
ছবি নিজে নড়ে না – কিন্তু নাড়ায়।
শিল্পী গণেশ হালুই (Ganesh Haloi)-এর এই কবিতার অংশ দিয়েই শুরু করা যাক। সময়টা ১৯৩৬ থেকে ’৫০ সাল, অবিভক্ত বাংলাদেশের মৈমনসিংহ জেলারজামালপুরে কাটে শৈশব। তারপর কলকাতায় চলে আসা। শিশুমন নরম। তাতে সূক্ষ দাগ ও পুরু হয়ে পড়ে। এসব দাগ যে কোনো মানুষের মনে পড়লেও, সংবেদনশীল মনের আঁচড়ে তাঁর বহিঃপ্রকাশের পথ হয় সৃষ্টির। গণেশবাবুর ক্ষেত্রে তা নিশ্চিতভাবে সত্যি। উৎখাতের যন্ত্রণা, তাঁর জীবনে ও কাজের ওপর রেখাপাত করেছে। এই ছাপ তাঁর সমসাময়িকদের অনেকের ওপরেই প্রভাব ফেলেছিলো। কিন্তু গণেশবাবুর ছবি সেই দেশভাগ ও স্থানান্তরের পূর্বস্মৃতিতে কখনও আটকে পড়েনি।

Untitled, 2016, Gouache on board
গণেশ হালুই ছবিতে একটি সমান্তরাল চিত্রভাষার সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির নিস্তব্ধতার যে শব্দহীন পুকার আছে, তার দীর্ঘ অনুশীলনের ফসলই এই ছবির ভাষা।
প্রকৃতির সঙ্গে, বিশেষ করে ভূ-দৃশ্যর সঙ্গে গণেশবাবুর সম্পর্ক দৃঢ়। যা তাঁর শিল্পসৃষ্ট অনুপ্রেরণার উৎসগুলির মধ্যে একটি। প্রকৃতির ভাঙন, মৃত্যু, ক্ষত যে ক্রমে তাঁর ব্যক্তিগত ক্ষতি করেছে, তা ওঁর ছবি পড়লেই বোঝা যায়। পড়ার কথা বললাম, কারণ গণেশ হালুইয়ের ছবি শুধু দেখে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ছবি নয়। পড়তে চেষ্টা করলে, গভীর থেকে আরও গভীরে প্রবেশ করা যায়। গণেশ হালুই ছবিতে একটি সমান্তরাল চিত্রভাষার সৃষ্টি করেছেন। প্রকৃতির নিস্তব্ধতার যে শব্দহীন পুকার আছে, তার দীর্ঘ অনুশীলনের ফসলই এই ছবির ভাষা। অনুশীলনের প্রসঙ্গ ইচ্ছে করেই টানলাম। কারণ গণেশবাবুর কলকাতায় প্রথম জীবন কাটে গভর্নমেন্ট কলেজ অফ আর্ট এন্ড ক্রাফট-এ। শিল্প শিক্ষার পাঠ না থাকলে যে দীর্ঘদিন ছবির চর্চা করা যায় না, এ আমি বিশ্বাস করি। ১৯৫৬ সালে পাশ করে, দীর্ঘ সাত বছর পুরাতত্ব বিভাগে চাকরির সুবাদে অজন্তা চিত্রাবলীর উপর কাজ করেন। এ সময়ের কাজগুলি নিয়ে খুব সম্প্রতি ওঁর একটি একক প্রদর্শনী হয়ে গেল বিড়লা একাডেমিতে। কাজগুলিতে তাঁর বলিষ্ঠ রেখায় ভারতশিল্পের যাবতীয় উপকরণের নিদর্শন মেলে। এক্ষেত্রে বলে রাখা দরকার, ভারতশিল্পের প্রাথমিক ছটি উপকরণ, যাকে আমরা ‘ষড়ঙ্গ’ বলে জানি।
যেকোনো প্রকৃত শিল্পসৃষ্টির গভীরে থাকে নিস্তব্ধ নিঃসঙ্গতা। তাই গণেশবাবুর ছবিতে বারবার কাঠামোগত নিঃসঙ্গতা ফিরে ফিরে আসে। সে একাকিত্ব খুব ব্যক্তিগত। অনুভব করতে হয়। গণেশবাবু তাই হয়তো বলেছেন ছবি নিজে নড়ে না, কিন্তু মুহূর্তেই আমাদের নাড়িয়ে দিতে পারে। অর্থাৎ ছবি দুর্বল নয়, শক্তিশালী। এই পাঠ তিনি প্রকৃতি থেকে গ্রহণ করেছেন। একইসঙ্গে ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজে এই পাঠ পড়িয়েছেন। নিভৃতে শিল্পের রসাস্বাদন করেছেন। দেশে-বিদেশে বহু গ্যালারি সেসব ছবি দেখিয়েছেন। অকশন হাউসগুলিতে তাঁর ছবি সার্থকভাবে নিলাম হয়েছে। অথচ এসব বাহ্যিক সার্থকতার ছাপ ব্যক্তিজীবনকে অবিচল রেখেছে। অতি সাধারণ যাপনই তাঁকে আরও মাটির কাছে এনেছে। তরুণ ছাত্রের মতন নিয়মিত অনুশীলন করে তিনি এখনও পাঠ নিচ্ছেন। এ যারা জানে তাদের কাছে অনুপ্রেরণার।

Untitled, 1996, Gouache on rice paper pasted on mount board (Left), Untitled, 1996, Gouache on rice paper pasted on mount board (Right)
মাটির স্পর্শ পাবো বলেই
শূন্যে ডিগবাজি খাই।
‘নিশ্চিত বিশ্বাস’ নামক কবিতায় এ কথাই বলেছেন। বাংলাদেশ-নিসর্গ-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা-প্রকৃতি-মানুষ-শূন্যতা এসবের মধ্যে দিয়ে সরলরেখা টানলে আংশিক গণেশবাবুকে পাওয়া যায়। বক্ররেখা টানলে হয়তো আরও খানিকটা পাওয়া সম্ভব। আমার মনে হয়, কালি ফুরিয়ে আসা ডট পেনের ভাঙা-ভাঙা দাগের মতন রেখায় সবচেয়ে ভালো ওঁকে ধরা যায়। কারণ ঐ স্পেসগুলো ভীষণ জরুরি ছবি পড়তে গেলে। একটা চিত্রপট জুড়ে শুধুই আঁচড়, রঙের প্রলেপ, কিছু অচেনা হরফ যা পড়ে ফেলা শক্ত। এদের একে অন্যের থেকে আলাদা করলে আরেকটা দৃশ্যপট হয়ে যায়। এ যেন এক রঙের খেলা। একটানা ওঁর ছবি দেখলে সংবেদনশীল দর্শক সেই খেলায় বুঁদ হয়ে মেতে ওঠে। আবার খুব স্থির হওয়ার দেখলে বাহ্যিক কোলাহল ম্লান হয়ে যায়। চোখের সামনে কিছু দীর্ঘ রেখা, গাঢ় রঙের ওপর অন্য রঙের আস্তরণ নড়াচড়া করে সরে যায়। শব্দ নেই, তবুও ক্ষীণ শব্দের ওঠাপড়া রয়েছে যেন। এই যে হিজিবিজি এত কথা লিখছি, এ সবই বিমূর্ততার বর্ণনা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা মাত্র। আসলে তো বিশুদ্ধ বিমূর্ততার কোনো কাঠামো হয় না। তাই তা বর্ণনাতীত। নিজের মতো করে এর সুবাস নিতে হয়, নিংড়ে নিতে হয় রস। যতবার দেখা যায় ততবার ভিন্ন রূপ-রং-রস-আবেদন নিয়ে ধরা দেয়। সকলকে যে এসব জেনে নিতে হবে তা নয়, তবে জানলে তাড়িয়ে তাড়িয়ে রসাস্বাদন করা যায়।
ওঁর ছবিতে এক ছন্দময় কাব্যরূপ রয়েছে। অর্থাৎ যাকে বলে পোয়েটিক নেচার। আরেকটু ভেঙে বললে, কম্পোজড ছবিতে উপস্থিত আঁচড়, রেখা, বৃত্ত বা ব্যবহৃত রঙের প্রলেপ, কোথায় কতখানি থাকবে, তা যেন সুপরিকল্পিত। খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোথাও তাল কাটছে না, বা কোথাও ছন্দপতন ঘটছে না।

Untitled, 2021, Gouache on Board
আসলে একটা তরল মন চাই বিমূর্ততা বুঝতে গেলে। নিখিল ব্যানার্জীর বিলম্বিত বাগেশ্রীর আলাপের মতন। যে স্বরগুলো জানে, তার কাছে একরকম আনন্দ দেয়, আর যে জানে না সেও সুরে মজে যায়। সবসময়েই কি অর্থ থাকবে? এ এক অদ্ভুত ভেসে থাকা। বিমূর্ততা আমাদের ভাসিয়ে রাখে। ফের ডুবিয়ে নিয়ে যায় গভীর অন্ধকারে, তারপর আলো। এই ডুবের মধ্যে রয়েছে বেঁচে থাকার লড়াই। তাই হয়তো গণেশবাবুর ছবিতে অস্তিত্বের টানাপোড়েন এতো প্রবল। ওঁর ছবিতে বিমূর্ততা অনেকসময়ই পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাস্তবের সঙ্গে সাদৃশ্য বা সমতা রক্ষা করে চলে না। সম্পূর্ণ ভাবপ্রধান এই অ্যাবস্ট্রাকশন। এই ভাব আবার নিরাকার। মনের অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে বদলে যায়। ভেঙে বললে, ভাব অদৃশ্যমান, তাই কল্পনার তীব্র শক্তিতেই তা দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। গণেশবাবুর ‘আমার শিল্পভাবনা’ বইতে লেখা একটি উক্তি গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে, “…রূপকে চিনি, ভাবকে অনুভব করি। যেমন – মায়ের কথা মনে পড়লেই কিন্তু মাকে দেখি না – বদলে এক প্রকার ‘মাতৃত্বের’ ভাব নিমেষেই আমাদের মধ্যে উদয় হয়; এবং এই ভাবের মধ্যেই ‘মা’-এর শাশ্বত রূপ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। অনুভবে তাকে বুঝতে পারি। Abstraction ও Distortion-এর মধ্যে যেন একটা আত্মিক সম্পর্ক আছে।”
একটি কথা বারবার মনে হচ্ছে, ওঁর ছবিতে এক ছন্দময় কাব্যরূপ রয়েছে। অর্থাৎ যাকে বলে পোয়েটিক নেচার। আরেকটু ভেঙে বললে, কম্পোজড ছবিতে উপস্থিত আঁচড়, রেখা, বৃত্ত বা ব্যবহৃত রঙের প্রলেপ, কোথায় কতখানি থাকবে, তা যেন সুপরিকল্পিত। খুব সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোথাও তাল কাটছে না, বা কোথাও ছন্দপতন ঘটছে না। আবার কোনো ছবির চিত্রপট ধূসর, অমসৃণ। তাতে একটা উজ্জ্বল হলুদ রেখা অসমান দু-ভাগে ভাগ করে দিয়েছে দৃশ্যপটকে। এই বিভাজন এতই অপ্রত্যাশিত যে দর্শকের মনে উদ্বেগ হবেই। এক্ষেত্রে ছন্দপতন হল কি? হলে তাও যেন পূর্বপরিকল্পিত। অর্থাৎ শিল্পী স্বেচ্ছায় একটা খোঁচা দিলেন।

Untitled, 2021, Ink on paper
হয়তো কোনো ছবির সবুজ রঙের প্রেক্ষাপট ক্রমে বাঁদিক থেকে ডানদিকে ম্লান শ্যাওলা হয়ে গিয়েছে। ঠিক তাঁর ওপরে একটা লাল দাগ। এ যে কোনো সংবেদনশীল মনকে নাড়া দেবেই। ছবিগুলি আমার কাছে শুধুই ল্যান্ডস্কেপ বা নিসর্গচিত্র নয়। এগুলি সরাসরি পলিটিক্যাল মাইন্ডস্কেপও বটে।
নিরন্তর শিল্পচর্চা করেন অনেকেই। কিন্তু সততা ও সমর্পণের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে চর্চা চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। গণেশ হালুই নতুন এক পথ খুঁজে, বিমূর্ত একটি জগৎ নির্মাণ করেছেন। যা তাঁর যাপনের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ওঁর চিত্রভাষা ভারতশিল্পকে সাবালক হতে সাহস জুগিয়েছে। যারা ওঁর ছবির অর্থ খুঁজে না পেয়ে মুখ ফিরিয়েছেন, তাদের জন্য করুণা হয়। আর যারা হারিয়ে গিয়েছেন ওঁর চিত্রকল্পে, তারা সৌন্দর্য দর্শনের নয়া পথ খুঁজে পেয়েছে বলে আমার নিশ্চিত বিশ্বাস

