বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিনলিপিতে মনের স্নান

দিনলিপি মনের নিকটতম লেখা, মানুষের যাপনের সারাৎসার কালো অক্ষরমালায় ফুটে ওঠে সাদা পৃষ্ঠার খসখসে শরীরে। তাঁর জীবনে শূন্যতা ও পূর্ণতা, বিপন্ন-বিস্ময় থেকে অগাধ বেঁচে থাকার ঢেউয়ের গুঞ্জন, কাউকে বলতে না পারার আনন্দ দুঃখের নিভৃত-বন্ধু দিনলিপি। সেই দিনলিপি যদি কোনো সৃষ্টিশীল মানুষের হয়, যে নিজের জীবন নিয়ে সারাক্ষণ কান পেতে আছেন নতুন সৃষ্টির জন্য; তাহলে তাতে ধরা পড়ে শিল্পকাজের আগমুহূর্ত ও পরমুহূর্ত, শিল্পীর শ্রম ও যন্ত্রণা, প্রতিদিনের কীভাবে বেঁচে আছি এই আশ্চর্য-বোধের ইতিহাস।

রবীন্দ্রনাথের ডায়েরি পড়ার সুযোগ নেই, রানি চন্দের লেখাগুলি, ছিন্নপত্রাবলী-সহ অন্যান্য কিছু চিঠি পড়তে পড়তে আমরা রবীন্দ্রনাথের একেবারে ব্যক্তি-জীবনের কিছু অংশের ছায়ারোদ দেখতে পাই, যেন জানলা দিয়ে দেখা, মহৎ এক জীবনের ধূ-ধূ হাওয়া-বাতাস চোখেমুখে এসে লাগে। পদ্ম যেমন ধীরে অতি ধীরে নিজের পাপড়িগুলো খুলে দেয়, এক একটি দিনের বিকশিত হওয়াও তেমনি আমরা দূর থেকে দেখি। নদীতীরে অসীম নির্জনতায় বালুচর কাঁপতে কাঁপতে ডুব দেয়। সন্ধ্যাতারা ওঠে, অস্ত যায়।

শুধু অতীতে চলে যাওয়া নয়। হাজার হাজার বছর পরের কথা লিখছেন। অর্থাৎ একজন লেখক সমসময়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেহমনে ধারণ করছিলেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্রোত। লিখছেন একটি বালক ও প্রৌঢ়ের ভবিষ্যৎ – পৃথিবীতে ভ্রমণের কথা।

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা স্মৃতির রেখা, তৃণাঙ্কুর, ঊর্মিমুখর আমাদের এই সর্বনাশ সময়ে আরও বেশি করে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। যখন মানুষের লোভ হিংসা নির্লজ্জতা সীমাহীনভাবে বেড়ে গেছে, অসাড় কথার ঢেউ, ব্যক্তি আক্রমণ, রুচির দৈন্য চারিদিকে প্রকট; তখন ঠিক তখনই নিজেকে স্থির রেখে অনন্তের দিকে উড়ানের জন্য, কল্পনা-প্রতিভাকে জিইয়ে রাখার জন্য, অবাক বিস্ময়কে কোনোমতেই নিভতে না দিয়ে তুচ্ছতার মধ্যে গভীর আনন্দকে খুঁজে পাওয়ার জন্য একান্ত করে দরকার এখন এইসব নিভৃত-পাঠ। যত্ন করে স্মৃতির রেখা, তৃণাঙ্কুর বারে বারে যদি পড়ি তাহলে ধরা পড়বে যে জীবনটা পেলাম, তার জন্য অসীম কৃতজ্ঞতা, অনেক নাই নাই বোধ ও অপ্রাপ্তির ভিতরেও গভীরতর লাভের সেই অপূর্ব সমে এসে দাঁড়ানো মন।

অবধারিতভাবে রবীন্দ্রনাথের গান মনে পড়বে –

“আমি   বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।
এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর জীবন ভ’রে॥
না চাহিতে মোরে যা করেছ দান– আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ,
দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায় সে মহা দানেরই যোগ্য ক’রে
অতি-ইচ্ছার সঙ্কট হতে বাঁচায়ে মোরে॥”

এই যে না চাইতেই আকাশের নীল, বাতাসের আশীর্বাদ শরীর মন দিয়ে উপভোগ করতে পারছি তার জন্য নতজানু যে শ্রদ্ধার বোধ, ক্ষয়- অন্ধকার থেকে উঠে দাঁড়ানো আলোর যে স্বাদ, তার ধারাবিবরণী যেন এইসব দিনলিপি বিভূতিভূষণের।

“বেলা পাঁচটা, ঠিক সন্ধেটা হয়ে এসেছে, ছোট ছোট সেই অজানা রাঙা ফুলগাছগুলোর দিকে চেয়ে কেমন হঠাৎ আনন্দ এসে পৌঁছলো – নাথনগরেরে আমগাছগুলোর ওপর সূর্য অস্ত যাচ্ছে, কেমন রাঙা হয়ে উঠেছে সেদিকের আকাশটা – এই সামান্য জিনিসের আনন্দ, কচিমুখের অকারণ হাসি, রাঙা ফুলগাছটা, নীল আকাশের প্রথম তারা, ঐ যে পাখীটা বাঁকা ডালে বসে আছে, সবসুদ্ধ মিলে এক এক সময় জীবনের কেমন গভীর আনন্দ এক এক মুহূর্তে আসে…”

বিভূতিভূষণের মনে হঠাৎ আনন্দ-মুহূর্ত তৈরি হয়েছে। শুধু আনন্দ নয় কিন্তু, গভীর ও ব্যাপ্ত আনন্দ। এর কারণ হিসেবে জানতে পারছি কতগুলো অস্তসূর্যর রঙে রাঙা ফুলগাছ, পাখি, নীল আকাশের তারা ইত্যাদি। এই লাইনে এসে দাঁড়িয়ে থাকত হয় কিছুক্ষণ। সামান্য বনঝোপ ওমন আনন্দের ঢেউ আনছে। এক কবি রেললাইনের ধারে নামহারা ফুল দেখে পেয়েছিলেন নাটক লেখার আইডিয়া। বিভূতিভূষণ ডুবে যাচ্ছেন মগ্ন আনন্দের ঢেউজলে।

এবার আত্মপ্রশ্ন করি যদি, কবে দেখেছি শেষ সূর্যডোবা, কবে আলোর রং বদলে সন্ধে সময়কে একা বুঝতে চেয়েছি, কতদিন হয়ে গেল আকাশের মেঘেদের বদল খেয়ালই করিনি, সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে যায় প্রকৃতি থেকে আমাদের দূরত্ব-রেখা। ওঁর দেখার আর একটি বিশেষত্ব হল, বর্তমানবিন্দু দাঁড়িয়ে মনকে বহুদূর অতীতে নিয়ে চলে যাওয়া। সাধারণ দশ বিশ বছরের দূর নয় কিন্তু, সুদূর হাজার হাজার বছর আগে।

বিভূতিভূষণ ‘Emotional Sadness’-কে বারংবার গুরুত্ব দিচ্ছেন, সব পেয়ে যাওয়া নয়, না পাওয়ার ভিতরেও যে দুঃখ দিনের রক্তকমল আছে তার মধুর খোঁজে মনকে নিয়ত সজাগ রাখার কথা বলছেন।

“হঠাৎ যেন মনে হল হাজার হাজার বছর আগে যে সব পাখী বনে বনে গান গেয়ে চলে গিয়েছে, আজ এই ছায়াভরা সন্ধ্যায় তারাই যেন আবার কোথা থেকে গেয়ে উঠল। যে সব ছেলে মেয়ে হাজার বছর আগে মা-বাপের কোলে মিষ্টি হাসি হেসে কতদিন হল ছেলেবেলায় দেখা স্বপ্নের মত কোথায় মিলিয়ে গিয়েছে, আজ সেই সন্ধ্যায় সেই সব অস্পষ্ট দূর অতীতের ছেলেপিলে মিলিয়ে যাওয়া হাসিরাশি – নদীর ধারে বনে বনে মাঠে মাঠে ঝোপে ঝোপে ফুল হয়ে ফুটে গোধূলির আঁধার আলো করে আছে।”

শুধু অতীতে চলে যাওয়া নয়। হাজার হাজার বছর পরের কথা লিখছেন। অর্থাৎ একজন লেখক সমসময়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেহমনে ধারণ করছিলেন অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের স্রোত। লিখছেন একটি বালক ও প্রৌঢ়ের ভবিষ্যৎ – পৃথিবীতে ভ্রমণের কথা। ভবিষ্যৎ-বালকের চোখে অপার বিস্ময়। এটা ওটা জিজ্ঞাসা করছে, যেমন করে কুঠির মাঠে পড়ন্ত বিকেলে অপুর নবীন চোখে জাগে অনন্ত জিজ্ঞাসার রোদ তেমন।

“এখন থেকে বিশ কি ত্রিশ হাজার বছর পরের কথা। এই প্রকাণ্ড কলকাতা শহরের ওপরে কয়েক শত ফিট পলি জমে গিয়েছে, মনুমেন্টের চূড়োটারও অনেক উপর পর্যন্ত মাটি জমে গিয়েছে, তার উপর দিয়ে এক বিরাট বিশাল মহাসমুদ্র প্রবাহিত হচ্ছে, কত মাছ কত প্রবাল কত ভীষণদর্শন সব সামুদ্রিক প্রাণী তার কুক্ষির মধ্যে…”

বিভূতিভূষণ তরল আনন্দের বিরোধিতা করছেন। সমাজ ও পুঁজি অবিরাম আমাদের ক্রেতা বানিয়ে, কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে ঠেলে দিচ্ছে তরলতর সুখভোগের দিকে। বিভূতিভূষণ ‘Emotional Sadness’-কে বারংবার গুরুত্ব দিচ্ছেন, সব পেয়ে যাওয়া নয়, না পাওয়ার ভিতরেও যে দুঃখ দিনের রক্তকমল আছে তার মধুর খোঁজে মনকে নিয়ত সজাগ রাখার কথা বলছেন। তাতে নিজের মনের অচেনা ভূখণ্ডগুলো আবিস্কৃত হয়, অনুভূত হয় মহাবিশ্বের নিঃসঙ্গতা ও পবিত্র বিষাদ।

“এই গাছপালা, মটরলতা, পাখীর গান, সন্ধ্যাকাশে বর্ণের ইন্দ্রজাল – এ অন্য জগৎ – আমি সেই জগতে ডুবে থাকতে চাই – সেটা আমারই কল্পনায় গড়া আমারই নিজস্ব জগৎ, আমার চিন্তা, শিক্ষা, কল্পনার, স্মৃতি সব উপকরণে গড়া!”

এইরকম একটা সংবেদনশীল মন নিয়ে চললে তো চারপাশ ছিন্নভিন্ন করে দেবে, বাস্তব একেবারে থেতলে ঘষটে দেবে মন। তাহলে উপায়? উপায় নিজের শুশ্রূষাঘর, নিজের নিরাময়কেন্দ্র নিজেকেই বানিয়ে তোলা। মায়ের গর্ভের মতো গোপন ও নিরাপদ। বিভূতিভূষণের সেই প্রকৃতি ও গ্রহান্তরের ছায়াপাতে গড়া সেই আনন্দগৃহের আভাস দেখতে পাই আমরা। এর থেকে মনশিক্ষা নেওয়া যায়, এই পৃথিবীতে নিজের মনকে কীভাবে বাঁচাব।

কলকাতায় ভোরে উঠে ইডেন গার্ডেনে যাচ্ছেন। ভেজা ঘাসে বেড়াতে বেড়াতে খালের জলে রত্ন-মৃণাল দেখছেন। কেয়াঝোপের পাশে বসে ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের ছক তৈরি করছেন। খসড়া করার সময় নাম ছিল ‘আলোক-সারথি’। গ্রামে ফিরে প্রকৃতি হচ্ছে বিশল্যকরণী। আট আনা খরচা করে নৌকা ভ্রমণে মনের শ্রান্তি ধুয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামের মানুষের অশিক্ষা, কুসংস্কার, অজ্ঞানতা পীড়া দিচ্ছে মনকে। শিক্ষার গুরুত্বের কথা মনে জাগছে। আবার গ্রামবাসীর সলতেখাগী আমগাছতলায় ঝড়ে আমকুড়ানো দেখে চোখে জল আসছে। স্নান করে বাড়ি ফেরার পথে আকাশের মেঘস্তুপে মনের পাশাপাশি শরীর অবধি দুলে উঠছে। এই আমগাছটি বিশেষ, পথের পাঁচালীতে এর উল্লেখ আছে।

একটি গাছও জাগ্রত মনে ওমন চিরছাপ রেখে গেছে। তাই আমরা দেখতে পাই সমগ্র সাহিত্যে মানুষজনের পাশাপাশি সমান গুরুত্বে আছে গাছপালা, ফলফুল, মাঠঘাট, কীটপতঙ্গ, উদার ও উন্মুক্ত প্রকৃতি। শিল্পীর আত্মতৃপ্তিই আসলে সর্বনাশের রূপো-ঘণ্টা। আত্মতুষ্টি এলেই সৃষ্টিকাজ একটি আবর্তে ঘুরতে থাকে। সাধকের মতো চোখ বুজে নয়, চোখ খুলে চারপাশের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শকে উপভোগ করে আনন্দ বেদনায় মুদ্রিত করে চলাই কাজ; এর জন্য পার্থিব জীবনের অনেক কিছুই মরুভূমি হয়ে যায়, সারাক্ষণ সাধনা করতে হয়, দুঃখ মৃত্যুকে পার করে মনকে অসীমে শিল্পের পায়েই উৎসর্গ করতে হয়। প্রত্যেক শিল্পীর পথ নিজের নিজের মতো। খুঁজতে খুঁজতে পাওয়া।

অপরাজিত উপন্যাস ছাপা শুরু হওয়ার ঠিক আগে একটি সাধনাকাজ কীভাবে হবে ওঁর জীবনে সেই পথহদিশের একটি তালিকা আমরা পাই। তালিকাটি গভীরভাবে দেখলে বিভূতি জীবন ও সাহিত্যের অনেকগুলি তল স্পষ্ট হয়। লিখছেন ডায়েরিতে –

(১) ভাল ভাল উপন্যাসকার ও ছোটগল্প-লেখকদের পুস্তক পাঠ।
(২) ইতিহাস, Biology ও Astronomy সম্বন্ধে আরও বই পড়া।
(৩) Philosophy সম্বন্ধে আধুনিক চিন্তাবিদদের বই পড়া।
(৪) Sir Thomas Browne ও Anatole France-এর বই আরও ভালো করে পড়া।

(৫) চিন্তা, ভ্রমণ, গল্প ও আড্ডা – ভাল সম্প্রদায়ের।
(৬) পল্লীতে যাওয়া ও quaint ধরনের লোকের সঙ্গে আলাপ।

যখন একটু নামখ্যাতিতে মন টলোমলো নিজেকে মাথা ছাড়িয়ে যাওয়া মানুষ বলে মনে করাটাই যুগস্বভাব তখন বিভূতিভূষণের দিকে তাকিয়ে দেখি নিজেকে আরও দীনভাবে কীভাবে নিয়োগ করছেন নতুন সৃষ্টিতে। কোনো স্বীকৃতি, কোনো পুরস্কার বা সংবর্ধনা মনে ছায়াপাত করছে না। শ্রীরামপুরে আনন্দ পরিষদের অধিবেশনে সভাপতিত্ব করে ফিরতি ট্রেনপথে জিরেট-বলাগড়ের একজন মানুষের সঙ্গে বিড়ি খেতে খেতে গল্পগুজব করতে করতে ফিরছেন। এই লোক দেখা ও তাদের আন্তরিক যত্নে শোনা এর পরিচয় বহুবার আমরা দেখেছি বিভূতিজীবন ও অপুজীবনে। জীবনের প্রেরণা পাচ্ছেন পুরোনো ভিটা, বাঁশবন ও মায়ের রান্নার কড়াখানার কাছ থেকে। এই জিনিস পড়লে মন সজল হয়ে আসে। বিকেলবেলা নিজের ভিটেতে গিয়ে বই নিয়ে খানিকটা পড়ে আসছেন। বাতাস বইছে। আনন্দে শরীর শিউরে উঠছে ওঁর।

এই রক্তগোধূলি সময়ে আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত দুঃখ-রাতে, জীবনের শ্রী ও সুষমা থেকে মন উঠে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হলে, মনকে সুন্দর ও শিল্পের কাছাকাছি রাখার জন্য আমরা বারবার ফিরব বিভূতিভূষণের দিনলিপি-র কাছে। ওঁর লিখিত জীবন ও সাহিত্য হোক আমাদের সন্ধ্যামেঘের ছায়ার নিচে সম্পূর্ণ মনশিক্ষা, প্রশান্তি ও স্নানের আরাম।

__________
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডায়েরি থেকে উদ্ধৃত-অংশগুলির বানান অপরিবর্তিত রইল | গ্রন্থঋণ: দিনের পরে দিন

Written by