
শাহী ইমামবাড়া
শহর কলকাতা এক আশ্চর্য নগরী, যেখানে পথে হাঁটতে হাঁটতে কান পাতলে শোনা যায় ইতিহাসের ফিসফিসানি, যা পথিককে বলে চলে বয়ে যাওয়া দিনের গল্প। কলকাতার বন্দর অঞ্চল ছাড়িয়ে কিছুটা গেলেই শোনা যায় তেমনই এক ইতিহাস, যেখানে গঙ্গার সংস্কৃতির স্রোতে মিশেছে গোমতীর সংস্কৃতির স্রোত। পশ্চিমবঙ্গের রাজধানীর বুকে উঠে এসেছে এক টুকরো উত্তরপ্রদেশের রাজধানী, কলকাতার কলতানে মিশেছে লখনৌয়ের মেহেফিল। কলকাতার কোথায় সেই জায়গা? জায়গাটা মেটিয়াবুরুজ (Metiabruz)।

ইমামবাড়ার ফটক
কিন্তু কলকাতার এই অঞ্চলে লখনৌয়ের সংস্কৃতি কীভাবে মিশলো? কেনই বা জায়গাটির নাম হলো মেটিয়াবুরুজ? এসব উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হবে দেড়শো বছরেরও আগের কলকাতায়। দেশে তখনও জ্বলে ওঠেনি মহাবিদ্রোহের আগুন। ব্রিটিশ সরকারের নীতিতে তখন একের পর এক রাজ্য চলে যাচ্ছে ইংরেজদের কবলে। সেই রকম সময়ে ১৮৫৬ সালে, যখন আওধের সিংহাসনে ওয়াজেদ আলি শাহ্ (Wajid Ali Shah) রাজত্ব করছেন, সেই সময় ইংরেজ সরকার পুরোপুরি দখল করলো আওধের সাম্রাজ্য। নবাব তখন বড়োলাটের সঙ্গে দেখা করতে এলেন ভারতের তৎকালীন রাজধানী কলকাতায়, উদ্দেশ্য রাজত্ব পুনুরুদ্ধার। এই প্রসঙ্গে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্ এবং তাঁর সৃষ্টি নিয়ে গবেষণারত শুভাশিস বক্সী বঙ্গদর্শন.কম-কে জানালেন, “ওয়াজেদ আলি শাহ্ ক্ষমতায় আসার আগেই ইংরেজরা লখনৌয়ের রাজত্বের প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ দখল করে নেন। এরপর ওয়াজেদ আলি শাহ্ ক্ষমতায় এলে তাঁর সংস্কৃতিমনস্কতার সুযোগ নিয়ে মাসিক একলাখ টাকা পেনশনের বিনিময়ে তাঁরা পুরোপুরি রাজ্য দখল করে নিতে চান। এই সময় নবাব কলকাতায় বড়োলাটের সঙ্গে কথা বলে রাজ্য ফেরাতে চাইলে বড়োলাট বলেন, লন্ডনে রানি ভিক্টোরিয়া যদি অনুমতি দেন তাহলেই একমাত্র রাজত্ব ফেরানো সম্ভব। এই কথা শুনে নবাব তাঁর মা এবং ভাইকে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা করিয়ে দেন। প্রমাদ গুনলেন কলকাতার ব্রিটিশরা। কারণ তাঁরা ভাবলেন রানির কাছে দরবার করলে হয়তো রাজত্ব ফিরিয়ে দিতে হবে। তাই তখন তাঁরা ওয়াজেদ আলি শাহ্ -কে বোঝাতে লাগলেন ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর রানি যদি নাকচ করে দেন তাহলে ওই পেনশনও বন্ধ হয়ে যাবে। ভীত নবাব তখন মা এবং ভাইকে আবার ফিরিয়ে আনতে চান। কিন্তু পথশ্রমে অসুস্থ হয়ে ওয়াজেদ আলি শাহের মা এবং ভাই পথেই মৃত্যুবরণ করেন। এরপরে তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন এবং লখনৌ থেকে আরও লোকজন নিয়ে এসে এখানেই গড়ে তোলেন দ্বিতীয় লখনৌ”।

ওয়াজেদ আলি শাহের সমাধি
জায়গাটির নাম মেটিয়াবুরুজ কেন? শাহী ইমামবাড়া-র এক কর্মী আমাদের জানালেন, মাটির আধিক্যের জন্য এই জায়গার নাম হয় মেটিয়াবুরুজ। ‘বুরুজ’ কথাটির অর্থ গম্বুজ জাতীয় বস্তু। বোঝা যায়, স্তুপাকৃত মাটি থাকার কারণেই জায়গাটির নাম হয় মেটিয়াবুরুজ (বুরুজ ব্রুজ-এর অপভ্রংশ)। শ্রী বক্সী আরও জানান, ওয়াজেদ আলি শাহ্ কলকাতায় পাকাপাকি ভাবে থাকতে শুরু করেন ওই অঞ্চলে বর্ধমান রাজার এক রাজবাড়িতে। প্রথমে ভাড়া হিসাবে এবং পরে ওই বাড়ি কিনে নিয়ে নতুন করে সাজিয়ে তুলে ‘সুলতান খানা’ নাম দিয়ে গড়ে তোলেন তাঁর নিজস্ব প্রাসাদ। যেখানে তৈরি হয় কলকাতার প্রথম চিড়িয়াখানা। জায়গাটি আজও ‘আয়রন গেট’ নামে পরিচিত হলেও সেই প্রাসাদ আজ কালের প্রবাহে অবলুপ্ত।

এখনকার আয়রন গেট অঞ্চল
সেই প্রাসাদ এবং চিড়িয়াখানা না থাকলেও নবাবের তৈরি ইরানি স্থাপত্যের শাহী মসজিদ আজও বর্তমান। যেখানে আজও প্রার্থনা করতে আসেন এলাকার মানুষ। মসজিদের প্রচলিত স্থাপত্যে অভ্যস্ত চোখ এখানে খোঁজে নতুনত্ব। শুধু স্থাপত্য নয়, কলকাতায় নবাবের আগমন সঙ্গে এনেছে নতুন সংস্কৃতি, নতুন খাদ্যাভাস। লখনৌ থেকে ঘুড়ি প্রস্তুতকারক, দর্জি, নৃত্যশিল্পী, বাদ্যকার এই রকম বিভিন্ন পেশার মানুষদের কলকাতায় নিয়ে আসেন ওয়াজেদ আলি শাহ্। এছাড়াও নবাবের সঙ্গে আসেন প্রচুর বাবুর্চি। যাঁদের হাত ধরে কলকাতায় এল বিরিয়ানি। শুধু বিরিয়ানি নয়; রেজালা, কাবাব, কালিয়া ইত্যাদি খাবার, যেগুলো এখন কলকাতাবাসীর প্রিয় খাদ্যের তালিকাভুক্ত, সেগুলোও এসেছিল এই বিচালি ঘাটের পথ ধরেই।
নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের বংশধর কামরান আলি মির্জা বঙ্গদর্শন.কম-কে জানিয়েছেন, “এই বছর অর্থাৎ ২০২৩ সাল ওয়াজেদ আলি শাহের ২০০ বছর (জন্মের দ্বিশতবর্ষ)। ১৮২৩ সালের ১৯ জুলাই ওয়াজেদ আলি জন্মগ্রহণ করেন। সেই উপলক্ষ্যে এই বছর জুলাই মাসে শিল্পী সৌম্যদীপ রায় একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এছাড়াও তাঁর স্মরণার্থে সারাবছর ধরেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা রয়েছে”।

শাহী মসজিদ
কলকাতার শাহী ইমামবাড়ায় আজও চিরনিদ্রামগ্ন অযোধ্যার ভাগ্য বিড়ম্বিত এই নবাব। তবে এই কথা সত্যি যে নবাবের ভাগ্যের বিড়ম্বনা কলকাতায় সৃষ্টি করেছিল নতুন ইতিহাস। তার ফলেই জলপথে গোমতী তীরের সংস্কৃতি গঙ্গার তীরে এসে তৈরি করেছে বাংলার ছোটো লখনৌ (Metiabruz — Kolkata’s mini-Lucknow)।
__________________
*লখনৌর অন্যান্য বাংলা বানান — লখনউ, লক্ষ্ণৌ
ছবি — নিজস্ব

