কাঁথাকে কেন ‘আর্ট’ বলবো, বুঝিয়ে দেয় অনিতা মিত্রর নিপুণ সেলাই

“আশির দশকে কলকাতার ফ্যাশন বাজারে ঢেউ উঠেছিল শান্তিনিকেতনের বাটিক আলপনার অনুকরণে ‘রানস্টিচ’-এ ভরাট করা একপর্দা কাপড়ে মেয়েদের শাড়ি, পোশাক-আশাক তৈরির। ‘কাঁথা স্টিচের শাড়ি’ নাম দিয়ে প্রচার করে একদল শান্তিনিকেতনের প্রাক্তনী, তখন ব্যবসা করতে বসেছে।”  বলছিলেন শিল্পী অনিতা মিত্র। 

কাঁথাসেলাই মানেই শাড়ি-পাঞ্জাবি কিংবা শান্তিনিকেতন নয়। এর নিজস্ব ঐতিহ্য আছে, বৃহত্তর শৈল্পিক পরিসর আছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে চীন থেকে পাওয়া চিত্রাবলীতে এমন নিপুণ সব সেলাই শিল্পকর্ম দেখতে পাওয়া যায়, যেগুলোকে রং-তুলিতে আঁকা ছবি বলে মনে হয়। গত মার্চের শুরুতে উইমেন্স ক্রিশ্চিয়ান কলেজের রবীন্দ্র কক্ষে আয়োজিত, শিল্পী অনিতা মিত্রর অভিনব কাঁথা-প্রদর্শনী দেখতে দেখতে ঠিক এটাই মনে হচ্ছিল। তাঁর এক-একটি সেলাইয়ের কাজে রঙের ব্যবহার, তার স্তর নির্মাণ সবটাই উল্লেখযোগ্য। ট্রাডিশনাল এবং কনটেম্পোরারি দু-ধরনের দৃশ্যভাবনাই দেখা যায় তাঁর কাঁথায়। কাঁথা ফোঁড়ের সঙ্গে নানান সম্ভাবনাকে তাঁর কল্পনার সঙ্গে মেলাতে চেষ্টা করেছেন। ৩০-৪০ বছর ধরে করা এইসব কাজ, বহু গবেষণার ফসল। অথচ কলকাতার সরকারি আর্ট কলেজে তিনি পাশ্চাত্য রীতির চারুকলার ছাত্রী ছিলেন। কাঁথা সেলাই ছিল তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের জায়গা। সেই জায়গাটিই ক্রমশ তাঁর শিল্পবোধ প্রকাশ করার মাধ্যম হয়ে ওঠে।

“মাকে দেখেছি কাঁথা তৈরি করতে, তাই কাঁথার লেয়ারিং-এর আবশ্যকিতা সম্পর্কে কোনও সন্দেহ ছিল না। শান্তিনিকেতনের পাঠভবনে আমাদের এমব্রয়ডারি শেখাতেন ক্ষমাদি অর্থাৎ ক্ষমা ঘোষ। ওই প্রথম সুতোর গতিপথ ও টেক্সচারের বৈচিত্র্য আমার মনের গভীরে দাগ কাটে। কিন্তু মনে পড়ে না, শান্তিনিকেতনে কাউকে কাঁথার কাজ করতে দেখেছি কিনা (পঞ্চাশ-ষাটের দশকে)! কাপড়ে বাটিক, লেদার বাটিক, বাঁধনি ও কিছু দেশজ এমব্রয়ডারির যথেষ্ট প্রচলন ছিল।… আবার মা-র তৈরি কাঁথাতেও কখনও নকশা দেখিনি! অনেক পরে আমি ডিজাইন এঁকে দিয়েছি। গবেষণার আগে একে তাকে ‘শান্তিনিকেতনী ডিজাইন’ এঁকে দিতাম। একসময় ভাস্কর মীরা মুখার্জিও আমাকে যথেষ্ট উৎসাহ দিয়েছেন।” বলেন অনীতা।

কাঁথাশিল্পকে খানিক হেয় করেই ‘ক্রাফট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, পণ্য বানিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে। বাঙালির নস্টালজিয়া-প্রীতিকে কাজে লাগিয়ে কাঁথাশিল্পের নামে নিম্নমানের কাঁথাসেলাই করা কাপড় বিকোচ্ছে যত্রতত্র।

তাঁর মতে, বেশিরভাগ মানুষজন বিশেষত বিত্তবান শ্রেণির ‘তথাকথিত’ শিক্ষিতরা কাঁথাকে ভাবেন নিচু, গরিব-গুর্বোদের শীতের আচ্ছাদন মাত্র। তাঁরা বুঝে উঠতে পারেন না কাঁথা ‘আর্ট’ নাকি ‘ক্রাফট’! অনিতা মিত্রর কথায়, “যেহেতু ব্রাশের চলন মননের গতির সঙ্গে মেলে, তাই আঁকাআঁকি ডায়নামিক, অতএব ‘আর্ট’। অন্যদিকে ছুঁচের ডগা ফোঁড় দিতে দিতে ধীর গতিতে এগোয় যা মনের গতির সঙ্গে মেলে না। তাঁদের আঁকা গ্রাম্য, শিল্প শিক্ষার ছাপ তাতে পড়ে না। মেয়েরা শুধুই অভ্যেসে কাঁথা সেলাই করে। তাই সে ‘ক্রাফট’। এ এক অদ্ভুত যুক্তি! এই ব্যাখ্যা সংকীর্ণতার লক্ষণ। কাঁথা-শৈলী হারিয়ে যাবার পিছনে একটা বড়ো কারণ বাজার ক্রমশ ভরেছে কনজিউমার গুডসে। তাই শহুরে মানুষদের কাঁথাকে ভুলতে সময় লাগেনি। বর্তমান প্রজন্ম তো জানেই না ‘কাঁথা’ কী? তার উপর মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে কাঁথাস্টিচের নামে শাড়ির পশরা নিয়ে বাজারে নেমে পড়েছে প্রবঞ্চকরা।”

কাঁথা একান্তভাবেই নারীশিল্প। আরও ভালো করে বললে, গৃহস্থ-নারী শিল্প। একসময় গৃহস্থের প্রয়োজনে অবসর সময়টুকুও অপচয় করতেন না বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলারা। পুরোনো কাপড়ের খোল তাঁদের কাছে হয়ে উঠত ক্যানভাস, রঙিন সুতোগুলোর চলন তুলির স্ট্রোক আর তাঁরা শিল্পী। সকলের কাজই যে বাঁধিয়ে রাখার মতো হত তা নয়। তবে নিজস্ব সৃজন-শৈলী, ভাবনা ও অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার স্বতঃস্ফূর্তভাবে মাধ্যম হয়ে ছিল কাঁথা। আমাদের দুর্ভাগ্য, সেই কাঁথাকে অন্তঃপুর থেকে বের করে এনে ‘আর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করায় আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে আছি। এই দেশের আর্ট কলেজগুলোর টেক্সটাইল বিভাগের দিকে নজর দিকেই ছবিটা আন্দাজ করা যাবে। অনেক অভিভাবকই সন্তানদের ছবি আঁকা মূর্তি গড়া ইত্যাদি শেখাতে আর্ট কলেজে পড়াতে চাইলেও, সেলাইশিল্পকে তাচ্ছিল্য করেন।

কাঁথাশিল্প ক্রমে বাণিজ্যিক ও বিশ্বজনীন হয়ে উঠেছে ঠিকই, তবে একথাও অস্বীকার করা যায় না, এই শিল্পকে খানিক হেয় করেই ‘ক্রাফট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, পণ্য বানিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে। কাঁথাশিল্প আর কাঁথা সেলাইয়ের মধ্যে ফারাক আছে। বাঙালির নস্টালজিয়া-প্রীতিকে কাজে লাগিয়ে কাঁথাশিল্পের নামে নিম্নমানের কাঁথা সেলাই করা কাপড় বিকোচ্ছে যত্রতত্র।

ধরুনী, ক্রস, ভরাট, গুড়ি, রান, ডবল রান, তেরছা, কুচি, গাঁট, চেন, নিঃসরণ, ডাল, দোরোখো (কাঁথা দুপিঠ থেকেই দেখতে সমান হয়) – কাঁথাশিল্পে নানা ধরনের ফোঁড়ের প্রচলন ছিল। যেহেতু বেশিরভাগ কাঁথাই আজ বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে করা হয়, সেখানে শুধুমাত্র রান (সবচেয়ে কম সময় লাগে), ভরাট, ক্রস ও বেঁকি ফোঁড়ের প্রাধান্য দেখা যায়। নকশা হয় গতানুগতিক। পরিশ্রম থাকলেও যার মধ্যে গবেষণা বা নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টা থাকে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে অনিতা মিত্রর মতো শিল্পীরা শিকড়ে ফিরিয়ে নিয়ে যান, সেই সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে ভরসা দেন সেলাই শিল্পে নতুন পথ উন্মোচনের।

এই দেশের আর্ট কলেজগুলোর টেক্সটাইল বিভাগের দিকে নজর দিকেই ছবিটা আন্দাজ করা যাবে। অনেক অভিভাবকই সন্তানদের ছবি আঁকা মূর্তি গড়া ইত্যাদি শেখাতে আর্ট কলেজে পড়াতে চাইলেও, সেলাই শিল্পকে তাচ্ছিল্য করেন।

প্রসঙ্গত বাংলায় কাঁথাকে ঘিরে বাণিজ্য নতুন নয়। একসময় ভারতের নানা অঞ্চলের সেলাই শিল্প ছিল সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বিশেষ সংস্কৃতিপ্রসূত। যেমন এককালে বাংলার প্রাচীন বাণিজ্যিক রাজধানী সপ্তগ্রাম বা সাতগাঁও সূক্ষ সেলাই শিল্পের কাঁথার জন্য প্রসিদ্ধ ছিল। সেইসব কাঁথার নকশায় ভারতীয় ও ইউরোপীয় শিল্পের মেলবন্ধনে দেবদেবী, প্রকৃতি, জীবজন্তু, মানুষ ইত্যাদি স্থান পেত। দুই ভিন্ন ধারার সংস্কৃতি, ভাবনা ও সৃজনশীলতার মিলনের প্রামান্য দলিল ছিল এই সাতগাঁও কাঁথা। হুগলি জেলায় ষোড়শ শতাব্দীর শেষের দিক থেকে এই কাঁথার সন্ধান পাওয়া যায়। পোর্তুগিজ শাসনের পতনের পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও সাতগাঁও কাঁথা রপ্তানি করত।

সম্প্রতি, উইভার্স স্টুডিও রিসোর্স সেন্টারের উদ্যোগে Textiles from Bengal: a shared legacy শিরোনামে কলকাতার কেসিসিতে প্রদর্শিত হয়েছে সেই কাঁথার চমৎকার নিদর্শন। এছাড়াও, সাম্প্রতিক সময়ে বেঙ্গল বিয়েনেলের বহুচর্চিত কাঁথার ইনস্টলেশন, রাজ্য সরকার আয়োজিত নকশিকাঁথার বার্ষিক প্রদর্শনী বা ভারত সরকারের তাকদিরা বেগম—প্রীতিকণা গোস্বামীকে পদ্মশ্রী সম্মান, নিঃসন্দেহে সাধু উদ্যোগ।
____________

ছবি: নিজস্ব

Written by