
সুভাষগঞ্জের পোড়ামাটির পুতুল
মায়ের সঙ্গে সন্তানের আত্মিক বন্ধন বাংলার ঐতিহ্যের মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে। অবিভক্ত বাংলায় প্রাচীনকাল থেকেই মাতৃকা সাধনা হয়ে আসছে। সেই সাধনার মধ্যেই নিহিত রয়েছে বিশ্ব মাতৃকাকে চেনা ও জানার অন্বেষণ। বাংলার পুতুলের মধ্যেও রয়েছে মাতৃত্বের ছোঁয়া। এর পরম্পরা হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর সঙ্গে তুলনীয়। কারণ সিন্ধু সভ্যতায় প্রত্নখননে যে মাতৃকা মূর্তি উঠে এসেছিল তার সঙ্গে বাংলায় প্রত্নখননে উঠে আসা পোড়ামাটির পুতুলগুলির মধ্যে মিল রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্প ও শিল্পী সমাজ বইতে তারাপদ সাঁতরা কুম্ভকার সম্প্রদায়ের তৈরি পুতুলগুলিতে নারী কেন্দ্রিকতার দিকটি আলোকপাত করেছিলেন। তাঁর মতে, “মাটি খুঁড়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা যেসব প্রাচীনতার লক্ষণযুক্ত পোড়ামাটির পুতুল বা মৃৎফলক আবিষ্কার করেছেন সেগুলোর সঙ্গে বর্তমানের কুম্ভকার শিল্পীদের কৃত পুতুলের মধ্যে যেন একটা প্রবাহমান সামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া যায়।” শিল্প ঐতিহাসিক স্টেলা ক্রামরিশের বক্তব্য তুলে ধরে তারাপদবাবু তাঁর বইতে লিখেছেন যে, ভারতে দুই ধরনের পুতুল পাওয়া যায়, যার মধ্যে একটি হল সময়োচিত অন্যটি কালোত্তীর্ণ। এই কালোত্তীর্ণ পুতুলের গঠন বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে প্রাক সিন্ধু সভ্যতার পোড়ামাটির পুতুলের সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। তারাপদবাবুর মতে, বাংলার বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের বেশ কিছু পুতুল পাওয়া যেত এবং এই কালোত্তীর্ণ পুতুলগুলি বার-ব্রত ও শিশুদের খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত হত। সেই ঐতিহ্য এখনও অল্পবিস্তর রয়ে গেছে, পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।
উত্তর দিনাজপুরের সুভাষগঞ্জে পোড়ামাটির টেপা পুতুলের মধ্যে মাতৃত্বের প্রকাশ দেখা যায়। পাবনা-শৈলী মেনেই এই পুতুলগুলো তৈরি করা হয়। এগুলো ছাঁচের নয়। এঁটেল মাটির মণ্ড থেকে লেচি তৈরি করে সেটি হাতে টিপে পুতুলের গঠন নির্মিত হয়। তারপর মুখের আদল দেওয়া হয়, যার মধ্যে কোনও প্রকারের অভিব্যক্তি থাকে না। নৃতত্ত্বের ভাষায় এই পুতুলগুলির মুখাকৃতি ‘ল্যাম্ব শেপ’ বা ভেড়ার মতো। পুতুলগুলোর হাত এবং পা এবস্ট্রাক্ট বা বিমূর্ত। গলার মালা, পায়ের পাতায় নূপুর – মাটি দিয়ে নানা অলংকরণ বানানো হয়। বাঁশ কাঠি দিয়ে পুতুলের মধ্যে বাড়তি শৈল্পিক ছোঁয়া দেওয়া হয়। মায়ের কোলে ছোট্ট শিশু আবার কখনও পা ছড়িয়ে বসে থাকা মায়ের কোলে আনন্দে খেলতে থাকা শিশু। মায়ের দু-হাতে দুই শিশু বসে রয়েছে এমন পুতুলের দেখাও সুভাষগঞ্জে মেলে। মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে আত্মিক টান সেটা এই পুতুলের মধ্যে অনবদ্য ছন্দে প্রস্ফুটিত হয়। শিল্পীরা এই পুতুলকে ষষ্ঠী পুতুল বলেন। ‘এজলেস’ বা শাশ্বত পুতুলের অন্যতম নিদর্শন সুভাষগঞ্জের পুতুল।
বাংলা ও বাঙালির রক্তে রয়ে গেছে মাতৃকা সাধনা। রাজ্যের একাধিক জেলায় প্রত্নখননে মাতৃকা মূর্তি উঠে এসেছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চন্দ্রকেতুগড়, পান্ডু রাজার ঢিবি।
পাবনা-শৈলীর টেপা পুতুল নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরেও দেখা যায়। স্থানীয় বরিষ্ঠ শিল্পী চিত্তরঞ্জন পাল ও তাঁর স্ত্রী শেফালি পাল এই শৈলীকে ধরে রেখেছেন। শিল্পীর স্মৃতিচারণায় ভেসে এল ছোটোবেলার কথা। তখন চড়কের সময় বেতের ঝুড়ি ভর্তি করে পুতুল মেলায় নিয়ে বসতেন। মূলত বাচ্চাদের খেলার জন্যই এই পুতুলগুলো তৈরি করতেন। মাটির অলংকার এই পুতুলগুলির বৈশিষ্ট্য। পুতুলগুলির পোশাকে হাঁটু পর্যন্ত কাপড়ের বিন্যাস স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। মাথার পেছনে খোঁপা ও তার চারিদিকে মালার আস্তরণ, সিঁথির বিভাজন, কাপড়ের কুচির ভাঁজগুলিকেও শিল্পী যত্ন সহকারে অলংকরণ করেন। প্রসারিত চোখ, চওড়া পেট, বাঁ কোলে বাচ্চা। কৃষ্ণনগর বলতেই আমাদের মানসপটে বাস্তবধর্মী পুতুলের কথা মনে আসে। সেখানে দাঁড়িয়ে দশকের পর দশক ধরে পাবনা-শৈলীর এই পুতুলের ধারাকে বজায় রেখেছেন শিল্পী। সুভাষগঞ্জের তুলনায় চিত্তরঞ্জন পালের তৈরি এই পুতুলের মুখমণ্ডলে হালকা হাসির ছোঁয়া থাকে।
উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াগঞ্জের কুনোরের পুতুলে দেখা যায় যে মায়ের কাঁধে চড়ে বসে রয়েছে শিশু। আবার মায়ের বুক জড়িয়ে ধরে কোলে উঠে রয়েছে নবজাতক। মাতৃত্বের এই অমোঘ টান কুনোরের পুতুলের আকর্ষণের কেন্দ্র। এই পুতুলের কোনো পা নেই। পুতুলের কোমরের পর থেকে ঘণ্টা আকৃতির। চাকায় ঘুরিয়ে এই ঘণ্টা আকৃতি তৈরি করা হয়। ওপরের অংশটা হাতে টিপে বানানো। গলার মালা মাটি দিয়ে নির্মিত। অন্যান্য অলংকরণ বাঁশ কাঠি দিয়ে পুতুলের উপর খোদাই করা। নৃতত্ত্বর ভাষায় এ ধরনের পুতুলকে ‘বেল শেপড’ বা ঘণ্টা পুতুলও বলা হয়ে থাকে। মূলত শিশুদের খেলার জন্যই এই পুতুলগুলো তৈরি করা হয়। সুভাষগঞ্জের তুলনায় এই পুতুলগুলো মুখের গঠন ভিন্ন। হাতে টিপে তৈরি করা হলেও মুখের অবয়বে বাস্তবধর্মী রূপ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে পুতুল ও খেলনা গ্রন্থে ড. সোমা মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, যে কুনোরে মূলত রাজবংশী সম্প্রদায়ের শিল্পীরাই মাটির পুতুল তৈরি করে থাকেন। রাজবংশী মা যেমন সন্তানকে কাপড় দিয়ে পিঠে বেঁধে সমস্ত কাজ করেন। এই পুতুল সেই ভাবেই তৈরি হয়।
বাঁকুড়ার পাঁচমুড়ায় সন্তান কোলে জননী অথবা জনপ্রিয় নাম ষষ্ঠী পুতুলের দেখা মেলে। সুভাষগঞ্জের টেপা পুতুলের খোঁপা মাথার পেছনদিকে অবস্থিত। কিন্তু এই পুতুলের খোঁপা একেবারে মাথার মধ্যখানে। প্রথম দেখাতে মনে হবে মাথার ওপর যেন পুতুলটি মুকুট পরে রয়েছে। পুতুলের পা নেই। তোলার দিকটা সরু গোলাকার। অভিব্যক্তির কোনও চিহ্ন নেই মুখমণ্ডলে। বাঁশ কাঠি দিয়ে গলায় অলংকরণ করা হয়েছে। দু-হাতে দুই সন্তান আঁকড়ে ধরে রয়েছে ষষ্ঠী। বাঁশ কাঠি দিয়ে চোখের মধ্যে ফুটো করে মণির আকৃতি তৈরি করা হয়েছে। হাত, গলা ও কুনুইয়ের মধ্যে কাঠি নরম মাটির ওপর খোদাই করে অলংকরণ করা হয়েছে। পুতুলটির বুক এবং পেট সরু। হাতের গঠন বিমূর্ত। বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের ফৌজদার পরিবারের তৈরি কাঁচামাটির রঙিন হিঙ্গুল পুতুলের মধ্যে মাতৃত্বের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়।
মুর্শিদাবাদ কাঁঠালিয়ায় সাধন পালের তৈরি পুতুল
মুর্শিদাবাদের কাঁঠালিয়া গ্রামের পুতুল শৈলীকে আজও ধরে রেখেছেন বরিষ্ঠ শিল্পী সাধন পাল। কার্যত একার কাঁধেই তিনি এই পুতুল শৈলীর ধারাকে আজও বয়ে নিয়ে চলেছেন। কাঁঠালিয়া পুতুলের মধ্যে মাতৃত্বের এক অনুপম নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। পা ছড়িয়ে বসে শিশুকে কোলে নিয়ে তেলের বাটি থেকে অল্প তেল নিয়ে শিশুর দায় মাখিয়ে দিচ্ছে মা। সাধনবাবুর তৈরি এই পুতুলের মধ্যে শিশুর প্রতি মাতৃত্বের যত্নশীলতা আমরা লক্ষ্য করতে পারি। অন্যদিকে তার তৈরি গোয়ালিনী পুতুলের মধ্যে জীবন সংগ্রামের সীমাহীন ধারা পরিলক্ষিত হয়েছে। মাথায় ঝুড়ি, কোলে বাচ্চা। শ্রমজীবী নারীর চিরকালীন সংগ্রাম তুলে ধরা হয়েছে এই পুতুলের মধ্যে। কাঁঠালিয়া পুতুলগুলি মাটির ভিতের ওপর বসানো। অর্থাৎ চ্যাপ্টা চতুষ্কোণ মাটির ভিতরের ওপর পুতুলগুলি সংযুক্ত করা হয়েছে। পুতুলগুলির তলার অংশটা চাকে ঘোরানো। হাত, গলা, কাঁধ হাতে টিপে তৈরি করা হয়েছে। মুখটি ছাঁচের। রংয়ের ক্ষেত্রে বাহ্যিকতা নেই। খড়িমাটির সাদা রংয়ের ওপর লাল ও কালো ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটা পুতুলকে সধবা হিসেবে দেখানো হয়েছে। শিল্পীর কথায় কর্ণসুবর্ণে প্রত্নখননে যে পোড়ামাটির পুতুলগুলো উঠে এসেছিল, তারই অনুকরণে এই পুতুলগুলো তৈরি করা হয়ে চলেছে বংশ-পরম্পরা ধরে। প্রত্নখননে যে পুতুলগুলি উঠে এসেছিল সেগুলোর রং করা ছিল না। উল্লেখ করা যেতে পারে আরলি টেরাকোটাস অফ বেঙ্গল গ্রন্থে এস সি মুখোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন যে ফারাক্কা ব্যারেজ নির্মাণের সময় মাটি খুড়তে গিয়ে মাতৃকা মূর্তি বেরিয়ে আসে। সেই পুতুলগুলির বুক ও পেট চওড়া। কোমর বন্ধনী রয়েছে। এই পুতুলগুলোকে লেখক মাতৃকা মূর্তি হিসেবে অভিহিত করেছিলেন।

ছবি চিত্রকরের তৈরি জো পুতুল
অবিভক্ত মেদিনীপুরের চিত্রকর রমণীদের হাতে টিপে তৈরি করা পুতুলে মাতৃকা শক্তি আজও প্রবাহমান। ফুলজান, আবিরণ, ছবি, শেরিফান, আয়েশা চিত্রকরদের হাতে আজও টিকে রয়েছে এই পুতুল। জনপ্রিয় ভাবে এই পুতুলগুলিকে জো পুতুল বলে অভিহিত করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলার কোনো টেপা শ্রেণির পুতুলকে এমন নামে ডাকা হয় না। কেন এই পুতুলকে জো বলা হয়, তা নিয়ে গবেষকরা দ্বিধাবিভক্ত। গবেষক সোমা মুখোপাধ্যায়ের কথায় এই পুতুল তৈরিতে চাষের জমি ব্যবহার করা হয়ে থাকে। উর্বরতা কেন্দ্রিক ভাবধারা থেকে এই পুতুলগুলো তৈরি। ফসলের বীজ জমিতে দেওয়ার আগে মাটিকে ভালো করে জোত দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেই জোত কথাটা থেকেই জো শব্দটি এসেছে। বাংলার মাটির পুতুল গ্রন্থে গবেষক বিধান বিশ্বাস জোড়া কথার থেকে জো শব্দটি আসতে পারে বলে অনুমান করেছেন। তাঁর মতে, “পটুয়া পুতুল শিল্পী এগুলোকে জো বা যো পুতুল বলে থাকে। এই জো কি জোড়া থেকে এসেছে তা জানা যায় না। তবে জোড়া পুতুল আর জো পুতুল একই মাত্রার ছেলে আর মেয়ে পুতুল।”
অবিভক্ত মেদিনীপুরের বর্ষীয়ান চিত্রশিল্পী প্রদীপ মাইতির মতে, চিত্রকর রমণীরা এত সুন্দর ভাবে পুতুলগুলোকে রং করতেন দেখে মনে হতো জীবন্ত। অনেকটা জড়বস্তুতে প্রাণদানের মতো। এই জীবন্ত কথাটির থেকে জৌ কথাটি এসেছে। পরে সেটি জো হয়েছে। তাঁর মতে পুতুল রং করার সময় গালার ব্যবহার হতো। গালাকে জতুও বলা হয়। সেই জতু থেকে জো কথাটি এসেছে। আর সেই কারণেই জো পুতুল বলা হয়। যদিও এখনকার সময়ে কোনো জো পুতুলেই গালার ব্যবহার হয় না। এই পুতুলগুলো মূলত শিশুদের খেলার জন্য।
চিত্রশিল্পী অনির্বাণ মিত্রের কথায় ওড়িশার বালাসোরে জোকেন্দাই নামে এক ধরনের পুতুল তৈরি হয়। সেই পুতুলে লাক্ষা থেকে তৈরি হওয়া গালা রং ব্যবহার করা হয়। লাক্ষাকে জাটু বলা হয়ে থাকে। ওড়িশার থেকেই মেদিনীপুরে টেপা পুতুলের ওপর গালার রং ব্যবহার হওয়ার প্রচল হয়। আর জোকেন্দাই উচ্চারণের অপভ্রংশের ফলে জো হয়ে যায়। তাঁর মতে যে পুতুলে লাক্ষা বা গালার রং ব্যবহার করা হয় সেটাই জো পুতুল। আর যেটাতে এই রং ব্যবহার হয় না সেটা জো পুতুল নয়।
ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি শিশুরা মায়ের কোলে সন্তান পুতুলের মধ্যে মাতৃত্বের অনুপম স্বাদ পেয়েছিল। যার ধারা আজও গ্রামীণ পুতুলে বিদ্যমান।

বৃন্দাবন চন্দের গালার পুতুল (বাঁদিকে) এবং চিত্তরঞ্জন পালের পাবনা শৈলীর পুতুল (ডানদিকে)
বাংলার গালার পুতুলের মধ্যেও মাতৃকা শক্তির নিদর্শন পাওয়া যায়। বীরভূমের ইলামবাজারে গালার পুতুল তৈরির ঐতিহ্য ছিল। বাস্তবধর্মী সেই সব পুতুল বাংলার ঐতিহ্যের প্রধান অঙ্গ ছিল। বর্তমানে ইলামবাজারের গালার পুতুল শিল্পকে একক প্রয়াসে বাঁচিয়ে রেখেছেন শেখ ইউসুফ আলি। অন্যদিকে, অবিভক্ত মেদিনীপুরের গালার পুতুল শিল্পকে আজও ধরে রেখেছেন বরিষ্ঠ শিল্পী বৃন্দাবন চন্দ। যদিও তার পুতুল শৈলী ইলামবাজারের গালার পুতুলের মতো বাস্তবধর্মী নয়। তাঁর তৈরি পুতুলগুলিতে আদিমতা বিদ্যমান; আমরা দেখতে পাই মায়ের দুই হাতে দুই সন্তান। মাতৃত্বের এই পূর্ণ প্রভা শিল্পী অনিন্দ্য সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন।

জয়দেব পালের তৈরি রঙিন ছাঁচের পুতুল
বাস্তবধর্মী দুই খোল ছাঁচের রঙিন পুতুলেও মাতৃশক্তির নিদর্শন দেখা যায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া নজর নগরের শিল্পী জয়দেব পালের পুতুল। রঙিন শাড়ি পরিহিতা কাঁখে কলসি ও অন্য হাতে সন্তানকে আগলে নিয়ে হেঁটে চলেছেন মা। তাঁর তৈরি অন্য আরেকটি পুতুলের দেখা যায়, সন্তানকে কোলে নিয়ে এগিয়ে চলেছেন মা। শিল্পীর অনুপম তুলির টানে বাঙ্ময় হয়ে উঠেছে পুতুলগুলি। নজর নগরের বুকে একাই এই শিল্পের ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন জয়দেববাবু। অন্যদিকে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা-র জয়নগর মজিলপুরে সন্তানকে হাতে নিয়ে চলা জননী পুতুল প্রায় আট প্রজন্ম ধরে তৈরি করে চলেছেন শম্ভুনাথ দাস। পটচিত্র আঙ্গিকের ছাপ রয়েছে মজিলপুরের পুতুলের মধ্যে। চোখের আকৃতি ও শারীরিক গঠনে পটচিত্রের ছোঁয়া রয়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার আরতি পাল, কাঁচা মাটির এক খোল ছাচের সন্তানকে কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলা মা পুতুল তৈরি করেন ঝুলন ও রথযাত্রা উপলক্ষে। তাঁর তৈরি পুতুলগুলির হাতগুলো বিমূর্ত। মূলত শিশুদের আনন্দ দেওয়ার জন্যই তিনি এই পুতুলগুলো তৈরি করে থাকেন।

বাঁকুড়া সোনামুখির ভাগ্যমণি পুতুল
বাঁকুড়া জেলার সোনামুখি অঞ্চলের পটুয়া পাড়ার দক্ষ শিল্পীদের হাতে বানানো এক মাটির পুতুলের নাম ভাগ্যমণি পুতুল। এই পুতুলের মা পুতুলটি কখনও বসে আবার কখনও দাঁড়িয়ে থাকে, কোলে থাকে চার পুত্র সন্তান। খানিক মধ্যযুগীয় চিন্তাভাবনা থেকেই এই পুতুলের ধারণা। সে সময় মনে করা হতো, এক মায়ের সকল সন্তানই পুত্র হলে তিনি খুবই ভাগ্যবতী, অর্থাৎ পুত্র সন্তানে মায়ের ভাগ্য নির্মিত হতো। সেখান থেকেই ভাগ্যমণি পুতুলের প্রচলন।
বাংলা ও বাঙালির রক্তে রয়ে গেছে মাতৃকা সাধনা। রাজ্যের একাধিক জেলায় প্রত্নখননে মাতৃকা মূর্তি উঠে এসেছিল। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল চন্দ্রকেতুগড়, পাণ্ডু রাজার ঢিবি। ফলে এই ঐতিহাসিক নিদর্শন থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে প্রাচীনকাল থেকেই বাঙালি শিশুরা মায়ের কোলে সন্তান পুতুলের মধ্যে মাতৃত্বের অনুপম স্বাদ পেয়েছিল। যার ধারা আজও গ্রামীণ পুতুলে বিদ্যমান।
______________
ছবি: শুভঙ্কর দাস এবং বঙ্গদর্শন আর্কাইভ

