
উড়ন্ত শব্দের কাছে অক্ষরকর্মী হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। বললেন, তাঁর সারাজীবনের প্রত্যেকটি দরজা-জানলা খোলা রইল অবারিত, তুমি আমায় গ্রহণ করো হে নাবিক! হে ঈশ্বর! এরকমই আমাদের মাথার উপর শঙ্খ ঘোষ। সমুদ্রের মতো। ঢেউয়ের মতো। নিজের লেখার কাছে, যাপনের কাছে, সর্বোপরি যন্ত্রণা-বিদ্রোহের কাছে আজীবন সৎ থাকতে পারা কবির নাম শঙ্খ ঘোষ।
কবিতা বলছে সংখ্যালঘুদের কথা। অচ্ছুত আর দলিতদের কথা। অত্যাচারের কথা। এঁদের কথা কে শুনবে? কারা শুনবে? শঙ্খবাবু বলছেন, তাঁদের নিজেদের জোট বাঁধতে হবে। ৮৮ বছর বয়সে এ কথা উচ্চকণ্ঠে বলেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ।
কী চাইব আমরা কবিতার কাছে? তা কি শুধুই একপ্রকার দেওয়া আর নেওয়ার সম্পর্ক? মধ্যিখানে যে বিস্তৃত সাঁকো, তার উচ্চারণ কি মাধুর্যের নয়? ‘শব্দ আর সত্য’ গ্রন্থে কবি-অধ্যাপক শঙ্খ ঘোষ লিখেছেন, জীবনের কাছে অথবা কবিতার কাছে আমাদের অতিনির্মিত সচেতন দাবির ধরনটা খুব উচ্চারিত। আমরা চাই হৃদয় অথবা মেধা, জাদু অথবা যুক্তি, রহস্য অথবা স্বচ্ছতা, ব্যক্তি অথবা সমাজ, ক্ষমতা কিংবা ক্ষোভ, নম্যতা বা বিদ্রোহ, আসক্তি বা বিদ্রূপ। আমরা নির্বাচন করে নিই এর মধ্যে যে-কোনো এক দিক, মনে করতে থাকি সেটিই জীবনের সম্পূর্ণতা…।
শঙ্খ ঘোষের কবিতা যতবার পাঠ করা যায়, ততবারই নতুন অর্থ উদ্রেক করে। ধরা যাক, একটি কবিতার গড়ন আপাতভাবে প্রেমের। প্রথম পাঠ অভিজ্ঞতা থেকে এমনটাই মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় পাঠে সেই কবিতা বিদ্রোহের হয়ে যাচ্ছে। তৃতীয় বা চতুর্থ পাঠে সেই একই লেখা হয়ে উঠছে বিষাদের আখ্যান। যেন ফিসফিস বলে উঠছে কেউ, “চুপ করো, শব্দহীন হও”। এই অদৃশ্য মৌনতাই এগিয়ে দেবে যতি-চিহ্ন। আন্দোলনের ডাক দেবে মৌনতা। মৌনতা আদর করে মুখে ভাত পুরে দেবে। শঙ্খ ঘোষ তো এই বেঁধে বেঁধে থাকারই কথা বলতে চেয়েছেন বারবার।
শঙ্খবাবুর ২০১৯ সালে লেখা একটি কবিতা, যেখানে দুটি চরিত্র কথা বলছে। সংলাপধর্মী। কবিতার রাজনীতিটি চমৎকার। প্রথম চরিত্র বলছে, “শহরের বাবুদের কাছে গেছিলি কি?” উত্তরে দ্বিতীয় চরিত্র বলছে, “গিয়া কুনো লাভ নাই। বাবুরা একদিন হয়তো শহরের রাজপথ ভইরা দিবে মিছিলে মিছিলে। গরম গরম ধ্বনি দিবে। তারপরে দায় সারা হইল ভাইবা দিবানিদ্রা দিবে তারা। সামনে কুনো পথ নাই আর। অজাত-কুজাত আমরা, জঙ্গুলি মানুষ আমরা, অচ্ছুৎ দলিত—এককাট্টা হইয়া আমাদের কথা আজ আমাদেরই কইতে হইবে মা। এককাট্টা হইয়া লড়াই করন ছাড়া আর কুনো পথ নাই আজ।”
এই কবিতা বলছে সংখ্যালঘুদের কথা। অচ্ছুত আর দলিতদের কথা। অত্যাচারের কথা। এঁদের কথা কে শুনবে? কারা শুনবে? শঙ্খবাবু বলছেন, তাঁদের নিজেদের জোট বাঁধতে হবে। ৮৮ বছর বয়সে এ কথা উচ্চকণ্ঠে বলেছেন কবি শঙ্খ ঘোষ। এই কবির কলমেই আবার বেরিয়ে এসেছিল পাঁজরের কথা, কিছু ফিকে হয়ে যাওয়া ‘নেই মানুষের’ কথা, “পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ, রক্তে জল ছলছল করে/ নৌকোর গলুই ভেঙে উঠে আসে কৃষ্ণা প্রতিপদ/ জলজ গুল্মের ভারে ভরে আছে সমস্ত শরীর/ আমার অতীত নেই, ভবিষ্যৎও নেই কোনোখানে।”
শঙ্খ ঘোষের কবিতা উচ্চকিত ছিল না কোনোদিনই, মৃদু অথচ খানিক উইট ঘেরা উচ্চারণে তিনি আর পাঁচজন কবির থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। আজীবন এই মৃদু স্বভাব থেকে সরে যাননি। তিনি ভাবিয়েছিলেন, কিছু কিছু সময় ‘শব্দহীন’ হওয়াও প্রতিবাদ।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই, শঙ্খ ঘোষ সমাজ গঠনের কারিগর। পৃথিবীর অসংখ্য সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পালাবদলের ঘটনায় তিনি মুখর হয়েছেন। কলম ধরেছেন নিজস্ব ভঙ্গিতে। কখনও চুপ করে থাকেননি। তাই তিনি যখন বারবার অসুস্থ হয়েছেন, আমরা চিন্তিত হয়ে উঠেছি। ভয় পেয়েছি। এই একবিংশ শতাব্দীর তথাকথিত ক্ষয়ে যাওয়া সময়ে আমরা ভয় পাই শিরদাঁড়া হারানোর। সমস্ত জ্বালা-যন্ত্রণার কথা কাকে বলব? কে শুনবে? বিদ্রোহের কথা, বিষাদের কথা, ভালোবাসা বা প্রেমের কথা তখন কারা বলবেন?
দেশ, দেশের মাটি এবং শিকড় এই তিনটির প্রতিই ওঁর অনুরাগ প্রবলভাবে ব্যতিক্রমী। স্মরণে আসে ‘আপাতত শান্তিকল্যাণ’। “পেটের কাছে উঁচিয়ে আছো ছুরি/ কাজেই এখন স্বধীনমতো ঘুরি/ এখন সবই শান্ত, সবই ভালো/ তরল আগুন ভরে পাকস্থলী/ যে কথাটাই বলাতে চাও বলি/ সভ্য এবার হয়েছে জমকালো।”
এই ‘জমকালো’ সমাজে কবিরাই সত্য এবং অনিবার্য – এমন দাবি করতে ইচ্ছা হয়। শঙ্খ ঘোষের কবিতা উচ্চকিত ছিল না কোনোদিনই, মৃদু অথচ খানিক উইট ঘেরা উচ্চারণে তিনি আর পাঁচজন কবির থেকে স্বতন্ত্র ছিলেন। আজীবন এই মৃদু স্বভাব থেকে সরে যাননি। তিনি ভাবিয়েছিলেন, কিছু কিছু সময় ‘শব্দহীন’ হওয়াও প্রতিবাদ। সংবাদপত্রের শিরোনাম কবিতা হয়ে উঠেছিল ওঁর লেখায়। ‘পুলিশ কখনও কোনও অন্যায় করে না তারা যতক্ষণ আমার পুলিশ’ — এই পংক্তিও কবিতার লাইন হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, যে কোনও ব্যাভিচারের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানটা বুঝে নিতে আমাদের বারবার মনে পড়ে যায় এসব অমোঘ লাইন। কবিতায় এমন ‘সহজ’ হওয়াও খুব সহজ নয়। শঙ্খ ঘোষের কবিতায় আমরা কী পাই? দলিতের আর্তি, সাধারণ মানুষের হৃদয়ের অভিব্যক্তি, দর্শন, শ্রেণি বৈষম্যের স্বর, স্বদেশচেতনা, দেশভাগের ব্যথা, বাউলচেতনা, প্রকৃতিবাদ, রোম্যান্টিকতা, দ্রোহ, দুঃখের আর্তনাদ, ক্ষমতায়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, মধ্যবিত্ত মানুষের টানাপড়েন — কবিতায় তিনি অমর। শৃঙ্খলার মধ্যে যে ছন্নছাড়া আবহ, শঙ্খ ঘোষের কবিতার সেই ভাষা হয়ে উঠেছে আদি, অকৃত্রিম ও অনন্ত। তিনি বদলাননি, অথবা বদলে না যাওয়ার আরেক নাম শঙ্খ ঘোষ।

