
ভাঁজো। রাঢ়বঙ্গের লুপ্তপ্রায় একটি ব্রত। কায়দা করে নাচা ও শরীরকে ভাঁজ করে বা বাঁকিয়ে নাচানোকেই বলে ভাঁজো। নামটি এসেছে ভাঁজ বা কায়দা থেকে। আর এক অর্থে শরীরকে ভাঁজিয়ে আদিরসাত্মক মজা ছড়া ও বাজনার তালে নাচানো থেকেও ভাঁজো শব্দের উৎপত্তি হতে পারে। কোথাও কোথাও একে ভাঁজোই নামেও অভিহিত করা হয়। ভাদ্র মাসে ভাদু গানের মতো ভাঁজো নাচের ব্রতও উদযাপন করা ইন্দ্র দ্বাদশীর সন্ধ্যায়। এবছর ভাদ্র মল মাস থাকার কারণে অনেক জায়গাতেই আশ্বিন মাসেও পালন করা হল।

রাঢ়বঙ্গে বর্ধমান ও বীরভূম-এ প্রধানত প্রান্তিক সমাজের মেয়েরা আজও ভাদ্র মাসে পালন করে ভাঁজো ব্রত। ড: মিহির চৌধুরী কামিল্যা ভাঁজোর ব্রত নিয়ে বলেছেন, “ভাদ্র মাসের ইঁদ একাদশীতে ইঁদ পূজার পর ছাগ বলি স্থানের বা দুর্গা মণ্ডপ সংলগ্ন স্থানের কিংবা ইঁদুরে তোলা মাটির কিছু মাটি একটা আলপনা আঁকা নতুন বা বিগত বছরের ব্যবহৃত খোলায় বা সরায় কুড়ানো হয়। তার উপর ৭ বা ৮ রকমের কিছু কিছু করে ছড়ানো হয় ধান, বিড়িকলাই (খোটাবিড়ি), সরষে, শনবীজ, ছোলা, মটর, মুগ ও পোস্তদানা। খোলায় পরানো হয় শালুক ফুলের মালা। তারপর পূজার্থিনীদের সুবিধামতো পূর্ব্বোল্লিখিত স্থানের যেকোনো একটিতে আলপনা দিয়ে নানা ফুলে সজ্জিত করে খোলাটি রাখা হয়। তার পাশেই রাখা হয় পঞ্চপল্লব যুক্ত জলভর্তি ঘট। একেই বলে ভাঁজো।”
ভাঁজো হল শইসের প্রতীক দেবতা। কুমারী মেয়ের সমস্ত চাওয়া পাওয়া পূরণ করেন। মনে করা হয়, শইস পূজা করলে সম্পত্তি বাড়ে, বংশবৃদ্ধি ঘটে। যদিও এটি কৃষি উৎসব, আদিকাল থেকে চলে আসা ইন্দ্র পূজার সঙ্গে গভীর সম্পর্কযুক্ত। এখানে ইঁদুরে তোলা মাটিতে বীজ বপন করা হয়। শন, ধান, যব, খেসারি, ছোলা, খেসারী, পাট, সরিষা – এই ৭টি শস্যই বোনা হয় ‘শোষ’ পাতায়। তখন সাধভক্ষণ করানো হয়। ‘শস’ অর্থাৎ শস্য, আর ‘পাতা’ অর্থাৎ বিছানো।
আরও পড়ুন: ‘ছৌ’ যখন আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য

ভাঁজোতে নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয় লুচি, সুজি, মিষ্টি, পায়েস, গুড়পিঠা, নানা ধরনের ফল, দুধ, দই, চিড়া ইত্যাদি। বলি দেওয়া হয় আখ, শসা, গোটা সুপুরি, চালকুমড়ো ইত্যাদি। কুমারী মেয়েদের জন্য ছোটো ভাঁজো বা বিবাহিত নারীদের জন্য বড়ো ভাঁজো ব্রত উৎযাপন করা হয়। মেয়েরা ঢোলের তালে নাচতে নাচতে থেমে গিয়ে নিজেদের মধ্যে আদিরসাত্মক ছড়া কাটে, মুখে বলে – ভাঁজো লো কলকলানি মাটি লো সরা…

