
“যদি মেয়েরা যুদ্ধবিমান চালাতে পারে, নিজের দেশের জন্য লড়তে পারে, তাহলে আমি একজন মেয়ে হিসেবে নিজের শিল্পকে বাঁচানোর জন্য লড়তে পারবো না কেন, বলুন তো?” – দৃঢ়প্রতিজ্ঞ গলায় প্রশ্ন করেন পুরুলিয়ার বিটি মৌসুমী চৌধুরী (Moushumi Choudhury Chau)। বীররসের নাচ ‘ছৌ’-এর উপর পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও যে সমান অধিকার, বিগত বছরগুলিতে তা সমাজের চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করেছেন এই মহিলা ছৌ-শিল্পী। ছৌ নাচ তাঁকে নিয়ে গিয়েছে পুরুলিয়া জেলার মালডিহ গ্রামের ছোট্ট পরিসর ছাড়িয়ে, বহুলাংশে বৃহৎ আন্তর্জাতিক মঞ্চে।
মনে করা হয়, ছৌ নাচের জন্ম হয়েছিল বাঘমুন্ডির রাজা মদন মোহন সিংদেও-এর শাসনকালে। এটি মূলত ভারতীয় আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য। অনেকে মনে করেন, তিব্বতি ‘ছাম’ নৃত্যধারা থেকে এই নাচের উৎপত্তি। ছৌ নৃত্যশিল্পীরা রং-ঝলমলে পোশাক পরে বিভিন্ন দেবদেবীর চরিত্র অনুকরণ করেন। মুখ ঢাকা থাকে রঙিন নিরেট মুখোশে। ২০১০ সালে ইউনেস্কো-র রিপ্রেসেন্টেটিভ লিস্ট অফ দ্য ইনট্যাঞ্জিবলকালচারাল হেরিটেজ অফ হিউম্যানিটি-র তালিকায় সগৌরবে জায়গা করে নিয়েছিল বাংলার ছৌ নাচ।

মৌসুমী চৌধুরী, Moushumi Choudhury Chau, ছৌ নাচের জন্ম, মহিলা ছৌ-শিল্পী, মহিলাদের কখনও ছৌ নাচ করতে দেখা যায় না কেন?, মিতালী ছৌ মালডিহ মহিলাদল, পুরুলিয়া থেকে প্রথম মহিলা ছৌ শিল্পী হিসেবে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন মৌসুমী
কিছু বছর আগে অবধিও ছৌ নাচে পুরুষ শিল্পীদের একছত্র আধিপত্য চলত। “মূলত আদিবাসী পরিবারের পুরুষরাই এই নাচে অংশ নিতেন। বাবা জগন্নাথ চৌধুরী ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান হয়েও ছৌ নাচের শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁকে দেখেই আমার মধ্যে নাচ শেখবার আগ্রহ জাগে। পুরুলিয়ার প্রতিটি বাড়িতেই ছৌ নাচের আবহ রয়েছে। প্রতিটি বাড়িতেই হয়তো আপনি একজন না একজন ছৌ শিল্পী পাবেন। ছৌ-এর বাজনা, তাল, মাত্রা ছোটো থেকেই ভীষণ টানতো আমাকে। ঘরের ভিতরেই ছৌ-এর সমস্ত সরঞ্জাম দেখতে পেতাম। বাবার সঙ্গে খেলার ছলেই দু-একটা স্টেপ করতাম কখনো সখনো। তবে ছৌ নাচ নিয়েই এগোতে চাই বা ক্যরিয়ার গড়তে চাই, এমনটা কখনো ভেবে দেখিনি।” – বঙ্গদর্শন.কম-এর সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেন মৌসুমী।
অষ্টম বা নবম শ্রেণিতে পড়তে পড়তে প্রথমবার মৌসুমীর মনে প্রশ্ন এসেছিল, মহিলাদের কখনও ছৌ নাচ করতে দেখা যায় না কেন? মহিলা চরিত্রগুলির প্রয়োজন থাকতেও সমস্তটায় দখল কেবল পুরুষ শিল্পীদেরই কেন? মেয়েরা এই লাফঝাঁপের নাচ করতে সক্ষম কিনা, উচিৎ-অনুচিত কিচ্ছু না ভেবে নিজের মতো করে চেষ্টা করেন মৌসুমী। আগে পুরুষ শিল্পীরাই একাধারে গণেশ-কার্তিক-মহিষাসুরের পাশাপাশি দুর্গা-কালী-নর্তকীর ভূমিকাও পালন করতেন। বর্তমানে এই ছবি বদলেছে। নারী চরিত্রগুলি তো বটেই, জোরালো পুরুষ চরিত্রগুলিও মহিলা ছৌ শিল্পীরাই দাপটের সঙ্গে পরিবেশন করেন। মৌসুমী যখন ছৌ নাচের জগতে পা রাখেন, সেভাবে কোনো মহিলা শিল্পীর নাম শোনা যেত না। এখন বহু মহিলাই এই নাচের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

মৌসুমীর জেঠুর হাত ধরে তৈরি হয়েছিল মিতালী ছৌ মালডিহ নৃত্যগোষ্ঠী; যদিও তা কিছু বছর চলে বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে মৌসুমীর বাবা জগন্নাথ চৌধুরী তা পুনরায় চালু করেন। পুরুষ ছৌ শিল্পীদের নিয়ে গঠিত এই গোষ্ঠীটি বহু জায়গায় গিয়ে ছৌ নৃত্য পরিবেশন করত। মৌসুমি জানান, “বাবা মনে করতেন, শিশুদের ছোটো থেকেই ছৌ নাচের প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে, তা দেখে আরও বহু মানুষ এই শিল্পের প্রতি আগ্রহী হবে এবং এমন পদক্ষেপ নেওয়া গেলে তা সামগ্রিকভাবে ছৌ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করবে।”
জগন্নাথবাবুর এক প্রস্তাব একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের পছন্দ হয় এবং তারা গ্রামেই একটি কর্মশালার আয়োজন করে। একরকম জেদ করেই তাতে অংশ নেন মৌসুমী; সঙ্গে তাঁর বোন ও গ্রামের অন্যান্য বেশ কিছু মেয়ে। সেই ওঁর ছৌ নাচে হাতেখড়ি। ঐ বছরই প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মিতালী ছৌ মালডিহ মহিলাদল’, যেখানে বর্তমানে মৌসুমি প্রশিক্ষকের ভূমিকায় নিয়োজিত রয়েছেন। ২০১৬ সালে সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছৌ ডিপ্লোমার কোর্স করেন। সেখানে ক্লাসের বাকি ৪৯ জন পুরুষ ছৌ শিল্পীকে পিছনে ফেলে প্রথম স্থান দখল করেন তিনি। এরপর শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন সেই বিশ্ববিদ্যালয়েই।

বর্তমানে পুরুলিয়ায় প্রায় ৩৫টিরও বেশি মহিলা ছৌ দল তৈরি হয়েছে। ৩০-৪০ জন সদস্য নিয়ে এক একটি দল। এই দলগুলির ক্ষেত্রে পুরুষদের ভূমিকা কেবল মাত্র বাজনা বাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাকি সমস্তটাই মেয়েরা সম্পাদনা করেন।
পুরুলিয়া থেকে প্রথম মহিলা ছৌ শিল্পী হিসেবে বিদেশে পাড়ি দিয়েছেন মৌসুমী। ২০১৮ সালে নরওয়েতে কর্মশালা পরিচালনা করেছেন। এছাড়া ২০১৯ সালে ‘এশিয়া প্যাসিফিক ইয়ুথ স্টোরিটেলিং কন্টেস্ট’-এ ১৯টি দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতায় ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে অর্জন করেছেন গ্র্যান্ড প্রাইজ। সম্প্রতি ইউনাইটেড নেশনস উইমেন্স ডিপার্টমেন্ট-এর তরফ থেকে ‘হম’ নামের যে পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়েছে, সেখানেও স্থান করে নিয়েছেন তিনি। “আমার কর্মজীবনে বহু মহিলা এসে জানিয়েছেন যে আমাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। নিজের থেকে অনেক বেশি বয়সের মহিলাদেরও প্রশিক্ষণ দিয়েছি। পুনের এক ছৌ কর্মশালায় একই সঙ্গে ৬৫ বছর বয়সী দিদার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল নাতনিও। এর চেয়ে পরম প্রাপ্তি একজন শিল্পীর জীবনে আর কীই বা হতে পারে!” বলেন মৌসুমী।
নিজের স্বপ্ন পূরণের ক্ষেত্রে, বাবার মতোই পাশে পেয়েছেন স্বামীকে। মৌসুমীর সঙ্গে তাঁর স্বামীর পরিচয় ছৌ নাচ প্রশিক্ষণের মঞ্চেই। বিয়ের পর দুজনে একসঙ্গে বাংলার বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু ছৌ কর্মশালা আয়োজন করেছেন। মৌসুমী এখন এক সন্তানের মা। সংসার সামলেও নিয়মিত জারি রেখেছেন শরীরচর্চা, কারণ ছৌ নাচের ক্ষেত্রে শারীরিক স্বচ্ছলতা একান্ত প্রয়োজনীয়।

বর্তমানে পুরুলিয়ায় প্রায় ৩৫টিরও বেশি মহিলা ছৌ দল তৈরি হয়েছে। ৩০-৪০ জন সদস্য নিয়ে এক একটি দল। এই দলগুলির ক্ষেত্রে পুরুষদের ভূমিকা কেবল মাত্র বাজনা বাজানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। বাকি সমস্তটাই মেয়েরা সম্পাদনা করেন। মৌসুমীর মতে, “মেয়েদের ক্ষেত্রে কেবল শারীরিক সক্ষমতাই যথেষ্ট নয়। সমাজ সংসার সবকিছুই মেয়েদের পথের বাধা। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র ছৌ নাচের অনুষ্ঠান করে জীবিকা নির্বাহ করা যথেষ্ট কঠিন। কেবলমাত্র অদম্য জেদ ও মনোবল নিয়েই সমস্ত বিপত্তি ঠেলে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।”
এগিয়ে চলেছেন মৌসুমী। তাঁর কাহিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে, সমস্ত হার না মানা মানুষের জীবনের পাথেয় হয়ে উঠছে।
_____
বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন উৎসা তরফদার

