
দু-তিন বছর আগে সমাজ মাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল যাতে একজন নৃত্যপটিয়সী নারী নাচের মুদ্রা দিয়ে একঘর ছাত্রছাত্রীদের জানাচ্ছেন, “এই আমি একাশিতে পা দিলাম”। কথাটা বলেই তিনি যেমন ভাবে নৃত্য প্রদর্শন করলেন তাতে অবাক না হয়ে পারা যায় না। অশীতিপর একজন মানুষ ওই রকম ভাবে শরীরের ভারসাম্য বজায় রেখে নেচে উঠতে পারেন! বিদূষী পূর্ণিমা ঘোষ (Purnima Ghosh) হলে সবই সম্ভব। রাসবিহারী গুরুদ্বারের পাশের বিল্ডিংয়ে দোতলায় উঠে কালো আর সবুজ রঙের মেখলা পরিহিতা, কপালে বড়ো টিপের পূর্ণিমা ঘোষকে সেই স্মৃতি মনে করিয়ে দিলে তিনি হেসে ওঠেন। বলেন, “ওটা আমার একটা জন্মদিন ছিল। ১ মে আমার জন্মদিন। ছাত্রছাত্রীরা সকলে এসেছিল। ভাবলাম নাচ ছাড়া ওদের আর কী-ই বা দিতে পারি! তাই একটা রবীন্দ্রনৃত্য করে দেখালাম। ভালো হয়েছিল?” শুধু ভালো কেন, ওই ভিডিও বুঝি কত মানুষের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল।

পূর্ণিমা ঘোষ : আগে ও পরে
আমার যিনি প্রকৃত গুরু মানে তাঁর জীবনের শেষ দিনটি অবধি যিনি আমার হাতটি ধরেছিলেন, তিনি হলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, বিশ্বভারতীর সংগীতভবনের অধ্যক্ষ গুরু শ্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদার। উনিই স্থাপন করেছিলেন এই ‘সুরঙ্গমা’।
যে সমাজ-রাষ্ট্রে বয়সবাদের রমরমা, বয়স্ক মানুষ হলে বাদের খাতায় ফেলে দেবার রেওয়াজ, যেখানে একটা বয়সের পর ক্যালসিয়ামের অভাবে মেয়েদের হাঁটু ব্যথা থেকে শুরু করে বাতের কষ্ট শুরু হয়; সেখানে আশি পার করে একজন নারী ওই রকম প্রায় উড়ে উড়ে নাচছেন এ তো বড়ো কম কথা নয়। তবে এই আশির তো কখনও আঠারো ছিল। সেই শুরুয়াতটা কেমন ছিল? পূর্ণিমা বলেন, “আমার বাবা ছিলেন তখনকার দিনের প্রখ্যাত মণিপুরী শিল্পী শ্রী ব্রজবাসী সিংহ। বাবা চল্লিশের দশকে কলকাতায় আসেন। কলকাতার অনেক বিখ্যাত মানুষ ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বাবার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বাবার প্রাথমিক তিন-চার জন ছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন পুরোনো বাংলা ছবির অভিনেত্রী মলিনাদেবী। ছিলেন শীলা হালদার, লীলা দেশাই এবং রেণুকা দে। বাবার হাতে মণিপুরী নৃত্য প্রথম কলকাতায় প্রাণ পেয়েছিল বললে অত্যুক্তি হয় না। দু-এক বছর পর কলকাতায় বম্বিং শুরু হলে বাবা পরিবারসহ নবদ্বীপ চলে যান। নবদ্বীপে তখন এবং এখনও বহু মণিপুরী পরিবার বাস করে। আমার জন্ম নবদ্বীপেই। অবশ্য আমার বড়ো দিদি আছেন। নবদ্বীপ বাসের এক দেড় বছর পর বাবা আবার কলকাতা ফিরে এলে আমরা থাকতে শুরু করি কালীঘাট এলাকায়। বাবা তখন একটি নাচের স্কুল খোলেন, নৃত্য বিতান। স্কুলটি বহু বছর ছিল। আমিও ছোটোবেলায় ওই স্কুলেই শিখতাম। মহাকালী পাঠশালায় পড়তাম আমরা দুই বোন। আমি ভালো রকম ফাঁকিবাজ ছিলাম পড়াশোনার ব্যাপারে। এদিকে মঞ্চে নাচছিও। এমনও হয়েছে, আমি এত ছোটো, মঞ্চে উঠেছি কিন্তু নাচছি উইংসে বসা বাবার দিকে তাকিয়ে। বাবা বাজাচ্ছেন আর বারবার দর্শকদের দিকে তাকিয়ে নাচতে বলছেন আমায়!”

পূর্ণিমার রক্তে মণিপুর
অর্থাৎ আজ যিনি পূর্ণিমা ঘোষ তাঁর সম্পূর্ণ নির্মাণ আপন বাবার কাছেই। সেটা স্বাভাবিকও। কারণ, নিজের বাবা-ই যদি এত বড়ো একজন গুরু হন তবে তো যে কোনও শিক্ষা বাড়ি থেকেই শুরু হতে পারে। কিন্তু পূর্ণিমা ঘোষের কথায় বাবা ছাড়াও অনেক গুরুর সান্নিধ্যের কাহিনি উঠে এলো, যাঁদের সম্মিলিত শিক্ষাই পূর্ণিমা ঘোষের আজকের শিক্ষা।

পূর্ণিমা ঘোষের দুই মেয়ে ঐন্দ্রিলা ও চান্দ্রেয়ী
আমার রক্তে তো মণিপুর। মণিপুরের মেয়েরা ভীষণ কর্মঠ হয়। আমার মাকেও তাই দেখেছি। সংসার সামলে কী সুন্দর নাচতেনও! আমারও সেই ট্র্যাডিশন। আবার নাচের পাশাপাশি বুটিকও করেছি। এখন আমার স্টুডেন্টরা সব পঁয়ত্রিশ থেকে সত্তরের মধ্যে। তারা আমার কাছে শুধু নাচ নয় যেন জীবন শিখতে আসে।
কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার বাবা এক সময় বললেন যে আমাকে আরও অনেক ট্রেনিং নিতে হবে। এটা যে শুধু আমার ক্ষেত্রে তা নয়, নৃত্য বিতানের সব ছাত্রছাত্রীকেই উনি বলেছিলেন। আচ্ছা, এর মধ্যে বলে রাখি আমার যিনি কত্তা শ্রী মিহির কিরণ ঘোষ, তিনি আর্কিটেক্ট ছিলেন পেশায়, বি.ই কলেজের ছাত্র- তিনিও কিন্তু আমার বাবার কাছে মণিপুরী শিখতে এসেছিলেন। এবং সেই তেরো বছর বয়সে সেই বাঙালি মানুষটির প্রেমে পড়ি এবং আমার একুশ বছর বয়সে বিয়ে হয়। আমার শ্বশুরবাড়ি বর্ধমানে। বর্ধিষ্ণু পরিবার। আমরা ঘটি। সে যাই হোক, বাবার কাছে মণিপুরীর পাশাপাশি আমি ভরতনাট্যম শিখলাম- কলকাতায় তখন এসেছেন গুরু মরুথাপ্পা পিল্লাই- তাঁর কাছে। তারপর কলকাতায় এসেছিলেন কথকনৃত্যের একজন গুরু শ্রী রাম সিং, তিনি আমাদের বাড়ি এসে উঠেছিলেন- আমি তাঁর কাছেও শিখেছি। তারপর মণিপুর থেকে আরেকজন এলেন গুরু টি. নদিয়া সিং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে- যদিও সেটার নাম তখন উদয়শঙ্কর একাডেমি বা ওই রকম কিছু ছিল- আমি সেই গুরুজির কাছে মণিপুরীর ফর্মাল মানে থিওরি এবং প্র্যাকটিকাল সব ধরনের ট্রেনিং নিয়েছিলাম। তবে আমার যিনি প্রকৃত গুরু মানে তাঁর জীবনের শেষ দিনটি অবধি যিনি আমার হাতটি ধরেছিলেন, তিনি হলেন প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী, বিশ্বভারতীর সংগীতভবনের অধ্যক্ষ গুরু শ্রী শৈলজারঞ্জন মজুমদার। উনিই স্থাপন করেছিলেন এই ‘সুরঙ্গমা’। শৈলজাদা প্রথমে রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক হয়ে বিশ্বভারতীতে যোগদান করেছিলেন। তারপর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে সঙ্গীতভবনের অধ্যক্ষ করেছিলেন শৈলজাদাকে। তারপর সেখান থেকে অবসর নিয়ে কলকাতায় ঠিক তুমি আর আমি যেখানে বসে আছি সেখানে উনি ‘সুরঙ্গমা’ শুরু করেন ১৯৬০ সালে। প্রথম ভবনটা অবশ্য পেছন দিকে ছিল। এ-জায়গাটা রিবিল্ড হবার পর আমরা এই দোতলায় উঠে আসি। শৈলজাদার সঙ্গে ছিলেন শ্রী প্রসাদ সেন, ইন্দিরা দেবী চৌধুরানীও খুব সম্ভবত তাঁর মৃত্যুর আগে যখন ‘সুরঙ্গমা’ তৈরি হচ্ছে তখন দু-একবার এসেছিলেন। আমি এখানে যোগ দিই ১৯৬২-তে। এবং সেই যে রয়ে গেলাম আর কোথাও যাইনি।”
কখনও নিজের কোনও স্কুল করেননি নৃত্যশিল্পী পূর্ণিমা ঘোষ। কারণ শৈলজারঞ্জন মজুমদার বলে গিয়েছিলেন, পূর্ণিমা! সুরঙ্গমা কিন্তু তোমার নিজেরই। আজও কেউ শিখতে এলে- সে সাধারণ ক্লাসে আসুক কিংবা স্পেশাল ক্লাস- পূর্ণিমা সব সময় বলেন সুরঙ্গমাতে আসতে। পূর্ণিমা ঘোষকে, তাঁর নৃত্যশিল্পকে শুধু বাংলা কেন সমগ্র ভারত চেনে। কিন্তু তিনি তো কেবল শিল্পী মাত্র নন, সংসারী মানুষও। আমাদের দেশে নারী শিল্পীদের জীবন খুব অনায়াস নয়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে তাঁদের যেতে হয় শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে। পূর্ণিমা ঘোষকে এমন কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি? তাঁর জীবন কি কুসুমাস্তীর্ণ ছিল? জিজ্ঞেস করতেই পূর্ণিমা ঘোষ আবারও তাঁর বিখ্যাত হাসিটা হেসে ওঠেন আর হারিয়ে যান খানিক অতীতে। বলেন, “প্রথম যখন বর্ধমানে শ্বশুরবাড়ি যাই গ্রামের সব লোক দেখতে এসেছিল যে তাদের গ্রামে চিনাম্যান বউ এসেছে! মণিপুরী ও বাঙালি সংস্কৃতির মধ্যে চিরকাল একটা সহাবস্থান ছিলই। আমার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা বিশেষত আমার শাশুড়ি-মা, আমার ভাসুর- সকলেই আমার নাচকে সম্মান করেছেন। আর কত্তা তো ছিলেনই সঙ্গে মানে বহু সময় উনি বহু নৃত্যনাট্যে আমার নায়ক হয়েছেন। আমি দু-হাতে সংসার করেছি এবং নাচও করেছি। আমার দুই মেয়ে- বড়োজন ঐন্দ্রিলা, সেও নৃত্যশিল্পী আর ছোটো চান্দ্রেয়ী- সে অভিনেত্রী। ওদের স্কুলের টিফিন বানিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে বাড়ির রান্নাবান্না, ওদের পড়াশোনা- সব করেছি একা হাতে। এবং আমার কখনও অসুবিধা হয়নি এসব করতে। আসলে কি জানো আমার রক্তে তো মণিপুর। মণিপুরের মেয়েরা ভীষণ কর্মঠ হয়। আমার মাকেও তাই দেখেছি। সংসার সামলে কী সুন্দর নাচতেনও! আমারও সেই ট্র্যাডিশন। আবার নাচের পাশাপাশি বুটিকও করেছি। এখন আমার স্টুডেন্টরা সব পঁয়ত্রিশ থেকে সত্তরের মধ্যে। তারা আমার কাছে শুধু নাচ নয় যেন জীবন শিখতে আসে। ওরাই বলে এসব। সকালে ঘুম থেকে উঠি। বাড়ির টুকটাক কাজ করি। দুপুরে খেয়ে একটা ঘণ্টা ঘুমাবোই। আর প্রতিদিন বিকেল চারটে থেকে সাতটা এই সুরঙ্গমাতে আসি। বুকে পেসমেকার বসেছে। দু-মাস আগে হিপ-বোনে সার্জারি হয়েছে। কিন্তু নাচ করতে কোনও ক্লান্তি নেই।”

চুরাশির ‘তরুণী’ পূর্ণিমা ঘোষ
সত্যিই পূর্ণিমা ঘোষ বহু মানুষের প্রেরণা এই সব কারণেই। তিনি মণিপুরী অধ্যয়ন করেছেন, ভরতনাট্যম আজও শেখান। সঙ্গে তো রবীন্দ্রনৃত্য আছেই। কিন্তু আজকের যে রবীন্দ্রনৃত্য- সেই ধারা কি তাঁকে খুশি করতে পারে? তিনি উত্তর দেন, “রবীন্দ্রনৃত্য একশো বছরের পুরোনো একটি শিল্পমাধ্যম। উদয়শঙ্কর স্টাইল অফ ডান্সেরও আগে রবীন্দ্রনৃত্য। বাঙালির আপন নৃত্য। শৈলজাদার অনুপ্রেরণায় আমি আরও কিছু বিদেশি নৃত্য যেমন ক্যান্ডি, জাভা- এইসব শিখেছিলাম শুধু না, রবীন্দ্রনৃত্যে সেগুলো প্রয়োগও করেছি। আমাদের ধারাটা সর্বজনস্বীকৃত। হয়তো রবীন্দ্রনৃত্যের নামে অনেক সময়ই খুব খারাপ নাচ হয়, রবীন্দ্রনৃত্যের প্রকৃত দর্শন ফলো করে না সেগুলো, তারপরেও বলব, কোনটা ঠিক কোনটা ঠিক নয় সেগুলো বলে দেবার দায়িত্ব তো সিনিয়রদের, তাই না? আর তাছাড়া এই যুগ সাংঘাতিক গতিতে ছুটছে, সবকিছু অনলাইন হয়ে যাচ্ছে কিন্তু নাচের মতো গুরুমুখী বিদ্যা গুরুর সামনে শেখা ছাড়া কোনও উপায় নেই। টিভিতে নাচের নানা প্রতিযোগিতা হয়, সেগুলোর দরকার আছে কিন্তু গোজামিল দিয়ে আর যাই হোক নাচ হয় না। হবে না।”

পূর্ণিমা ঘোষ আজ বহু মানুষের প্রেরণা
আপাত মজার মানুষটির ভেতর যে একজন গম্ভীর দার্শনিক, গবেষক সর্বোপরি ভীষণ অভিজ্ঞ একজন নৃত্য প্রশিক্ষক রয়েছেন তা পূর্ণিমা ঘোষের এই কথাগুলো শুনলে বোঝা যায়। তিনি এমনই থাকুন। শুধু চুরাশি কেন একশোতে পা দিয়েও সুরঙ্গমার নৃত্যপারঙ্গম পটিয়সী বিদূষী পূর্ণিমা ঘোষ যেন একই ভঙ্গীতে নেচে যেতে পারেন।
___________
*সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত
