
সেদিন যাতায়াতের পথে চড়বড়ে শব্দটা হঠাৎ কানে আসতেই চমকে উঠলাম! গড়িইয়াহাটের ফার্ন রোডে এ শব্দ বেমানান—বিরল। দেখলাম, একটা লোক মাথায় এক ঝাঁকা চড়বড়ি নিয়ে এগিয়ে আসছে। মনে হলো এক ধাক্কায় অন্য ডাইমেনশনে ঠেলে দিল কেউ। ঝুপ করে বয়স অনেকটা কমে গেল। যে বয়স ধুলোখেলার। কিনে ফেললাম ২৫ টাকা দিয়ে একখান। সব পাওয়া যাবে, শহরে এ জিনিস হাতের কাছে পাওয়া যাবে না। গ্রাম থেকেও তো ক’দিন পর বিলুপ্ত হবে!
নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া অনেকেই ছোটোবেলায় বাংলার লোকশিল্পের উল্লেখযোগ্য এই নিদর্শনটির সঙ্গে বাল্যবয়সের স্মৃতি আছে। কিন্তু তারপর? যতদিন গেছে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে, জেন আলফার সঙ্গে মাটির সম্পর্ক যেন আলগা হয়েছে।
চড়বড়ি, বাপের ঘুম ভাঙানি, ট্যামটামি, ব্যাঙের গাড়ি, টমটম—এলাকা ভেদে নানা বাহারি নাম তার। পুরোনো দিনে তো বটেই, এপার এবং ওপার বাংলা মিলিয়ে নব্বইয়ের দশকে জন্ম নেওয়া অনেকেরই ছোটোবেলায় বাংলার লোকশিল্পের উল্লেখযোগ্য এই নিদর্শনটির সঙ্গে বাল্যস্মৃতি আছে। কিন্তু তারপর?
যতদিন গেছে বর্তমান প্রজন্মের সঙ্গে, জেন আলফার সঙ্গে মাটির সম্পর্ক যেন আলগা হয়েছে। যতই বলি, প্লাস্টিকের খেলনা নয়, শিশুদের হাতে পৌঁছে যাক মাটির পুতুলের সম্ভার, তা কি আজ সম্ভব? মাটি দিয়ে গড়া পুতুলখেলার বাসন-কোসন শহরের বাচ্চারা পছন্দ করবে? শহর-মফস্সলে ধুলো-কাদা মাখা শৈশব খুঁজে পাওয়া দায়। শপিং মলে কি আর এসব রাখা যায়! সেইজন্যেই বোধহয় এখন ছোটোদের মনে জায়গা করে নিতে অপারগ বাংলার হস্তশিল্পের তারিফযোগ্য নমুনা, প্রকৃতিবান্ধব এই খেলনাগাড়িটি। সামাজিক পরিকাঠামো তাদের শিখিয়েছে হাজার এক নামীদামী ব্র্যান্ডেড খেলনার পাশে ইহা নেহাতই অচল, ‘ব্যাকডেটেট’।

বাংলাদেশের খোলাস গ্রামে টমটম গাড়ি বানাচ্ছেন এক হস্তশিল্পী। সূত্র: প্রথম আলো
তবে, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের বহু জেলার গ্রামীণ এলাকার শিশুদের নির্মল মন এখনও ঝলমল করে ওঠে চড়বড়ির আওয়াজে। যেকারণে হস্তশিল্পটির অস্বিত্ব এখনও টিকে আছে। রথের মেলায় এখনও পাওয়া যায়। কোচবিহার রাস মেলার ঐতিহ্য এই টমটম (সেখানে এই নামেই পরিচিত) গাড়ি। শহরে এর একেবারেই যে চাহিদা নেই, তা বলা যাবে না। মাথায় ঝাঁকা নিয়ে দূর দূর থেকে ফেরিওয়ালারা মাঝেমধ্যেই শহরের ঢুঁ দেন। আমি যাঁর থেকে চড়বড়ি কিনেছিলাম, তিনি এসছিলেন উঃ চব্বিশ পরগণা-র বারাসতের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে। নিজেরাই বানান। বিশেষত রথের মেলার আগে-পরে কলকাতার অলিগলি ঘুরে ফেরি করেন। বিক্রির জন্য আলাদা করে হাঁক পাড়তে হয় না, চড়বড়ির মার্কামারা আওয়াজই ক্রেতা-আকর্ষণের জন্য যথেষ্ট (এর চড়বড়ে আওয়াজের জন্যই তো ওপার বাংলায় কোনও কোনও অঞ্চলে একে বাপের ঘুম ভাঙানি বলা হয়ে থাকে) । খেলনাগাড়িটি নিয়ে যাঁদের শৈশব-জোড়া স্মৃতি, বলা বাহুল্য শহুরে ক্রেতা তাঁরাই। ছোটোদের খেলনা হিসেবে নয়, এর গুরুত্ব আজ বেশি ‘সংগ্রহ’ হিসেবে। সংগ্রাহকরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়ান।
রফিকুল ইসলাম, বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের উস্থি থানার আলমপুরে। ওঁদের গ্রামে প্রায় ২০/২৫টি পরিবার এই চড়বড়ি বানান। মাটির অংশ স্থানীয়ভাবে তৈরি হয়। তলতা বাঁশ দিয়ে বাঁশের অংশ হয়। ছাগলের ভুঁড়ি দিয়ে ছাউনি হয়। তথ্য ও ছবি : সৌমেন নাথ (সংগ্রাহক)
খেলনাগাড়িটির দুটি প্রধান উপকরণ হল বাঁশ ও মাটি। এই গাড়ি তৈরির জন্য প্রথমে এঁটেল মাটি দিয়ে দুটো চাকা ও একটি গোলাকৃতির বাটি তৈরি করা হয়। এরপর এগুলো শুকিয়ে পুড়িয়ে নিতে হয়। এরপর বাটিটিতে একটি নকশাওয়ালা মোটা কাগজ আঠা দিয়ে বেশ টানটান করে বসিয়ে দেওয়া হয় (অনেক জায়গায় ছাগলের ভুঁড়ি দিয়েও এই ছাউনি বানানো হয়)। বাঁশের কয়েকটা কঞ্চি লাগে। এরমধ্যে দুটো কঞ্চি প্রথমে একটু চ্যাপ্টা ও পরে চিকন করে কেটে নিতে হবে। এরপর দুটো কঞ্চি দিয়ে একটি ত্রিকোণাকার ফ্রেম তৈরি করা হয়। একটি কঞ্চির মাঝখানে হালকা কেটে, সেখানে বাঁশের দুটি পাতলা ও চ্যাপ্টা পাতি ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এরপর ত্রিকোণাকার ফ্রেমটি লাগিয়ে দেওয়া হয় ও পরে মাটির চাকাদুটো লাগিয়ে নেওয়া হয়। ব্যাস! দড়ি ধরে টানলেই চড়বড় আওয়াজ তুলে ছুটবে গাড়ি। নিখাদ মজা বৈ তো কিছু না! আগে ওইটুকুতেই খুশি হতো শৈশব।

