফুল্লচন্দ্র রায়।
এই বাড়িটি যেমন পরাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী, তেমনই গ্রামীণ অর্থনীতির ভিত মজবুত করার লড়াইয়ের দলিলও বটে। এখানে সে’সময় ১২টি উৎপাদন কেন্দ্র, ২৫টি বিক্রয় কেন্দ্র, ৪৭৫জন তাঁতি এবং ৬৮০০টি চরকা ছিল। প্রতি মাসে প্রায় ১০ হাজার টাকার দ্রব্য উৎপাদিত হত। এখান থেকে বিভিন্ন বইও প্রকাশ করা হত। লাইব্রেরি, গবেষণাগার এমনকী ছাপাখানাও ছিল প্রতিষ্ঠানের। খাদি বস্ত্রের পাশাপাশি মধু, ধুপকাঠি, তালের গুড়, হাতে তৈরি কাগজ, দুগ্ধজাত সামগ্রী, ঘি, হলুদ, জিরে গুঁড়ো, রঙ, সাবান তৈরি হত। চরকা, ধান ভাঙার ঢেঁকি, তেল পেষাইয়ের ঘানি, মধু নিষ্কাশন, পাট প্রক্রিয়াকরণ, গো শালা সব মিলিয়ে গ্রাম স্বনির্ভরতার আদৰ্শ পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল খাদি প্রতিষ্ঠান। চেতনরবি দাস বাবু জানালেন, তিনি নিজেও এসব তৈরি হতে দেখেছেন। মধু তৈরির গল্প বলছিলেন। কিন্তু কালে কালে সব বন্ধ হয়ে গিয়েছে। চেতনবাবু পানিহাটি পৌরসভার কর্মী। প্রহরার দায়িত্বে এখন। তিনিই বললেন, খাদি প্রতিষ্ঠানের জায়গায় আস্তে আস্তে কোয়াটার তৈরি হয়েছে। এখন আশ্রমের জায়গা বলতে মোটামুটি তিন বিঘা জমি। দেখালেন কালো গ্রিল দিয়ে ঘেরা সীমানা, ওই সীমানাটুকুর মধ্যেই আশ্রম। গান্ধিজয়ন্তী, স্বাধীনতা দিবসের মতো দিনগুলোতে মানুষজন আসে। মূর্তিতে মালা, ফুল পড়ে।


এবার আসি ঐতিহাসিক ঘটনায়। গান্ধিজি ১৯২৭-‘৪৭-র মধ্যে একাধিকবার এখানে এসেছিলেন। ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে ত্রিপুরি কংগ্রেসের পর এই আশ্রমেই গান্ধিজির সঙ্গে বৈঠকে বসেন জওহরলাল নেহেরু এবং সুভাষচন্দ্র বসু (১৯৩৯-র ২৭-২৯ এপ্রিল)। সোদপুরে বসেই ২৯ এপ্রিল কংগ্রেস ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন নেতাজী। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বরে এই আশ্রমে ৫০ দিন ছিলেন গান্ধি। তখন প্রতিদিন সকাল, সন্ধ্যা প্রার্থনাসভা বসত। মানুষের ঢল নামত সোদপুরে। ভিড় সামাল দিতে প্রতি বিকেল ৪টে ১৫ মিনিটে শিয়ালদহ থেকে সোদপুরের উদ্দেশ্যে বিশেষ ট্রেন ছাড়ত। প্রার্থনা সভা রেকর্ডও করা হয়েছিল।
১৯৪৬ সালের ১০ অক্টোবর লক্ষ্মীপুজোর দিন নোয়াখালিতে শুরু হয় দাঙ্গা। সে’সময় এখান থেকেই নোয়াখালির উদ্দেশ্যে রওনা হন গান্ধিজি। ১৯৪৭-র ৯ আগস্ট গান্ধি শেষবারের মতো সোদপুর আসেন। অল ইন্ডিয়া রেডিও সোদপুর খাদি আশ্রমে বসেই তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করে। স্বাধীনতার দিন দুয়েক আগে, ১৩ আগস্ট সোদপুর থেকেই বেলেঘাটায় গিয়েছিলেন গান্ধি। সেই শেষবারের মতো সোদপুর ছাড়েন গান্ধিজি।
২০০৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানটিকে হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়। তবে, তখন সেভাবে কোনও সংস্কার হয়নি। আজ সেই বাড়ি জনশূন্য, বহু ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। খাদি প্রতিষ্ঠানের কেয়ারটেকার শঙ্কর চক্রবর্তীর সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন, “গোপালকৃষ্ণ গান্ধি যখন বাংলার রাজ্যপাল ছিলেন, সে’সময় তিনি খাদি প্রতিষ্ঠানের সংস্কারে উদ্যোগী হয়েছিল। গ্রিলের বাউন্ডারি দেওয়া হয়। ইলেকট্রিফিকেশন কাজ হয়।” আরও জানালেন ২০০৯ সালের প্রথম দিকেও এখানে পণ্য উৎপাদিত হয়েছে। তারপর সব বন্ধ। সংস্কার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতে জানালেন, “এখন হেরিটেজ কমিশন উদ্যোগ নিয়েছে। তারাই সংস্কার করবে। কাজ শুরু হবে। তবে কবে হবে জানি না।”


খাদি প্রতিষ্ঠানের অবহেলার প্রসঙ্গে বলছিলেন, “রামমোহন ট্রাস্টের একসময় এই প্রতিষ্ঠানটি সংস্কার করার কথা ছিল। এছাড়াও খাদি প্রতিষ্ঠানের অনেক ট্রাস্টি মারা গিয়েছেন। এ’সব নানান কারণে সংস্কার হয়নি। প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু জিনিস চুরিও হয়েছে। গোপালকৃষ্ণ গান্ধির আমলে, উত্তর ২৪ পরগণার তদানিন্তন জেলাশাসক খাদি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেন পানিহাটি পৌরসভাকে।” শঙ্করবাবু বললেন, “প্রণব মুখোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের জন্য বরাদ্দ করেছিলেন কিন্তু ২০১৪ সালে সরকার বদল হওয়ার পর সেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে যায়।”
খোঁজ নিয়ে দেখলাম, আহমেদাবাদের সবরমতী আশ্রম প্রিজার্ভেশন অ্যান্ড মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এই প্রতিষ্ঠানের পুনর্জীবনের দায়িত্ব নিয়েছিল। শোনা যায়, সোদপুরের গান্ধী আশ্রম সংরক্ষণের প্রকল্পটি বর্তমান কেন্দ্র সরকার বাতিল করে দেয়।
গান্ধিজির ঘরের তালা খুলতে খুলতে শঙ্করবাবুকে জিজ্ঞাসা করলাম, সম্প্রতি এক দৈনিক সংবাদপত্রে দেখলাম হেরিটেজ কমিশনের লোকজন ঘুরে গিয়েছেন। টাকা বরাদ্দ হয়েছে। তার কী খবর? তিনি জানালেন, “কাজ শুরু হবে। সব খাতায় কলমে হয়েছে।”


গান্ধিজির ব্যবহৃত চৌকি দেখালেন। যে চরকা তিনি ব্যবহার করতেন, তাও দেখালেন। অজস্র ছবি, গান্ধির সঙ্গে অন্য নেতাদের সাক্ষাতের ছবি, সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের কাটিংয়ের ছবি সাজানো রয়েছে দুটো ঘর জুড়ে, তাও দেখলাম। শঙ্করবাবু বলছিলেন, “কে আসেনি এখানে? সুভাষচন্দ্র বসু, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, জওহরলাল নেহরু, রাজেন্দ্র প্রসাদ, মোতিলাল নেহরু, সরোজিনী নাইডু, বিধানচন্দ্র রায়, খান আব্দুল গফ্ফর খান, এপিজে আব্দুল কালাম, এমনকি আফ্রিকা থেকেও লোক এসেছে।”
গান্ধিজি তাঁর লেখাপত্রে, চিঠিতে একাধিকবার এই আশ্রমের কথা লিখেছেন। ২০১৪ সালের এপ্রিলে ইউনেস্কো সত্যাগ্রহ তথা ভারতের অহিংস আন্দোলনের পীঠস্থানগুলির যে তালিকা করেছিল, তাতেও রয়েছে সোদপুর খাদি প্রতিষ্ঠানের নাম। এমন জায়গা ও তার ইতিহাসকে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না। এহেন স্থান সংরক্ষিত হোক এবং দ্রুত হোক, এইটুকুই চাওয়া।
তথ্যসূত্র :
ক্ষেত্রসমীক্ষা
এ বাড়ির প্রার্থনায় জনসমাগম সামলাতে চলত বিশেষ ট্রেন: শান্তনু ঘোষ (আনন্দবাজার পত্রিকা)
ছবি : শৌভিক রায়

