বিষ্ণুপুরের ঐতিহ্য রাবণকাটা লোকনৃত্য

বিষ্ণুপুর নামটি শুনলেই যে দৃশ্যকল্প আমাদের সামনে ভেসে ওঠে তা হল— মল্লরাজদের রাজত্বের নিদর্শনস্বরূপ পোড়ামাটি ও মাকড়া পাথরে সৃষ্ট মদনমোহন, রাধাগোবিন্দ, জোড়ামন্দির, বৃহৎদুর্গ কিংবা লৌহনির্মিত সর্বাপেক্ষা বৃহৎ দলমাদন কামান। এছাড়াও, মল্লরাজাদের অবসর যাপনের অঙ্গ হিসেবে দশাবতার তাস, বিষ্ণুপুরীয় ঘরানার উৎকৃষ্টমানের সংগীতের মতো ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক বহুবিধ উপভোগ্য বিষয় বিষ্ণুপুরকে প্রাচীরের মতো জড়িয়ে রেখেছে। এবং এই বেষ্টনীর একেবারে কেন্দ্রেই রয়েছে ঐতিহ্যবাহী লোকনৃত্য রাবণকাটা— যা বিষ্ণুপুরবাসীর নয়নের মণির মতোই আজও উজ্বল।

দুর্গাপুজোর শেষলগ্নে দশমী থেকে দ্বাদশী পর্যন্ত সময়টিতে মল্লরাজভূমে কান পাতলেই শোনা যায় ফিকে হওয়া নাকাড়া, টিকারা, কাঁসি, ঝাঝনের শব্দ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে এগিয়ে আসছে। সঙ্গে আসছে একটি শোভাযাত্রা। যার প্রথম সারিতে রয়েছে জাম্বুবান, বিভীষণ, হনুমান, সুগ্রীবের ছাম অর্থাৎ মুখোশধারী দলের সঙ্গেই বাদ্যযন্ত্র বাদকের একটি ছোট্ট দল। যে দলের সঙ্গেই মালার মতো যুক্ত হচ্ছেন গ্রামের আঞ্চলিক অধিবাসীরা। আট থেকে আশি বছরের সকলেই সামিল এই শোভাযাত্রায়।

শেষ পর্যন্ত, ছামধারীর দল এসে দাঁড়াল কোনো এক গৃহস্থের দোড়গোড়ায়। গৃহকর্ত্রী তার বছর দুয়েকের সন্তানকে কোলে করে হাসিমুখে বেরিয়ে এলেন হেঁসেল থেকে। তারপর শিশুটিকে তুলে দিলেন ছামধারী জাম্বুবানের কোলে। তারস্বরে শিশুটি কেঁদে উঠতেই সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠলো নাকারা, টিকারা, কাঁসার আওয়াজ। শুরু হল, এক বিশেষ ভঙ্গিমায় জাম্বুবান, বিভীষণ, সুগ্রীব ও হনুমানের নৃত্যের সঙ্গে গ্রামবাসীদের উল্লাস। কিছুক্ষণ এমন নৃত্য চলার পরে জাম্বুবান তার কোল থেকে সন্তানকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিল। হাসিমুখে গৃহকর্ত্রী কিছু অর্থ প্রণামী হিসেবে ছামধারীর হাতে তুলে দিলে আবার সেই শোভাযাত্রা এগিয়ে চললো অন্য কোনো গেরস্ত-বাড়ির উদ্দেশ্যে। বিশেষত, যখন দশেরাকে কেন্দ্র করে রাবণদহন উৎসবে ভারতের বিভিন্ন অংশের জনজাতি মাতোয়ারা হয়ে ওঠে, তখন মূলত বাংলার এমনই প্রচলিত পরম্পরাকে সামনে রেখে বিষ্ণুপুরবাসী পালন করে রাবণকাটা পরব বা উৎসব।

মূলত, বিষ্ণুপুরের অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষরা এই ধরনের লোকনৃত্যে বংশপরম্পরায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। যাঁদের হাত ধরে এখনো এই লোকনৃত্যশিল্প বেঁচে রয়েছে তারা হলেন– সুকুমার অধিকারী, নারায়ণ বারিক, মিঠুন লোহার, রঞ্জিত গড়াই প্রমুখ।

মল্লরাজাদের সমসাময়িক প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন এই মুখানাচ। মূলত, বিষ্ণুপুরের অন্ত্যজ সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী মানুষরা এই ধরনের লোকনৃত্যে বংশপরম্পরায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। যাঁদের হাত ধরে এখনো এই লোকনৃত্যশিল্প বেঁচে রয়েছে তারা হলেন– সুকুমার অধিকারী, নারায়ণ বারিক, মিঠুন লোহার, রঞ্জিত গড়াই প্রমুখ। এঁদেরকে বাদ্যযন্ত্র (টিকারা, নাকারা, কাঁসি, ঝাঝ) বাজিয়ে সঙ্গ দেন সনাতন ধাড়া, শ্যামাপদ পণ্ডিত, তারাপদ ধাড়া, মধু দাসরা। তাঁদের সঙ্গে থাকেন দলের ম্যানেজার জয়দেব দত্ত। সারাবছর এই শিল্পীরা বিভিন্ন পেশায় জড়িত থাকেন। কেউ আইসক্রিম বিক্রি করেন, কেউ কেউ রাজমিস্ত্রির কাজ বা সব্জি বিক্রি আবার কেউ চুন বিক্রি করে নিজেদের সংসার চালান।

কথিত রয়েছে, একটা সময় ছিল যখন মল্লরাজারা এই লোকনৃত্য ও লোকশিল্পর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতেন। রাজাদের কাল আর নেই। এখন, বিষ্ণুপুরের সাধারণ মানুষরাই তাদের সাধ্যমতো অর্থপ্রদান করে থাকেন এই লোকপ্রসিদ্ধ পরম্পরাকে বহমান রাখতে।

এই ধরনের লোকনৃত্যে ব্যবহৃত মুখোশগুলি হল— জাম্বুবান (কালো), বিভীষণ (লাল), সুগ্রীব (সাদা), হনুমান (সাদা)। মুখোশগুলি গামার জাতীয় নরম কাঠের তৈরি। মুখোশের মাথায় লাগানো হয় পশমের মতো রঙিন চুল। প্রত্যেকটি মুখোশের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে নৃত্যশিল্পীরা পরিধান করেন লোমশ পোশাক। মাথায় একখণ্ড কাপড়কে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে তারপর পরিধান করা হয় মুখোশগুলিকে। এরপর শুরু হয় জাম্বুবান, বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমানের সমবেত নাচ। সঙ্গে বাজানো হয় টিকারা, ঝাঝ, কাঁসি ইত্যাদি। নাচের সময়ে প্রচলিত লোকাচার অনুযায়ী অনেকে ছামধারির পোশাক থেকে পশমের লোম ছিড়ে নিজের ঘরে রেখে দেন। অনেকের বিশ্বাস, এতে দূষিতজ্বর থেকে পরিবার পরিজনেরা রক্ষা পাবে। দশেরার প্রাক্কালে প্রত্যেকবার নতুন করে মুখোশগুলিকে রং করা হয়।

রাবণকাটাকে কেন্দ্র করে এই সময়ে বানানো হয় মাটির এক বিশালাকার রাবণমূর্তি ও সাজানো হয় রঘুনাথজীর রথ। দশমী থেকে দ্বাদশী অবধি তিনদিন ধরে এই ছামধারীর দল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে ঘুরে ঘুরে নাচ দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করেন।

রাবণকাটাকে কেন্দ্র করে এই সময়ে বানানো হয় মাটির এক বিশালাকার রাবণমূর্তি ও সাজানো হয় রঘুনাথজীর রথ। দশমী থেকে দ্বাদশী অবধি তিনদিন ধরে এই ছামধারীর দল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গ্রামের প্রায় প্রত্যেকটি ঘরে ঘুরে ঘুরে নাচ দেখিয়ে অর্থ উপার্জন করেন। এবং অনুষ্ঠানের শেষ দিন অথাৎ দ্বাদশীর রাতে বিষ্ণুপুরবাসী সমবেত হয় কাটানদার রঘুনাথজীর মন্দিরচত্বরে। অষ্টধাতুর রঘুবীর মূর্তিকে সাজানো রথে বসিয়ে জাম্বুবান, বিভীষণ, সুগ্রীব, হনুমানের সঙ্গে গ্রামবাসীরাও সমবেত উল্লাস করতে করতে এগিয়ে চলেন রাবণের উদ্দেশ্যে। জাম্বুবানের হাতে থাকা তরোয়াল দিয়ে রাবণের মস্তকছেদ করবার মধ্যে দিয়ে রাবণকাটা উৎসব-এর সমাপ্তি ঘটে। উৎসবের শেষে মাটির বিশালকার রাবণমূর্তিকে ভেঙে ফেলা হয়। আচার অনুযায়ী অনেকে এই মাটি  সঙ্গে করে নিয়ে যান ঘরে। সংসারের মঙ্গল কামনার্থে।

বিজয়া দশমীর বির্সজনকে কেন্দ্র করে  যখন বাংলার অন্যত্র শোনা যায় বিষাদের ঢক্কানিনাদ, তখন সমগ্র বিষ্ণুপুরে দৈত্যরূপী রাবণকে কাটার মাধ্যমে অশুভ শক্তি বিনাশের আহ্বানে শোনা যায় ঝাজ, টিকারার শব্দ। জাম্বুবান, হনুমান, সুগ্রীব, বিভীষণের মুখে ফুটে ওঠে হাসির ঝলক। তেমনই প্রশস্ত হয় বুক, ঐতিহ্যময় প্রাচীন সংস্কৃতিকে আজও চলমান রাখার গর্বে।

____________________

তথ্য সহায়তা: সুকুমার অধিকারী, শ্রেয় সেনগুপ্ত | কৃতজ্ঞতা স্বীকার: গুরুপ্রসাদ দে, সৌম্য সেনগুপ্ত

Developed by DXDasia