জল কি তোমার কোনো ব্যথা বোঝে? : প্রসঙ্গ তিতাস একটি নদীর নাম

৯২৫ সালে জন্ম হয়েছিল তাঁর, তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার রাজশাহী জেলায়। দেশটভাগের বহু আগেই তিনি চলে আসেন কলকাতায় পড়াশোনার জন্য। বলা যেতে পারে, তাঁর যৌবনের অধিকাংশ সময়টাই কেটেছে কলকাতায়। কিন্তু দেশভাগের পরে যেটা সব থেকে বড়ো সমস্যা হয়ে দাঁড়ালো, তা হল একটা অবশ্যম্ভাবী সত্য যে তাঁর বাড়িটা এখন ওপারে, সেখানে আর সহজে যাওয়া হবে না কখনও। সেখানে যেতে হলে একটা আন্তর্জাতিক রেখা লঙ্ঘন করতে হবে। ঋত্বিক ঘটক (Ritwik Ghatak) প্রথম ছবি বানালেন নাগরিক। আমরা দেখতে পাচ্ছি, একটা নগরকেন্দ্রিক মানুষের যান্তব শহরে বেঁচে থাকার গল্প, অযান্ত্রিক-এ তিনি চলে যাচ্ছেন আরেকটা বাংলা খুঁজতে, যেখানে থাকে সেই বাংলার আদি বাসিন্দারা। কোমল গান্ধার-এও আমরা দেখি ভৃগু আর অনসূয়া খুঁজছে ফেলে আসা বাড়ি, কিন্তু যাওয়ার উপায় নেই, তাই কলকাতাকেই তারা মেনে নিচ্ছে প্রেমের কুঞ্জবন হিসেবে, যেখানে ভারতের জন্ম হবে, এক নতুন ভারত। বারবার ঋত্বিক ঘটকের সিনেমা-তে আসছে বাড়ি না ফিরতে পারার গ্লানি ও শোক।

ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র জীবনে তাঁর স্টাইলকে নিজেই বারবার চ্যালঞ্জ করে গেছেন। এবং সেই কারণেই, প্রায় একই রকমের বিষয় নিয়ে সিনেমা বানালেও সেই সবকটা ছবির একটা স্বাধীন ভাষা রয়েছে। স্টুডিও লাইটের যে আধিপত্য আমরা দেখি নাগরিকে তা সম্পূর্ণ সরে যায় অযান্ত্রিকে। অনেক বেশি ন্যাচারাল হয়ে উঠল তাঁর ছবির আলোক সম্পাত। যদিও সেই যান্তব আলোকেই সম্বল করে ঋত্বিক নির্মাণ করলেন নীতাকে মেঘে ঢাকা তারা-য়। দর্মার ফাঁকফোকর দিয়ে ঢুকে পড়া আলো হয়ে উঠলো নিপীড়িত নীতার মাথার মুকুট। আর কোমল গান্ধারের ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, এই দুই ডিসিপ্লিনের সংমিশ্রণ ঘটালেন তিনি। কিন্তু এই ডিসিপ্লিন থেকে সম্পূর্ণ ডিপার্চার দেখলাম তিতাস একটি নদীর নাম (Titash Ekti Nadir Naam/1973) ছবিতে। এক প্রকার নতুন ভাবে যেন আবিষ্কার করলেন ঋত্বিক তাঁর ছবি নির্মাণের প্রক্রিয়াকে।

এককালের ওপার বাংলা, তারপরে পূর্ব পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ, ঋত্বিকের হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমি, যেখানে ট্রেন যেতে পারে না, বারবার বাফারে গিয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ে। কোমল গান্ধারে যে পদ্মাপারের বাফারে ট্রেনটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তিতাস যেন সেখান থেকেই গল্পটা তুলে নেয়।

প্রথমত বলতে হয়, যে বাড়ি তিনি হারিয়েছেন, তিতাসে সেই বাড়িকেই যেন নির্মাণ করতে চেয়েছেন। কোথাও গিয়ে অদ্বৈত মল্লবর্মনের তিতাস তাঁকে সেই পরিসরটা দিল। বাড়ি ছাড়ার আগের গল্পটা বলতে। এককালের ওপার বাংলা, তারপরে পূর্ব পাকিস্তান ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ, ঋত্বিকের হারিয়ে যাওয়া মাতৃভূমি, যেখানে ট্রেন যেতে পারে না, বারবার বাফারে গিয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ে। কোমল গান্ধারে যে পদ্মাপারের বাফারে ট্রেনটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে, তিতাস যেন সেখান থেকেই গল্পটা তুলে নেয়। ছোটোবেলা থেকে আমরা পড়ে এসেছি বাংলা নদীমাতৃক দেশ। নদী, নদীর চর, জলা জংলা দিয়ে গড়া বাংলা, কিন্তু তার মূল ভাগটাই রয়ে গেছে ওপারে। সেই খোঁজেই যেন ঋত্বিক পাড়ি দিলেন বাংলাদেশ।

তিতাসের দৃশ্যপট নির্মাণ নিয়ে কথা বলতে গেলে যেটা সবথেকে অবাক লাগে, তা হল নদীর বুকে নেওয়া ঋত্বিকের পরিচালনায় বেবি ইসলামের তোলা দুঃসাহসিক শটগুলো। তখনকার ক্যামেরা আর এখনকার ক্যামেরার মধ্যে মনে রাখা দরকার বিস্তর তফাৎ। ঢাউস বডি, তাছাড়া ব্যাটারিতে চলে না, চলে ডিসি কারেন্টে, প্রায় ২২০/৪৪০ ভোল্ট। সেই নিয়ে তাঁরা নদীর মধ্যে আকূল বর্ষায় যে কারিগরি মুন্সিয়ানায় শটগুলো ক্যামেরা বন্দি করেছেন তা দেখলে মনে হয় না, যে তিতাস আদতে সেলুলয়েড যুগের ছবি। বরং মনে হয়, এই ছবির নির্মাণ হয়েছে আমাদের সমকালীন সময়ে।

ফেলে আসা মাতৃভূমি নির্মাণ করবেন কী করে? কী সূত্রে আবার যোগস্থাপন করবেন সেই আত্মার সঙ্গে? তিতাস দেখে বারবার এই প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। তিতাস যেন ঋত্বিকের আখ্যানের নদী যা এক সময় ফুরিয়ে যাবে, যার বালুচরে থেকে যাবে ইতিহাসের চূর্ণ-বিচূর্ণ ছেঁড়া ছবি ও কথন। জলের প্রতি যে ঋত্বিকের একটা অমোঘ টান ছিল, তা বোঝা যায় অযান্ত্রিকে বর্ষার দৃশ্যটি দেখলে। আপোষহীন দুঃসাহসিকতা ও পশ্চিমী ফিল্মের বাক্সকে নিয়ে কোন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, ফিল্মকে একটা ফিজিক্যাল মাধ্যম হিসাবে কী কী ভাবে এক্সপ্লয়েট করা যেতে পারে, সেটা ঋত্বিকের কাজ দেখলে স্পষ্টতই বোঝা যায়।

হারিয়ে যাওয়া মাকে খোঁজার চেষ্টা যেন তিতাসের সব থেকে জরুরি একটা বিষয়। কিন্তু মা কী রূপে ধরা দেবে? মাটির রূপে, নদীর রূপে, নাকি ভবানীর রূপে? সেই রূপ নির্মাণের পন্থাই বা কী? সেই উত্তর পাওয়া যায়, তিতাস দেখলে। নদীর ঘাটের কাদাজলে পড়া প্রতিবিম্ব, নদীর জল টলটল করছে, তাতে ভেসে বেড়ানো কচুরিপানা, ঘাটের কাছে মাসির পায়ের ক্লোজ আপ, মা হারা শিশুর আধ জলে ডুবে থাকা দৃশ্য দিয়ে ঋত্বিক নির্মাণ করেন তাঁর ফেলে আসা মাতৃভূমি ও তাঁর স্বপ্নীল ইমেজকে।

সময়ের ট্রাঞ্জিশন দেখাতে সুবর্ণরেখায় ঋত্বিক ঘটক ব্যবহার করেছিলেন, দৃশ্যত লেখা অক্ষরের। কিন্তু তিতাসের ক্ষেত্রে তিনি আরও আধুনিক, সেখানে কিছু নদীতে নৌকো বয়ে যাবার শট দেখে সময়ের বহমানতা লক্ষ করি। একেবারেই মন্তাজের সূত্র ধরে, ঋত্বিক আমাদের এক কাল থেকে পরবর্তী কালে নিয়ে গিয়ে ফেলেন।

আমাদের শেখানো হয়েছে, যে প্রাণী চলে ফিরে বেড়াচ্ছে, নিশ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে, বা যার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন বোঝা যায়, সে জীবিত। যে কারণে জগদীশ বসুকে প্রমাণ করতে হয়েছিল, উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে। ঋত্বিক ঘটক সেই একই ভাবনা আনতে চেয়েছিলেন প্রবাহমান নদীর জলের মধ্যে। জলের মধ্যেই আছে ইতিহাস, জলের মধ্যেই আছে মালোদের জীবন-ইতিবৃত্ত, সেই জলই এপারের সঙ্গে ওপারের মিলন ঘটায়। এই ভাবনা আমরা লক্ষ করতে পারি তিতাসের সম্পাদনাতেও।

ছবির শুরুতেই দেখি ছোট্ট বাসন্তীকে। এই বাসন্তী চরিত্রটি বাংলা সিনেমার এক অভিনব চরিত্র। এরকম চরিত্রের চলন এর আগে বা পরে প্রায় কেউই প্রয়োগ করেননি। বাসন্তী ছোটোবেলা থেকে একজন পুরুষকে বিয়ে করতে চায়। কিশোর এবং সুবলা দুজন ভাই, তাদের জীবিকা মাছ ধরা। কিশোরের সঙ্গে বিয়ে হবার কথা ছিল বাসন্তীর। কিন্তু সে বিয়ে হয় না। কিশোর যায় মেঘনায় মাছ ধরতে, সেখানে এক মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হয়, কিন্তু পথে ডাকতি হয়, বউ খোয়া যায়। এই দুই ঘটনা এক অসামান্য ট্রাঞ্জিশনের মধ্যে দিয়ে দেখান ঋত্বিক ঘটক। শুরুতে আমরা যে ছোট্ট বাসন্তীকে দেখি, তার পরে একেবারে ছবিটি নিয়ে যায় কিশোর এবং সুবলার ১৭ -১৮ বছর বয়সে। শুরুতে কেবল বাসন্তীকেই দেখি, কিশোর বা সুবলা কাউকেই দেখতে পাই না আমরা।

সময়ের ট্রাঞ্জিশন দেখাতে সুবর্ণরেখায় ঋত্বিক ঘটক ব্যবহার করেছিলেন, দৃশ্যত লেখা অক্ষরের। কিন্তু তিতাসের ক্ষেত্রে তিনি আরও আধুনিক, সেখানে কিছু নদীতে নৌকো বয়ে যাবার শট দেখে সময়ের বহমানতা লক্ষ করি। একেবারেই মন্তাজের সূত্র ধরে, ঋত্বিক আমাদের এক কাল থেকে পরবর্তী কালে নিয়ে গিয়ে ফেলেন। এখানে আবার উল্লেখ করতে হয় কীভাবে ঋত্বিক পশ্চিমের সমস্ত ফিল্ম নির্মাণের নিয়মকে তিলে তিলে ভাঙতে থেকেছেন। সাধারণ সময়ের বয়ে যাওয়াকে দেখানোর জন্য আগের দৃশ্য থেকে অন্য দৃশ্যে যাবার সময় বিশেষ কোনো রূপককে ব্যবহার করা হয়, যাতে বোঝা যায় সময় বদলে গেছে। কিন্তু ঘটক তা করলেন না, এমনকি দিন-রাত্রিরও কোনো রকম বদল হয় না শটের। মনে হয় যে দিন দেখছিলাম, সেই দিনকে দেখতেই দেখতেই দশ বছর সময় পেরিয়ে গেল। সময়ের এই বয়ে যাবার কাব্যিক প্রয়োগ অনেকক্ষেত্রেই তিতাসকে ঋত্বিকের অন্য ছবির তুলনায় আলাদা করে দেয়। সিনেমাও যেন নদীর মতো। তা বইতে থাকে সময়ের সঙ্গে। বা সে আসলে একটা সময়কেই ধরে রাখে তার মধ্যে। ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম যেন সেই ভাবনা ও ইতিহাসের কাছেই নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দর্শককে। বাসন্তীর মধ্যে দিয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন; দেখিয়েছিলেন সেই সত্যকে, যেখানে বেঁচে থাকার শেষ সম্বল হারিয়ে গেলেও তাকে মাতৃভূমি ছেড়ে যেতে হয় না।

Written by